Sponsor

.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

Thursday, August 25, 2016

সুরমা গাঙর পানিঃ উজান পর্ব ১০

(দেশভাগ এবং পরের দশকের কাছাড় সিলেটের প্রেক্ষাপটে রণবীর পুরকায়স্থের এই উপন্যাস ছেপে বের করেছে দিন হলো। ভালো লাগা এই  উপন্যাস পুরোটা টাইপ করে তুলে আমার প্রিয় কথা শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। আশা করছি আপনাদের সবার এটি পড়তে ভালো লাগবে। সম্পূর্ণ উপন্যাসের সংলাপ ভাগটি সিলেটিতে -সে সম্ভবত এই উপন্যাসের সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক। আপনাদের পড়বার সুবিধে করে দিতে, ঈশানে এই উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে আসছে। আজ তার  উজান  পর্বের অধ্যায় দশ  ---সুব্রতা মজুমদার।) 



দশ
 শুকনো ভুতুড়ে রাতের পর রাত কেটে যায় অনেকদিন । জমিদারের দেওয়া বাড়ির চৌকাঠ পেরোয় বৃষ্টির জল । অবিশ্রাম বৃষ্টির শব্দ বৈতলের রক্তে দোলা দেয় । বৈতলের মাথার ঠিক থাকে না । বর্ষা এলে মানুষের কষ্ট হয়, দুর্দশা বাড়ে, বৈতলের ধরে নেশা । ঘরে থাকতে পারে না । তবে যে যাই বলুক দুঃখ দুর্দশার মধ্যেই গরিব মানুষ কিন্তু বর্ষা ঋতুকে রানি বানিয়ে রাখে । বাকি পাঁচ ঋতুর খবর এখানে কেউ রাখে না । বর্ষাকে মন রাখে, এত সুখের কষ্ট তো কেউ দেয় না বর্ষার মতো । সারা বছর ধরে চলে শুধু প্রস্তুতি । উৎসবের মালাগাঁথা । সুখ সওয়া জলের সঙ্গে । ঘর বাঁধা হয় শক্ত করে শন বাঁশ বেত দিয়ে ছাওয়া হয় চাল । জলের সঙ্গে লড়াই এ কোনও প্রতিরোধ টেকে না । উঁচু করা হয় ভিটে । রূপসী বর্ষার ছলাকলার কাছে হার মানে সব । দুঃখী মানুষ হয় আরো দুঃখী । ঘাটিবাটি সব ভেসে যায় জলে, বেহায়া মানুষ যে জল শুকিয়ে গেলেও সুখী হয় না পুরোপুরি । আর বছরে আবার এসো বলে আগাম আমন্ত্রণও জানিয়ে রাখে ।
     সুখের সঙ্গে ভিজে সময়ের একটু মন খারাবিও আছে । একলা থাকলে হয় । মন ভাল করতে বৈতল তিন বন্ধুকে ডাকে বাঁধের উপর । ভেজা মনকে ওম দিতে বন্যা জলের ছপ ছপাশ কাটিয়ে সবার আগে পৌঁছে যায় সংকেত স্থানে । আধভেজা তফন এর খুঁট থেকে বের করে বিড়ির বান আর দিয়াশলাই । নাসিরউদ্দিন আর ঘোড়ার মাথা ।
     ভেজা শলই খটশখটশ করে । একটার পর একটা কাঠি থেকে বারুদ খসে । বৈতলেরও জেদ চাপে । দাঁতের চাপে বিড়ির ক্ষত গভীর হয় । নেশার ঘোরে বৈতল জলবন্দি শিলঙ্গি মাছের মতো ঘাই মারে বাঁধের উপর । দাপিয়ে বেড়ায় ডাইনে বাঁয়ে । কোথায় যাবে আগুন আনতে । ভেজা মনকে চাঙা করতে গরিবের একমাত্র ওম বিড়ির ধোঁয়া । এক টানেই রোদে ঝলমল করবে মনের আকাশ । দিয়াশলাই যদি না জ্বলে বিড়ির বান দিয়ে কী হবে । কী আবার হবে, উপায় বের হবেই, দুঃখে থেমে থাকার মানুষ নয় বৈতল । জল ডিঙিয়ে যাবে লোকালয়ে, নিয়ে আসবে ইন্ধন । আবার যাওয়া আসার ভাবনায় গতি আনতে এদিক ওদিক তাকায় বৈতল । এমন সসাগরা সন্ধ্যা সে দেখেনি অনেকদিন । দুদিকেই অথৈ জল । একদিকে ঘোলাজলের ভরভরাট বরাক নদী, ওপারে দুধপাতিল গ্রামের আভাস শুধু জলে ভাসা বাড়ির চাল আর সুপারি গাছের বামন অস্তিত্বে । অন্য দিকে, যে-জল দিয়ে সে এল ছপছপিয়ে, সেদিকে বৃষ্টিজলে মগ্ন শহুরে মানুষের সংসার । সংবৎসরের জল উৎসব ।      
অতিবর্ষণের বিকেল বেতলা শলইর মতোই মনমরা । কানি কাপড়ের মানুষ খাদ্য ও বাসস্থানের খোঁজে যাচ্ছে উঁচু জায়গায় । কিছু থাকল পড়ে, কিছু মাথায় নিয়ে হারাধনের দল চলে, কাছাড় হাইস্কুল, নর্মাল স্কুল, গভর্নমেন্ট স্কুলের দিকে । সারাদিন বৈতল অনেক টিপ দিয়েছে । একবারও যাইতাম নায় বলেনি । এমন কি ত্রাণ শিবিরের গরম খিচুড়ির গন্ধও বৈতলকে আকুল করেনি । বর্ষায় টেলটেলে জলের মতো গরম খিচুড়ি বড় প্রিয় তার । মানুষের দুর্দশায় বৈতল ভুলেছে তার প্রিয় । শরীরে এসেছে অমানুষিক শক্তি । সপসপসপ জলের ভিতর প্যাডেল ঘোরে আর বৈতলের মনে পড়ে আর এক প্রলয়রাতের কথা, মালির ভিটা কালিবাড়িতে জড়ো হয়েছে হিন্দু মুসলমানের সম্মিলিত এক মানুষ দল । ভাটির দেশের বন্যায় শহুরে বৈচিত্র্যে নেই । ডুবে গেলে ত্রাণের কোনও ব্যবস্থা নেই । এর মধ্যেই বৈতল আর লুলা প্রলয় জলে ঝাঁপ দেয় । লুটপাট করে, এক কথায় ডাকাতি করে রসদ সংগ্রহ করে । সর্বহারা মানুষের মুখের হাসি দেখে মনে হয়েছে এরকম লুটপাট সে বারবার করতে পারে । ভুল ঠিক কিংবা পাপ পুণ্যের লড়াইএ থাকে না বৈতল । বৈতলের মনে এক বিচারশালা আছে, যেখানে সওয়াল হয় না জবাব মেলে তৎক্ষণাৎ । লুলাকে দন্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত বদল হয়নি তাই । এরকমই এক দুর্যোগের মাঝে উথালপাথাল পিয়াইনের জলে লুলাকে সমর্পণ করে বলেছে বৈতল, পবিত্রোপবিত্রবা । যেমন করতেন দুর্গাবতীর বাবা ভুড়ুৎ ঠাকুর । ঘাটব্রাহ্মণ মরা মানুষকে পবিত্র করে স্বর্গের দ্বার খুলে দিতেন । পিতার মৃত্যুর পর দুর্গাবতীও হতে চায় তিলকাঞ্চন করার অধিকারী । পাকিস্তান হয়ে-যাওয়া দেশেও তাকে দেয়নি অধিকার । নারীর অধিকার বড় শক্ত মানুষ সমাজে । তবে বৈতল তার বুদ্ধি দিয়ে দুর্গাকে দিয়েছে অধিকার । হরিৎবরণ ঠাকুরবাড়ির পূজারিণী হয়েছে বৈতল পাটনির ঘরণী ।
     বৈতলের বাপ বলে মাইমলের বুদ্ধি থাকে নৌকোয় । বলে,
--- ‘তেলির বুদ্ধি চুঙ্গাত আর পাটনির বুদ্ধি ডিঙাত’ ।
     তাই জল আর ডিঙা দেখ্‌লেই বৈতলের বুদ্ধি চড়চড় করে । দুষ্টবুদ্ধিও খেলে । গৃহস্থ বাড়ির গরুর ‘ডিগরা’ খুলে নেওয়ার মতো অচেনা মাঝির নৌকাও খুলে দেয় বৈতল । ভরা নদীর মাঝখানে গিয়ে বৈঠা উঠিয়ে রাখে গলুইএ । মনপবনের নাওকে বলে, যথা ইচ্ছা তথা যাও । কুড়ুলাকে ডাকে । বলে,
--- আয় দেখি তোর কত শক্তি, বৈতলরে নে । দেখি তোর কুড়ুলার ভিত্‌রে কত কুচক্কইর
 মাঝনদীতে নৌকা ছেড়ে ঝাঁপ দেয় জলে । ঘাটে এসে ওঠে আবার নদীর জলে থপথপায় । নদীকে সাবাশি দেয় । বৈতল জানে জল তার প্রতিদ্বন্দ্বী নয় । জল তার শক্তি । পুকুর হোক খাল হোক হাওর বিল নদীর জল সুন্দর হয় বর্ষার নতুন চাদর গায়ে জড়ালে । জলভরা নদীতেও তাই বৈতল ফিরে পায় তার রাজ্যপাট । কৈশোরের মিরতিঙ্গা যেমন, নতুন দেশের অসমাপ্ত পুলের চার নম্বর খুঁটি যেমন । যেমন এই বর্ষণ সন্ধ্যায় বরাক নদীর মাটি বাঁধের দুপার গঙ্গা ।
     বিপর্যস্ত মানুষের অসংখ্য নৌকা বাঁধা আছে বাঁধের গায়ে । বৈতল একটা নিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারে ডিঙা ভাসানে । একবার মুখোমুখি হওয়া নদীজলের । থপথপিয়ে সাবাশি দেওয়া নয়, থাবড়া মেরে ধমক দেবে এবার । বলবে থামাও এবার । বলবে,
--- থামাও বেটি । তুমি বুলে মা, ইতা কিতা কর । দুর্গাবতীয়ে তুমারে পুজা করে, তেল সিন্দুর দেয় । কত বৌ বেটি হকল আইন তুমার কাছে, তুমার বর চাইন । মা বাপ জামাই পুয়া পুড়ি নাতি নাতন লইয়া সুখে থাকার আশীর্বাদ চাইন তুমার কাছে । তুমি ইতা কিতা কর । মাইনষর ভালা দেখতায় পার না নি ।
    বৈতল এককোষ ঘোলা জল হাতে নিয়ে ঢালে নদীর বুকে । ভক্তি ভরে প্রণাম করে নদীকে । বলে আবার ।
--- থামাও বেটি ।  
বৈতলের মন ভাল হয়ে যায় । দাঁতের ফাঁকে ধরে রাখা বিক্ষত বিড়ি মুখ থেকে জলে ছুঁড়ে ফেলতেই আবার বিরক্ত হয় । বান খুলে নতুন বিড়ি নেয় মুখে । শেষ চেষ্টা আবার । ফুসফাস করে সবকটা বারুদ ভাঙে কাঠের কাঠির গা থেকে । আগুন যন্ত্রের প্রতারণায়, অসহায় আক্রোশে ঘোড়ার মাথা ছুঁড়ে ফেলে জলে । কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে আসে বৈতলের পায়ে । অগ্নিদৃষ্টিতে জলের কৌটোয় তাকায় বৈতল । জলে আগুন জ্বলে । বিদ্রূপের আগুন জ্বালিয়ে দেয় তাকে । ক্রুদ্ধ বৈতল বলে,
--- শালা বেইমান ।
পিটির পিটির বৃষ্টির সঙ্গে পুটুর পুটুর বিড়ি ফুকতে ফুকতে এসে জড়ো হয় আরো দুই বন্ধু । একজনের মুখে জ্বলন্ত বিড়ি আর একজনের মুখে হাড় জ্বালানো মুচকি হাসি বছই আর দুখু ।
বৈতল জানে মুশকিল আসান এসে গেলে আর চিন্তা নাই । দুখুর উপর বৈতলের ভরসা যেমন, লাগও বেশি । বৈতল যে-কোনও কারণেই ভুবনের রাগ নামিয়ে দেয় দুখুর উপর । দুখুর কথায় মিষ্টতা নেই । কাঠ কাঠ কথায় যে-কোনও সময়ই আগুন লাগতে পারে । তাই বৈতলও দুখুর সঙ্গে ব্যবহারে অকারণ নিষ্ঠুর । রেগে যায় কথা না শুনেই । এতক্ষণের মেঘলা আকাশ, বৃষ্টি আর বন্যার কল্যাণে রাগ বাড়ে । ঘোড়ার মাথার আগুন নষ্ট হওয়ার ক্রোধ জ্বলে ওঠে বছইর মুখের বিড়ির আগুনে । বছইর উপর জমা রাগও গিয়ে পড়ে দুখুর হিসিবে । রাগের সঙ্গে যোগ হয় বেঁটে মানুষটির ফিচেল হাসি । বৈতলের দুর্দশার খুশি । তার মানে, ওর বিড়ম্বনা লুকিয়ে দেখেছে দুজনেদুখুর গায়ে অপরিসীম শক্তি, তাই পারতপক্ষে গায়ে হাত দেয় না বৈতল । মুখেই চলে লড়াই । বলে,
--- শালা, এগুয়ে বিড়ি ফুকের আর ভাবের দুনিয়া কিনি লাইছে । আর এগুয়ে ভাবের হে টানে না এর লাগি সাধু । ইগুয়ে খায় আরো বেশিসবর ধুমা একলগে টানে । ডুব দিয়া জল খাছ বেটা ভাবছ একাদশীর বাপেও টের পাইন না । হালার হালা ।
এবার মুচকি হাসিতে বছইও যোগ দেয় । আঙুল আর হাতের তালুর মধ্যে নিপুণ প্রক্রিয়ায় লুকিয়ে রাখে বেহেস্তের আগুন । বৈতলকে দেয় বিড়ির টুকরো । বলে,
--- নে ধরা ।
ধরে না তিতা ভিজা বিড়ি । বৈতলের রাগ আবার ওঠার আগেই বছই নিয়ে নেয় বিড়ি । ভাঙা চেয়াল ফুকফুকিয়ে ধরিয়ে দেয় বৈতলকে । তিনজনের মুখ তৎক্ষণাৎ খুশিতে উজ্জ্বল হয় । দুখুটা অতি হারামজাদা । খুশির মধ্যেই মারে চিমটি । বলে,
--- অখন ক । কারে কইলে বেইমান ।
--- কারে আবার কইলাম । তুই বেশি শুনছ ।
--- শেওরা গাছর তল থাকিনু আমরা দেখলাম তোর ফালাফালি ।
--- দেখচছ তে কিতা অইছে । পয়সা কিতা গাঙে দি ভাইয়া আয় নি । দুই পয়সার শলই ইগু গেল । এর থাকি শ্যাম কম্পানির সূর্যমার্কাউ ভালা । আগুন ছাড়া বিড়ি ধরে নি ক । আর দেখলেউ যখন, তখন আর মুশন মারলে কেনে লুকাইয়া ।
--- দেখলাম কিলাখান ধুমাগান্ধ্রা বেটা তুই । ধুমার লাগি পাগল অই গেলে । কেনে খাচ । ছাড়ি দেছ না কেনে ।
      বিড়ির ওম পেয়েও বৈতলের মাইমলি রাগ কমে না । দুখুর উপদেশ শুনে আবার তেলেবেগুনে জ্বলে । বলে,
--- ছাড়তাম কেনে । তোর মতো নি ডুব দিয়া পানি খাওরা । তোর মতো রাড়ি বেটির জীবন নায় আমার ।
দুখুর বৌ মরেছে অনেক কাল । দুখুকে নিয়ে সত্য মিথ্যা অনেক কথা । খুন ছিচকেমি গুণ্ডামি সব ক্রেছে । বৌকে মেরে এখন আধা পির । আর বিয়ে করেনি । মামুর খেদমতি করে মনে প্রাণে । বন্ধুদের সঙ্গ দেয় সব অপকর্মে । বৈতলের সঙ্গেও বাসনের ঝনঝনি চালায় । বৈতল কিংবা দুখু কেউই কড়া কথা হজম করে না বলে কড়া কথাই বলে দুজন দুজনকে । দুখু প্রত্যুত্তরে বলে,
