Sponsor

.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

Thursday, September 29, 2016

কোন কথা নয়



প্রতিবাদ নয়।
প্রতিরোধ নয়।
প্রতিশোধ নয়।
শুধু দেখে যেতে হবে , শুনে যেতে হবে, কথা হবে না।

যুদ্ধের ক্ষত অবশিষ্ট অভিশাপের বীভৎস সংরাগ!
ইরাক যুদ্ধে জেহাদী আই এস আই এসের যৌন দাসীরা
জীবনের জন্য,  ইয়াজিদি ফুল ফুল মেয়েগুলি
আত্ম সমর্পণে,  ফুলের মত দেহদানে নারাজ ছিলো।
যুদ্ধবাজ, কামুক জেহাদী যুদ্ধবাজ নষ্ট দংশনে
ঐ ফুলের মত যুবতী মেয়েদের দেহ ছেঁড়াখোড়া করে।
আহা! ফুল ফুল বন্দিনী মেয়েগুলি, আহা সন্তানবতীরা!
আজন্ম দেহটাকে, দেহের সম্ভ্রমটাকে একেবারে
একান্ত আপন ভেবেছিলো
এই যুদ্ধের দেশে যুদ্ধবাজদের কামুক বারুদ স্তুপে
মাতা নয়, জায়া নয়, কন্যা নয়, বন্দিনী ধর্ষিতা শুধু!
এইমাত্র পরিচয়ে বেঁচে থাকার ক্লিন্ন ক্লেদাক্ত জীবন?
যে ধর্মকে আত্মা বলে জেনেছিলো
ধর্মবাজ জেহাদী তাও কেড়ে নিলো।
নষ্ট দেহ, হৃত আত্মা এ কেমন জীবন!
এবার শুধু অবসান!  
তাই ঝাঁপ,  মরণঝাঁপ মাউন্ট সিনজার থেকে!

প্রাচীনা এশিরিয় নগরী নিনেভের কাছাকাছি
পশ্চিম তীরে কলোচ্ছ্বাসিত টাইগ্রিসের নবীনা মোসুুল!
উত্তর ইরাকের ঝকমকে মুক্তো ' আল ফায়েহা ', প্যারাডাইস,
সবুজের উত্তাল তরঙ্গ 'আল খাদ্রা ' মোসুল!
উনিশটি যৌবনবতী ইয়াজিদি যৌনদাসী সেদিন
আই এস আই এস কামুক যুদ্ধবাজদের যৌন সঙ্গিনী হলো না।
কী দুঃসহ আস্পর্ধা! কী ভয়ঙ্কর পরিণতি! কী নির্মম শাস্তি!
সুদৃঢ় লোহার খাঁচায় পুরে আগুনে পোড়ানো
জলজ্যান্ত উনিশটি কুসুমিতা নারীকে নিধন!
হাজারে হাজারে দু 'পেয়ে মানুষ নামধারী দর্শক,
কেউ কিছু বললো না,  কোন প্রতিবাদ হলো না
ভীতির কবলে মোসুলের হাজারো সুসভ্য জনতা
দগ্ধ নারীমাংসের দুর্লভ ঘ্রাণে মুগ্ধ ধীরপায়ে হেঁটে
টাইগ্রিসের কুলকুল কান্নায় ডুব দিয়ে নিনেভের
ধ্বংসস্তুপ সভ্যতা পেরিয়ে হাজারো বছর আগের
আরণ্যক অসভ্যতায় চলে গেলো শুধু।

© সুনীতি দেবনাথ 

Wednesday, September 28, 2016

সর্বহারাদের কথা

।।শৈলেন দাস।।
(১)
বাড়িটা বিক্রি হয়নি তখন তাই ফিরতে পেরেছে যতীন। হাওর অঞ্চলের এক প্রত্যন্ত গ্রামে সাতপুরুষের ভিটে বলতে বিস্তৃত টিলার এক কোণে ছোট কুঁড়েঘর,  কয়েকটি আম জামের গাছ সহ চারপাশে ঝোপ জঙ্গল। পরিবারের লোকজন ও কিছু গৃহপালিত পশুপাখি নিয়ে সে ছিল এক সুখের নীড়। তবে এখন সে একাই এসেছে রাতের আঁধারে, পালিয়ে। স্ত্রীপুত্র কেউ সাথে নেই।
মানব সৃষ্ট দূষণের যন্ত্রণায় রুষ্ট হয়ে মাতৃসমা হাওর মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় দেনার দায়ে পড়তে হয়েছিল যতীনকে। সুযোগ বুঝে সুদখোর মহাজন চাষের জমির জবরদখল নেয়, বাড়িটার প্রতি আগ্রহ দেখায়নি নিষ্ফলা বলে। রোজগারের অন্যকোন উপায় ছিলনা তাই পরিবার প্রতিপালনের জন্য সে চলে এসেছিল শহরে। শূন্য হাতে সহায় সম্বলহীন যতীন ঘর বেঁধেছিল শহরতলীর এক পরিত্যক্ত জলাভূমিতে।
বিশ্বায়নের ছোঁয়া লেগে শহরের শরীর বাড়ন্ত, তার সাথে ক্রমশ বিত্তশালী হয়ে উঠা শহরের আদি বাসিন্দারা যতীনদের মত সর্বহারাদের তখন আপন করে না নিলেও শহরে তাদের উপস্থিতিকে মেনে নিয়েছিল ক্রমবর্ধমান শ্রমিকের চাহিদা পূরণ করবে বলে। মাথা গুঁজার ঠাঁই যেমন পেয়েছিল যতীন তেমনি রুজি রোজগারের ব্যবস্থাও হয়ে গিয়েছিল সহজে। যদিও আর্থিক সচ্ছলতা কখনো আসেনি যতীনের জীবনে, তবে না খেয়ে থাকতে হবে এই ভয় আর তাড়া করেনি তাকে। তাই সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর রাতে অঘোরে ঘুমানোর বদ অভ্যাস পেয়ে বসে তাকে। কিন্তু শীতের কোন এক সকালে প্রতিবেশী যুবকের আর্ত চিৎকারে তার অন্তরাত্মা জেগে উঠতে কার্পণ্য করেনি বলে পুলিশ আজ তাকে খুঁজছে।
শৈরাচারীদের অত্যাচারে জর্জরিত হত দরিদ্র জনগণের 'মারের বদলে মার' মনোভাবের প্রতি শহরবাসী সাধারণ জনগণের সায় থাকলেও এককালে বাম আদর্শে উদ্বুদ্ধরাও বিপ্লব আখ্যা দেয়নি বলে যতীনকে পালাতে হয়েছে ভয়ে। সহজসরল গ্রাম্য জীবন যাপনে অভ্যস্থ যতীন স্বল্প মেয়াদের এই শহুরে জীবনকালে দেখেছে ধর্মীয় উন্মাদনার সাথে রাজনীতির সংমিশ্রণ, মিটিঙে মিছিলে গিয়ে শুনেছে অনেক বিপ্লবীর কথা। সর্বহারাদের মুক্তির আশায় যে মানুষগুলি সবার সমান অধিকারের নীতি অনুসরণ করার বুলি আওড়েছে পথেঘাটে, তারাই মেকি ভদ্র সেজে পথে নেমেছে যতীনদের দুষ্কৃতি আখ্যায়িত করতে অথচ শৈরাচারীর বিরুদ্ধে টুঁশব্দটি নেই!
দুদিন থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। আজও দুপুর গড়িয়েছে অনেকটা। বাড়ির পূব দিকে বড় হিজল গাছের ছায়ায় বসে হাওরের দিকে চেয়ে আছে যতীন। কোঁচড়ে গামছার এক মাথায় কয়েক মুটো মুড়ি, যা একটু আগে দিয়ে গেছেন পাশের গ্রামের শুক্কুর চাচা। দুপুরে হাওরে গরু চড়াতে এসেই যতীনকে দেখতে পেয়ে এসেছিলেন। জানিয়ে গেছেন, বাজারের লোকজন নাকি বলাবলি করছে কি সব গণ্ডগোলের জন্য পুলিশ শহরতলী ঘিরে রেখেছে। রেডিওতেও খবর দিয়েছে কোন এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির বাড়িতে হামলা করে দুষ্কৃতিরা নাকি সবাই পালিয়েছে; বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদে নাকি গোটা শহর উত্তাল। যতীন যেন কিছুদিন শহরে না যায়।
(২)
এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে শহরতলীর নিজের বাড়িতে শেষবার গিয়েছিল সতীশ। গণ্ডগোলের তিন চার দিন পর পুলিশ ও সেনাবাহিনীর নজর এড়িয়ে গোপনে সেখানে যেতে হয়েছিল তাকে। আতঙ্কময় পরিবেশে অনাহারে অর্ধাহারে নারী শিশুর দিন গুজরানো দেখে সেদিন নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়েছিল তার। স্বজনদের এই দুর্দিন  মেনে নিতে পারছিলনা সে, বিশেষ করে যতীনের দুই বছর বয়সী শিশুপুত্রের করুণ মুখ এখনও চোখে ভাসছে। ভদ্রলোকের বাড়িতে গরীবেরা ঢিল ছুড়েছে তাই রুষ্ট হয়েছে সুশীল সমাজ, এমন পরিস্থিতে কাকে বুঝাবে সে- যা রটেছে তা যে আদৌ ঘটেনি, শহরতলীর সর্বহারারা দুষ্কৃতি নয়। সতীশ লক্ষ্য করেছে পরিচিতজনেরাও এই কয়দিন যোগাযোগ করেনি, কি জানি তাকেও দুষ্কৃতি ভেবে বসে আছে কিনা! না, স্পষ্টীকরণ একটা দেওয়া দরকার। তাই চিঠি লিখেছে সে সবকয়টি সংবাদপত্রের পাঠকের মতামত বিভাগে। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটি পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়নি তার চিঠিটি।
কিছুটা হতাশ এবং বিমর্ষতা নিয়ে শহরের ব্যস্ততম রাজপথে যানজটে আটকা পড়ে সতীশ যখন এসব কথাই ভাবছিল ঠিক তখনই মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠল। কোন মতে বাইকটি রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে মোবাইল হাতে নিতেই স্ক্রীনে ভেসে উঠল মধু'দির নাম। ছোট একটি সাহিত্য পত্রিকা করে মধু'দি, সতীশ এর মত নতুনদের উৎসাহ দিতে মধু'দির এই প্রয়াস। বোতাম টিপে ফোন কানে ধরতেই মধুদি বললেন 'সতীশ, পিসি কথা বলতে চায় তোমার সাথে।' খরায় শুকিয়ে খাট হয়ে যাওয়া কৃষি জমিতে যেন ঝরঝর করে বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ল কয়েকটি। চরম হতাশার সময়ে আশার আলো খুঁজে পেল সতীশ। বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠার আগেই পিসির কণ্ঠস্বর - 'তুই কোথায় আছিস সতীশ? এতকিছু হয়ে গেল আমাকে একবারও বললি না? একদম মন ছোট করবি না, তুই এখনই আমার কাছে আয়।' লেখালেখির জগতে তার কলম যেমন অনন্য তেমনি সবাইকে ধরে রাখার অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব পিসি সাহিত্যজগতে সতীশদের অভিভাবক। ঘটনার আকস্মিকতা এবং সংকোচের কারণে সে ভুলেই গিয়েছিল পিসির কথা। সতীশের চিঠি দৈনিক পত্রিকাগুলির একটিও ছাপেনি, ছেপেছিল নিতু'দির সাপ্তাহিক 'নতুন দিশা'তে এবং এর ফলেই এক সপ্তাহ পরে পিসি জানতে পেরেছে সতীশরা ভাল নেই।
(৩)
এক মাস কেটে গেছে শহরতলীতে আর পুলিশ আসেনি। যতীনও ফিরে এসে আগের মতই লেগে গেছে রুজিরোজগারে। পিসির এক চিঠিতেই কাজ হয়েছে, মানবাধিকার কর্মীদেরও ঘুম ভেঙ্গেছে ততক্ষণে। সতীশ তার লেখালেখির বিষয়বস্ত তথা ধরণ পাল্টে ফেলেছে, পরিস্থিতির কারণে অনেক পরিণত হয়ে গেছে সে। নিজেই লিখতে শুরু করেছে যতীনের মত সর্বহারাদের কথা।

