“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

রবিবার, ২৬ আগস্ট, ২০১২

কাটাকুটি খেলা...


- মোসলমানের পূত লুঙ্গি তোল। নিজেরে কাইট্টা তো তিন বিয়া করছত। অখন দেশটারে কাইট্টা ফালাফালা করতি!
লুঙ্গি তোল...'

এই শরীর ভাগের গল্প ঠিক কোন পর্যায়ে পড়বে আমি জানিনা। শরীরে জাত নামের কোন জীন জন্ম লগ্ন থেকেই ঈশ্বর ইঞ্জেক্ট করেন না এটা আমি জানি।
রক্তপাত করেই আমার শরীরের দখল নেয় ঈশ্বর অথবা আল্লাহ্‌।

আমার এই ঘটনার দুই চরিত্র অনিতা আর মুনির ভাই দুজনেই জন্ম লগ্নের অনেক পরে শরীরে জাতের ষ্ট্যাম্প সেঁটেছে। অনিতা জন্মেছে হিন্দুর ঘরে। তাই শাঁখা নোয়া পড়ে চলেছে পতিগৃহে ভারতীয় রেলের কামরায় চেপে।
আর মুনিরভাই জন্মের সাত বছর পরে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মুসলমানি করে সাচ্চা মুসলমান হয়েছে।
অর্থাৎ ঈশ্বর তাদের দখল নিয়েছেন। ব্রহ্মা নিয়েছেন অনিতার শরীর আর আল্লাহ্‌ নিয়েছেন মুনিরের শরীর। ওয়ান ইজ টু ওয়ান ভাগাভাগি করেই চলে দেশের মানুষ গুলির জাতপাত বিচার। রাষ্ট্রের কাছে তাই কেউ সংখ্যালঘু কেউ সংখ্যাগুরু অংশের মানুষ। শুধু ভোট চাই।

- আপনারা বিশ্বাস করেন না কেন আমি হিন্দুর বউ। আপনারা যাকে বলছেন মুসলমান, তিনি মুসলমান নন, আমার স্বামী। আমার জেলা কাছাড়। থাকি শিলচর।

পুরুষ জাতের কাছে নারীর শরীর মানেই সাপলুডো খেলার ছক। বাংলার মেয়েদের নাকি স্বাস্থ্য ভালো। তাই সাদা ঘর, কালো ঘর সব সমান। তাই সহজেই শিকার হয়, পুরুষের দানে লেগে যায় ছক্কা, পাঞ্জা।
অথচ অনাহারে, অনীদ্রায় থেকেও অনিতাদের অবিরাম তিন দশক ধরে চলে ক্রমাগত রক্তক্ষরণ নিঃশব্দে। এরপর একসময় রক্তাল্পতায়, আয়োডিনের অভাব, পুষ্টির অভাবে শুস্ক হয় বুক। শিশুর বুকে স্তন চেপে মারা পড়া একসময়।
নিহত মায়ের সিঁথির সিঁদুর, কপালের লাল টিপ আর হাতের লাল পলা সেই সধবার রক্তক্ষরণেরই ইঙ্গিত। যার ইতি হয় কবরে অথবা চুলায়।
পুরুষের কি দম্ভ। একটি আস্ত নারীর দখল পেয়ে প্রতিরাতে নিলাম চলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, এপাশ থেকে ওপাশে।
কোন অসুস্থ মানুষও বজ্জাত হয়না, বজ্জাত হয় আমাদের বোধ, ইন্দ্রিয়, ধর্ম।

- বেটির সাহস দেখ। বেজাইত্যা মাগী। হিন্দু হইয়া আবার মুসলমানেরে নিকা! চল আগে মালটারেই...

বাথরুমেই ফালাফালা করে চলল হিন্দু বউয়ের শরীর ভাগাভাগি। দেশটা তাই বেঁচে গেল আরেকবার, তৃতীয়বার ভাগ হওয়ার হাত থেকে।

সৃষ্টি কে বাঁচাতে নাকি নারাণ ঠাকুর টুকরো টুকরো করে দিয়েছিল সতীর দেহ। পোড়ামুখির আজও সৎকারও হলোনা ঠিকঠাক। স্বয়ং ঈশ্বরেরও বোধহয় সাহস ছিলনা সতী নারীর শরীর দাহ করার। সুন্দর শরীরকে মিটিয়ে দেয়ার স্পর্ধা আর লোভ তাই থেকে যায় আজও একান্নপীঠে।
কালীঘাটের বেশ্যা পট্টী দরকার। সমাজে যত্রতত্র অপরাধী পুরুষের স্খলন বন্ধ করতে।