--- অই পুঙ্গির বাই । বৌ নাই তে কিতা অইছে । তোর তো হালার হালা থাকিয়াও নাই ।
--- কিতা কইলে হালা বাঙাল । আবার ক । কল্লা লামাইলিমু কইলাম ।
বৈতল রাগলে তার শরীর থেকে মাছের গন্ধ বেরোয় । মাছের তেলের আঁশটে গন্ধে ভরে যায় চারপাশ । বেঁটে মানুষ দুখুরও আঁতে লাগে ঘা । বিষ ঝাড়ে কথায় । বলে,
--- আমি কইতাম কেনে । হক্কলেউ কয় ।
--- কিতা কয় ।
--- কয় তুই ধ্বজভঙ্গ । তর বউ তোর লগে হয় না ।
--- কার লগে হয় তোর বাপর লগে নি ।
--- বাপ তুলিয়া মাতিছ না বেটা রিফুজি । ভালা অইত নায় কইলাম । আমার বাপ নায়, তোর বাপ অউ জমিদারর কুলো হয় । আর শুনতে নি । মাইনষে কয় পুড়ি ইগুও তোর নায় । আর কিচ্ছু ।
--- আর সব কথা কইছ, পুড়ি লইয়া মাতিছ না দুখু । আমার মাথা ঠিক থাকত নায় ।
ক্ষীণকায় বৈতলের রাগ দেখেনি দুখু । আলদসাপের বিষ ঝড়ে টুপটাপ । তখন দুখুর গায়ের জোরের কথাও ভুলে যায় । শুধু গায়ের জোরে কিছু হওয়ার নয় জানে বৈতল । শক্তিমান দুখুকে কাবু করতে জানে বৈতল । মনের জোরে বৈতল সব পারে । কিন্তু দুখুর সঙ্গে তার লড়াই যে সমানে সমানে । কম সেয়ানা তো নয় মামুপিরের খিদমতগার । লড়াই ঝগড়ায় ডাকাত মানুষটা মন দিয়ে প্যাঁচ কষে । অকারণে শরীরকে বেগার খাটতে পাঠায় না । বিশ-মেশানো হাসিতে প্রতিপক্ষকে কাবু করে । লুলার সঙ্গে এই অমিলটা কিছুতেই মেলাতে পারে না বৈতল । লুলাও হাসে, তবে লুলার হাসি যে অনাবিল । লড়তে লড়তে লুলা দান ছেড়ে দেয় । দুখুও তাই করে । তবু কেন যে দুখুকে বড় রুক্ষ মনে হয় বৈতলের । মনে হয় রহস্যময় । দুখুর মনের নাগাল পায় নাআবার দুখু কাছে থাকলে মনে হয় সে নিশ্চিন্ত । বন্ধু থেকে অভিবাবক বাশি । বড় বেশি মাতব্বর । লুলা বৈতলকেই ওস্তাদ মানে । দুখু দুখুর মতো, বৈতল বৈতলের মতো । দুজনেই রাজা, দুজনেই নেতা, আর দুয়ে মিলে একও । বৈতলের কোনও পিছুটান নেই দুখুকে নিয়ে, যে যার মতো চলে ওরা । লুলাকে নিয়ে সব আতান্তর বৈতলের, লুলা যে তার খেলার পুতুল । লুলার মনটা বড় নরম । তাই হয়তো বৈতলের মায়ের পক্ষপাত বেশি লুলার প্রতি । লুলা বাড়িতে এলেই মায়ের মন খুশি হয়ে যায় । ঝলমলানো খুশি নিয়ে মা বলে,
--- দুই ভাই মিলামিলি থাকিছ রে ।
 বৈতলকে পাঠিয়ে দেয় মকবুলবাড়ি । লুলা যে মুরগি খেতে ভালবাসে । ঝুঁটি ঝুলিয়ে বাচ্চা পাখি এনে ফেলে দেয় বৈতল মায়ের উঠোনে । কঁকর কোঁ করতে করতে বাচ্চা মুরগি দৌড়য় আবার মকবুলের বাড়ি । দুই বন্ধু দৌড়ে গিয়ে ধরে আনে । বৈতলের বোকামি দেখে মা রাগে না, হাসে শুধু । লুলাকে বলে,
--- নে বেটা বিসমিল্লা করিলা
 বৈতল বিসমিল্লার অর্থ বুঝে না, লুলাও অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে । মা বলে,
--- আমার সামনে কাটিছ না । লই যা গি হাওরর পারো, বিন্না খেতর ধারো জবাই করি ধইয়া উইয়া লই আইছ ।
     রান্না ঘরের মাচান থেকে মাটির হাঁড়ি বের করে দেয় লুলার হাতে । লুলাও অতি উৎসাহে খুলে ফেলে তার লুঙির গাট্টি । গাট্টিতে থাকে বিচিত্র সব সরঞ্জাম । লাল কালো সুতোয় বাঁধা ছোট ছোট সব গাছের জড়ি । কাচের শিশিতে সাদা রঙের তেল । লুলা হাসে আর বলে,
--- ‘ঘরে ঘরে গিয়া বেজ নানা গীত গায় ।
পেটের কারণেতে রুল আমিন সারিন্দা বাজায়
  মুর্দা দিলে জিন্দা করে কুদরতে রব্বানি ।
--- তুই সারিন্দা বাজাছ নি, গানও গাইতে পারছ নি বে ।
--- না বে । ধান্দামি করলে কততা কওন লাগে । বাজানে বুলে আরো কিতা কিতি কইত আর জড়িবুটি বেচত । ইতা নানার কাছ থাকি শিখছি । সাপর বিষ একরতি আট আনা ।
     সাপের বিষের কথা শুনে বৈতলের মার মুখে হাসির উদ্ভাস দেখে ভয় পায় বৈতল । মা লুলাকে বলে,
--- আমারে দিছ চাইন একটু রাখমু নে । কত নিবে ।
--- তুমারে মাগনাও দিতাম নায় । এমনেউ খাইলাও, মরতায় নায় । ইতা মিঠা, নাইরকল তেলো তেতই বিচির গুড়া মিশাইয়া বিষ বানাইয়া মানুষ ঠগামি । আমিও ঠগাই
--- তুই কেমনে ঠগাইবে । আমারেউও ঠগতে দিলে না
--- তুমারে কেনে ঠগাইতাম । তুমি আইলায় মা বেটি ।
লুলার মা নেই, তাই বৈতলের মার আদর আদায় করে । বৈতলকে বোকা মাও পটে যায় লুলার মিষ্টি কথায় । বৈতলের হিংসা হয় । লুলার গাট্টিতে আরো কত ধনরত্নতিন চারটে খাগের টুকরো কাগজের ‘তাও’ কয়েকটা, সাদা এবং ছেরেং ভেরেং লেখায় । একটা কালির বড়ি, চিনামাটির সাদা দোয়াত । লুলার আছে চটি চটি বই । একটায় আকাশের জিল্‌কি টুকরো করে সাজানো । লুলা বলে,
--- ইটা আমপারা । কুরাণ পড়ন লাগব নানি বেটা, আল্লাপাকে নবিরে যে লাখান কইছইন সব লেখা আছে আরবি ভাষাত ।
ছোট বৈতল লেখা পড়া জানে না । কিন্তু বাংলা বই, বাংলা লেখা দেখেই বুঝতে পারে । লুলার অন্যান্য বই দেখে বলে,
--- তুই বাংলা জানছ নি ।
--- আমি কিচ্ছু জানি না বেটা । আমিও শিখতাম ।
--- আমারে শিখাই দিবে নি ।
--- দিমু নে ।
--- জানছ নি, আইর পুথি লেখা অইছে বাংলাত । করিমগইঞ্জ থাকি আয় । আমি শিখতাম । বাংলা শিখিয়া আমি একদিন মনসামঙ্গল গাইমু দেখিছ ।
    মুরগি জবাইর অস্ত্রও আছে লুলার পেটিকায় । দুই ইঞ্চির এক ভাঁজ করা ছুরিঅতি উৎসাহে নখের টানে খোলে লুলা । চার ইঞ্চির ভোঁতা অস্ত্রে মুরগির গলা ঘষতে ঘষতে বিড়বিড় করে লুলা । বৈতল বলে,
--- কিতা মাতরে বে ।
--- চুপ যা । ইতা মাতন লাগে । আল্লাপাকর নাম নেওন লাগে
--- মন্ত্র পড়বে নি । জরৎকারুমুর্নিপত্নী বাসুকি ভগিনীস্তথা মনসা দেৈব্য নমঃ ।
      বৈতলের মায়ের যে কত রুপ । মাটির হাঁড়িতে মা রান্না করে দেয় লুলাকে । বৈতলকে দেয় না । চান করে এসে বৈতলকে ভাত বেড়ে দেয় । বৈতলের জন্য মুরগি বরাদ্দ নয় । মিষ্টি কুমড়ো আর ঘাঘটশুটকির ঝোলও বিস্বাদ লাগে । বৈতল রাগে । মার উপর রাগে থালা ছুঁড়ে দেয় । বলে,
--- ইগুরে মুরগি খাওয়াও, আমারে কেনে দেও না । ইগুকুনু তুমার পুয়া নি ।
--- অয় হেও আমার পুয়া । খা রে বাবা খা । হারা বছর যখন পাঠা খসি খাও, হাস কাঠুয়ার মাংস খাও, তারে দেওনি । তার নু মা নাই হে আইছে দুই দিনর লাগি, আকতা যাইব গিয়া ।
--- ইগুয়ে কিতা খায় জানো নি । ইগুয়ে গরু খায় ।
--- খাউক, তার ভালা লাগলে খাউক ।
--- আমারে তুমি মুরগিউ দেও না । জাত যাইব গি নানি । জাত কিতা ।
--- জাত উত কিচ্ছু নায়, খাইতে নি । তর ভালা লাগলে সব খাইছ । শরীলো শক্তির লাগি খাইছ । মন চাইলে খাইছ বাপ । অউ কইয়া গেলাম ।
সেদিন আর কিছুই খায় নি বৈতল । মার উপর রাগ কমেনি । মা কেন বলে, ‘অউ কইয়া গেলাম’ । কোথায় যাবে মা । বৈতলের মা সব উল্টোপাল্টা কথা বলে । লুলার কাছ থেকে সাপের বিষ কেন চায় । বৈতল সব জানে, মা মরে যেতে চায় । বৈতলকে ছেড়ে যেতে চায় । মার মনে অনেক দুঃখ । বৈতল তো মাকে দুঃখ দেয় না । বাদিয়ার বাচ্চা লুলাকে স্নেহ করে মা, মুরগির মাংস রেঁধে খাওয়ায় । মায়ের আদর টুকরো হয়ে যায় । তাও তো মেনে নিয়েছে ছোট বৈতল । মায়ের মনে কখনও দুঃখ দিতে চায় না বলেই সেদিন মুরগির মাংস খায়নি । মা তো মত অমত করে নি । অমত করে নি বলে লুলার দিকে তাকাতে পারে গর্ব ভরে । বলে,
--- দেখ বেটা, আমার মা ।
লুলাও কী বুঝে কে জানে । মুগ্ধচোখে তাকিয়ে থাকে বৈতলের মার দিকে । মার প্রশংসায় একই কথা বলে বারবার । বলে,
--- অয় বে, এক্কেবারে দেবী মার লাখান ।
এরপর দুই বন্ধুতে মিলে সব খেয়েছে । মন্দিরের খিচুড়ি লাবড়া, মহাপ্রভুর বাড়িতে কচুর শাক খেয়েছে লুলা দাস । গরুর গোস্ত খেয়েছে রুল আমিন বেজ এর বন্ধু বৈতল মিয়া অবস্থা বুঝে জাত পাল্টেছে । মায়ের কথা মনে রেখেছে বৈতল ।
--- মন চাইলে খাইও বাপ । যেতা খাইলে শক্তি বাড়ব, খাইও ।
     বৈতল আর লুলা শরীর মনে বেড়ে উঠেছে । বাড়তে বাড়তে এমন যে বাড়বে লুলা, বৈতল ভাবতেও পারে নি । লুলার শরীর ফালাফালি করে, তাই না লুলা অসময়ে মরে ।
     দুখুর শরীরে লুলার মতো অকারণ ফালাফালি নেই । আর বৈতল, শরীর চাইলে বৈতল দুর্গাবতীর কাছে যায় । দুর্গাবতীর কাছে পায় না বৈতল । মনটা পায় । শরীর চেয়ে রাগারাগি করে বৈতল নাগাপট্টি যায় । বৈতলের বাঁধা মানুষ আছে মধুবালা । দিলীপ কুমারের নায়িকার নামে ডাকে চার টাকার রমণীকে । বৈতলের একটা মনের মানুষও চাই । মনের মানুষ দুর্গাবতী তো মেয়েমানুষমেয়েমানুষ মনের মানুষ হলে বেটাগিরি থাকে না । লুলার মৃত্যুর পর তাই শিথিল হয়ে থাকে বৈতল । মনের আঘাত সয়ে যেতে সময় লেগেছে । উদভ্রান্তের মতো  দুর্গাবতীর কথা মতো চলেছে । পুরুষ যা করে না বৈতল তাই করেছে । পত্নীর পদবি নিয়েছে । রিফ্যুজি ক্যাম্পে সরকারের দয়ায় জীবনযাপন করেছে । স্ত্রীর প্ররোচনায় হরিৎবরণ জমিদারের আশ্রিত হয়েছে । বৈতল তার পরিচয় হারিয়ে ফেলেছে । দুখু শারীরিক শক্তি আর মনের বলে বৈতলের মনের মানুষ হয়েছে । বৈতল আবার জেগে উঠেছে । দুখু বৈতলকে তার রুক্ষতা দিয়ে ঘিরে রাখে । বৈতলের পৌরুষকে সজাগ রাখে । বৈতলের প্রতিটি পদক্ষেপেই দুখু পথ কেটে দেয় । পথ পরিষ্কারও করে ।
বৈতলের চাই পরিপূরক শক্তি । ওকে দুর্বল করে দিতে চাইলে মানবে কেন । দুখু বৈতলের দুর্বলতা নিয়েও খেলা করে । বৈতল তার স্ত্রী দুর্গাবতী, মেয়ে মণিকে নিয়ে কোনও কথা শুনতে চায় না । তেলে জলে বৈতল যেমন আছে ভালই আছে, তার জীবনকে তো গুছিয়ে রাখছে এই দুটি প্রাণীএর মধ্যে যদি ব্যাথা থাকে তা শুধু বৈতলের । দুই দেশ আর দুই নদীর সংযোগকারী জলমাটিও ওরা দুজন । বৈতল কখনও দুঃখ পুজো করে নি । বৈতল তার দুঃখের নিরাময় করে নিজে । একান্তে । ওখানে দুখুর মতো চোর ডাকাতের মধ্যস্থতার দরকার নেই । বৈতলের দুঃখে মধ্যস্থতাকারী আছে একজনা । আছে তার জল, তার পানি । বৃষ্টির ঝমঝমি । বন্যাজলের ছলছলাৎ । জলের তড়পানি দেখলে বৈতলেরও তৎপরতা বাড়ে । হয়ে ওঠে সে মহাবীর । পাহাড় ভাঙা জল আর ঝড় বৃষ্টির অপরিসীম শক্তির সঙ্গে লড়াই এখানে নেই । তবু জলকে মান্য করে বৈতল । জলের কোনও জাত নেই ধর্ম নেই । জলের কোনও ছোট নেই, বড় নেই । জলের কাছে সব শক্তিই নির্বল বৈতল জল থেকেই শক্তি আহরণ করে । জলের সঙ্গে খেলতে খেলতে জলের ধর্ম আয়ত্ত করতে হয় শিখিয়েছে বাপ । তাই তো বৈতল বাপ ডাকলেই নেমে যায় জলে । বাপের ডাকে থাকে অজানার ইশারা । বাপ ডাকে,
--- হেই বৈতল পানিত লাম ।