Tuesday, September 27, 2016

সুরমা গাঙর পানিঃ উজান পর্ব ১৬

(দেশভাগ এবং পরের দশকের কাছাড় সিলেটের প্রেক্ষাপটে রণবীর পুরকায়স্থের এই উপন্যাস ছেপে বের করেছে দিন হলো। ভালো লাগা এই  উপন্যাস পুরোটা টাইপ করে তুলে আমার প্রিয় কথা শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। আশা করছি আপনাদের সবার এটি পড়তে ভালো লাগবে। সম্পূর্ণ উপন্যাসের সংলাপ ভাগটি সিলেটিতে -সে সম্ভবত এই উপন্যাসের সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক। আপনাদের পড়বার সুবিধে করে দিতে, ঈশানে এই উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে আসছে। আজ তার  উজান  পর্বের  অধ্যায়   ষোল  ---সুব্রতা মজুমদার।)  



ষোল
    
বৈতলের দিন কেটে যায় বুদ্ধির ব্যবহারিক প্রয়োগে । দিনের শরিক অনেক । সঙ্গীহীন রাতের অসহায়তা কাটাতে রাতের উত্তর খুঁজে বেড়ায় দিনের আলোয় বৈতলের চাই স্থায়ী আস্তানা । পশরাহীন মেলার দোকান নয় । ক্যাম্প আর রিফ্যুজি শব্দের অবজ্ঞা থেকে বেরোতে চায় বৈতল । আর বৈতল চাইলেই তার উপায়ও বেরিয়ে আসে যথাসময়ে । হয়ে যায় যোগাযোগ ।
     ইটখোলার তেমাথায় শৈলেন কবিরাজের ঔষধালয় । কবিরাজি দোকান তো নয়, এক বৈঠকখানা । ঘরের তিনদিকে কাঠের আলমারিতে বৈয়াম । কোনোটা ভর্তি কালো কালো বড়িতে কোনোটা খালি । ছোটখাটো চেহারার কবিরাজ মশাই তার চৌকির মধ্যমণি হয়ে গড়গড়ায় প্রথম টান দিয়ে শুরু করেন সান্ধ্য আসর । তখন রোগী থাকে কম, সমবয়স্ক বান্ধব সমাজই প্রধান । বৈতলও ঘরের এক কোণে বসে ওদের কথোপকথন শোনে, কখনও মন্তব্য করে আলটপকা । হেড়ম্ব ভট্টাচার্যের গলাটাই থাকে চড়া । ইটখোলা মালুগ্রাম হরিৎবরণের একমাত্র পুজারি ব্রাহ্মণ । বেঁটে মানুষটি এলাকায় বাট্টি ভট নামেই বেশি পরিচিতি । সবার ভিতরবাড়ির অনেক খবরই তার নখদপর্ণে । গূঢ় সংবাদ পরিবেশনে সতর্কতার কণ্ঠস্বর তার কিছুতেই নিচু থাকে । কারণ বাট্টি ভটের গলার আওয়াজ একই তারে বাজে, কোনও ওঠা পড়া নেই । সব সময় ভম্‌ভম্‌ মুলি বাঁশের গাঁট ফাটা গলা । তাই সাংকেতিক ভাষার ঘেরাটোপ । বৈতলের বুঝতে অসুবিধা হয় । বাট্টি ভট বলে,
--- রাহুয়ে বুঝছইন নি কবিরাজ মশায়, কেতুরে আর রাখাল না । পুড়ি ইগুরে লইয়া যেতা ইচ্ছা করের, যেখানো ইচ্ছা ঘুরের । অউত্ত গেছেগি এক চা বাগানো, ডার্বি না ভুবনডর ।
   পুরনো বই এর দোকানদার বিনোদ চক্রবর্তীও কেচ্ছাগল্পে সমান উৎসাহী । বলে,
--- লগে কিতা ভোলা গেছে না নি ।
--- ভোলায় কিতা করত । ভোলা ইগু তো দালালি করে । বদনাম হয় ভোলার, মাঠা খায় হিগুয়ে । রাহুয়ে ।
--- কেমনে গেল তাই, বাপে ছাড়ল কেনে ।
--- বাপ ছাড়াছাড়ির কে । কালা চেভরলেট অগু চালাইয়া অউত্ত ডাইল ভাত কেতুর । বাগানো গেছে তখন তো উপরি ও পাইব ।
--- অ গাড়ি লই গেছে নি । তে আর কিতা বাপ লগে আছে ।
--- বাপ লগে থাকত কই । ইউনিয়নের জিপ লইয়া গেছে । পানি কাপড়র জিপ ।
কথোপকথনের শেষ পর্যায়ে এসে কিছু সত্য বৈতলের বোধগম্য হয় । কালো গাড়ির সূত্রে কিছু আন্দাজ করে । বৈতল আপন মনে হাসে, রাবণের উপমাটা তার, আর রাহু । দুটোই বেশ জুতসই । কিন্তু পুড়ি কে কেতুই বা কে । অপ্রয়োজনীয় ভাবনাকে দীর্ঘায়ীত করে না বৈতল । জমিদার যমুনাপ্রসাদের এরূপটাও সে ধারণা করেছে, তথ্যে নিশ্চিত করতে পারেনি । তবে বেঁটে মানুষটার উপস্থাপনাতে বেশ মজা আছে । সব কথা বলাও হয়, নামও নেওয়া হয় না । উপস্থিত মধ্যবয়সী জনেরাও তাকে রটনা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মানে । তাই আরো তথ্যের খোঁজে বাকিদের হামলে পড়তে দেখে বৈতল প্রমাদ গোনে । সময় বয়ে যাচ্ছে এককথায় সেকথায় । বৈতলে ফিরে যাওয়ার জন্য তৎপর হয় । কম পথ নয়, সাত আটমাইল হবে ইটখোলা মেহেরপুরের দূরত্ব । কবিরাজ মহাশয়কে বলে,
--- কাকুবাবু, আমি ইখানো থাকি কিতা করতাম আম্মকর লাখান । পয়সা দিলাইন যাই গিয়া ।
--- তুমি আম্মক অইতায় কেনে রেবা, আমার কবিরাজির বনাজি অইলায় তুমি । ইতা জড়িবুটি গাছ গাছালি পাতালতা আনিয়া না দিলে অষুদ বানাইলাম নে কেমনে । আইজ থাকিউ যাও, কাইল তুমারে এক লিস্টি দিমু, আনি দেওন লাগব । তুমি তো কইছ বড় হাওরর পারো তুমার বাড়ি, তে ত শালুক চিনো, বনতুলসী শিমূল ভুবি লুকলুকি দুরণ কলমী এরেন্ডা আর শটির কিছু পাতা আনি দিও । তোমারে পুরা পয়সা দিতাম পারতাম নায় একলগে । তুমি তো দেখছউ সবে পুরা পয়সা দেয় না, পয়সা না দিয়াউ লই যায় অষুদ । গাছ গাছালি নায় তুমি দিলায়, কিন্তু মধু তো কিনন লাগে, ধাতুঅ কিনন লাগে । বাড়ির সোনারূপা শেষ অই যার । মার ইতা ভাঙ্গাই দিয়ার । মায়ে তো আর দেখরা না ।
 শৈলেন কবিরাজকে গাছ গাছালির শিকড়। পাতা ফল ফুল দেয় বৈতল । কবিরাজ বৈতলকে মূল্য দেওয়ার কথা বলেন কিন্তু দেওয়া আর হয় না । বৈতল দুচার পয়সার জন্য চাতলা হাওরের পারে বনজঙ্গল থেকে লতাপাতা শিকড় বাকড় আনে না । রোগী দরদী কবিরাজকে সাহায্য করার উদ্দেশ্য একটা তো আছেই, আর আছে তার স্থায়ি-ঠিকানার খোঁজ, হদিশ । জমিদার বাড়ির পুকুরপারে চালা ঘর একটা দেখে এসেছে । সেই ঘরের গেরস্ত হবে বৈতল । তার আগে তো টোপের মুখে ঢালতে হবে মধু । জানতে হবে ভিতু জমিদারকে কাবু করার কৌশল । গুণের কথা, চরিত্রদোষের কথাও তো জানতে হবে । আর সে-কাজে ভাল মানুষ কবিরাজ যে তার কোনও সহায় হবে না সে জানে বৈতল ।
     জলের জাদুকর বৈতল জানে জাদু দিয়ে কিছু হয় না । জানতে হয় কৌশল । নদী বিল পুকুরে জলের বুড়বুড়ি দেখে, মকা পুঁটি দাড়কিনার চালচলন দেখে বুঝে বড় বোয়ালের হালহদিশ, রুই কাতলার ঠিকানা । কবিরাজ কাকুর সভাঘরের ভিতরও বৈতল কৌশলে খুঁজে নেয় তার ঠিকানা । হেড়ম্ব ভট্টাচার্য ওরফে বাট্টিভটই এখন তার টোপের নিশানা । মোটা গলার মানুষটার শয়তানি তার চোখে মুখে । নিজের সুখ নেই আনন্দ নেই লাভ নেই তবু পরনিন্দা আর পরচর্চায় কাটিয়ে দেয় সময় । যজমান বাড়ি গিয়ে আহরণ করে পারিবারিক আর ব্যক্তিগত কুটকচাল, শৈলেন কবিরাজের ঔষধের বড়িতে মিশিয়ে দেয় কথার বিষভদ্রলোক কবিরাজও মাঝে মধ্যে বিরক্ত হয়ে বলেন,
--- তাইন যে কিতা মাতইন ।