হিন্দু বউয়ের শরীরের কাছে সেদিন নির্জীব হয়ে পড়েছিল দুষ্কৃতিরা। সেদিন ট্রেনের কামড়া থেকে ছুরে ফেলে দেয়া হয়নি মুনির ভাইকে।
নারীর আর কিছু কাঁটার থাকে না তো, শুধু শরীর আর লজ্জা ছাড়া। মেয়েমানুষের জাত লাগেনা। ধর্মেও তাই নারীর যৌনাঙ্গ কাঁটার কোন নির্দেশ নেই। পুরুষের আছে।
ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত ইন্দ্রদেবের বিচার এখনও ফাইল বন্দী। আমাদের বিচারবিভাগ কি শুধু হিন্দুদের জন্যই! গান্ধারীর কালো কাপড় বাধা মূর্তি, অশোক স্তম্ভ, গান্ধীজী শোভা পায় আদালতে। কোরানের কোন সূরা বা আয়াত নেই কেন এজলাশের দেয়ালে! ক্রশবিদ্ধ যীশুর ছবি মনে হয় পৃথিবীর তাবৎ বিচারব্যাবস্থার সিম্বল হতে পারে। এমন নির্মম হত্যাকান্ডের পিকচারাইজেশান কোন ধর্মে নেই!

অনিতার কপালের সিঁদুর আর শঙ্খ নোয়া খুলে নেয়া হলো হাসপাতালের ওটি তেই। একটা সবুজ কাপড়ের আড়ালে একটা মানুষের রক্তক্ষরণ চলছে। এই সবুজ উপত্যকার শরীর খারাপ হয়েছে আজ অসময়ে, দেবী কামাখ্যা ঋতুবতী হলেন আবার! কেউ প্রস্তুত ছিলেন না। ভেসে যাচ্ছে কামরূপ পাহাড়।

বিয়ের প্রথম রাতেও এভাবেই ভেঙ্গেছিল অনিতার নথ। মত্ত স্বামী উল্লাসে বিবস্ত্রা করেছিল অনিতার শরীর।
- শাঁখা পরিয়ে তোমার হাতে হাতকড়া বাঁধলাম সই। এবার আমার বশ্যতা স্বীকার করে নাও। আনন্দোল্লাসের রাত্রি আমার বিয়ের রাত্রি, খাইয়ে পড়িয়ে ধর্ষণের বৈধতা দেবে তুমি প্রিয়ে... অন্যথায় অবিবাহিতা আর সন্তানহীনা স্ত্রীজাতির মুখ দেখলেও পাপ! যাও অন্যথা পাকের পথে!
সতী তাই একান্ন টুকরো হয়। যৌনাঙ্গ থেকে জন্ম নেয় কামের দেশ। অনিতাদের দেশ অসম।

অনিতার সিঁথিতে বীরভুমের লাল মাটি। এই মাটির সোঁদা গন্ধ যখন নাকে এল তখনই ছাড়া পেয়েছিল অনিতা।

মুনিরভাইয়ের লুঙ্গির নীচে জাতকাটা দেখার সাধ ছিল বাহানা। সাধ ছিল পাহাড়িয়া কামরূপের বুক থেকে ভাদ্রের শস্য কেটে নেয়ার। আজকাল কচি তালের শাঁস দুফালা করে বিক্রী হয় বাজারে।

মুনির ভাই, এসেছিল বাড়ি ফিরে। অনিতা এখনও রেল হাসপাতালেই।
চার রাত্রি পার হয়ে গেছে, অনিতার শরীর থেকে রক্তপাত এখনও বন্ধ হয়নি। মুনির ভাই তিন রাত্রি কাটিয়েছে রেলের হাসপাতালেই।
রোজার শেষ দিনগুলি কেটেছে হাসপাতালের বারান্দায়। অনিতার জ্ঞান ফিরতে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল একবার। তখন ঈদের চাঁদ ছুঁয়েছে পৃথিবীকে। এই উপত্যকায় এবার ঈদের চাঁদও ছিল ফ্যাঁকাসে।
হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়েছিল।