     বৈতল নেমে যায় । জলের সঙ্গে খেলে । উত্তাল জলে, ভরাবর্ষার হাওর আঁধারে নেমে যায় বাপ । অন্ধকারেও বৈতলকে প্রলুব্ধ করে বাপ । বলে,
--- পানি খেইড় খেলতে নি বৈতল, চল ।
     বৈতলের বাপ বৈতল থেকে ভিন্ন প্রকৃতির । জলের সঙ্গে লড়াই করতে করতে বাপ ভুলে যায় তার পরিচয় ভুলে যায় মৎস্যজীবীর জীবিকা । লড়াই করার মানসিকতা আছে । জয়ের উদ্যম নেই । বাপের কোন ‘তিক’ নাই । জলের সঙ্গে দাপাদাপি করে শূন্য হাতে উঠে এলেও লজ্জা নেই । খালি হাতে ডাঙায় উঠে বৈতলের সামনে হাসে । বলে,
--- খেইড়ো হারনও লাগে বেটা ।
হেরো বাপের মুখে তখন খৈ ফোটে জয়ের দিনের গল্প বলে পুষিয়ে নেয় হারের দুঃখ । বাপ বলে সেই মহাপ্লাবনের কথা আবার । মহাসমুদ্রের মতো চরাচর, সব জলের তল । জলের উপর ডিঙি নৌকোর মতো এক গাছের ডালে বসে আছে বাপ তিন দিন তিন রাত । সেই গাছের অন্য বাপের সঙ্গী আর এক পালোয়ান । বাপের বন্ধু বজরি দাস । মাছ ধরার কাজ না থাকলে লাঠি খেলে, জমিদার বাড়ি পাহারা দেয় । জমিদারের চাকরকে দুচোখ দেখতে পারে না বাপ । বাপ বলে ‘গাছুয়া আলদ’ । বাপ তাকে গাছের উপরই গলা টিপে মারে । ফেলে দেয় হাওরের গর্ভে । অসহায় আক্রোশে বাপ বিলাপ করে বৈতলের কাছে । বলে,
--- অউ বেইমান বেটিরে দেখত বজরি হালার হালায় । এর লাগি শাশি রগো টিপিয়া মারি ফালাই দিছি।
     সেই বাপের ছেলে বৈতল । বৈতলের স্ত্রী কন্যা নিয়ে কথা বললে বজরি দাসের হাল হয়ে যাবে । সে তুমি যতই লেঠেল পালোয়ান হও না কেন । বৈতল বেঁটে দুখুর হাট্টাগাট্টা শুকনো শরীরকে ফু দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারে । সত্যি কি পারে । দুখুর দশাসই চেহারায় কিল মেরে দেখেছে, পারবে না সহজে । কলের কাজ বলে হবে না । তাই বলে,
--- দেখিছ রে বাট্টিবেটা তোরেও একদিন পানিত ডুবাইয়া মারমু ।
 বৈতল বেশি রাগলে দুখু শান্ত হয় । শান্তিবার্তা দেয় । বলে,
--- আমারে মারিয়া কিতা করতে দোস্ত । আমরা গরিব মানুষ এমনেউ মরি রইছি । মরার উফরা যে হালার হালা মরলে দুনিয়াত শান্তি আইব, ইগুরে তো মারতে পারতে নায় ।
--- মারমু মারমু । সব বেটারেউ মারমু ।
--- অয়, হুলার গুমগুমি নালিয়া খেতো, খালি দুখুরে দেখলেউ রিঙ্গো উঠি যাছ । দুখুর কথাও ঠিক । বৈতলের মনে একটা কাঁটা খচখচ করে । একটা মানুষকে শাস্তি দিতে পারলেই তার শান্তি । কিন্তু বৈতলের দুঃখ আর তার নিরাময়ও যে তার নিজের । ওখানে কেউ নেই আশেপাশে, দুখু নেই বছই নেই আপদ নেই, এমনকী তার দুর্গাবতীও নেই । গায়ে কাঁটা ফুটলে সে নিজেই তা উপড়ে ফেলবে । কাউকে ডাকবে না বৈতল । জলসমাধি দিতে হলে দুইমনি পাথরে বেঁধে ফেলে দেবে নসিবালি হাকিমের দিঘীর গভীরে । কেউ জানবে না হদিশ । তারপর সে আবার ফিরে যাবে আপন দেশে । গ্রামে বইয়াখাউরি, পরগনা ছাতক, মহকুমা সুনামগঞ্জ জিলা সিলেট । দেশ পাকিস্তান (পূর্ব) । লুলা খুনের মামলা এতদিনে শেষ হয়ে গেছে জেল পুলিশের ভয় নেই । নতুন করে মাছুয়া মাছুয়ার মতো জীবন শুরু করবে । আর রিক্সা চালাতে হবে না জাতব্যবসা ভুলে । জলের পোকা জলে নামবে বৈতল । রাতের পর রাত কাটাবে বিল হাওরের জলে । পেশির গুলি পাকাবে গাছপাকা ফজলি আমের মতো । ভদ্রলোকের রান্নাঘরে মাছ যোগাবে বছরভর । নতুন বন্ধু হবে আবার । চুরি চামারি ছেড়ে দেবে । শ্রাবণ মাসের কটা দিন শুধু গুরু সৃষ্টিধরকে স্মরণ করবে । মনসা পুঁথি পড়বে, নাচবে গাইবে । ওদেশে তো আর কেউ নেই বৈতলকে শপথ ভাঙার কথা মনে করিয়ে দিতে । বিষহরির কালনাগিনীর ছোবল মায়ের মৃত্যুর পর যে আড়ি করেছে বৈতল সে-কথা এখন আর কেউ জানে না । ঢলানি জিয়ানির নেশার ঘোরে কাটিয়ে দেবে শ্রাবণী । গোঁসা ভাঙিয়ে আইর গোঁসা সামাল দিলে আর কাকে ভয় বৈতলের ।
সাপিখুপির ভয়ডর নেই বৈতলের । বৈতলের জলকেও ভয় নেই । জলের সঙ্গে খেলায় বৈতলের সর্বসুখ । সেই জলের ঋতুতে মা মনসার পুঁথি পড়তে, পুঁথি গাইতে, নাচতে নাচতে বিভোর হয়ে যেতে চায় বৈতল । বাপের বেটি বেটে আই মনসা । যা চাই, তা চাই । যে – কোনও উপায়ে হাসিল করা চাই । নীতি নৈতিকতার কোনও ইস্কুল খুলে বসে নি মা মনসা দরকারে প্রতিপক্ষের দুনিয়া ছারখার করে দিতেও পিছপা নয় বেটি । তেমন মাকে না ডেকে কি পারা যায়বৈতলের পুঁথি পড়ার ধুম দেখে দুখু আজাব বকে । বকে বকে বৈতলকে তাতায় । বলে,
--- তুইন বেটা সাপর ডরে পুঁথি পড়ছ ।
--- তুই ডরাছ নানি । ডরাছ, দেখছি আন্ধাইর রাইতো ইশ আশ হুনলেউ দুই হাত এক করি লাছ । তুই কুনু কীর্তিনিয়া নিক না কারে ডাকছে ।
--- আল্লারে ।
--- জানি মনে মনে তুই আস্তিক মুনিরে ডাকছ ।
--- ডাকিতো ডাকি, সাপরে হক্কলেউ ডরায়, তোর মতো গাট্টামি করি না ।
এই এক ভয় বৈতলের অন্য বন্ধু বছইরও । তারও আছে অন্তর কাঁপুনি । বছইর খুব ডর সাপকে । নদীকে পারে ঘর । সারা বছর জল আর জলের ভিতর লতা নিয়ে বাস । রাতে নাম করতে নেই । বৈতল দিনেও নাম নেয় না । গুরু সৃষ্টিধর শিখিয়েছেন যে । বলেছেন,
--- এমনে যারারে দেখরায় তারারে না ডরাইলেও চলব, কিন্তু বেরা পুঁথির নাগ অইলা দেপতা । তারারে মানিও ।
দেবদেবী নিয়ে বৈতলের কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই । তাই মান্যতার প্রশ্নও নেই । কিন্তু গুরুবাক্য যে অমান্য করে না বৈতল । বছই বাঙালের মতো দুখুর আর এক খাদিম আপদও মনসাপূজার সময় জমিদার বাড়িতে ভেটর চাউল দিয়ে যায় । বলে,
--- অউ বেটির বড় গুসা ।
--- তুই নু কছ তোর মজবো ইতা নাই ।
--- মজবর তুই কিতা জানছ । কিচ্ছু জানছ না । সব অউ আল্লার ফরিস্তা । ইতা লইয়া বেশ মাতিছ না ।
--- মাততাম না কেনে । হুন, এক গপ হুনতেনি ।
--- বাদ দে অখন ই পানির মাঝে তর হুকনা গপ ।
--- হুকনা নায় বে, ভিজা তিতা, পেকর গপ । হিগুরে ডাক, ইমাম সাহেবের ডাক । তান নি পছন্দ হয় দেখি ।
 বৈতলের কাছে গল্প শোনার প্রস্তাবে দুখু ভুলে যায় গোসা । ইমাম সাহেব বলার বিদ্রূপও হজম করে । বৈতলের গল্প মানেই মজা, আর মজার ভিতর কী একটা আছে । বেশ ভাল লাগে । গুরু সৃষ্টিধরের নাম নিয়ে বৈতল শুরু করে কথা,
--- দুই বন্ধু সনা আর মনার গপ, বুঝলে নি । দুইটায় অউ নাগাপট্টি থাকি খাইয়া বার অইছে, তখন রাইত বারোটা । আর খাইলেউ তারার আল্লা আর ভগবানের কথা মনো পড়ে । কে বালা কে খারাপ ইতা লইয়া তর্কাতর্কি মারামারিও অই যায় । তর অউ দামা ইগুর মতো, অউ যেন বে বেট্টি ইগু, কিচ্ছু বুঝে না বেটা তিন কড়ার বালিগড়া, কিন্তু তান কথায় কথায় থুতা করন লাগব ।
কথার ভিতর এত দুখুকথা শুনেও দুখু রাগে না, তাতে না । বরং হাড়জ্বালানি মুচকি হাসি দিয়ে বৈতলকে রাগায় । বৈতলের দু লাইন কথা মাঠে মারা যাওয়ায় মূল গল্পে ফিরে যায় আবার । বলে,
--- তারপরে বুঝছস নি হিরাইত আক্‌তা দুইজনে কয় আর তকরার ঝগড়া করত নায় । কয় ইবার চিৎপটাং অউক । যে চিৎ অইবা তাইন অউ ভালা । মানন লাগব । অয় অয় ।আট আনি এগু বার করল সনায়, সনাউর । দিল মনারে, মনোরঞ্জন । কইল নে কর চিৎ, আমার চিৎ । মনায় আটানি ইগু নিয়া রাখল নউখর উপরে, মারল ঠেলা । ঠুংঠাং করল না । পয়সা গিয়া পড়ল নালাত । আর আঠানি হারাইয়া ইগুয়ে হিগুর গলাত ধরিয়া নি অউ কান্দা । ইগুয়ে কান্দিয়া ডাকে পিসিমারে । আবার কয় আমার আপন পিসি নায়, তাইন পিওনহড়ি । ইগুর দেখাদেখি হিগুয়ে ডাকে খালারে, কয় আমার আপন খালা । কান্দতে কান্দতে মনায় কয়, উবা তর আটানি আমি বার করি দিমুনালাত হাত দিয়া মদুয়ায় পয়সা খোঁজে, পায় না । সনায় কয়, তুই কান্দিছ না হর, আমি বার করমু । আর এক মদুয়ায় হাত দেয় পায় না । খালি পেক উঠায় । তখন ইতা পেক উক দেখিয়া তারার আল্লা আর ভগবানর কথা মনো পড়ে । কয় এক কাম করি হুন, আমরা তারার নাম লইয়া খুঁজি । সনাউরএ ভগবানর নাম লইয়া খোঁজে, মনোরঞ্জনে আল্লার নাম লইয়া খোঁজে । খুঁজতে খুঁজতে তারা দেখে হারাইছিল এক আটানি পাই লিছে দুই আটানি । কেমনে পাইল ক ।
ধর্মপ্রাণ দুখু ধর্মাধর্মের বিভিদে নিজেকে জড়াতে চায় না । বলে,
--- উপর আলারে লইয়া তোর ইতা ফাত্‌রামি আমার ভালা লাগে না । বাদ দে ।
--- কইতে পারলে না ।
--- কেনে পারতাম নায়, আল্লায় খুশি হইয়া দিছইন । তোর তো খালি ইতা ভাইয়াপির গপ । রুন্দা যে খাইয়া আইচছ পাকিস্তান থাকি তেও পেট ভরছে না ।
--- ইগু ভাইয়াপির গপ নায় বেটা পুঙ্গির ভাই ।
--- তে কিতা ।
--- উপরআলায় খুশি অইয়া দিছইন ঠিক অউ । ভাবছইন কী ভালা মানুষ, উপরআলা বদলাবদলি করি আধলি খুঁজের এর লাগি দুইজনরে দিছইন দুই আধলি । উপর আলাও ঠগছইন, তারা কেউ নিজর ঈশ্বররে পেকো লামাইত না করি ইতা কইছে । বুঝচছনি মানুষ কত শয়তান উপরআলা থাকি । অখন ক, তুইনি পেকো লড়াচড়া দেখিয়া আস্তিক মুনি ডাকছ ।
ওদিকে শুকনো নেশার টানে বছই মিয়ার তর সয় না । বৈতলের সম্পর্কে আর দীর্ঘ হতে দেয় না । ইতি টানতে বলে,
--- ঠিক অউ কইচছআপনা থাকি বেগ্‌না ভালা, পানি থাকি পেক ভালা । অখন ক আনচছ নি ।
--- কিতা আনতাম । মশল্লা তো ইতা তো আনব আপদে ।
   এবার রাগে বছই । বলে,
--- অউত্ত মালাউন হকলর এক দুষ । কথার ঠিক নাই হালার ভাইর ।
চার বন্ধুর একজন শুধু ভিন্ন ধর্মের । সে বৈতল । তাকে নিয়ে, তার ধর্ম নিয়ে মস্করা করে বাকিরা । রিফ্যুজি বাঙ্গাল মালাউন হালার হালা এসব যেমন তাদের গালাগালির ভাষা তেমনি ভাইয়াপির ভাষাও, দোস্তির ভাষাও । হিন্দু বন্ধুকে যেমন ধর্ম নিয়ে গালাগালি দেয় আবার বন্ধুত্বের প্রয়োজনে বৈতল মিয়া সাজিয়েও নিয়ে যায় বেরাদরিতে । গালাগালির আঠা দিয়ে ওরা বন্ধুত্বের জোড় শক্ত রাখে ।
ইতিমধ্যেই চতুর্থজনের প্রবেশ । শ্রীমান আপদ আলি মোল্লা । চারবন্ধুর শারীরিক গঠনের কোনও মিল নেই কারো সঙ্গে । বৈতল যেমন মাঝারি লম্বা টিঙটিঙে বাতাস দিলে উড়ে যায় । দুখু বেঁটে মোটা আম গাছের গাইল, ‘হাজার টেকার মরিচ খাইয়া আরো খাইত চায়’ । বছই লম্বা মোটা ‘আঠালি’ কলার গাছ আর আপদ শুধু নামেই আপদ, রং কালো কিন্তু বৈতল থেকে লম্বা, এক থাবা বেশি । সবুজ লুঙির অনেকটাই কোমরের উপর, তার উপর লাল গামছা । গামছায় বাঁধা পুটুলি । বৃষ্টির ছাট বাঁচিয়ে, শরীরকে ধনুকের মতো বেঁকিয়ে দৌড়ে এসে আসরে ঢোকে । বেতের শরীরে কোন হাঁফ নেই হাঁসফাঁস নেই । বলে,
--- কই বইতে চল
       বছইও লম্বা কম নয়, তবে বৈতল থেকে কম । শরীরে লম্বা কিন্তু মাথায় মোটা । বলে,
--- কেনে চল, হাকিম সাহেবের কব্বর সব থাকি উচা ।
কবর বিশারদ দুখু মিয়া জানে জলের হদিশ, হাল হকিকৎ । দুখু কয়েকটি বড়লোক পরিবার থেকে টাকা পয়সা পায় কবরের বেদি পরিষ্কার রাখা দেখাশোনা করার জন্য, বিশেষ দিনে ধূপকাঠি জ্বালানোর জন্য । হাকিম সাহেবের কবরও তার । তাই বলে,