     কথা শুরু করতেও হেড়ম্ব ভট্টাচার্যর সুতো ধরতে হয় না । সুতো এসে ওর হাতে ধরা দেয় । যেমন বৈতল আহম্মকির কথা । ওই এক কথায়ই তোপ ঘুরিয়ে দেয় বৈতলের দিকে । হুকোর নাইড়চা এদিক থেকে ওদিকে ঘুরিয়ে মুখ লাগিয়ে আয়েস করে দেয় এক টান । ধোঁয়া গেলে একপেট । বৈতলের দিকে ঘুরে ধোঁয়া মিশিয়ে দেয় বাতাসে । বলে,
--- আম্মকির কথা কিতা কইলে বেটা । আমরা কিতা ইনো আম্মকির মাত মাতিয়ারনি ।
--- এ ঠাকুর, ইতা কিতা কইরা। আপনারা তো কিচ্চু মাতলাউ না । আর আমার আম্মকির লগে আপনারার কিতা কইন । আমি অইলাম আম্মক ছয়, যে হক্কল কথাত কয় অয় অয় । আপনার যেতা কইবা সবতাতঅউ আমারে অয় অয় করন লাগব । রিফুজি মানুষ তো কিচ্চু চিনি না । এর লাগিউ কইয়ার যাই গিয়া ।
--- যাইতায়গি কই রেবা, বাবন বাড়িত আইছ না খাইয়া গেলে অইবনি ।
     ব্রাহ্মণ বাড়িতে খাওয়ার অভিজ্ঞতা বৈতলের ভাল নয় কিন্তু শৈলেন কবিরাজের বাড়ি অন্যরকম । খাওয়ার ব্যবস্থা এক সিদ্ধ চাল ডাল সব্জি নুন সব এক সঙ্গে । কবিরাজের পরিবার বলতে এক খোঁড়া কিশোর শিক্ষার্থী । কবিরাজ শিখেছে, বাড়ি ভুবন পাহাড় । ওরা কেউই তার জাত গোত্র জানতে চায় নি । কবিরাজও না তাঁর ছাত্রও না । একসাথে বসে খেয়েছে, নিজেরা নিজের পাত্র ধুয়ে রেখেছে । খাওয়া শেষে এক টুকরো যষ্টিমধু এনে দিয়েছেন কবিরাজ । বলেছেন,
--- খাওরেবা । মিঠা লাগব ।
মিষ্টি মানুষের লোভেই আসে বৈতল । দুর্গাবতীর রাগ সহ্য করে থেকেও যায় ভালমানুষের কাছে দুদণ্ড । নির্লোভ সাধু মানুষের জীবনে শখ দেখতে হলে শুনতে হলে থাকতে হবে এক রাত এক ভোর । রাত ভোর হওয়ার আগেই ঘুম ভেঙে যায় কবিরাজ ঠাকুরের । পেছন ঘাটা খুলে ভাঙা বালতি আর ঘটি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন । অনেক দূরে খাটা পায়খানার কাজ সেরে ফিরেও আসেন তৎক্ষণাৎ । আর ঘরে ঢোকা হয় না, চিলিম উল্টে পোড়া তামাকের গুড়ো মুখে দিয়ে কচর মচর করতে করতে শুরু হয় বাটিসাবানে বুরুষ ঘষে গালে ফেনা তোলা । রেজারে ভারত ব্লেড লাগিয়ে ফটকিরি ঘষে একবার ছোট হাত-আয়নায় দেখে নেওয়া গালের মসৃণতা । বৈতল মাটির বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাকাবাবুর কান্ড কারখানা দেখে আর শোনে মিষ্টি মানুষের মিহি সুরের গান।,
রাইজাগো গো
জাগো শ্যামের মনমোহিনী
তারপর শ্যামাভোগের মুড়ি বাতাসা আর জল আহার শেষে বেরিয়ে পড়া দুপুরের খাওয়া, বলেন, ভোজনং যত্র তত্র । শহরে তো আর আখড়ার অভাব নেই । দুপুর পর্যন্ত ভ্রাম্যমান ঔষধালয়ের চিকিৎসা শেষে ভোগের প্রসাদ । মেহেরপুর কিংবা শিলকুড়ির উদ্বাস্তু শিবিরে গেলে হরিমটরদুর্গার সঙ্গেই প্রথম পরিচয় শৈলেন কবিরাজের রবির বারবেলায় । ক্যাম্পে বিনাপয়সায় রোগী দেখা এবং ঔষধ দেওয়ার দিন রবিবার । ইটখোলা থেকে পায়ে হেঁটে যান মেহেরপুর । সেখানেই পরিচয় এই অকৃতদার চিকিৎসকের সঙ্গে । রোগের লক্ষণ জেনে কালো বড়ি খাইয়ে বাঁচিয়ে দেন দুর্গাবতীকে । বলেন, অতিসারসঙ্গে নুন জলের অনুপান । কৃতজ্ঞতায় বৈতল কাবু হয়ে যায় । তারপর যে-কোনো ছুতোয় চলে যায় অ্যাওলা হরতুকি ব্রাহ্মীশাক যা পায় তা নিয়ে । বিস্বাদ হবিষ্যি আহারের লোভে থেকেও যায় । প্রথম রাতে যষ্টিমধু মুখে দিয়ে পরিতৃপ্তির ঢেকুর তুলেছে বৈতল । বলেছে,
--- কবিরাজ মশয় একখান কথা কইতাম নি ।
--- কও না, কে না করছে ।
--- না, বাবন বাড়িত খাইতে আমার খুব ডর লাগত ।
--- কেনে বা ?
--- তারা খুব ছুয়াছুয়ি মানইন ত ।
--- আমিও মানি । আমি চিকিৎসা করি । নিয়ম মানিয়া জীবনধারন করি । তে আমি ছুয়াছুতর বাবন নায় রেবা ।
--- না, আপনার কথা কইয়ার না । আমরার ছাতকো আছিল এক বাবনবাড়ি ।
--- তুমার বাড়ি ছাতক নি । ছাতকর মানুষ বুলে খুব আড়ুয়া ।
--- আমি কুনু আড়ুয়া নি ?
--- না রেবা, ইতা এক কথার কথা । এক ছড়া মনো পড়ল । হুনো,
ছাতক তনে আইলা এক আড়ুয়া, যাইতা বদরপুর ।
সিলট আইয়া জিগার করলা, জৈন্তা কতদূর ।
নেও কও, কিতা কইছলায় ।
--- না, আমরার ছাতকো আছিল জৈন্তেশ্বরীর মন্দির । অউ মন্দিরর পুকইরো এক মাছ ধরি দিছি পুরইতরে । অউ বড় বড় কালিয়ারা । বাবনি এইন আছলা বড় ভালা, কইল খাইয়া যাইছ বেটা । আমি তো আদরর পাগল, খাইলাম । জীবনে ভুলতাম নায় সোয়াদ । পুস্তু বাটিয়া রান্দচইন কালিয়ার মাছর ঝুল, পিয়াইজ উয়াইজ ছাড়া । অত আদর করি খাওয়াইলা মাসীয়ে । খাওয়াইয়া দেখি হক্কলর উছিত উঠাইলা, ধইয়া আনি রাখলা, আমার উছিত উঠাইলা না । শেষে উঠাইলা, উঠাইয়া ছান করিয়া আইলা ।
--- কেনে ?
--- আমি নু ...
 বৈতলের মনে পড়ে দুর্গাবতীর কথা । দেশভাগের কথা, ওপারের বৈতল কৈবর্ত, এপারে যে শর্মা । ব্রাহ্মণ । তাই বৈতল শুদ্ধ করে নিজের বয়ান । বলে,
--- তারা নু চক্রবর্তী বাবন । সবর উপরে ।
--- তুমার কিতা ?
--- আমার শর্মা । অগ্রদানী বাবন ।
হেড়ম্ব ভট্টাচার্য বা বাট্টি ভট সন্তুষ্ট নয় বৈতলের জবাবে । বলে,
--- আম্মক ছয় কইলে কেনে বেটা । আমরা কুনু আম্মক পাঁচ নি ? বেশ চালাকি করিছ না, পুরা কতা ক ?
--- পুরা কথা কইতাম কেমনে, আপনারা কে কিতা কুনু জানি নি ?
--- আবার চালাকি কররে । ফকরামি নি ?
--- আইচ্ছা, ঠিক আছে কইয়ার, হুন্ততাউ যখন হুনইন । গাইল্লাইন না যেন ।
আম্মক এক-অল্প বয়সে লয় ভেক ।
আম্মক দুই-চাল ছাইয়া টুল্লিত থয় খুট ।
আম্মক তিন-যে ছুটলুকর কাছে করে ঋণ ।
আম্মক চাইর-যে থাকে শরিকি বাড়ি ।
আম্মক পাচ যে শরিক অইয়া মাছ কিনে ।
আর আমি অইলাম আম্মক ছয় । অউ শেষ ।
--- না আরো আছে আমি জানি । তুই আমারে কইরে, আমি ঘরজামাই এর লাগি কইরে । ক কইলা আম্মক চৌদ্দ কিতা ? তুইতো বেটা ছয় নায় খালি, তুই আম্মক এগারো ও, তুই পরর কাম করছ বেগার । ই কবিরাজর বেগার খাটিয়া কিতা লাভ তর । এর থনে জমিদারর বেগার খাট, পয়সা পাইবে ।
--- পয়সা দিলে খাটতাম না কেনে । কত দিবা ।
--- যত চাছ দিব । ইতা কুনু নাড়ী টিপিয়া জ্বর দেখা আর ছালি দিয়া বড়ি বানানি নি । জমিদার বাড়িত সব পাইবে । বিয়া করচছনি, বৌ আছেনি ।                
বাট্টি ভট দরিদ্র কবিরাজকে অবজ্ঞা করলেও সোজা কথার মানুষটিকে ভয় পায় বিলক্ষণ । তাই শৈলেন ঠাকুরের সামনে সব কথা বলার সাহস করেনি । বৈতলকে একান্তে ডেকে জানায় যমুনাপ্রসাদ জমিদারের দুর্বলতা । বলে,