অনিতা আবার চোখ বন্ধ করেছিল। আজও জ্ঞান ফেরেনি।

ট্রেনের কামড়ায় সহযাত্রী ছিল তাঁরা। অনিতা একাই দিল্লি ফিরছিল স্বামীর আব্দারে। মুনিরের পরীক্ষা ছিল।
মুনিরকে বাঁচাতেই দুষ্কৃতিদের সেদিন পরিচয় দিয়েছিল নিজের স্বামী বলে। শেষরক্ষা হলোনা।

কাটাকুটির খেলায় এক অনির্বচনীয় সত্যি। একজনকে কাটতেই হবে। সবুজ উপত্যকার ভাগ নেয়াটা জরুরী। নরম মাটির মানুষ, নরম ধানের দখল সহজ। তাহলেই বেঁচে যাবে হয়তো অনেক মুনির। অঙ্কটা হবে টু ইজটু ওয়ান। দখল নিশ্চিত হবে মসনদের আর দেশটার।

অনিতারা আজও হেরে যায় বন্ধু। কাটাকুটি খেলা চলুক, বাজী ধরেই হোক না আরেকবার! তবে কাপড় খুলে নামতে হবে মাঠে, একটাই নিয়ম এই খেলার।

লাশে তাজ পরালে সম্মান জানানো হয় না, কাপড় পরালে মনোরম হয়না কফিন, অপমান হয় মৃত্যুর।
অনিতা এখন কোমায় আছে। তাই একটা কাপড় দেয়া যেতেই পারে, চলুন না আপাতত নাহয় অনিতার মৃত্যুটাই নিশ্চিত করি আমরা।

৪টি মন্তব্য:

ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় বলেছেন...

'কাটাকুটি খেলা' - অসাধারণ , অসামান্য লেখা । সেলাম জানাই তোমাকে মিত্রপক্ষ । এ লেখা পড়ে কয়েক ঘন্টা আর অন্য কোন লেখা পড়তে পারিনা , আমার মধ্যবিত্ত বোধ কেমন যেন অসাড় হয়ে যায় ।

সুশান্ত কর বলেছেন...

হ্যা, ঠিক বলেছেন। হতে পারে কখনোবা তাঁর কবিতাতে শিল্পের দায় পেছনে পড়ে থাকে; কিন্তু সমাজের প্রতি দায়েরওতো মূল্য থাকা চাই।

অপরাজিতা বলেছেন...

এ লেখাটির ওপরে কোনো কমেন্ট করতে গিয়ে থমকেই আছি। লেখককে স্যালুট বলাটাও হিপোক্র্যাসীর মতো লাগছে। কারণ, এ দহন স্যালুট চায় না, মলম চায়। প্রতিকারের স্বপ্ন দেখাটাও এখন আমার কাছে প্রতারণা মনে হয়, নিজের সাথে, অসহায় মানুষগুলোর সামনে দিয়ে পার হয়ে যাবার ছুতো ছাড়া আর কোনো মূল্যবোধ বহন করেনা তা। নারী-শিশু-পুরুষ, আহা কই মানুষ? জোর যার মুল্লুক তার। প্রতিটি মহিলার অস্ত্র চালনায় দক্ষতা অর্জন করা উচিত, সে খুন্তি/দা'ই হোক না হয়! যে দা-খুন্তি'ই তাদের আইডি কার্ডের মনোগ্রাম।

অপরাজিতা বলেছেন...

এ লেখাটির ওপরে কোনো কমেন্ট করতে গিয়ে থমকেই আছি। লেখককে স্যালুট বলাটাও হিপোক্র্যাসীর মতো লাগছে। কারণ, এ দহন স্যালুট চায় না, মলম চায়। প্রতিকারের স্বপ্ন দেখাটাও এখন আমার কাছে প্রতারণা মনে হয়, নিজের সাথে, অসহায় মানুষগুলোর সামনে দিয়ে পার হয়ে যাবার ছুতো ছাড়া আর কোনো মূল্যবোধ বহন করেনা তা। নারী-শিশু-পুরুষ, কই মানুষ? জোর যার মুল্লুক তার। প্রতিটি মহিলার অস্ত্র চালনায় দক্ষতা অর্জন করা উচিত, সে খুন্তি/দা'ই হোক না হয়! যে দা-খুন্তি'ই তাদের আইডি কার্ডের মনোগ্রাম।