--- কই তোর কবর, সব পানির তলে । অখন অউ সরকারি বান্দা আর কালভার্ট । বইলে বও নাইলে উবাই উবাই মারি দেও ।
--- কেনে ছাতনি গাছোর আগা আছে নানি । চল উঠি যাই ।
     দুখু বাধা দেয় । বলে,
--- না, আমি ই পিছলা গাছো উঠতাম নায় ।
    বৈতল দুখুকে মেজাজ দেখায় । বলে,
--- তোরে কে উঠত কইছে রে হালা, তুই বান্দর উপরে থাকবে । পারা দিবে ।
     দিশেহারা চার নেশাড়ু সমাধানের পথ পায় না । কোথাও একটু না বসলে মৌতাত হয় না । হাঁটতে হাঁটতে ওরা একটা কালভার্টের কিনারা পায় ইট সিমেন্ট বাঁধানো । আশেপাশে কেউ কোথাও নেই । নিশ্চিন্তে হাওয়ায় ওড়া যাবে ।
 কিন্তু ওরা পৌঁছনর আগেই একজন ঘাপটি মেরে বসে থাকে জল আর স্থলের সীমানায় । দুখু আর বছইর দুজোড়া হাত ভয়ে জড়ো হয়ে যাচ্ছে । মাথামোটা আপদ কিছুই দেখেনি, এগিয়ে যাচ্ছে জায়গা নিতে । বৈতল লম্বা মানুষটিকে এক ঝটকায় টেনে এনে ফেলে দেয় অন্য দুজনের গায়ে । মুখে আঙুল দিয়ে চুপ থাকতে বলে । বৈতল এগিয়ে যায় জলের সীমানায় । দৃশ্যমান লেজের উপর কৃশ হাতের ছায়া পড়তেই লতাদেহ নড়ে ওঠে । ক্ষিপ্রতায় অতুলনীয় বৈতল লেজ ধরে নেয় তার বজ্র আঁটুনির মুঠিতে । তারপর সেকি ঘূর্ণন মহাদেবের তাণ্ডবও এমন ধীর স্থির নয় । নির্ভুল পদচারণা, নির্ভুল হাত ঘোরানোর মুদ্রা । ঘোরাতে ঘোরাতে একসময় সাউৎ করে ছুঁড়ে দেয় ডান দিকে, মাঝনদী তাক করে । বৃষ্টির জল, না ঘামের জল বোঝা যায় না, তবে রাগে কাঁপে ভেজা বৈতল ।
আপৎকাল কেটে যাওয়ায় দুখু ফিরে পায় তার স্থৈর্য । স্বভাবসিদ্ধ মন্তব্যে তাতিয়ে দেয় বৈতলকে । বলে,
--- কাজিমরা এগুরে খেদাইয়া অখন তড়পাইরে কেনে ।
--- তারা কুনুদিন কাজিমরা অয় না
     দুখু জানে না বৈতলের ক্রোধের কারণ । লুলা বেজ তাকে শিখিয়েছে সাপের বংশ নাশ করার কৌশলদুখুকে বলে বোঝাতে পারবে না বৈতল তার ক্রোধের কারণ । বৈতলের মাকে মেরেছে যে, তার প্রতি কোনও দয়ার সম্পর্ক নেই বৈতলের । দুখু বুঝবে না, মেলাতে পারবে না মনসামঙ্গলের গায়ক সৃষ্টিধর শর্মা ওঝা ওরফে বৈতল আর সাপের শত্রুতার পরস্পর-বিরোধিতা । তাই বৈতল দুখুর কথার চিমটি ঝেড়ে বীরবিক্রমে আপদের দিকে তাকায় । বলে,
--- মরি গেলে নে বেটা যেলা আউগ্‌গাইছলে ।
--- ছাড়ি দিলে কেনে তে ।
--- না ছাড়লে তর অউ ইমামে কইত হালাল কর, এক ছেদে মারিছ না । ইতা না হিতার ঝগড়ার মাঝে অলগর্দা ইগুয়ে আমরারেউ ডংশি লাইলনে ।
--- ঠিক অউ করচছ । আলদ ইগুও ডরাইছিল । আমরার কিতা আমরা তো কুনুখানো জাগা পাইলিমু । পানি বাড়লে গরমেণ্ট ইস্কুল, টাউন মাদ্রাসা নায় নর্মাল ইস্কুলো জাগা পাইমু । তারা কই যাইত ঠিক অউ অইছে মরারে মারিয়া লাভ নাই ।
--- অই মরা কিগুরে কছ । ইতা কুনু সময় মরে না । খালি মারে ।
--- তে ছাড়ি দিলে কেনে ।
--- ইতা তুই বুঝতে নায় । দাত ভাঙ্গি দিছি । বিষদাত গেলে ইগু আর সাপ থাকল নি । ইগুর হালত পাকিস্তানোর হিন্দুর লাখান । লেংটি খুলি গেছে, ইদিকে খালি বেটাগিরি । সুভাষ বোস আইয়া দুই বাংলা এক করবা ।
--- অই হালার হালা । সাপ মারচছ না বালা করচছ, অখন ইতা কাবিলাতি ঝাড়রে কেনে । তর কথাত নি চলত দেশ । তুইন অইলে রিফুজি, তর কুনটা হাচা কুনটা মিছা, কেমনে বুঝতামতুইন একবার কছ বাবন, একবার কছ মাইমল, অখন কইরে তুই বেজ । বাদিয়ার লাখান সাপ নাচানি শিখলে কানো ।
--- তর বাপর কাছ থাকি । এক লাথ মারমু শুওরর জনা ।
বৈতলের বিচারশালার জবাব যে এত তড়িঘড়ি হবে কেউ ভাবেনি । মুখের কথা বেরোতে না বেরোতেই বৈতল সত্যি সত্যি লাথি মারে দুখুর পেছনে । বৈতলের হঠাৎ ক্ষেপে যাওয়ার হতভম্ব বছই আর আপদ । অপ্রস্তুত দুখুও আচমকা আক্রমণে লাট্টুর মতো গিয়ে ছিটকে পড়ে বাঁধের উল্টোদিকে । যেখানে বৃষ্টির জলের শেষ সীমানা । দুখুও কম শক্তিধর নয় । জল আর স্থলসীমার এক বিপরীত কোণে দাঁড়িয়ে সে বৈতলকে দেখে । চোখে তার আগুন । লুঙিতে গিঁট দেয় নতুন করে, দুপায়ের ভিতর ঢুকিয়ে কষে দেয় টান । দেয় হায়দরি হাঁক । অশ্রাব্য গালাগালি দিতে দিতে উঠে আসে বৈতলের কাছে । বৈতলের চোখে চোখ রাখে । চোখ সরিয়ে নেয়দুখুর ওঠানো হাত থেমে থাকে । কাকে মারবে দুখু । এ যেন ঘোর লাগা এক মানুষ । এক অচেনা মানুষ, কিন্তু মিথ্যে নয় অতি পরিচিত । দুখু বৈতলের অজানা দুঃখ সহ্য করে । পাল্টা মারের ওঠানো হাত দিয়ে এক ধাক্কা মারে সজোরে । সরে আসে । বৈতলও গিয়ে বসে নদীমুখে কালভার্টের উপর নদীর দিকে তাকায়, নদীকে প্রশ্ন করে কিছু । নদী তো উপলক্ষ । আসলে বৈতল দুখুকে চায় । দুখুর মধ্যে বৈতল লুলাকে খোঁজে । একা, আপনমনে পাশে এক কল্পনার দুখুকে বসিয়ে তার কাঁধে হাত দেয় । বলে,
--- আইচ্ছা দোস্ত ক চাইন, তোরে কেনে মারলাম । তুই তো আমার প্রাণর বন্ধু । তোর দোস্ত নায় নি আমি । আমি কিতা বেটি পাগল অই গেছলাম নি রে । দুর্গার লাগি নি । কী জানি কিতা ।
     ভরা নদী আর তার অছল তছল জলের ডাকাডাকিতে বৈতলের বিভ্রম হয় । মনে পড়ে কৈশোর সহচরকে । মনে পড়ে স্বদেশ । দুখুর উপর অভিমান হয়, কেন তাকে অবিশ্বাস করে দুখু ।
দুখু বৈতলকে বুঝিয়ে দেয় শুধু গায়ের জোরে শক্তিধর নয় । মনও আছে তার । দুখুই শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দেয় আপদকে তাড়া দেয় । বলে,
--- নে ইতা ছাড়, অখন বার কর তোর মাল । সাপ ঘুরাইতে ঘুরাইতে তো হিগুয়ে হাইঞ্জা লামাই লিলো ।
     সত্যি মেঘ বৃষ্টিতে অন্ধকার সন্ধ্যা নামে । তাড়াতাড়িই নামে । বৃষ্টিরও থামার নাম নেই, আকাশ কালো ও ঘুটঘুটে হয়ে আসে । চারপাশে মুখ গোমড়া ঘোলাজলের মাঝখানে কালো রঙের চারজন লুঙিপরা মানুষকে ভূতের মতো লাগে । সিমেন্ট বেদির একদিকে নদীর সঙ্গে কথা বলে বৈতল । অন্যদিকে দুখুর নেতৃত্বে নেশার প্রস্তুতি । ওরা কেউ কালভার্টে বসে না, বসে আপদ আলির লাল রঙের গামছা । গামছা বাঁধা পুঁটুলি । বৃষ্টির ঝমঝমিতে পূঁটুলি ভেজে আপদ আবার উঠিয়ে নেয় তার প্রাণের ধন । আবার পেটের নিচে চালান দেয় । দুখু ধমক দেয় । বলে,
--- অই বেটা, কইলাম নু ধনুরাশি হইয়া থাক । ভিজত নায় ।
আপদ দুখুর কথামতো ধনুর মতো পিঠ বেঁকিয়ে থাকে । বছই মিয়া বাঁকা জায়গার শূন্যস্থান পূর্ণ করে । আপদের পেটের নিচে ঢুকে যায় । জলের হাত থেকে বাঁচে পেটিকা । কিন্তু বৈতলের মান তখনও ভাঙেনি । দুখু আবার রাগে । বলে,
--- অই বচই । তুইতো লাম্পাও গাট্টাও ইগুর পেটো থাকতে পারতে নায়নেশাখোর হিগুরে ক আইয়া বানাইত । নাইলে ইবার আমিউ লাথ মারি ফালাই দিমু গাঙ্গো ।
ধমক খেয়ে ওস্তাদ তখন সুরসুরিয়ে নামে আসরে । দুখুকে সরিয়ে দেয় একপাশে । বলে,
--- সর সর রাড়ি বাটি । ইতা তোর কাম নায় ।
     বৈতল ঢুকে যায় আপদের বাঁকানো শরীরের বাঁকে । নিপুণ প্রক্রিয়ায় আপদের গামছার গিঁট খোলে । বছই খোলে দ্বিতীয় গিঁট । তৃতীয় গিঁট খুলতেই বেরোয় গুপ্তধন । ক্যাপস্টান সিগারেটের কৌটো । পরিচিত ঘটনার দৃশ্য চার জোড়া চোখে । আপদের কোমরকশি থেকে বেরোয় গাঁজার চিলিম । বৈতল দুখুকে ডাকে,
--- নে ধর ।
দুখু ধরে পোড়ামাটির কল্কে, বছই দেয় এক টুকরো ন্যাতা । কারো লুঙির ছেঁড়া টুকরো । দুখু চিলিমের নিচে জড়িয়ে দেয় । সিগারেটের টিন থেকে বেরোয় চিলিমের গুলি । বৈতল এবার আসল কাজের জন্য দুখুর হাত থেকে কেড়ে নেয় চিলিম । দীর্ঘাঙ্গ আপদের নুয়ে পড়া পেটে থাবড়া মেরে বলে,
--- বাক্কাউতো বেটা ঘাসকাটা কাটিয়া আনচছ । জল দেওন লাগত নায় । এমনেউ ভেতলা অই রইছে । শলই জ্বলব তো ।
--- জ্বলব জ্বলব । সব নিচে রাখছি শলই, ভিজাত নায় । ঘোড়ার মাথা এমনেউ নষ্ট হয় না ।
--- আর কইছনা তোর ঘোড়ার মাথা । আপদ ভাই যদি একটু আগে আইতে, দেখলে নে ঘোড়ার ফালাফালি । বিড়ি ধরাইত না পারিয়া হেশে শলইরে কয় বেইমান ।
     দুখুর তেড়া বেঁকা কথা উপেক্ষা করে বৈতল । এবার তার পালা । সে এখন আগুন জ্বালাতে ব্যস্ত । একবারেই কাঠি ফড়ফড়িয়ে উড়তে থাকে ফুলকি । জ্বলেছে, ফুটেছে গাঁজার ফুল । ঘুরছে এ হাত থেকে ওহাত মৌতাতে মজে যায় তিন বন্ধু । বৈতল গান ধরে শিবনাথের,
তাথৈয়া তাথৈয়া নাচে ভোলা
বম বম বাজে গাল ।
এক এক টানে শেষে তিনবন্ধু মিলে বৈতলের প্ররোচনায় দুখুর কানে গিয়ে হাঁক দেয় ‘শিবো হে’ ।
 বন্ধুদের কাণ্ডকারখানা দেখে দেখে দুখুর মুচকি হাসি বড় হয় । বৈতলও দুখুর থুতনি নেড়ে দেয় । বলে,
--- দেখো দেখো, শিব ঠাকুরে গাইঞ্জা খাইন আর বলদবেটার নেশা হয় । বাট্টি বেটা ইগুয়ে উঙায় দেখো, হালার হালা শয়তানর লাট্টি । দে না এক টান, এক টানে কিচ্ছু অইত নায় ।
     এক অদৃশ্য ভেল্কিবাজিতে তখন চরাচর থেকে মেঘ উধাও, বৃষ্টি উধাও, ছলছলাৎ জলও উধাওচার বন্ধুর প্রাণে শুধু আনন্দ । বৈতলের প্রাণে আনন্দ এলে গুরু সৃষ্টি ধরকে মনে পড়ে । জৈন্তিয়া পাহাড়ে গিয়ে নেশা করেন গুরু । দেশি মদ খেয়ে বিভোর হয়ে তার পাঁচ কন্যাই দান করে দেন বৈতলকে । বৈতলেরও চোখ ঢুলুঢুলু । খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে গুরু আনন্দের ব্যাখ্যা দেনবলেন,
--- বুঝলায় নিবা, গরিবর আনন্দ উৎসবো কুনু চান্দোয়া টাঙানি লাগে না । দুই পয়সার নেশা দিলাও হে এক বছরর লাগি খুশ । কাইল থাকি আবার রান্দা টানমু । কিন্তু আইজ তো আনন্দ ।
  গুরুবাক্য শিরোধার্য করে বৈতল দুখুকে বলে,
--- দে নাবে একটান । আইচ্ছা কাম নাই টানাটানি করিয়া । তোর অউ হাসি খান অউ থাকউক । হাসিত অউ আনন্দ রে বেআক্কল । তুই খামোকা খামোকা তিনবার বেআক্কলর হাসি হাসিয়া দেখাছ না । নে তোর অউ হাসির লাগিয়াউ ফরমান উঠাই নিলাম । যা, আর তোরে জলো ডুবাইয়া মারতাম নায়রে হালা ।
     ওরা শালা ছাড়া পরস্পরকে দেওয়ার মতো গালিও খুঁজে পায় না । দুতিন বার চারবার দম দেওয়ার পর নেশাকে আটকে রাখতে ওরা ধোঁয়া বেরোতে দেয় না একটুও । দমবন্ধ হয়ে থাকে যতক্ষণ পারে । এবং এক অদ্ভুত প্রক্রিয়ায় হজম করে ফেলা ধোঁয়া বেরোতে থাকে কান দিয়ে নাক দিয়ে কিছু চোখ দিয়ে । লাল হয়ে যায় চোখ । লাশছাড়া অবস্থা হতেই কাজ শুরু হয় দুখু মিয়ার । কলকে ন্যাকড়া ধুয়ে নেয় বন্যার জলে । সিগারেটের টিনে সব গুছিয়ে রাখে । কল্কে বেঁধে দেয় আপদের কশিতে । বৈতল সব দেখে । গোছগাছ হয়ে গেলে গতর ভাঙে । বলে,
--- এর লাগিউ তোরে লাগে । তুই বেটা পাক্কা পিরর চেলা । তুই মজিদো থাকলেও ভালা ইমামতি করতে পারলে নে ।
 