--- সুন্দর সান্দর না অইলেও অইব, গতর থাকন লাগব ।


চলবে 

Sunday, September 18, 2016

সুরমা গাঙর পানিঃ উজান পর্ব ১৪


(দেশভাগ এবং পরের দশকের কাছাড় সিলেটের প্রেক্ষাপটে রণবীর পুরকায়স্থের এই উপন্যাস ছেপে বের করেছে দিন হলো। ভালো লাগা এই  উপন্যাস পুরোটা টাইপ করে তুলে আমার প্রিয় কথা শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। আশা করছি আপনাদের সবার এটি পড়তে ভালো লাগবে। সম্পূর্ণ উপন্যাসের সংলাপ ভাগটি সিলেটিতে -সে সম্ভবত এই উপন্যাসের সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক। আপনাদের পড়বার সুবিধে করে দিতে, ঈশানে এই উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে আসছে। আজ তার  উজান  পর্বের  অধ্যায়   চৌদ্দ   ---সুব্রতা মজুমদার।)  


চৌদ্দ

শোনা যায়, নদীর ওপারে দুধপাতিল থেকে এপারে যখন চলে এল জেলা শহর, শুরু হয় নগরায়ন প্রক্রিয়া । তখন এই হরিৎবরণের মাটি পুড়িয়ে তৈরি হয় ইট । কলকারখানা বলতে চুন ভাটা এ মাথায় বরফ কল ও মাথায় প্রকাণ্ড দিঘীর পারে সাহেব বাংলো আর দুএক ঘর বসতি । হরিৎবরণ আর ইটখোলায় স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠে সুন্দর বিহার আর পশ্চিম দেশের শ্রমিক কারিগরের । শহরের সামগ্রিক অবস্থার সঙ্গে তুলনামূলক অনুন্নত এই ভাগকে কিন্তু বরাক নদী পলিমাটি দিয়ে উন্নত করে বছরের পর বছর । বাৎসরিক প্লাবনেও বিধ্বস্ত করে ।
রাজব্যবস্থাও কিছু পাল্টায়নি স্বাধীনতার পর । হিন্দুস্থানি প্রজা আর জেলার চা শ্রমিকদের একচ্ছত্র নেতা হয়েছে হিন্দু মহাসভার প্রাক্তন নেতা জমিদার যমুনা প্রসাদ সিং । প্রায় একদলীয় শাসনে গণতন্ত্র এবং আইনের প্রয়োগ কম, ফাঁকফোকর বেশি, সুবিধাভোগীর স্বার্থ রক্ষায় তৎপর । জমির উর্দ্ধসীমা আইন ও বিনোবা ভাবের ভূ-দান আন্দোলনের ভয়ে বিশাল জমির মালিক বাড়ির চাকর গৃহপালিত কুকুর বিড়ালের নামে জমির ভাগ বাঁটোয়ারা করে রেখে আইন রক্ষা করে । হরিৎবরণের জমিদারও যার ব্যতিক্রম নয় । স্বাধীনতার শিক্ষায় প্রজানুরঞ্জনের নবপাঠে দীক্ষিত হয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ও শ্রমিক কৃষক বান্ধব ভাবমূর্তি গড়তে তৎপর হয়েছে যম নেতা । স্বাধীন দেশের প্রজার উল্লাসে গলা মিলিয়েছে । বলেছে,
--- বন্দেমাত্‌রম কইয়া দেশ স্বাধীন অইছে । স্বাধীনতার অর্থ বুঝেনি । আর বৃটিশ নায়, রাজা মহারাজা জমিদার নায়, অখন রাজা অইল আমজনতা । কৃষক আর শ্রমিক ।
     যম জমিদারের নতুন প্রজা বৈতলও শোনে প্রতিদিনের ভাষণ জমিদারের বৈঠকখানায় । বৈতল এ নিয়ে দুর্গাবতীর সঙ্গে হাসিতামাশা করে । বলে,
--- আম তো জানি চুকা নায় পুকড়া অয় । ই নতুন আম ইগু কিতা কও চাইন । আমজনতাও কানা আম অইব । নাইলে আকতা বেটারে মানি লাইল সবে । হিন্দুর দেশ বানাইত যে বেটা, ঘাড় ধাক্কা দিয়া মুসলমানরে পাকিস্তান পাঠাইত হে নি আকতা কামলা দরদি অই গেল । ছাপার অক্ষরে কয় কৃষক শ্রমিক । কত দরদ হালার ।
    বৈতলের জম-বিরোধিতা দুর্গাবতীর পছন্দ হয় না । বৈতলকে বলে,
--- ইতা কও কেনে, তারা বড় মানুষ
--- বড় মানুষ না আমার ইও । মুখ ছলাইছনা খামোকা ।
--- কেনে ইতা কও । তুমারে থাকার জাগা দিছইন ।
--- অখন আর ই ঘর আমার নায় । অখন হে তোরে দেখে । আমারে খেদানির তাল খুজের ।
দুর্গাবতী বৈতলের জমিদার-সংবাদ মজা দিয়ে শুরু হয়, শেষ হয় ক্রোধে আক্রোশে এবং দ্বৈরথে এত সবের পর বৈতল ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম করতেই দরজায় শব্দ । দুর্গাবতী ঘরের বাঁশের দরজা আগলহীনই থাকে, তবু দুর্গাবতী খুলে দেয় । পুনা, কেতুমামার মেয়ে পুণ্যবতীকে দেখে দরজা আগলে দাঁড়ায় দুর্গা । ঘরে ঢুকতে দেয় না । কিন্তু পুনা দুর্গাকে ঠেলে ঢুকে পড়ে ঘরের ভিতর । দুর্গার পছন্দ নয় পুণার চালচলনএমন ধাড়ি মেয়ে, এখনও ফ্রক পরে ঘরের বাইরে যায় কলেজ-পড়া মেয়ে । বুকে দুটো শরীরকে বলে, তুই থাক আমি যাই । বৈতলের গা ঘেঁষে দাঁড়ানো আর দাদা ডাকের বিপরীত ব্যবহারে দুর্গার রাগ হয় । বৈতলও ভাবে সন্ধ্যারাত পর্যন্ত এমন ভরা যোয়ান মেয়ের কী কাজ জমিদারের বৈঠকখানায় পুণা দুর্গাকে উপেক্ষা করে বৈতলের গায়ে টোকা দেয় । চোখ নাচিয়ে বলে,
--- যমুনাদায় তোমারে ডাকছইন, যাইতায় ।
--- কেনে ।
--- চা বাগানো বনাছ দিব নানি । আমরার ইউনিয়নর মেম্বার সব ।
--- বনাছ কিতা বে ।
--- বনাছ কিতা জান নানি । বৌদিরে জিগাও । হিহি । বৌ নাচ । গেলে পয়সা পাইবায় কুড়ি টাকা । আইয়া বৌ নাচাইবায় ।
বলেই হাসতে হাসতে চলে যায় নাচনি মেয়ে পুণ্যবতী । পুণ্যকে নিয়েও ধন্দ বৈতলের । যম জমিদারের কালো শেভ্রলে গাড়ির ড্রাইভার কেতুমামা । সাদাসিধে মানুষটার মেয়ে-অন্ত প্রাণ । গুরুচরণ কলেজে মেয়েকে আইএ পড়তে ভর্তি করেছে । মেয়ে পড়াশুনায় ভাল । জমিদারের বৈঠকখানায় হরিৎবরণের গরিব বাচ্চাদের বিনাপয়সায় পড়ায় । বলে অবৈতনিক শিক্ষকতা । জমিদারেরও মনে ধরেছে, তাই বাড়িতেই ব্যবস্থা করে দিয়েছে । পুণার সঙ্গে নেতার নামও হবে । পুণার সঙ্গে যমুনাপ্রসাদের মাখামাখিটা ইদানীং বেড়েছে । তবে বৈতল জমিদারের স্বভাব নিয়ে ভাবে না । দুর্গাবতীর সঙ্গেও তার সমান মাখামাখি । সে-হিসেব বৈতলের নিজস্ব । তবে পুণ্যবতীর শরীরে একটা টান আছে, ভাল লাগে বৈতলের । মেয়েটার অনেক গুণও আছে । দুর্গাবতীর অকারণ শত্রুতা বৈতলের ভাল লাগে না । দুর্গাকে বলে,
--- তুমি দেখতায় পার না কেনে পুড়ি ইগুরে
--- কে কইল । তাইত বালাউ । তে জমিদার বাড়িত যেলা আওয়া যাওয়া শুরু করেছে কতদিন বালা থাকব ।
--- অউ মানলায় তো । নিজর মুখে কইলায় । জমিদার ইগু বাদুয়া । মাগিবাজ হালার হালা ।
--- ছিঃ কী মাতর ছিরি । আমি ইতা কইয়ার না, অত কষ্ট করিয়া, কী লেজারতি করিয়া পড়াইরা মামায় আর তাই খালি ভুটর কাম করে । বিনাপয়সায় ছাত্র পড়ায় । চান্দা উঠাইয়া মানুষরে চশমা দেয়, আরো কততা করে । ঢঙঢাঙ করে, তুমারে নাচাইয়া গেল । যাইতায় নি ভুবনডর । কইছে লাবকও যাইতায় পারো, ডারবি যাইতায় নি
--- এ তুমিও দেখছি ইউনিয়নআলি হই গেছো । অউহালারে জিতানির কাম কররায় নি ।
--- যাও না । ভালা পয়সা দিব ।
--- কত দিব ।
--- এমনে বুলে দশ টেকা দেয় । পুণায় কইছে তুমারে বিশটেকা দিব ।
--- কেনে, আমারে বেশি দিত কেনে ।
--- কথা না হুনিয়াউ নাচ কেনে । তুমারে কেশিয়ার করি নিব । এর লাগি বেশি ।
ক্যাশিয়ার হওয়ার লোভে বৈতল যায় পাতিমারা চা বাগান । কাছারির মাঠ থেকে সকাল সাতটায় রওয়ানা হয়ে যায় গাড়ি । সারিসারি জিপ গাড়িতে নাম ধরে ধরে উঠিয়ে দেয় ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবক । পুণ্যবতী বৈতলকে বুঝিয়ে দেয় কী করতে হবে, টাকার হিসেব থেকে বড় কথা নিরাপদে নিয়ে আসা । সদরঘাটের জুড়িন্দায় পার হয় গাড়ি । সব যাত্রী নেমে যায়, ওপারে গিয়ে আবার ওঠা । ড্রাইভারের পাশে হরিৎবরণেরই নানুক আর ভোলা বসে এসেছে কাছারি থেকে, ওরা কাজ করবে বৈতলের সঙ্গে । ক্যাশিয়ারের উপরে তো নয় ওরা, তাই বৈতল দৌড়ে উঠে যায় সামনের সিটে । একজনকে যেতে হবে এবার পিছনে কাঁঠালঠাসা হয়ে কিন্তু তিনজনেই যেহেতু টিঙটিঙে তাই অসুবিধে হয় না । শুধু ড্রাইভার গিয়ার বদলাতে গিয়ে বিরক্ত হয় । আর বৈতলরা হাসে । নানকুর উদারবন্দ পর্যন্ত খুব চেনাপথ । মধুরামুখ থেকে হাতিছড়া পর্যন্ত গরুর গাড়ি চালায় । বাঁশের গাড়ি । জিপগাড়ি কাঁচাকান্তি মন্দিরের সামনে এসে থামে । সবাই ভক্তি ভরে প্রণাম করে, ড্রাইভার নেমে গিয়ে প্রণামী দিয়ে আসেহাতিছড়া থেকে ভোলা পথ দেখায় । বলে,
--- যমুনাদা যখন দিল্লি গেলা, আমি আইছি তান লগে, অত মাল কে টানত, খালি ছোট ছোট চা-র পেটি তিন বাক্সত, এমপি মন্ত্রী বহুতর লাগি । ইদিকে একবার উল্টা রাস্তাত ঢুকিয়া যাইন । অউ দেখ সীতানাথ গোসাইর মন্দির, তান গুরু । গুরুরে প্রণাম না করিয়া কুনুখানো যাইন না ।
বৈতলকেও শুনেছে এই গুরুর নাম । গুরু শিষ্যের জন্য সব করেন । শহরের বেশির ভাগ মান্যগণ্যরাই তাঁর শিষ্য । গরিবেরও গুরু তিনি । গুরু পূর্ণিমার সময় মন্দির লোকে লোকারণ্য হয় । তিন বিঘা জমির উপর মন্দিরে কেউ প্রসাদ না পেয়ে যায় না । ভোলা বলে এক ভিন্ন গল্প,