      দুখু মিয়ার হাসি চওড়া থেকে চওড়া হয় । বলে,
--- আমি ইমাম অইলে তরে পয়লা মুসলমান বানাইমু ।
--- আমি অই যাইমু, অই যাইমু মুসলমান । দেখিছ তুই । আমার খালি একখান কাম বাকি রে দুখু । ই ধুড়া সাপ দুইটায় বুঝত নায় কিচ্ছু । তুই পারবে ।
--- কিতা পারমু । আমি কিচ্ছু পারতাম নায় । তুইনতো হালা আমারে পানিত মারতে । মার ।
--- না বেটা, তোরে নায় তোরে নায় । তুই তো আমার দোস্ত । জান বাচাইচছ ।
--- অই তুই আমারে ধুড়া সাপ কইলে ।
--- কইলে ।
    একযোগে প্রতিবাদে দুই নেশাখোর জেগে ওঠে জলের অতল থেকে । বলে আবার,
--- যা তোরে আর ইখান থাকি লইয়া যাইতাম নায় । আমরা তিনজনে তোরে পানিত ফালাইদিমু । আর অউ আলদ যেগুরে ফালাইচ্ছ, হিগুয়ে আইয়া খাইব তোরে । তারা সব চিনি রাখে । ফুশ করি মারব এক কামড় । আর কইতে নি ধুড়া
--- অ বুঝছি, তিনজনে মিলিয়া বুদ্ধি করচছ । হিন্দু ইগুরে মারিলাইতে । মার ।
--- অয় মারমু । এগু অইলেও তো কমল ।
--- মারিছ না বেটা । কমত নায়, বাড়ব । আমিও বাঙাল অই যাইয়ার ।