--- যমুনাদার লাগি রসগোল্লা বড় বড় রাজভোগ । আর আমরার লাগি কড়া কড়া বইর বিচির লাখান । তে পুড়ি রেবা তুমরার পুণ্যবতী । দাদার লগে আইছিল তো, আমরারে কইল, খাইও না তুমরা । গুরুরে নায়, যেতায় ইতা দেইন ইতারে কি ধমকানি ধমকাইলো । কইল, আইজ থাকি ইতা চলত নায়, খাইলে হক্কলে খাইব একতা, নাইলে কেউ কিচ্ছু না ।
--- অখন কিতা ঠিক অইছেনি ।
--- অইত না কেনে । পুণার কথা না মানিয়া উপায় আছে নি ।
--- হাচাউ কইচছ, পুড়ি ইগু বাঘর বাইচ্চা ।
--- আইচ্ছা বা বৈতলদা । আইচ্ছা ড্রাইভারদা ডাইনে ঘুরাই নেও না, খাসপুরেদি অইয়া গেলে পাতিমারা তাড়াতাড়ি পড়ব ।
--- চুপ মারি বও না কেনে, আমার চালানি আমি চালাইয়ার । আরো তিন বাগানো নামানি লাগব তার পরে তুমরার পাতিমারা সবর শেষে ।
কিছু দুর যাওয়ার পর বৈতলের ঠাণ্ডা লাগে । ভোলাকে বলে,
--- ঠাণ্ডা লাগের কেনেবে ।
--- পাহাড়ো উঠছ নানি ।
--- অয় জয়ন্তিয়া পাহাড়োও অলাখান ঠাণ্ডা আছিল ।
--- না, ইখানো হাফলং পাহাড় ।
--- অ এর লাগি অউ । অনো লামতাম নি আমরা । অত উচাপাড়ো যে চা অয় দেখছি না ।
--- তুমি আবার চা বাগান কই দেখলায় শর্মাদা
--- কেনে বেটা, ইতা চা বাগান তো পুয়া । চা বাগান দেখছি আমরার শ্রীমঙ্গলো । একবার সাজাইল বাগান । চাঘরর ধারে দি গেলে মনে লয় সারাজীবনর চা খাই লিছি । অলা সুন্দর গন্ধ । ইতা আর দেখতাম নায়রে জীবনে ।
বৈতলের দুঃখ আনন্দে বদলে যেতেও সময় লাগে না । পাহাড় ঘেঁষা পাতিমারা চা বাগানের সৌন্দর্য ওর মনকে আপ্লুত করে । চা ঘরেও ফিরে পায় সেই ঘ্রাণপানের আস্বাদ । চাঘরের সামনেই অফিস ঘর, যেখানে তলব হয় । তলব ঘরের সামনেই বসেছে বোনাসের বাবু টেবিল । ইউনিয়ন নেতা রামচন্দ্র কৈরি একটা টেবিল এনে জুড়ে দেয় বোনাস বাবুর পাশে । ভোলা লেখাপড়া জানে, সে খাতা নিয়ে বসে পড়ে টেবিলের পাশে বেঞ্চিতে । আর বৈতল তো কিছুই জানে না, সে ক্যাশিয়ার । যম জমিদার বলে দিয়েছে, টাকা যেন অন্য কারো হাতে না যায় । রামবাবু বৈতলের জন্য একটা চেয়ারের ব্যবস্থা করে । কিন্তু বোনাসের কোনও খবরই নেই । দশটা থেকেই বসে আছে সবাই । এগারোটা বাজে, বারোটা বাজে টাকা আসে না । ঐদিকে রামচন্দ্র খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করেছে ওদের জন্য । বলেছে দুপুরে মুরগি হবে । পুরুষ মহিলার একটা অংশ নেচে যাচ্ছে মত্ত হয়ে । মাঝে মাঝে উত্তাপও ছড়াচ্ছে অকারণ । মালিকের নাম ধরে গালাগাল দিচ্ছে নেশাড়ুরা । রামচন্দ্র কৈরি নেতাসুলভ দাপটে কথা বলছে বাবুদের সঙ্গে । বলেছে, হাঙ্গামা হলে ওরা দায়ী নয় । মিনমিনে বাবুরা আর কী করে, বলে শিলচরের ব্যাঙ্ক থেকে টাকা আসতে আসতে দুপুর হয়ে যায় । রামচন্দ্র বৈতলকে বলে এরকম হয় । উঠবস করে করে বৈতলের ভাল লাগে না, নানকু আর ভোলাকে বলে দুগ্লাস হাড়িয়া মেরে আসতে । ভোলা নানকু বৈতলকেও সঙ্গে চায় । বৈতল রাজি নয়, একসঙ্গে দুই কাজ হয় না তার, পুণ্যবতী তাকে বড় মুখ করে পাঠিয়েছে ক্যাশিয়ার করে । মান রাখতে হবে মেয়েটার । এদিক ওদিক একা একা ঘোরে বৈতল । অনেকের সঙ্গে কথা হয় । এরা বড় গরিব, বৈতল থেকেও হতচ্ছাড়া দশা । একজনের নাম লক্ষীমনি, লক্ষীমনি নামের পুরুষ আগে দেখে নি বৈতল । যার নাম তাকেই বলে,
--- লখ্‌খিমনি আবার বেটা নি । আমারে আউয়া বানাইরে নি ।
--- সচ বলছে, হামি লক্‌খিমনি বটে । লক্‌খিমনি রাউত । হামার বউ আছে সুখিয়া । চল হামার ঘরে, দেখবি ।
--- ঘরো কিতা আছে । হাড়িয়া খাওয়াইবে নি ।
--- হাড়িয়া খাইবু । চল, দোকান থেকে খাবু ।
--- না না, দুকানো খাইতাম নায় ।
--- হামি পয়সা দিবে । হেই দেখ ।
--- অত টেকা কই থাকি পাইলে বে ।
--- হুহু । হামার বহুত পয়সা আছে । অউর ভি আছে একটা গাউরি । বিচে দেব ।
--- গাউরি কিতা ।
--- শুওর শুওর । তোকে খাওয়াব । আইজ হামি ঘরে যাবেক নাই । সুখিয়া লেড়কির শাদির জন্য শুওর পালছে দুটা আমি একটা বেইচে দিলাম ।
--- আইচ্ছা বাপ তো তুই । একটু পরেউ তো বনাচর টেকা পাইবে । তে কেনে বেচলে ।
     লক্ষীমনি রাগে, হাসে, আবার হাসে । চুপ করে থাকে কিচ্ছুক্ষণতারপর আবার হাসে । বলে,
--- হামার লেড়কির উমর একসাল । বাপ বলে না, খালি মা মা করে । আর বোনাসের কিস্‌সা কী বললি । বোনাস উনাস কুছু না । বোনাস তো দেয় একবার দুর্গাপূজার টেইমে । দুই সাল আগে মজদুরি বেড়েছিল তিন পয়সা হপ্তা । তখন দেয়নি এখন এরিয়া দেবে । টিপ দেব, পয়সা পাব নাই । তুই সব লিয়ে যাবি । ইউনিয়নের লেভি লিবি । দুই টেকা বকেয়া হলে হামি পাব আঠআনা । বাকি সব রামবাবু লিবে, তর বেগ মোটা হবে, চলে যাবি শিলচর । বিলাইতি দারু খাবি, মাংস খাবি, শালার লেতা হয়ে ফুর্তি করবি মেয়ে ছেলা নিয়েহামার টেকা ঠগিয়ে লিয়ে যাবি থু ।
হয়তো লক্ষীমনির নেশা চটকে যায় । তাই বৈতলকে ছেড়ে চলে যায় তার নিজের মানুষের দিকে । হয়তো বকেয়া টাকার জন্য লাইন দিতে যায় । কারণ ততক্ষণে টাকা এসে গেছে । বৈতলও তার ব্যাগ নিয়ে বসে পড়ে লেভি আদায়ে । বকেয়া পাওনা বা এরিয়ার শব্দে কোনও উৎসব হয় না । তাই অকাল বোনাসের ধুম লাগে পাতিমারা বাগানে । আরো সব বাগানে । লক্ষীমনির কথাকে সত্য করে একজনের পাওনা ষোল টাকায় সতের টাকা আট আনা লেভি ধার্য হয় এক উদ্ভট নিয়মে । এক টাকা আট আনা তিনটে তলবদিনে আট আনা আট আনা করে কেটে নেবে রামচন্দ্র কৈরি । কৈরি নেতার হাবভাব চালচলনে বৈতল যম প্রসাদ সিং জমিদারের মিল খুজে পায় । যেন দুই হারিয়ে যাওয়া  ভাই এর একজন পাতিছড়ায় অন্যজন তার সৌভাগ্যকে সঙ্গী করে হরিৎবরণের বৃহৎ পরিসরে বড় নেতা । বড় সুখের ভাগীদার ।
জমিদার যমুনাপ্রসাদ শহর থেকেও শহরের নিয়ম মানে না । গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ধার ধারে না । নিয়ম মানলে নেতা কেন । কেন রাজসম্মান । শহর পুরোনো হলেও নাগরিক মানুষের সংখ্যা খুব একটা বেশি নয় । একতলা দোতলা বাড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রশস্ত ফুল ফুলের বাগান সাজিয়ে থাকে সচ্ছল পরিবার । আর খাসিয়াপট্টি টিকরবস্তি ঘনিয়ালাবস্তির একাংশ এবং নাগাপট্টিতে থাকে কায়িক পরিশ্রমের বৃত্তিধারীরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে । নগরোন্নয়নের পরিষেবার দায়িত্বে আছে একটি পুরসভা, নদীর পাশে পুরসভার আছে সুদৃশ্য ভবন । গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত জনেরা নির্ধারণ করে সুখ-সুবিধার মাত্রা । হরিৎবরণের জমিদার ওসবের ধার ধারে না । নবীন জমিদার তথা জননেতার কথাই শেষ কথা, তাই পার্শ্ববর্তী খাসিয়া পট্টিতে থাকে খানাখন্দ কাঁচারাস্তা, রাজবাড়ির পথে পাথরকুচি আর পিচের ড্রাম নামে রাজপথ তৈরির জন্য ।
পণ্ডিতদের মতে শহরটি অর্বাচীন না হলেও স্থায়ী কোনও জনগোষ্ঠীর পরিচয় মেলে না । নদীর ডান দিকের নাথ লস্কর মনিপুরি ছাড়া বাকি সবাই সিলেটি । পাশাপাশির বড় শহর বলে নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যের কারণে মানুষ এসেছে শিলচর । নামের মিল করার জন্য শ্রীহট্ট নামটিও পাল্টে গেছে সিলেটে । ধ্বনিসাদৃশ্য সিলেট আর শিলচরে আত্মীয়তা হয়েছে । পশ্চিমের বিহার যুক্তপ্রদেশ থেকে এসেছে নগণ্য কিছু সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ । বাঙালি ব্যবসা বিমুখ জাতি বলে ভিনদেশি মাড়োয়ারিরাও জাঁকিয়ে বসেছে নদীর বাঁকের কাছাকাছি জানিগঞ্জে গোপালগঞ্জেও । সিলেটি বাংলার আত্মীয় হয়ে গেছে মুখের কথায় । নদীর ভাটির দিকে একটু এগোলেই সদরঘাটি, জুড়িন্দায় নদী পারাপার । নদী না পেরোলে বিমানবন্দর যাওয়ার উপায় নেই । গৌহাটি আর কলকাতার দুটি মাত্র উড়ান ।বিশাল আকারের নদীসেতুটি অনেকদিন থেকেই অর্ধসমাপ্ত ।
 লেভির টাকা আদায় করতে গিয়ে বৈতলের অনেক শিক্ষা হয়েছে । শিখেছে কী করে গাছে বসে গাছের গোড়া কাটতে হয় । ভোলা রজকের সঙ্গে একদিনের সঙ্গ তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে । ভোলার মতো ছেলেরা সব জানে সব বোঝে কিছু বলে না । একটু হাঁড়িয়ার টোপ দিলে উগরে ফেলে । যম জমিদারের অনেকের মধ্যে এক দেহরক্ষী সে । লেখাপড়াও জানে কিছু কিছু । জানে অনেক কিছু । বৈতল তো শহরের এমাথা থেকে ওমাথা, এদিক শ্রীকোনা ওদিকে ফকির টিলা পর্যন্ত, চামড়া গোদাম থেকে মালুগ্রাম শিববাড়ি টিকরবস্তি থেকে বিলপার নাগাপট্টি কোথায় না গেছে । তবু ভোলার মতো এত জানে না । উৎসাহী শ্রোতা পেয়ে ভোলা তাকে সব শোনায় পুঙ্খানুপুঙ্খভোলার গর্ব তার শহর নিয়ে । বলে,
--- দেখো রেবা উঝাদা, মাল খাওয়াইছ এর লাগি কইয়ার না, তুমি বড় ভালা বেতর লাখান সপাংসপাং কথা কও, কেউরে চুকো না । তেও কই যেখানো থাকবায় হিকানরে ভালা পাওন লাগব । মাটিরে চিনন লাগব । কও চাইন দেখি আমরার সিনেমা হল কয়টা ।
--- তিনটা, ইতা জানি, গীতশ্রী ওরিয়েন্টল আর মাঝখানো কিতা একটা আছে রবি লালার ।
--- কলাবতী  । ইস্কুল কলেজ কয়টা আছে কও ।
--- কলেজ একটা জানি । ইস্কুল জানি কাছাড় ইস্কুল নরসিং ইস্কুল অধরচান্দ বিদ্যাপীঠ পাবলিক ইস্কুল পুড়িন্তর স্বদেশি আর শিলংপট্টিত একটা ।
--- টাউন মাদ্রাসা কইলায় বা । সূর্য কুমার তর্কসরস্বতী টোল আছে নানি । ইস্টিশন একটা ডাক্তারখানা সিবিল হাসপাতাল ।
--- কেনে আমরার মুর্তজা ডাকতর ।
--- ই ত ভর্তি । হে তো কম্পাউন্ডার । বিভট কত বড় ডাকতর । অমুল্য হালদার নলিলাক্ষ চধরি এরাও বড় ডাকতর । ফাটক বাজারর লাখান অতবড় বাজার দেখছ নি কুনুখানো, কত ছন্তর ।
 বৈতল বড়বাজার দেখেছে অনেক । সিলেটেই কত, জিন্দাবাজার বন্দরবাজার বড় হলেও ফাটকবাজারের বিশালত্ব দেখা যায় বৃহস্পতিবার বাজারবারে । ভোলা আরো যে কথা বলে না সে হল দেহব্যবসার ঠেক নাগাপট্টি লাগোয়া । বৈতল গ্রামের মানুষ, উকিল ব্যারিস্টার জজ শিক্ষক ডাক্তার ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশাদারের জন্য জনপদের এমন বিন্যাস দেখেনি এর আগে । উকিলপট্টি নাজিরপট্টি সঙ্গে সঙ্গে প্রেমতলা যে কেমন নাম । তবে নিম্নবর্গের বৃত্তি বিন্যাস দেখেছে গ্রামে । চাষীদের আলাদা মাছুয়াদের আলাদা লুহারু হাপর চালায় যারা তারা থাকে গ্রামের শেষে সীমায়, কর্মকার কুম্ভকারদের আলাদা আলাদা বসত থাকে একই গ্রামে, যেমন ব্রাহ্মণ কায়স্থরা থাকে । শহরের পাইকারী ব্যবসা মূলত মাড়োয়াড়িদের হাতে, নাহাটা গুলগুলিয়া ভুরা সারদা । কিছু সাহা বণিকও আছে, মিলে মিশে । মারোয়ারিরা জুতোর ব্যবসা করে না, সাহারাই প্রধান ফ্লেক্স বাটার বাইরে । কুমিল্লার বটুক দত্তর ব্যাঙ্ক সেন্ট্রাল রোডে, নদীর পারে ইমপিরিয়াল । ভুইঞাদের বিশাল কারবার, বাৎসরিক ঝুলন উৎসবের জন্য বিখ্যাত, বিলপারের রাধামাধব আখড়ায়ও হয় ঝুলন । খান সাহেব গাভরু মিয়ার বিশাল ব্যবসা দেওয়ানজি বাজার বেরেঙ্গা মধুরবন্দে । শহরের অন্যান্য এলাকায়ও আছেন ধনাঢ্য তথা বুদ্ধিজীবী মুসলমান । আর আছেন যারা বহুকষ্টে পয়সা জমিয়ে দীর্ঘ জলযাত্রার শেষে মক্কা থেকে হাজি হয়ে ফিরছেন তেমন ধর্মপ্রাণ । বৈতলের বন্ধু দুখুরও খুব ইচ্ছে একবার হজ করে আসে । সে ধর্মাচরণের প্রতিটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পালন করে । আর বৈতলের সঙ্গে ঝগড়া লড়াই করে । বৈতল জানে দুখু ওর সঙ্গে লড়াই করে সমকক্ষ ভেবে, বন্ধু ভেবে । বিধর্মী বন্ধুর প্রতি একটা টান আছে তার । বৈতলও তার সব দুঃখ ভুলে থাকে দুখু সঙ্গে থাকলে । ইমলিবুড়ির ঘোড়ার নাল চুরি করে বৈতলের দুঃখ হয়নি, বরং এক আবিষ্কারের আনন্দে বরাক নদীতে বিসর্জন দিয়েছে তার অদেখার দেখা সত্য । এক লোহার টুকরো দিয়ে একশ বছরের রমণী কী করে । মোহর তো চুরি করেনি বৈতল । কিন্তু ইমলিবুড়ি মরে যাওয়ার পর বৈতলের কষ্ট হয়েছে, তবে কি ঐ লোহার টুকরোর শোকে মরে গেল । বৈতলের মন খারাপ হয়ে যায় । বন্ধু দুখু বুঝতে পারে সব । নিয়ে যায় নদীর পারে । দুই বন্ধু অনেক সময় কাটিয়ে দেয় কথা বলে, চুপ করে বসে থাকে । অনেক কথার পর দুখু নতুন কথা বলে,
--- অউ দেখরে, পানি আর পানি যার । আওয়া পানি যাওয়া পানিরে মনো রাখের নি । দুনিয়ার নিয়ম বদলাইতে পারবে নি । 
   বৈতল তার স্বভাবসিদ্ধ ক্রুদ্ধতায় বন্ধুর কথার জবাব দেয় । বলে,
--- অই বেটা হুন, ইতা পিরাকি মাত বৈতলর লগে মাতিছ না । তুই আমারে  কিতা জানছ । মরা মানুষ লইয়া কান্দিয়ার নি । অউ পানিত আমি মানুষ মারিয়া ফালাই দিছি, হিগুও আমার বন্ধু আছিল । তোর মতো বাঙাল এগুরে আমি মারছি জানছ নি ।
--- তুইন । মানু মারচছ । কে মানব ক ।
--- তুই তো আমারেউ মানছ না ।
--- মানি নাতো । তুইন বেটা গুণ্ডামি করছ, বেটাগিরি দেখাছ তুইন ইতা কিচ্ছু নায় ।
তোর মন লরম । তুইন কিচ্ছু মানছ না কেনে ।
--- কিতা মানতাম । তোর আজারি মাত নি ।
--- কেনে তোর ভগবানরে তো মানতে পারছ ।
--- কে কইল মানি না । আমি সবরেউ মানি । আমি পাকিস্তানো কই থাকতাম জানছ নি । কালিমন্দিরো থাকতাম ।
--- ইতা জানি, গাইঞ্জা খাওয়ার লাগি ।
--- মদও খাইছি বাবাজির লগে । তুই কিতা ভাবছ তুই কিচ্ছু খাছ না এর লাগি তুই সাধু, আল্লা পাইলাইবে । তুই বউ মারচছ সবে জানে । তুই অখনও লুকাই লুকাই বেটিনতর কাছে যাছ । যাছ না । বছইর বৌর লগে তোর ইও নাই ।
--- ইতা বাদ দে । যে কথা কইয়ার হুন ।
--- !
--- মনর শান্তি পাওন লাগব ।
--- কিতা করতাম এর লাগি । অউত্ত তুই আচছ শান্তির মা, বছই আপদ ইগুইন্ত থাকলেও শান্তির নাতিপুতি । বাড়িত বউ আছে । পুড়ি আছে আর কিওর শান্তির বাড়ি ।
--- আরো লাগে বেটা । আমার কুনু ভয় ডর নাই জানছনি ।
--- আমারও নাই, এর লাগি কিতা ।
--- আমি চউখ খুলা রাখলেও দেখি, বন্দ রাখলেও দেখি । আমি সব সময় আল্লাপাকর ভরসা পাই ।
--- আমার ইতা নাই । ভগবান উন থাকলে তোমরা আছো, থাকো । খাও দাও ঘুমাও আমার কিতা ।
--- নারে, মানন লাগে । অখন মানিলা, ভালা লাগব ।
--- কারে মানতাম । শ্যামসুন্দর আখড়াত যাইতাম নি । ঘনিয়ালার মজিদো গিয়া নমাজ পড়তাম নি, রোজা রাখতাম নি । কাছারির গির্জা ঘরো গিয়া বই থাকতাম নি ডনাল সাহেবের লাখান । আমি হক্কলতাউ পারি, ইতায় আমার কিচ্ছু হয় না, পুতায় না । অত যে মদ খাই গাইঞ্জা খাই আমারে দেখচছ নি পাও টলতে । তে টলে । আমি কইয়ার তোরে, মামুর পাওর তলে বই থাকলে টলে, আমার দুনিয়া হিলি যায় । তাইন মাইনষর মতো মাতইন না এর লাগি তাইন আরো ভালাতান কুনু পিরাকি ভাও নাইভালা থাকিছ, ভালা চলিছ ইতা কইন না । কিন্তু আমি তানে ডরাই । তান আদররে ডরাই । আদর পাইলে বেটা সব হয় ।
--- মামু আমরার দাতা । তান কথা আলেদা । যেতাউ কছ আমার নানি খুব হাউশ একবার মক্কাত যাইতাম ।
--- যাছ না কেনে, কে আটকাইছে ।
--- একবার কাবা দেখতাম, ইসতিসলাম করতাম । একবার মিনাত যাইতাম । জমজমর পানিত হাত দিতাম । পারমু নিবে ।
--- পারতে না কেনে বেটা ।
--- বহুত টেকা লাগে নু ।
--- কত লাগে ক । এক রাইতেউ মারি দিমু । নছিবালি হাকিমর পুকইরো যে অত হলইদ রাখছি ইতা কিতার লাগি ।
--- ছি, ই পয়সা লইয়া যাইতাম নায় । পাক পয়সা ছাড়া অইত নায় ।
--- পয়সাত আবার পাপপুণ্য লেখা থাকে নি । ঠিক আছে আমি রিক্সা চালাইয়া পয়সা দিমু তোরে, দিনে রাইতে চালাইমু । হাউস অইছে যখন তুই যাইবে । আর কেউরে কইছনা । তুই যাইবে । বৈতল থাকতে পয়সার লাগি ডরাইছ না দোস্ত ।
 বৈতল মনে করে গুরুদক্ষিণা দিচ্ছে । গুরু সৃষ্টিধর চেয়েছেন বৈতলকে নিয়ে কামাখ্যা দর্শনে যাবেন । কাশী যাবেন মথুরা বৃন্দাবন যাবেন নবদ্বীপ যাবেন । অযোগ্য শিষ্য পারেনি, পালিয়ে এসেছে দেশ ছেড়ে । গুরুর মতো এক বন্ধুর শুদ্ধ ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে গুরু সৃষ্টিধরের উদ্দেশ্যে করজোড়ে প্রণাম করে বৈতল ।