   চার বন্ধুতে এবার হাসতে হাসতে একে অন্যের গায়ে লেপ্টে যায় । তিনজনের নেশায় অন্যজনও গ্রস্ত হয় । শরীরের উত্তাপে বন্ধুত্ব গরম হয় । 



চলবে 

Monday, August 22, 2016

দুটি হাত ...চিরশ্রী দেবনাথ

দুটি হাত

................©চিরশ্রী 

দুটি হাত শক্ত করে ধরে আছে বাসের হ্যান্ডেল

একটি হাত ,রোমহীন, সুডোল, স্বচ্ছ নখে রোদের চাষ 

যেন জ্যোৎস্নায় ঢাকা নদী নেমেছে বরফের স্বর্গ ছুঁয়ে

অন্য হাতে রোমের কালো বন, বাঁকাচোরা ময়লা নখ

যেন ময়াল সাপ উঠে এসেছে খনির অন্ধকার মেখে 

এই দুটো হাত যে যার মতো করে কাল রাতে ভালোবেসেছিল

কাল ছিল অমাবশ্যা ...সুগভীর 

কালো রোমশ হাত থেকে  লাফিয়ে পড়েছিল বাঘ

ময়লা নখ থেকে সুনামীর জলোচ্ছাস  

ফর্সা সুডোল হাত চেপে দিয়েছিল অন্ধকার

প্লুতনোভা আলোয় ভেসেছে তখন  রঙীন মাছ

দুখানি হাতের তলায় রোশন চৌকি, পরিশ্রমের নহবত

প্রতিরাতে তারা ভালোবাসতে যায়,

তারপর উটের মতো পথচলা রেখে আসে দোরগোড়ায়, 

আম্রপলবের কষ ঝরে,  টুপটাপ, সুস্বাদু মঙ্গলছাপ...




সুরমা গাঙর পানিঃ উজান পর্ব ৯



 
(দেশভাগ এবং পরের দশকের কাছাড় সিলেটের প্রেক্ষাপটে রণবীর পুরকায়স্থের এই উপন্যাস ছেপে বের করেছে দিন হলো। ভালো লাগা এই  উপন্যাস পুরোটা টাইপ করে তুলে আমার প্রিয় কথা শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। আশা করছি আপনাদের সবার এটি পড়তে ভালো লাগবে। সম্পূর্ণ উপন্যাসের সংলাপ ভাগটি সিলেটিতে -সে সম্ভবত এই উপন্যাসের সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক। আপনাদের পড়বার সুবিধে করে দিতে, ঈশানে এই উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে আসছে। আজ তার  উজান  পর্বের নবম অধ্যায় --- সুব্রতা মজুমদার।)