পাতিমারা চা বাগান থেকে লেভির টাকা নিয়ে ফেরার পথে বৈতলের মুঠো থেকে বন্দুকের গুলি ছোটে । ভোলার মুখে মারে মুঠো করা হাত । পুণার সঙ্গে শয়তান জমিদারের নাম জড়িয়ে কুকথা বলে ভোলা । পুণ্যবতী শুধু কেতুমামার মতো ভাল মানুষের মেয়েই নয়, পুণা তার আদরের মেয়ের মাস্টারনিও বটে । দুর্গাবতী পুণাকে জড়িয়ে বৈতলের সঙ্গে রসিকতা করে । পুণা খারাপ মেয়ে হলে দুর্গাবতীর চোখ এড়িয়ে যাবে না । বৈতল দুর্গাবতীর চোখ দিয়ে দুনিয়া দেখে ঠকেনি । তাই ভোলাকে শাস্তি দেয় । দুজন সারাপথ কোনও কথা বলে না, একই পথে ফিরে আসে বরাক নদীর ফেরিঘাটে । আবার জুড়িন্দা আবার সদরঘাট । রাত আটটায় নদীর পারের শ্রমিক কল্যাণ অফিসে টাকা সমঝে দেয় পুণার হাতে । বৈতল নিজের হাতেই সই করে সৃষ্টিধর শর্মা । খাতায় ওর নাম নেই লেখা আছে উঝাদা । বৈতল নামটা চালু করার চেষ্টা করেছে কিন্তু কেউই ডাকতে চায় না অকর্মা নামে ছোটরা সমীহ করে, উঝাদা ডাকে । বড়রাও অপ্রস্তুত হয়, উঝাই ডাকে । হরিৎবরণে বৈতলের পরিচয় যে মনসামঙ্গলের গায়ক পাঠক, নর্তক তাই হয়তো সম্মানের উঝা, উঝাদা । শুধু তিন বন্ধু ডাকে বৈতল । বৈতল যতটুকু শিখেছে পড়তে সব লুলার কাছ ঠেকে । সাপের ওঝা রুল আমিন বেজ হয়ে যায় কবি দিলবাহার বাঙাল । লিখতে শিখিয়েছে বৈতলকে তার কন্যা । বাপ মেয়েতে এক সাথে শিখেছে অ আ লিখতে । লাল মলাটের বর্ণপরিচয় থেকে অক্ষরের ছবি এঁকেছে শেলেটে, খাগ কেটে কলম বানিয়ে লিখেছে কাগজে, রাজহাঁসের পালকের কলম বানিয়ে, পি এম বাগচির বাড়ি কালি গুলে বৈতল লিখে চলেছে ওঝা গুরুদের রচনা, মনসাপাঁচালি সংগ্রহ করেছে গ্রামে গ্রামে ঘুরে । বৈতলের সুন্দর হস্তাক্ষরের তারিফ করে সবাই । পুণাও করে । বলে,
--- কাছাড়ি মাইনষে ছাপার অক্ষরে মাতইন কেউ কেউ । তুমারে দেখলাম ছাপার অক্ষরে লেখতায়ও পারো । অত সুন্দর তুমার অক্ষর রেবা উঝাদা । আমার লেখা যে ছেরেং বেরেং । তুমার লাগি হিংসা হয় ।
--- হিংসাইছ না রে বইন, আমি অইলাম মূর্খ মানুষ, আমি লেখাপড়া উড়া জানি না, বই দেখিয়া ছবি আকতাম পারি খালি ।
--- লেখা তো ছবি আকাউ । ছবি আকিয়া মনর কথা কওয়া । আগে মাইনষে কত কষ্ট করছে, পাথর খোদাই করিয়া লেখছে ।
--- কেনে চিঠি আছিল নানি, পোস্ট কার্ড ।
--- না, কিচ্ছু আছিল না ।
--- তে নু মাইনষে কয় পারোর পাও বান্ধি পাঠাই দিতা চিঠি রাজার পুড়ির কাছে
--- ইতা তো হিদিনর কথা
--- আইচ্ছাতে । তুমার কাছে নি আয় পারো উরো ।
--- আমি কুনু রাজার পুড়ি নি ।
--- অউ ইটখোলার ভোলা ইগু কিতা ক ছাইন । ইগু বুলে বিএ ফাশ । তোর লগে কিতা ইগুর ।
--- কেনে কিতা অইছে । হে অউত্ত ইতা আমার মাথাত ঢুকাইছে । মাইনষর ভালা করত । বিনা পয়সাত পড়াইত, ডাক্তার দেখাইত, চশমা দিত । হে নেতা অইত ।
--- আর ইবায় নাই চাম, জমিদারর বাইচ্চায় চাকর খাটার । হে কিতা লাঠিয়াল নি । তুই কছ না কেনে ভালা অইত ।
 --- আমি কইছি ইউনিয়ন অফিসো চাকরি করত । যমুনাদাও রাজি আছলা । হে করত নায় ।
--- ভালাউত্ত কইছে । হিগুর চাকর অইত কেনে । ই মাত বাদ দে । তার লগে তর কিতা ।
--- উঝাদায় যে কিতা মাতো ।
--- আমিও এক আউয়া, ভকা । খামোকা গাইল্লাইলাম, মারলাম কান কপালো ।
--- অখন খাইয়া আও গিয়া । যাওয়ার আগে টেকা লই যাইও ।
সে এক এলাহি আয়োজন । বিয়েবারিকেও হার মানায় । ডাল ভাজা বাঁধাকপির শুকনো তরকারি, রুই মাছের কালিয়া আর পাঁঠার মাংস । টক, দই, মিষ্টি । গরিব চা শ্রমিকের কষ্টার্জিত উপার্জনে ভাগ বসিয়ে রাজভোজ । তবে বৈতলের খাওয়া নিয়ে কোনও মান অভিমান নেই । চেটেপুটে চেয়েচিন্তে খায় । একটা ঢেকুর উঠতেই মনে পড়ে রাজার কথা, যম রাজাকে তো দেখছে না কোথাও । সকালে খদ্দরের পাজামা পাঞ্জাবিতে সেজে এসেছে । লেভি দলের তদারকি করেছে নিজে । বৈতলের কাঁধে হাত দিয়ে বুঝিয়েছে বিশ্বাস । যতক্ষণ জমিদারের হাত ওর কাঁধে রয়েছে, বৈতল ওর জানা সবরকমের গালাগালি একের পর এক দিয়ে গেছে বিড়বিড়েয়ে । তবে খাবারের এই বিশেষ আয়োজন সে খুশি । সব কিছুই বারবার চেয়ে নেয় । মাংস চাইতে গিয়েও পারে না । মাংসের বাল্টি হাতে দাঁড়িয়ে আছে ভোলা । তাই পাশে বসা নানকুকে বলে,
--- ইগুরে ক ই চন্নামিত্ত দেওন লাগত নায় । বাল্টি উল্টাই দিত ক ।
   কিছুক্ষণ আগের গাল-খাওয়া, মার-খাওয়া ভোলা রজক সব ভুলে আবার হাসে । সত্যি মাংসের বাল্টি উল্টে দেয় বৈতলের পাতে । বৈতলও হাসে । হাসতে হাসতে নানকুকেই বলে আবার,
--- ইগুর কিতা গুসা গেল নানি বে অখনও । আমারে কিতা খাওয়াইত মারত চায়নি । আইচ্ছা রে, সবরে দেখলাম তোর যমরাজারে দেখলাম না একবারও । রাইত আয় নানি ।
  নানকু বৈতলের কানের কাছে মুখ নেয় । ফিশফিশিয়ে তথ্য দেয় বৈতলের কানে । বৈতল গোপন কথার নির্যাস বের করে তার স্বাভাবিক তির্যক ভঙ্গিতে । বলে,
--- বেটায় নু পানিরে ডরায়, আবার সইন্ধ্যা অইলেউ নি পানিত ডুবি থাকে । কুন ঘরো রে তার আবার আলাদা ঘর আছে নি ইখানো । দেখমু চাইন ।
 বৈতলের দেখা হয়নি কাচের ঘর । সে যম জমিদারকে দেখতে যায়নি । পুণা বলেছে খাওয়ার পর টাকা দেবে । কুড়ি টাকা ভোজন-দক্ষিণা । নানকুই বলেছে জমিদার যমের ঘরে আছে পুণ্যবতী । কাচের ঘরের পর্দা তাই সারিয়েছে । কী দেখেছে । ঘরের সাজগোজ দেখেনি । তবে এক মিথুনমূর্তি দেখে বৈতল হতভম্ব হয়ে যায় । বৈতল কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি । পুণ্যবতীর খোলা যৌবন কি লুটিয়ে দিচ্ছে, না লুটে নিচ্ছে এক লম্পট যুবক । অসহায় বৈতল বুঝতে পারে নাগরিক পাপপুণ্য ন্যায় অন্যায়ের হিসাব বড় জটিল । যে-বৈতল নারীর অপমান সহ্য করতে না পেরে মানুষ খুন করে, প্রিয় বন্ধুকে গলা টিপে মারে, সেই বৈতল যমুনাপ্রসাদকে বেকায়দায় পেয়েও ছিটকে সরে আসে নীরবে ।
দুর্গাবতীও তো বৈতলের মতো গ্রামের মেয়ে । শহর দেখেনি, তবে কী করে শেখে কথা বলার নাগরিক চালাকি । তাহলে কি জাতিভেদ বর্ণভেদ তত্ত্বই সত্য । হোক না অগ্রদানী ব্রাহ্মণ কন্যা, উচ্চ বর্ণের তো বটে । বৈতল লক্ষ করেছে দুর্গার কথায় অনেক সময় ভূস্বামীসুলভ আদেশ থাকে । বৈতল কখনও মান্য করে কখনও রাগে । পুণ্যবতী নিয়েও সরাসরি কিছু বলেনি, কিন্তু আভাসে তো জানিয়েছে । বলেছে পুণ্যবতীর ঢংঢাং কথা । দুর্গা কেন সংকেত কথা বলে । সে কি জানে না বৈতল কৈবর্ত মারপ্যাঁচের কথা থেকে স্পষ্ট কথা শুনতেই পছন্দ করে বেশি । না হয় একটা লড়ালড়ি হবে । কথা পছন্দ না হলে রাগবে, পছন্দ হলেও তো মাথায় তুলে নাচে । বৈতল ভেবে পায় না এবার কী হবে । ভোলার কী হবে । ভোলাও তা হলে সব জানে । ভোলার রাজনীতি, নেতা হওয়ার শখ সবই যে পুণ্যবতীর জন্য, সে বুঝতে বাকি নেই তার । শহরের মানুষ বড় জটিল করে ভালবাসে । ভোলার জন্য দুঃখ হয় বৈতলের, মেরেছে বলে নয়, গালমন্দ দিয়েছে বলে নয়ভোলার মেরুদন্ডহীনতার জন্য তার দুঃখ । ছেলেটা কি পারে না ভালবেসে পুণাকে শুধরে দিতে । বৈতল জানে পুরুষ কিছুই পারে না । ভোলা শুধু জীবনের অমূল্য সময়টুকু নষ্ট করবে এক ব্যভিচারিণীর ছায়ায় । তারপর হাহকারে শেষ হয়ে যাবে । পুণার প্রতিও বৈতলের কোনও রাগ নেই, পুণা যে বাঘের পিঠে চড়ে বসে আছে । তবে শহর বৈতলকেও কিছু চালাকি শিখিয়েছে, সরাসরি জবাব দেওয়ার ভঙ্গি পাল্টেছে, এখন তার নিজের ভিতরই অনেক প্রশ্নোত্তরের পাঠশালা খুলে বসে আছে । কাচের ঘরে যা দেখেছে তা নিয়ে নিজের সঙ্গেই রক্তারক্তি খেলা খেলে । পুণ্যবতীর সারল্য কেন বদলে যাবে এক রাতে, পুণার প্রগলভতা আছে, পুণা নিজে থেকে কাউকে ভাসিয়ে নেওয়ার মানুষ নয় । মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ হলে দুরকম হয় না কেউ । তবে কি নিজেকে উৎসর্গ করে পুণা । ভোলা রজকের প্রতিষ্ঠার দাম । এক ভাঙা শেভ্রলের চালক, দিন আনতে দিন খাওয়া জোটে কি জোটে না পিতার কন্যা দাপটে বেঁচে থাকতে চাইছে, আখের গোছাতে চাইলে কেতুমামার সংসারে সচ্ছলতা আসত । নাকি জম-বিরোধী গুপ্ত সমিতির পুণাও এক সভ্য । তাই যদি হয় তবে অসহায় সমর্পণ কেন । ছলাকলায় ভুলিয়ে বিত্তহীন করার খেলা খেলতে পারে পুণা, পুরুষাঙ্গ কেটে নিতে পারে খচ করে । বৈতলের কোনও একটা কষ্টের জায়গায় নিরাময় দিতে পারে পুণা । এই এক নরকের কীট বৈতলের সাজানো সংসারটাকে ছারেখারে দিয়েছে । বৈতল তার মনের মানুষের মনটাই খুঁজে পাচ্ছে না । দুর্গাবতী তেমন রমণী নয় জানে বৈতল, তবে কেন যখন তখন যায় যমের বাড়ি । শুধু সংসারের আয় বাড়াতেবৈতল তো চায়নি বৌএর রোজগারে প্রতিপালিত হতে । গুরুবাক্য প্রয়োগ করে বৈতল সবার জন্য, নিজের জন্য খাটাতে পারে না । গুরু বলেন, বিশ্বাসে মিলায় কৃষ্ণ তর্কে বহুদূর । দুর্গাবতীকে বিশ্বাস করে বৈতল, কিন্তু মানুষের চোখ, মানুষের মুখ কী করে সামলাবে । তার মেয়ের গাত্রবর্ণ নিয়ে, মেয়ের জন্ম নিয়ে কেন মানুষ চারকথা বলে । বৈতলের কষ্ট গাঢ় হয় । কষ্ট হলেই বৈতল মহুয়ার মালা থেকে শুকনো ফুল ছিঁড়ে খায় একা একা । পুকুরের জলে তাকিয়ে থাকে । চোখের একাগ্রতা দিয়ে জলের গভীরতা মাপে । যমকে নিয়ে জলের নিচে একটা কাল্পনিক দ্বৈরথে নামে । আর জলের কাছে বৈতলের মতো শক্তিধর কেউ নেই । নীরব হাসির আয়োজন হয় বৈতলের ঠোঁটে, হাসির আবেশ নিয়ে বৈতল ঘুমিয়ে পড়ে পুকুরপারে ।