নয় 
   
গীতেশ বিশ্বাসকে বৈতল অন্য কথা জিজ্ঞেস করেছে । সেই তার পুরনো কথা, দুখু যাকে বলে পাগলামি । নদীর আকৃতি নিয়ে প্রশ্ন । নদী কোথা থেকে আসে দেখে নি বৈতল, তালগাছ চড়েও ঠাহর করতে পারেনি । তবে একটু জানে খুরাদিল এই বাটির জন্য শহরের যত দুঃখ । বছর বছর বন্যা । এত উঁচু বাঁধ । জাহাজ ঘাট থেকে এঁকে বেঁকে অন্নপূর্ণা ঘাটের অদূরে গিয়ে নদীর জল আর বৃষ্টির জলের একাকার । এর পরেই রেল গাড়ির ঝমঝমি ।
মাছিমপুর শালচাপড়া কাটাখাল পাঁচগ্রাম বদরপুর । একদিকে পাহাড় লাইন সোজাসুজি করিমগঞ্জ, মহিষাশন । হিন্দুস্থান পাকিস্তান ভাগাভাগি । দুর্গাবতীকে নিয়ে এক জলের দুপুরে বসেছিল ইস্টিশনে । কখন ছাড়বে করিমগঞ্জের গাড়ি । করিমগঞ্জ থেকে উল্টোপাকে বদরপুর হয়ে শিলচর । এর আগে বইয়াখাউরি থেকে কইমাছের মতো কানে হেঁটে, জল সাঁতরে আর ভোরায় ভেসে ওদেশের জল থেকে এদেশের মাটিতে আশ্রয় ।
এদেশে বৈতলের কেউ নেই । কৈবর্তের পুত, ব্রাহ্মণের কন্যা দুর্গাবতীকে সঙ্গে নিয়ে চলে এসেছে নতুন দেশে । দুর্গাবতী বৈতলকে দিয়েছে নতুন পরিচয় । বলেছে,
--- তুমি পাটনি থাকলে কৈবর্ত থাকলে তুমার কিচ্ছু নায় । আমার কিতা অইব কও । আমারে তো কেউ মাইমলের বেটি কইত নায় । একলা পুড়িরে পাইলে মাইনষে নি ছাড়ব কও, দেখছ অউত্ত । তুমি আমার কথা রাখো, তুমার বউ অইয়াই থাকমু । খালি তুমি একখান লগগুন লাগাইলাও । কইও তুমি শর্মা বাবন ।
 বেশ তবে তাই হোক । কেউ জানে না, হয়ে যায় বিয়ে । স্ত্রীর পদবি নিতে কোন দুঃখ হয়নি বৈতলেরদেশ ছাড়া মানুষের নামই বা কী, পদবীই কী । তাই গুরুর নামে নাম লেখায় রিফুজি খাতায়, সৃষ্টিধর শর্মা । একা একা শপথ নেয় । বৈতল আর কোথাও জড়াবে না, কাটিয়ে দেবে গরিব মানুষের গৃহস্থ জীবন নিরুপদ্রবে । কিন্তু বৈতলের জীবন কখনও সোজা খাতে বয় না । কোনো শপথ শেষ শপথ হয় না জড়িয়ে যায় সামাজিক সম্পর্কে । বন্ধুতা থেকে শত্রুতার ধারাবাহিকতায় তার নতুন সংযোজন হয় হরিৎবরনের জমিদার যমুনা প্রসাদ সিং । এছাড়া আসে তার খুশি, খুশির বন্যা, প্রাণের পুত্তলি তার কন্যা মনি । যম জমিদারের উপর রাগ করে বৈতল মেয়ের নাম রাখে মরনি । কী জানি কী সন্দেহের বশে মেয়েকে কোলে নিতেও দ্বিধা বৈতলের । মনের মধ্যেও তাচ্ছিল্য ।  বৈতলের বাপও তার নাম নিয়ে তাচ্ছিল্য করেছে । মায়ের মতো এমন গৌরবর্ণা মেয়ে বৈতল কামনা করেনি । তার সন্তান তারই মতো হবে কালোবরনী । জন্মের পর থেকেই বৈতল খুটে খুটে দেখে মেয়ের চোখ নাক কান হাতের পায়ের আঙুল, বৈতল নিজেকে খুঁজে খুঁজে হতাশ হয় । বৈতলের তো সবই বিপরীত, হতাশা থেকেই হয় আনন্দের সূত্রপাত । সেই মরনি কন্যার ‘র’ আর উচ্চারিত হয় না খুশিতে । সেই মনি মেয়েই এখন তার হৃদয়ের মনি । জড়িয়ে যায় বৈতল আবার ।
আরো হয়, তিন বন্ধু হয়, হয় বাপের মতো এক বোবা সাধু । বয়সটাও বাপের মতো, স্বভাবে গুরু সৃষ্টিধরের মতো অবিকল । আবার বিপরীতও অনেকটা । গুরু সৃষ্টিধরের গলায় সর্বক্ষণ কথা আর গান । তিনি তো কথাই বলেন না, কিন্তু এক উজ্জ্বল আলো বিচ্ছুরিত হয় তাঁর বিপুল শরীর থেকে । সেই সাধুমানুষকে ঘিরে জড়ো হয় তারা চার বন্ধু । মামুপিরের খিদমত খাটে চারজন ।
গ্রামের ছেলে বৈতল শহরে এসে হাঁপায় । রিক্সার প্যাঁ পোঁর যান্ত্রিকতায় বিরক্ত হয় । নিরিবিলি খোঁজে । সন্ধ্যের আঁধারে জাহাজঘাটের দিকে যায় । দেশভাগ হওয়ার পর জাহাজ কমে গেছে । মাঝে মাঝে কলকাতা থেকে কয়লার জাহাজ আসে । বিহারী দারোয়ান শামুদা বলে,
--- আভি তো কুছু নাহি, শুনশান । আগে জাহাজ কম্পানিতে কিতনা ভিড় ছিল ।
শামুদা নির্জন রাতে বৈতলকে জলের কাছে যেতে দেয় । বৈতল একা বসে থাকে, বসে থেকে জীবন সাজায় । ফেলে- আসা নদীর সঙ্গে জুড়ে দেয় নিজেকে । ভরাবর্ষার উথাল পাথাল সুরমার সঙ্গে নিজেকে মেলায় শরতের এই বরাকপারে । বৈতল গান গায় গুনগুনিয়ে । মন আনন্দের গানে ইদানীং আর পরিচিতি সুর কাজ করে না । বৈতল এখন নতুন গান শিখেছে । সিনেমার গান গায় যখন রিক্সা নিয়ে তারাপুর রেল গেট পেরিয়ে যায় তখন ‘তুফান মেল যায়’ কেউ যেন তাঁর গলায় তুলে দেয় । নদীপারের একাকী সময়ে এক নতুন শেখা গান গায় ‘ছিরু ভীরু পায় পল্লীর বালিকা বনপথে যায়’ । সুরের যাদুতে পাগল হয়ে যায় বৈতল । একদিন দুখুও শোনে তার একা সময়ের গান । দুখুর কাজ তো শুধু বৈতলের খুঁত ধরা । বলে,
--- ‘ছিরু ভীরু’ কিতা বে । ইতা কিতা গান
--- অইব কিচ্ছু, সুর ভালা লাগলে অত অর্থ খুজন লাগে না
--- তর পুথির গান থাকি একেবারে আলেদা । তুইন হিন্দু গান গাছ না কেনে । ‘পয়গাম’ আর ‘ইনসানিয়তো’ বউত ভালা ভালা গান আছে ।
--- অখন গাইমু । শ্রীমঙ্গল চা বাগানো শুনছি হিন্দি মাত আর অউ ইখানো আইয়া ইটখলাত । পুদুম, চেম, নুনুয়া কত কিছিমর নাম তারার । সিলেটর বাগানো অত নামর বাহার নাই । সাত দিনর নামে নাম । শুক্‌কুরবারে জন্মাইলে নাম রাখি দেয় শঙ্কর ভোলা নায় রামচন্দ্র । এগুর নাম আছিল জানছনি মঙ্গালাল, তে তার বৌরে টিল্লাবাবু এ জিগাইছইন মরদর নাম কিতা । হায়রে কপাল, বেটি ইগু মরি যায় শরমে, আবার টিল্লাবাবুরে নাম না কইলেও নায়, তখন কছাইন দেখি কেমনে কইল জামাইর নাম ।
--- জানি জানি । ইশারা করি কই দিছে আরি ।
--- অয়, তর মগজ ইগু হইল নাগেশ্বরর ছিয়া, সব জানে, জানতে জানতে ছাতু করিলায়, অলাখান ভুতা । কইল কিতা জানছ নি, কইল, তলব দিনে লাল লাগাইকে । অখন বুঝিলাও । মঙ্গলবাড়ে তলব দিন । তেউ মঙ্গলের লগে লাল, মঙ্গালাল ।
দুখুর মত না নিয়ে বৈতল কোনো কাজ করে না, আবার দুখুর সঙ্গেই লাগ সব থেকে বেশি । দুখুর ওস্তাদি বেশি, সব কিছুতেই শেষ কথা বলবে দুখু । বৈতল মানবে কেন । তাই খটাখটি ।
বৈতলেরও এক রগ তেড়া । চুরি করবে ডাকাতি করবে তবু কারো দয়ার দান নেবে না । হরিৎবরণ ইটখোলার জমিদারের আমন্ত্রণ ফিরিয়ে ফিরিয়ে দেয় গোঁয়ার্তুমি করে । দ্বিতীয়বার মেনে নেয় । মেহেরপুর রিফ্যুজি শিবির থেকে হরিৎবরণে চলে আসে দুর্গাবতীকে নিয়ে । যম সিং বলেছে থাকতে দেবে, ঘর দেবে পুকুর পারে ঘরের দুয়ারে । দুর্গাবতীকে জমিদারের ঠাকুরঘরে ব্রাহ্মণীর কাজ করবে । আর বৈতলবৈতলের প্রতি কৃতজ্ঞতায় তখনও ঠিক করে নি উপযুক্ত কাজ । তাই নতুন বাড়িতে এসে এদিক ওদিক ঘুরে, পুকুরে ডুব দেয় । হপ্তায় একদিন গিয়ে ডোল নিয়ে আসে মেহেরপুর থেকে । একেবারে তো নাম কাটিয়ে আসেনি । বৈতলের মন মানে না বদ্ধ জীবনে । অফুরন্ত জল না থাকলে, গায়ে মাছের গন্ধ না থাকলে কেন সে পাটনির পুত । বৈতল দুর্গাবতীকে বলে দেয় এখানে মন টিকবে না । দুর্গাবতী মানে না । বলে,
--- আর ফিরতাম নায়, পানিত ভাসি থাকতাম নায় আর । আলাদা জীবন অখন ।
     বৈতলের আপত্তি নেই । কিন্তু কী হবে তার জীবিকা । তার পরিচয় কী । দুর্গাবতী ব্রাহ্মণীর পতি হয়ে থাকা শুধু । কর্মহীন জীবিকাহীন, পত্নীর উপর নির্ভরশীল । বৈতল বিদ্রোহী হয়, জল ছাড়ে না, চলে যায় চাতলার পারে । হাওরের পাশে গ্রাম রাজপুরে, রাজপুরের কৈবর্ত রবিলাল বৈতলকে বলে সরকারি জমির কথা । মাছ মারবে, হাঁস পালবে ছাগল পালবে । ওখানে পশুপালন করে অনেকেই সচ্ছল হয়েছে । বৈতলের মারও শখ ছিল হাঁস ছাগল পালনের । মা বলে, ‘হাসে উনা কইতরে দুনা, ছাগলে পিন্দায় কানো সুনা’ । সোনা পরেনি মা, চান্দকপালিকে ঘরে এনেছে । মা মরে গেলে বাপ বেচে দিয়েছে সৌভাগ্যের গাভীটি । বেচে দিয়েছে না যৌতুক দিয়েছে যুবতি বৌ –এর লোভে । সেই বাপও শখ পূরণ না করে মরে যায় এক দুর্যোগের রাতে, গাছ মাচান এর উপর । বৈতল টঙএর উপর বসে বসে দেখেছে জলের দৈত্য বাপের জলে পড়ে হাবুডুবু খেতে খেতে মরে যাওয়া । হিসেবি জীবনে অভ্যস্ত নয় বৈতল, জীবজন্তু নিয়ে আয় দ্বিগুণ করা কিংবা কানের সোনা কল্পনাও করে না । বরং রবিলালের সঙ্গে হাওরের জলে মাছ মারতেই তার আনন্দ । রবির সঙ্গে ভাগাভাগিতে ভার বয়ে নিয়ে যায় ফাটকবাজার । রবিলালের পাশে বসে । দেখে দোকানদারি । ভাগা করে মাছ বিক্রি করে রবি, টুকরির ডালা উল্টে মাছের ভাগা করার অনেক কেরামতিগ্রাহক ঠকানোর অনেক কল জানে রবিলাল । উল্টো ডালায় অল্প মাছে ভাগা বড় দেখায় । বৈতল বিরক্ত হয় রবির কার্যকলাপে । তবু শোনে রবির কথা । রবিলাল বলে,
--- ঝলঝলা তাজা মাছ দিবে উপরে, আর তলে জাবড়া জুবড়া পচামাছও দিতে পারছ ।
--- অয় গাউক তর মতো আড়ুয়া বেভুতা নি । লাড়াই চাড়াই কিনব । একদিন নি বেচতে, পররদিন নি আইব কেউ ।  
--- আইব, আমার কাছে আইব আমি নু লাগাই দেই । ফাউ দিলাই লে অউ খুশি অই যায় ।
--- বুঝছি ঠগাউরা অইচছ তুই । অখন তর বাং উং ভার ডালা ইতা দিলাইছ আমারে কয়দিনর লাগি । আমি দেখি বেচতাম পারিনি ।
--- তুই কিনিলাছ না কেনে তরে দিলে আমি লিতা করমু ।
--- তুই মাছ মারবে, আমি বেচমু, পয়সা তোর ।
--- অয় পয়সা তোরতারপরে আমার ভার ভাগলে । রিফুজি হকল অখন খুব ঠগঠগামি কররা
--- তুই আমারে ঠগ কইলে নি । ঠিক আছে, দেখিছ আইজ অউ দেখিছ । ভার লইয়া আর রাজপুর ফিরতে না । ঠেং ভাঙি রাখি দিমু তোর
     মাছুয়ার সঙ্গে একটু মস্করা করার জন্যই বৈতলের কথা বলা । বলেই হেসেছে । ও হরি, এমন ভিতু মানুষ বৈতল দেখে নি জীবনে, বৈতলের কথায় গাট্টা গোট্টা মানুষটা ভ্যাঁ করে কেঁদেই দেয় । কিছু বলে না শুধু কাঁদে । এরকম ভিতু, ছইতে –মরা মানুষ বৈতলের পছন্দ নয়, কোথায় প্রতিরোধ করবে, উল্টো বৈতলের ঠেং ভাঙার শাসানি দেবে তবে না জলের সৈনিক । বৈতলের বন্ধু । লড়াই লড়াই ভাব না থাকলে কিসের পাটনি কিসের কৈবর্ত । আর বৈতলকেও তো জানতে হবে, বন্ধুর স্বভাব না জেনে শুধু কাঁদলে হবে । বৈতল জানে বন্ধুত্বের প্রথম ধাপই হলো লাগালাগি । অকারণ ঝগড়া । গায়ে গা লাগিয়ে পায়ে পা লাগিয়ে শত্রুতা । লড়াই করে টিকে থাকতে পারলে দোস্তি, ইয়ারি । লুলা পারে । প্রথম দিনই মিরতিঙ্গার পাহাড় থেকে বৈতলের লাথি খেয়ে পড়েছে নিচে । খিত্তা গাঁও এর বাঙাল কিশোর উঠে দাঁড়িয়ে বৈতলের বিরুদ্ধে ‘তাও’ নিয়েছে, তারপর হেসেছে । হয়েছে প্রাণের মানুষগুরু সৃষ্টিধর মানেন বৈতলের বুদ্ধি । বলেন,
--- যারে ভালা লাগে তারে একটু বাজানি লাগে । খালি মিঠা কুনু ভালা নি । পেট মাতলাইব, মধুমেহারি অই যাইব মনো । এর লাগি কিছু তিতাও খাওয়ানি লাগে । তিতাবাখরর ছাল জিবরা দিয়া ঢুকলে  নাড়িভুড়ি বারই যায় । কিন্তু শরীর ঠিক রাখেআমি তো আমার মনসা মাই হকলর লগে অতা করি । খালি লাগি । যারে ইচ্ছা কান্দাই দেই । ছোটজনরে কইলাম, তুমি যে অত কালা, তুমারে কেউ ঘরো নিত নায় । মাইঝলা জনর চুল ধরি এমন টান দিলাম যে তিন দিন ধরি কান্দরা । হেসে বুঝছি ইতা কান্দা নায় আমারে কান্দানির ফন্দি । আদর করতাম গিয়াবাপ আইছইন, বাপ আইছইন তানে ডরাও, ইলাখান কুনু ভালা নি কও ।
কান্নাকাটি ব্যাপারটাই পছন্দ নয় বৈতলের । রবিলাল যে তাকে এমন অপ্রস্তুত করবে ভাবেনি বৈতল । বৈতল চেয়েছে রবির বন্ধুত্ব । নইলে ছোট ছোট এসব কুয়ার সমষ্টি চাতলার হাওরে যাওয়ার কোনও ইচ্ছেই তার নেই । হাকালুকি আর বড় হাওরের পরাণকাড়া হাওয়ার কাছে চাতলা কিছুই না । জল থেকে যদি মায়ের আদরের মতো হাওয়া না বেরোয় তাহলে কী জলাশয় । ছোটমাছ ভাগা করে বিক্রি করার মানুষ যে নয় বৈতল, রবিলাল বুঝতেই চায় না । অকারণ ভয় পেয়ে যায় । যাক, ভালই হয়, তৈরি হওয়ার আগেই খুলে বেরিয়ে আসতে পারে বৈতল নতুন গ্রন্থি ।
বৈতলের মন এখন আর বিল হাওরে মজে না । এখন সে নদী আর তার অবিরল জলধারার রহস্যে মশগুল । কোথা থেকে আসে নদী, তৈরি করে জনপদ । মানুষ কি নদীর টানে আসে না নদী টানে মানুষকে । বৈতল জানে ভালবাসার কথায় শুধু জট লাগানো আর জট ছাড়ানোর খেলা । মানুষ আগে না নদী আগে, এসব কথার জবাব হয় না, তবু মন কথা বলে । নদীর সদাই চলা দেখে ভাবুক হয় মন । বৈতলের মন ও সদা চলমান । তাও তো বৈতল থামে, আবার চলে । সিলেটের গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরেছে, থেমেও থেকেছে । আবার চলেছে, ফিরে এসেছে বইয়াখাউরি । তার জন্মভূমি । একদিন জন্মভূমি জন্মজল ছেড়েও চলে এল বৈতল । দুর্গাবতীর হাত ধরে মেহেরপুর রিফ্যুজি ক্যাম্প । ক্যাম্প ছেড়ে ইটখোলা, হরিৎবরণ জমিদার বাড়ি । নদী কিন্তু চলেছে অবিরাম । আর আশ্চর্য এক নদী, একই শহরে নদীর উজানভাটি । এদিকে তাকাও উজান ওদিকে ভাটিএদিক ওদিক নদী দিয়ে সুরক্ষিত শহর কি আছে কোথাও । সুরমা গাঙকে বৈতল জেনেছে শুধু তার নিজের নদী, সিলেটের আপন নদী, তার সুনামগঞ্জে সুরমা শুধু ভাটিতেই বয় । কিন্তু সুরমার উজানেও যে আছে অন্য এক নদী বৈতল দেখেনি আগে । সুরমার ভাটির কথা বলেছেন শুধু গুরু সৃষ্টিধর । গুরুর কথায়,
--- সব নদী অউ সাগরো যায় । সব নদী অউ মানুষের মতো, খালি আউগ্‌গায় । থামে না, শেষে গিয়া ঝপ করিয়া সাগরো পড়ে । অউ অইল মৃত্যু । মৃত্যু কিন্তু শেষ নায় রেবা, আবার এক আরম্ভর লাগি সাজিয়া গুজিয়া বই থাকা ।
গুরু সৃষ্টিধর বড়াইল পাহাড়ের কথা বলেননি বইতলকে । গুরুর ভয়, যদি উৎসবের টানে শিষ্য বেরিয়ে পড়ে । গুরুর ভয় শুধু ভালবাসার আঘাত । অগেরস্থ গুরু ভরসা ভাবেন বৈতলকে । পঞ্চকন্যার একজনকে দান করার ইচ্ছা থেকে বৈতলকে ধরে রাখার টান । সদা চলমান বৈতলকে ধরে রাখবে কে । গুরুর হাত ছেড়ে পালায় বৈতল । পালিয়ে চলে এল জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে দেখা সুতোর নালীর মতো নদীর কাছে । নদীর উৎসেরও কাছাকাছি এখন । চোখ মেলে দেখে বড়াইল পাহাড়, পাহাড়ের কোন গুহা থেকে জানি বেরিয়েছে এই সুতার নালী, হঠাৎ জলরাশি হয়ে জড়িয়ে ধরেছে বৈতলের নবীন শহরকে । বৈতল একদিন পৌছে যাবে নদীর জন্মস্থানে । বরাকোত্তরীতে গিয়ে গুরুর পায়ে এক অঞ্জলি জল দেবে । বলবে,
--- খালি মৃত্যু নায়, জন্মও আসল ।
জন্ম ও মৃত্যুর মাঝামাঝি বসবাসের সময়কালে নদীর বিভঙ্গ বৈতলকে আকৃষ্ট করে । নৃত্যপরা রূপ থেকে কত যে মুদ্রার বিচ্ছুরণ । সেই আকর্ষণেই বন্ধু দুখুর সঙ্গে তার লড়াই । লড়াই করতে করতে কত রকম আকারে যে সাজায় শহরবাসী নদীকে । গুলতির বাঁট, খুরাদিল বাটি এমন কি চাঁদের আকৃতিতে সাজাতে সাজাতে বন্ধুত্বকে দৃঢ় করে । হেডমাস্টার বলে ঘোড়ার নাল, বৈতল জানে সব কল্পনারই এক সত্য থাকে । দেখার সত্য আর কল্পনার সত্য মিলেই তো সৃষ্টি; নতুন দেখা । দুখু বছই আপদ যোগেন্দ্রদ্দা লাখুদা হেডমাস্টার বৈতল সবার দেখা এক এক করে নতুন চোখের দেখা । একা মানুষের বুদ্ধিতে কতটুকু আর সুন্দর থাকে, সবাই মিলে যে সুন্দর সাজায় সেই তো আসল । মানুষ একা থাকার জন্য ঘরবাড়ি সাজায় না, একলা থাকার জন্য ধর্মকর্ম করে না, মানুষ একা থাকার জন্য সমাজ সাজায় না । জন্ম থেকে মৃত্যুর মাঝামাঝি সময়টাকে সহনীয় করতে মানুষ সুন্দরকে ডাকে । মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ সুগম করে । ভাটির পথে নামে । ভাটি মানে যদি অবধারিত পরিণতি পথ হয় তাহলে কেন দুপার উর্বরা করার এই শ্রম । বৈতল গুরুর কাছ থেকে জেনেছে নদীর শিক্ষা । মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ সাজায় নদী, খৈ ছিটিয়ে যায় নিজেই । মৃত্যুকে জয় করার সব উপকরণ রেখে যায় উপত্যকায় । এক ছুতার মানুষের সান্নিধ্য বৈতলকে অনেক কিছু শিখিয়েছে । গুরু সৃষ্টিধরও তাই হৈ চৈ করে বেঁচেছেন । আট আনা রোজগার করে এক টাকা খরচ করেছেন । বলেছেন,