বৈতলের মন যখন উতলা হয় চলে যায় বিয়ানিবাজার । বৈতল কি আর যেতে পারে স্বদেশ । বৈতলের মন যায় । গুরু সৃষ্টিধরের সঙ্গে কথোপকথনে মন শান্ত হয় । প্রথমদিনই গুরু বন্দনা শিখিয়েছেন সৃষ্টিধর । তাই মনে মনে মন্ত্র উচ্চারণ করে বৈতল,
আগে বন্দি মাতা পিতা আর শিক্ষাগুরু
এ জগতে যারা হন বাঞ্ছা কল্পতরু ।
গুরুর পায়ের কাছে বসে বৈতল । জোড় হাতে প্রণাম করে । বলে,
--- অখন আমি কিতা করতাম কইন । আপনারে কই পাইতাম ।
--- মনে মনে যে কও ডাকরায় । মনসামঙ্গল গাও মনসা কথার অর্থ জানো নানি । ইতা পাঁচালির কথা উতা সব আমরার মনর কথা । মনসা বেটিরে ডাকবায় সবরে পাইবায় ।
--- অখন কইন ইগুরে মারি ফালাই দিতাম নি । বৈতলে ইতা ডরায় না, জমিদার উর চুকে না ।
--- চুকন লাগে । তোমার বাড়িত বৌ আছে পুড়ি আছে । অখন কুনু আর বড় হাওরর ডেকাগরু নি তুমি ।
--- এর লাগি অউও । ইগু মানুষ নায় । আমার বউর লগেউ কিতা করে জানি না । পুড়ি ইগুরেউ ছাড়ব নি । ই গরিবর পুড়ির কুনু দোষ নাই । তাই কিতা করত, লোভ দেখাইছে । অখন আপনেউ বাঞ্ছা কল্পতরু
গুরু সৃষ্টিধর কোনোদিন মাথায় হাত দেননি বৈতলের । গ্রামের ছুতোর মিস্ত্রির সাদামাটা জীবন মানুষের । সৎপথে থাকেন, সারাদিন করাত রান্দা চালিয়ে অবসরে মনসামঙ্গল সুর করে পড়েন । মানুষ দূর-দূরান্তের পাঁচালি শুনতে নিয়েও যায় । বৈতলের উৎসাহ দেখে তাকেও সঙ্গী করেন গুরু শুধু আম শিশু আর গামারির জাত নির্ণয়ে নয়, মানুষমনের সবরকম বিদ্যায় পারদর্শী এই কাঠকারিগর । যে-কোনও বিষয়কেই তিনি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারেন, মুখের কথা থেকে গানের সুরে বদলে দিতে পারেন মানবমন । দেশভাগের মতো নিষ্ঠুর সত্যকে পর্যন্ত তিনি মেনে নিয়েছেন নিরুদ্বেগ । বলেছেন,
--- কার্জন সাহেব যেদিন বাংলা দুইভাগ করা মনস্থ করছইন, হিদিন অউ দেশ ভাগ অই গেছে । হিন্দু মুসলমান দুইজাতির চিন্তা ঢুকাই দেওয়া হইছে বাঙালির মনো । চল্লিশ বছর ধরি ধিকি জ্বালিয়া মরার দরকার আছিল না । তখন অইলে অইন্য নাম অইলনে, নিজর মতো । অখন অইল ইন্ডিয়া আর পাকিস্তান । বাঙালির ভাষাত আছে নি ই দুই নাম । বঙ্গ নামটাউ হারাই গেল ।
    গুরু গুরুভার কথার সঙ্গে গান সংযোগ করেন । গেয়ে ওঠেন,
খন্ড হইল বঙ্গদেশ
খন্ড কাইব্য অইল শেষ
বঙ্গের মঙ্গল আজি করিল কর্জন
শ্রী বঙ্গ-মঙ্গল গায় বঙ্গবাসীজন ।
গুরুগিরিতে বিশ্বাস নেই যে গুরুমহাশয়ের, সেই সৃষ্টিধর ওঝার বরাভয়ে বৈতল দেয় নির্ভয় ডুবসাঁতার । সাঁতরে পেরিয়ে যায় পাথার । গুরুর পায়ের সামনে রাখে তার যন্ত্রণার উপাচার । ব্যভিচারী শ্রমিক নেতা ভূস্বামী যমুনা সিংকে হাতে নাতে ধরেও যে ছেড়ে দেয় বৈতল, তার কী উপায় । পুণ্যবতী নিশ্চয় যে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি । মেয়েটা তো ভাল, মন্দ নয় মোটে । বুঝতে পারে দারিদ্যের চাপ । তাই কি জমিদারকে শরীর দিয়ে নিতে চাইছে কোনও প্রতিশোধ । নাকি আত্মপ্রতারণা করে কাউকে দিতে চাইছে পুরষ্কার । সে কি ভোলা রজক । বৈতল জানে প্রত্যেকের যুদ্ধ আলাদা আলাদা, কৌশলও ভিন্নতবু এই প্রথম কোনও নির্বাস নারীর শরীর দেখে দুঃখ হয় বৈতলের । ধর্ষণকারী লোকটাকে তাই তৎক্ষণাৎ কোনও শাস্তি দিতে পারেনি । বৈতল মনের উচাটন গুরুপদে রেখে গুরুর করস্পর্শ পেতে চায় । তার প্রশ্নের জবাব চায় । গুরু সৃষ্টিধর হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিতেই বৈতলের চোখ বুঝে আসে । গুরু বলেন,
---  বুঝছ নি রেবা, তুমারে কওয়ার আমার কিচ্ছু নাই । তুমি অউ অখন বাঞ্ছা কল্পতরু । তুমি পুড়ি ইগুরে দেখিও । আর তুমারে আমি মহাভারতের গপ কইছি নানি । তুমি অউ অইলায় চক্রধর শ্রীকৃষ্ণ ।
--- ছিছি কিতা কইন আপনে । আমি এক চুর, হারাদিন মিছাকথা কই আর রিক্সা চালাই পক্‌খিরাজ ।
--- অউ পঙ্খীরাজ অউ তোমার কপিধ্বজ । অর্জুনের রথকেশবেও বহুত মিছা কথা কইছইন । নিজে কিচ্ছু করছইন না । তুমি রেবা নিজে হক্কলতা করতায় চাও ।
--- তে কিতা করতাম । ইগু তো অত পাপ করের তেও বাচি যার ।
--- তার পাপর ভরা পূর্ণ অইছে না এর লাগি ।
--- কুনদিন ভরব ।
--- এর লাগি উপায় বার করন লাগব ।
--- এ আপনে ইতা কিতা কইন । উপায় তো ঠগামি । মিছা কথা ।
--- করন লাগব । শ্রীকৃষ্ণ না অইলে কিতা কুরু বংশ ধ্বংস অইলনে নি । শিখন্ডিরে আউগ্‌গাই না দিলে কিতা ভীষ্ম মরলা নেঅশ্বথামা হাততিরে না মারলে দ্রোণরে মারা গেল নে । অর্জুনের মারার লাগিয়ে অস্ত্র রাখছিলা কর্ণয়, হি অস্ত্র দিয়া ঘটোৎকচরে মারলা । রথর চাক্কা উঠানির সময় কইলা, মারি দেও । শয়তান রাজা দুর্যোধন যুদ্ধ থাকি ভাগল একলা একলা, বিলর পানিত লুকাই থাকল, হিখানোও উপায় করলা মাধবেগাইল্লাইয়া বার করাইলা । স্যমন্তপঞ্চকর নাম হুনছ তো । হিখানো অইল গদাযুদ্ধ, দুর্যোধনরে হারানি কাম নায় ভীমর আবার মাধবে অর্জুনরে উরাত দেখাইলা । গদাযুদ্ধত নাইর নিচে মারার নিয়ম নাই । তাইন কইলা আর অর্জুনেও দেখাই দিলা উরাত মেজভাইরে । এর লাগি কিতা কেউ শ্যামসুন্দরে গাইল্লায় নি । তারা যেতা করছইন তার থাকি বেশি করছে দুর্যোধনে আর তার বাপে । ননীচোরায় তো খালি ডাকতরি করছইন তারার শয়তানির জবাব ঠিকঠাক দিছইন !
--- ইতা কুনু ধর্মস্থ অইল নি !
--- ধর্ম কিতা রেবা ! ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরেও মিছা কথা কইছইন । জুয়া খেলছইন । তে কৃষ্ণর ভাই আছলা সাধু মানুষ । তাইন কইতা সাধুয়ে ধর্মকর্ম করে । আর টেকার লোভে আর বেটির লোভে মানুষে ধর্ম নষ্ট করে । ধর্ম টেকা আর বেটি যে ঠিক করি রাখতে পারে, হে উ বেটা ।
--- ই তো ধর্মকথা কইলা, তখন কইন আমি কিতা করতাম ।
--- অখনও বুঝলায় নানি । দেখো, হে বাড়উক, তার বানাইল গাতা তুমি আর একটু নিন করিয়া রাখি দেও । দেখবায় নে আপনেউ পড়ব ! হে অইল জিয়া বেঙ, তারে পাল্লাত মাপিও না । কলর কাম কেনে বলে করতায় চাও । তুমার অউ এক দুষ । ধর্মর ঘণ্টা আপনেউ বাজব, তখন নিমিত্তর ভাগী কে অইবা ইতা কেমনে কইবায় । উরাত দেখাইয়া ঘণ্টা বাজাইলা সারথি শ্রীকৃষ্ণয়, দেখলা অর্জুনেতাইন আবার দেখাইয়া বাজাইলা দেখলা ভীমে, পাপীরে মারলা । মাঝখানে অর্জুন পড়ি গেলা, বাসুদেবে তো কইয়াউ রাখছইন, তান হাতো সব মরি গেছে । অখন নিমিত্তর ভাগ । অউত্ত গপ, অউ মহাভারত ।
--- তার পরে । শেষ হইল কেমনে ।
--- শেষ হইত কেনে । পাপীর শাস্তি হইত, কিন্তু সৃষ্টি চলত । যুদ্ধ শেষ । অর্জুনর কপিধ্বজ রথ তো পুড়িয়া ছালি ।
--- হে, জয় জয় দেই ।
--- বুঝছি, তোমার মন ভরি গেছে । মহাভারতর কথা কুনু শনিপূজা নি । যে জয় জয় দেওন লাগব, জয় শনিপ্রীতে জয় । মহাভারত গাওন লাগে । তুমি যেলাখান মনসামঙ্গল গাও । বাংলাতে মহাভারত লেখছইন কাশীরাম দাসে । দিলে তান জয় দেও । গাও দেখি আমার লগে মহাভারতের কথা অমৃত সমান, কাশীরাম দাসে কহে শুনে পুণ্যবান
     বৈতলের মন ভরে গেছে সত্যি । গুরুবাক্যে কোথাও যে অদৃশ্য শক্তি আছে অলৌকিক এই কথোপকথনের সূত্রে কি বৈতল কোন এক দায়িত্বভার গ্রহণ করে । কোনো এক পথ নির্দেশ । শ্রীকৃষ্ণ অর্জুন ভীম এবং সাধুপুরুষ রোহিণীনন্দন । এদের থেকেই বৈতলকে গ্রহণ করতে হবে রসদ । হলধর বলরামের মতো ভালমানুষ হবে না বৈতল । ভগবানের মতো কুচক্রী হতে পারবে তো । তার চেয়ে মনসা মায়ের গোঁসা তার পক্ষে বোঝা সহজ । আইও সোজাপথের পথিক অনেকটা, চৌদ্দ ডিঙা ডুবিয়ে দেব তো দেবই, লক্ষীন্দরকে মারব তো মারবই, কথার মারপ্যাঁচে ভুলিয়ে দেওয়ার ব্যাপার নেই । এক ছোবলেই কলার ভেলায় ।




চলবে 


আরো পড়তে পারেন

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...