--- তুমি দেখাত দেখরায় আট আনা । আমার মনর মাঝে নু কোটি টেকার সিন্দুক ।
     মনের সিন্দুক খুলে গুরু টাকা বের করেন একা একা । কেউ থাকে না সঙ্গে । মনসামঙ্গল গাওয়ার জন্য সৃষ্টিধর ওঝা ঘোরেন সারা সিলেট । সাকরেদ বৈতলকেও থাকে সঙ্গে স্বাধীনতার মিটিং মিছিল, তেভাগার আন্দোলনেও সবার সঙ্গে । নিয়ম করে কখনও দেবতাঘরে যেতে দেখেনি বৈতল গুরুকে । কিন্তু তিনি একবার দিনের শেষে নিয়ম করে কোথায় যেন হারিয়ে যান । বৈতল ভাবে গুরুর ভর হয় । বৈতল ভাবে সিন্দুক খুলে টাকা বের করেন । গুরু বলেন,
--- না রেবা খালি বার করলে অইব নি । সিন্দুকো না জমাইলে বার করমু কেমনে । দিনো একবার একলা হওন লাগে । নাইলে তো আরি, রান্দা, বাইশর লাখান অস্তর অই যাইবায় । একটু স্বার্থপর না অইলে আর মানুষ অইলাম কেনে । ঔ সময় দেখবায় মগজেদি জ্যোতি বার অইব ।
বৈতল জ্যোতির দেখা পায় নি । বৈতল চেষ্টা করেও একাকী থাকার সুফল পায়নি । লুলার সঙ্গে, দুর্গাবতীর সঙ্গে, দুখু আপদের সঙ্গে, মামুপীর হেডমাস্টার সবার সঙ্গে থাকতেই বৈতলের সুখ । নতুন বান্ধবহীন দেশে রবিলালের সখ্য না পাওয়ায় একবার একাকী হয় বৈতল । মিরতিঙ্গার টিলায় যেমন তার পাথর, তেমন পাটপাথরের খোঁজে অভয়াচরণ ভট্টাচার্য পাঠশালার মাঠে বসে থাকে একাকী । আর এস এন কোম্পানীর জাহাজঘাটার সন্ধ্যায় ‘ছিরুভিরু পায়ে’র শব্দ শোনে । বরাক নদীর উপর নির্মীয়মান পুলের উপরমুখী নির্জনতা থেকে হারিয়ে যায় আকাশনীলের কুলুকুলু ডাকে । সন্ধ্যার ঘনায়মান অন্ধকারে আলো নেই কোথাও, কিন্তু আভাসে বোঝা যাচ্ছে পাথরের পুল উঠে যাচ্ছে গগনে, নদীর উপর থেকে সোজা গিয়ে থেমেছে, আকাশের গায় । নাকি আকাশ থেকে নেমেছে আকাশগঙ্গা । বৈতল দেখে বাঁশের বেড়া পুলের উঠতি পথে, আগাছার জঙ্গলে পরিত্যক্ত নির্মাণ । ঝোপঝাড় আর বেড়া পেরিয়ে পুলে ওঠা কঠিন কাজ নয় বৈতলের । তেলাল শরীরে গতি আনে বৈতল, বেড়া জঙ্গল পেরিয়ে মেচি বাঘের ক্ষিপ্রতায় অসমাপ্ত পুলের উপর দৌড়য় বৈতল, পেরিয়ে যায় এক নম্বর দুনম্বর খুঁটি । ভাবে এ কেমন পুল, শুধু উঠছেই উপরে । বাঁশের হাকম দেখেছে গ্রামের ছড়ার উপর বইয়াখাউরির হাতলহীন হাক্ম দেখে অভ্যস্ত বৈতলের চোখ বিস্মিত হয় সিলেটের লোহাপুল দেখে । সুরমা নদীর উপর এই বিশাল পুল দেখে বলেছে, বাপরে বাপ । বরাক নদীর উপর পাথরের পুল এত লম্বা না হলেও চওড়ায় বড় । বৈতল শুধু উপরেই ওঠে । তিন চার নম্বর খুঁটির নিচে বসে বলে, আঃ কী আরাম । এমন সুখের ঠাঁই কোথাও খুঁজে পায় নি শহরে । কিন্তু কোথায় নদী, অন্ধকারে কিছুই বোঝা যায় না । ঐ দূর কালীবাড়ির দিকে নদীর জলরেখা চিকচিক করে আলোর প্রতিফলনে । নদীর সুবাতাসে আকুল হয়ে মনে পড়ে তার ফেলে –আসা একাকীর সাম্রাজ্যকথা । প্রথমেই মনে পড়ে মিরতিঙ্গার টিলা পাহাড়, তারপর একে একে সব বিল হাওর চুনা পাথরের টিলা, পিয়াইন সুরমা কুশিয়ারা । বরাক নদীর পারের মানুষের বড় ভূতের ভয় । জল আর জঙ্গলময় শহরে শেওড়াগাছের ঘন ছায়া অন্ধকারে কলাগাছের দীর্ঘ পাতাকে ডাকে আয় আয়, পাতা বলে সরসর । দুখু এসব গাছভূতের কথা শোনায় বৈতলকে । বলে,
--- দেখছি কুনুবাড়ির ঘসামাজা থালবাটিত কিচ্ছু খাইছ না ।        
--- কেনে বে ।
--- ইখানো মাইনষে ভূতর ভয়ে রাইত বার অইননা ।
--- তে কিতা করইন ।
--- অখন বুঝিলা । তেও যদি না বুঝছ খাওয়ার সময় বর্তনর গন্ধেউ বুঝি লাইবে ।
     সন্ধ্যের পর তাই আধখানি পুলের ধার ঘেঁষে না কেউ । খেয়াঘাটে তখন সাহেব ভূতের মোচ্ছব হয় । সাদা রঙের সাহেবরা এসে জড়ো হয় পুলের উপরসাহেব ভূতের জন্যই নাকি পুল সম্পূর্ণ হয় না । রাতের বেলা ভারিরা আসে হাজারে বিজারে । কত রকমের খাবার আসে কেক পাউরুটির বাখরখানি রুটি গরু শূয়োর মুরগির মাংস আসে কাছাড় ক্লাব থেকে । চিনামাটির বড় বড় বোতলে বিলাতি মদ আসে জন স্মীল থেকে । সদরঘাটে সারসার গাড়ি জমে থাকে সারারাত । জুড়িন্দায় পারাপার হয় সাহেব মেমে ভর্তি গাড়ি । ঘোড়ায় চড়ে আসে লাবকের ডাক্তার । বৈতল তাই ঘাপটি মেরে বসে থাকে বিলাতি ভূত দেখতে । দেখার হাওরে, বড় হাওরেও ভূত আছে শুনেছে মায়ের কাছে । মা বলে,
--- দেওলা ।
বলে,
--- দেখিছ, একদিন আমারেও দেওলায় নিব ।
মাকে দেওলায় নেওয়ার ভয় নিয়ে বড় হয়েছে বৈতল । সন্ধ্যে হলেই মাকে আগলে আগলে রাখে । হাওরমুখো হতে দেয় না । বাপের মুখ যেদিন ছোটে, সেরাতে বৈতল মাকে ছাড়ে না এক মুহূর্তের জন্য । নৌকোর কাছি খুলে বাপ যে – রাতে ডাকে, বৈতল প্রমাদ গোনে । একাকী মাকে রেখে যায় কী করে । বাপের কথাও অমান্য করে না বৈতল । বাপ বলে,
--- হেই বৈতল, পানিত লাম ।
 নেমে যায় বৈতল বাপের সঙ্গে পানি খেইড় খেলতে । সারারাত ধরে মাছ ধরার খেলা । জল খেলার রাতে বৈতল বাপের সঙ্গেও খেলে । বন্ধু লুলাকে ডেকে আনে । বলে,
--- মারে দেখিছ ।
বৈতল মাকে শেষ দেখা দেখতে পারেনি । লুলা দেখেছে । লুলা করেছে সন্তানের কাজ । সর্পদংশনে মৃত মায়ের সৎকার । মাকে নিয়ে লুলার সঙ্গে হিংসার সম্পর্ক বৈতলের । মা আবার তাদের জুড়েও রাখে । বলে,
--- রাম জন্মাইতে বেটা রইম । দেখিছ ছাড়াছাড়ি অইছ না ।
     সেই লুলার শ্বাসনালী টিপে মেরে ফেলে দিয়েছে বৈতল ক্রুদ্ধ পিয়াইন এর জলে । ছাড়াছাড়ি হয় জীবনের মতো । লুলার যে বুদ্ধিনাশ হয় । লুলা কেন মরে, এখনও হিসাব মেলাতে পারে না বৈতল লোকে বলে লুলা বেছে বেছে হিন্দু মেয়ের সর্বনাশ করে, ধর্মনাশ করে । বৈতল জানে লুলা ওরকম নয় । লুলার মনে মলিন রঙের সব দুঃখ । লুলার মা নেই । বাপ নতুন মাকে নিয়ে চলে যায়, লুলা বড় হয় নানার কাছে । বৈতলের মাকে মা পেয়ে লুলা হাসে । সেই মাও একদিন চলে যায় আচমকা । বৈতলও নেই বইয়াখাউরি, মনসাপুঁথি শেখাতে রেখে এসেছে বিয়ানিবাজারের রইদপুয়ানি গ্রামে । কালো রঙের পেচকুন্দা পাখির সঙ্গে জড়িয়ে যায় বৈতল গুরুগৃহে । গুরু সৃষ্টিধরের কনিষ্ঠা কন্যাকে যখন ছেড়ে যায় তখন দেরি হয়ে গেছে । লুলা বইয়াখাউরি ছেড়ে চলে গেছে পাগলা । লুলা কবিগান লিখতে শুরু করে । সুর করে পড়ে গ্রামের হাটে বাজারে । লুলা নাম পাল্টে হয় দিলবাহার বাঙ্গাল । বৈতলকেও বলে নতুন নাম দেবে সুখবাহার । বৈতলের টানেই লুলা ফিরে আসে এনায়েৎপুর কবরখানায় । সব হারিয়ে বরাকপুলের চারনম্বর খুঁটিতে বসে বৈতল বুক চাপড়ায় একা একা । অশরীরী লুলাকে বলে,
--- কৈ দিলে বেটা । নাম দিলে না, সুখও দিলে না, গেলেগি । মার কথা রাখলে না, মায় কইছলা ছাড়াছাড়ি অইছ না । এক বেটির লাগি মরি গেলে । দুর্গার উপরেউ তর চউখ  পড়ল কেনে । দুর্গায় তো তোরে চাইত না । তে কেনে হাত দিলে তাইর গাত । দুর্গা কথার অর্থ জানছনা বেটা । দুর্গার গাত যখন হাত দিচছ তর বিনাশ তো অইবউ ।
নির্বান্ধব শহরে এতসব কথার মাঝে কি চোখ দিয়ে টপটপ জল ঝরে বৈতলের । বৈতলের চোখ চুনাপাথরের থলা, জলের কোনও উৎস নেই । বৈতল কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করে না । কিন্তু বুক ফাটে মাঝে মাঝে । বুক খুলে দেখায় না বৈতল । তবু দেখে তিনজন । অন্ধকারের অতিথি আরো তিনজন তখন চারের উল্টো খুঁটিতে । গাঁজার আসরে বসে তিন ভূতশরীর । বেয়াদব দখলদারের উপর রাগে ওরা
তিনজনের মধ্যে বেঁটে লোকটাই দুখু । দুখুই ন্যাকড়া জড়ানো চিলিম বাড়িয়ে দেয় বৈতলের দিকে । সন্দেহের চোখে দেখে, বৈতল জানে, বাট্টি হারামজাদার লাট্টি । সাবধান হ্য় । শুকনো নেশার মৌতাতে না করতে নেই, তাই নেয় । কয়েকটানে পেটভরা ধোঁয়া নিয়ে চুলু ঢুলু চোখে বলে,
--- ইতায় আমার কিচ্ছু হয় না । আমার লগে কানা পয়সাও নাই যে বেহুশ করিয়া লুটি লাইবায় । খাওইয়াইছ, বালা করছ । আমিও খাওইয়াইমু একদিন । কও কুনদিন খাইতায় ।
--- আমরা রুজঅউ খাই ।
--- আমিও খাই । তে ইতা নায় । আমি মালা খাই ।
--- মালা কিতা । পানি নি । শরাব ।
--- না, না । মউয়া চিনো নানি ।
--- মউয়া ।
--- অয় আমিও চিনতাম না । তে ইখানো আইয়া জমিদার বাড়ির উঠানো দেখলাম মস্তবড় এক গাছ । সাদা সাদা গুটার লাখান ফুল । খাইলে নিশা হয় । আমার বউএ গাছর তলে যেতা পড়ি থাকে ইতার মালা করিয়া শুকাইয়া রাখি দেইন । আর আমি যখন রিক্সা লইয়া রাইতর টিপো যাই, তখন মালা থাকিয়া ফুল ছিড়িয়া খাই । কী মজা লাগে । পেডেলর আগেউ গাড়ি ছুটে ।
--- ধুর বেটা পগার পগা । তর বাড়ি কই । কোন জমিদার বাড়ির কথা কইরে ।
--- বৈতলরে পগা উগা কইছ না । মারি ফালাই দিমু কইলাম, তিনটায় মিলিয়াও কিচ্ছু করতে পারতে নায় । অখন গাইঞ্জা খাওয়াইচছ, কিচ্ছু কইতাম নায় । যদি লাগতে চাছ, কাইল আইছ, হরিৎবরণ জমিদারিত । দেখাইমুনে মউইয়ার তাকত ।
--- বাক্কাউ দেখি শুক্কুর মামুদর পুত । তিন টানেউ বেটা হাতেমতাই ।
--- কইলাম যে ইতার আমার কিছহু হয় না । আমার আসল নিশা পানি ।
--- পানিও খাচ নি বেটা অত পয়সা পাছ কই । জমিদারে দেয় নি পেদারে ।
--- জমিদারে কেনে দিত । আমি কাম করি নানি । আমার রিক্সা আছে । আরো কাম আছে । রাইত টিপ মারলে বহুত পয়সা ।
সব উল্টোপাল্টা হয় । নেশাড়ু তিনজনের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন খুলে দেয় বৈতল । ইশারায় জানায় তার সব কথা । বুঝলে বোঝ, কাছে এসো । দোস্তি করো । দেশ ছাড়ার পর তো বিশ্বাসের মানুষ পায়নি । অন্ধকারের তিন চুতরা পাতাই সই । বইয়াখাউরির একমাত্র বদমতলবি মানুষই হলো বৈতল । আর সব ভাল । বন্ধু লুলা ও সহজ সরলবৈতলের পাল্লায় পড়ে সিলেট জুড়ে ধূর্তামি করে বেড়িয়েছে । তখন তো একটাই দেশ, সবাই মিলে মিশে থেকেছে নিজের নিজের ভিটেয় । এখানে স্থানীয় মানুষ আর ভিটে ছাড়া মানুষে হয়েছে রেষারেষি । সব শয়তানি শিখেছে খাদ্য আর বাসস্থান এখন সহজলভ্য নয় । ভালমানুষিতেও কাজ হয় না । রিফ্যুজি না হয়েও অনেকে ক্যাম্পে নাম লেখাচ্ছে । চাল ডাল নগদ টাকায় ডোলের সন্ধান পেয়েছেতাই বৈতল একটু মেজাজ দেখায় । মারামারির ভয় দেখায় । মানে পুরোপুরি বিশ্বাস নেই এখনও । কিন্তু বৈতলের পছন্দ হয়েছে একটাকে । যেটা খুব চ্যাটাংচ্যাটাং কথা বলেছে, বেটার নাম দুখু । গাঁজা খায় না কিন্তু সঙ্গ দেয় । মানে, বৈতল ঠিকই ধরেছে, ঐ ব্যাটাই হারামজাদা । পঞ্চায়েতির উস্তাদ । বাকি দুটো বছই আর আপদ । তিনটেই বাঙাল, মুসলমান । দুখুই ওদের দাবড়ে বেড়ায় । বৈতলের সন্দেহ, লোকটা অনেক কুকর্ম করে । যদিও বলে মামুপিরের খিদমতগার । অন্ধকারের ভিতরই বৈতলকে জেরা করে । বলে,
--- তোর বাড়ি সুনামগইঞ্জ নি
--- তুই কেমনে বেটা, হক্কলতাত উস্তাদি মারছ দেখি ।
--- আউয়া দেখলেউ মারি । তোর পানি নিশা কইলে নানি ।
--- পানি তো হবিগঞ্জোও আছে ।
--- আউয়া নাই হবিগইঞ্জো । ছলাইরে নি ।
--- না বেটা, তোর খুব পানিতরাস । শরীল দেখিয়াউ বুঝিয়ার । পানিত নামতে নি । অউত্ত দেখ আধখানি পুলর মাথা । মাথা থাকি মার এক ফাল, গিয়া পড়বে পানিত । পাইবে মাছ । ঘাঘট বোয়াল গজার । ধরিয়া লইয়া আইতে পারলে কইমু বেটা ।
--- হাচানি । আমারে হাচারির আউয়া পাইচছ নি । নদীত গজার ধরতাম । জাল ছাড়া মাছ মারতাম ।
--- ঠিক আছে, গজার নায় রউ অউ ধর চাইন দেখি ।
--- জাল লাগব ।
--- তে আর তুই বেটা কিওর পাটনি ।
একটু তো নেশা হয় বৈতলের । কিন্তু বৈতলের কাছে সব নেশার রাজা হল জল । তাই নদীর জলের কথায় নড়ে চড়ে জলচর শরীর । বৈতল জানে জলকে তার ভয় নেই । জলের নাগাল পেলে সে মহাবীরযদি অর্ধেক পুল থেকে ঝাঁপ দিলে নদী হয়, তাহলে কোনও ভয় নেই । সে নেবে যাবে ঝপাং । কিন্তু যদি জলের বদলে থাকে শুকনো পাথর । বেঘোরে মারবে বৈতল । তবে বন্ধুহীন বেঁচে থাকাও কি বাঁচা । যদি ওরা ভুল বলে, তবে ওরাই মরবে । একের বদলে তিনদগ্ধে দগ্ধে মরবে । লুলা তাকে যেমন মারছে, মারবে সারাজীবন । তাই নবীন বন্ধুদের বলে, আনবে । মাছ ধরে আনবে । একটা কিছু বাহাদুরি না দেখালে ওরাই কেন মানবে বইয়াখাউরির মাইমলকে । বৈতল ভুলে যাওয়া দেবীকে স্মরণ করে, গুরু সৃষ্টিধরের চরণে প্রণিপাত করে, পেছন ফিরে দেয় দৌড় । চারের খুঁটি থেকে পিছিয়ে তিন দুই এক । বৈতল পালাতে জানে না, বেটাগিরি দেখাতে পেলে ছাড়ে না । তেলাল শরীর থেকে নিমা খোলে, তফন খোলে, আন্ডার প্যান্টের ফিতে শক্ত করে বাঁধে । অন্ধকার রাতের স্নগে মিশে যায় বাপের বেটা বৈতল । শরীরে পায় মাইমলি গন্ধ । বাপ যেমন বলে,
--- মাছর লগে লড়তে অইলে, সাপর লগে লড়তে অইলে মাইমলি গন্ধ লাগে । কালা তেলাল শরীর লাগে । শত্রুরে ডর দেখানি লাগে আইছলা গন্ধে ।
     কে কার শত্রু । কাকে বৈতল ভয় দেখাবে তার আঁশটে গন্ধে আর কালো শরীরে । বৈতল এখনও জানে না পাগলার মেয়ে দুর্গাবতী তার কালো শরীরকে ভয় করে না ভালবাসে । দুর্গাবতীর কাছে সে অবলম্বন না ভরসা, জানে না বৈতল । দুর্গাবতীর দুধের শরীরটায় লোভ আছে বৈতলের, তাই দুর্গার পায়ের তলায় পড়ে থাকে । রহস্য করে বলে,
--- আমি অইলাম ভোলানাথ । তুমার পাওর তলে পড়ি থাকমু ।
     বিয়ানিবাজার রইদপুয়ানির চায়নার রঙ নিকষ কালোবৈতলের রঙে রঙে মেলানো । মনটা যে ধলা ফক্‌ফকা । মন দিয়ে বসে রয়েছে, শরীরও যে দিতে চায় । নেয় না বৈতল । কেন, কালো বলে, গুরুকন্যা বলে । সৃষ্টিধর ওঝা কাঠমিস্ত্রি বৈতলকে শেখান পুঁথির মন্ত্র, মনসামঙ্গল । শেখান জাতিধর্মের বিভেদ ভুলতে । বৈতল জানে চায়নার গায়ের রঙই বিভেদ করে । আবার সেই গায়ের রঙই মনে পড়ে রেল গাড়ির কামরা । টেলিগ্রাফের তারের উপর দেখা লেজঝোলা ফিঙে পাখি । চায়নার কাছে ফিরে আসে । বলে,
--- অউ পেচকুন্দির টানেউ আইলাম আবার ।
      ফিরে আসে বৈতল চামেলির কাছে । থাকে কই । গুরুকে অমান্য করে চলে যায় বইয়াখাউরি আবারধলাবরণ দুর্গাবতীর জন্য খুনখারাবিও হয় । দেশ ছাড়বে না বলে শপথ করেছিল । জেল ফাঁসির ভয়ে পালিয়ে যায় ইন্ডিয়া ।
 নতুন শহরের এমাথা থেকে অমাথা রিক্সা চালায় বৈতল । ‘যাইতায় নিবা’ বললে সেও মাঝে মধ্যে বলে ‘যাইতাম নায়’ । শহরের প্রতিটি গলিঘুঁজি বৈতল চেনে । দিনের বেলা, রিক্সা চালাতে চালাতে সে দেখেছে পুলের অবস্থান । বৈতল জানে কোনখানে জল, কোনখানে চোরাপাথর । তবু সে দৌড়য় । সাহেব ভূতের মোচ্ছব দেখতে এসে তারও সাধ হয় ভূত হওয়ার । মহাবীরের মতো দৌড় শুরু করে বৈতল । আত্মহত্যা করার মানুষ নয় সে, তবে কেন সে দৌড়ে পৌঁছে যায় শেষ সীমায় বৈতল জানে তার মনে কী আছে । বৈতল জানে বন্ধুরা জাপটে ধরবেই । নইলে যে মরণ । ভাঙাপুলের শেষ সীমানা থেকে অনেক দূরে নদী । ঝাঁপ দিলেই পাথুরে পথের উপর থেঁতলে মরা । বেঁটে লোকটা, যার উস্কানি সবচেয়ে বেশি, সেই আটকে দেয়, আপদ অন্ধকার জড়িয়ে ধরে কাঁদে । বছই সাজায় আবার চিলিম । বৈতল হাসে রহস্যনয়নাকি কাঁদে ভিন্নধর্মী তিন বন্ধুর বুকে মুখ রেখে । বুক কাঁদে, বৈতলের চোখে দুষ্টুমি ছাড়া কোনও ছাপ নেই ।



চলবে  

আরো পড়তে পারেন

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...