“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

শুক্রবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১২

সৌম্য দাসগুপ্তের কবিতার বই ‘আলো, আলোতর, আলোতম’


রথমে বন্দনা করি মায়ের চরণ।
আল্লারসুলের নামে নিলাম শরণ।।

ইণ্টারনেটে আড্ডা হৈল মৌনমুখর।
তর্ক উঠেছে এলা রাজনীতির উপর।।

আন্তর্জালে গুণীজনে জানাই সালাম।
কেহ বাবা দক্ষিণধারী কেহ বাবা বাম।।

কেহ রাজধানী থাকে কেহ বা বংগাল।
কেহ সাহেব-বিবি কেহ নিজ ইন্দ্রজাল।।

তত্বজ্ঞানী কেহ, কেহ মাটির উপর।
কেহ ঊর্ধগামী দেখো কেমন সুন্দর।।

সর্বমনোহর কথা মহাকাশ হৈয়া।
যুক্তি করে দেখো দুঃখসুখজাগানিয়া।।

ভবজন্মে তর্ক কৈরা কে জিতেছে কবে।
অধমের নিবেদনো ধুলি ভস্ম হবে।।

এই কথা বলিয়া সৌম্যপালাগান ধরে।
এপিসোড কি অ্যানেকডোট যুক্তি পেশ করে ।।

             এভাবেই শুরু হয়েছে সৌম্য দাসগুপ্তের কবিতা ‘নিউজগ্রুপের পালাগান’২০১১র কলকাতা বইমেলাতে প্রকাশিত তাঁর বই ‘আলো, আলোতর, আলোতম’র ৪০তম কবিতা। ৪টি সর্গের দীর্ঘ  কবিতা। ওভাবে কেউ কবিতা লেখে!  আন্তর্জালের যুগে  ‘পালাগান’! পালাগান আর কবিতা এক হলো! এই ‘আধুনিক’ প্রশ্ন যারা করতে শুরু করবেন তাঁরা কবিতাটা পড়ে গেলেই দেখবেন শেষে এসে নিজেরাই প্রশ্ন করছেন, আগের প্রশ্নটা কি ছিল  সংগত?  এ আমরা নিশ্চিত বলতে পারি। পালাগানে গল্প থাকবে। এই কবিতাতেও আছে। আছে ‘ছোট শিশু আতিয়ার’ এবং আতিয়ারদের গল্প। পড়তে পড়তে আমারতো বহুদিন আগে পড়ে না-পছন্দ গল্প ‘আদাব’কে মনে পড়ছিল। (অন্য পাঠকে অন্য কিছু মনে পড়তে আপত্তি নেই)  আর ভাবছিলাম, কত হেলাফেলার গল্পই না আমাদের ‘আখ্যান’ নির্মাণ করে গেছে দশকের পর দশক। সৌম্যের গল্পের স্থান-কাল এগুলোনা সরল কিম্বা সমান্তরাল রেখা ধরে। বোধকরি, যেটুকু তুলে দিলাম, তাতে পাঠক এও ধরে ফেলেছেন যে তাঁর ভাষাও এগোয়না সরলরেখায়! কোনো ভাষার ‘মানে’ একে ধরা যাবে না।  ধরা যাবে শুধু কবিতার মানে। কবিতার টানে। যেখানে যেমন দরকার পড়েছে, শব্দ তুলে নিয়েছেন। কোনো রকম পক্ষপাত কিম্বা অস্পৃশ্যতাতে হননি পথভ্রান্ত! ছন্দেও তিনি সেরকমই বৈচিত্রময়। পয়ারে যেমন, গদ্যেও তেমনি স্বচ্ছন্দ!
               পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, বইটার ওমন নাম কেনো? উত্তরে ভেবেছি, অনেক কিছুই। শুরুর ভাবনাটা ঐ আলোরই মতো। আলো এগোয় সরলরেখায়। এটা দেখা যায়। কিন্তু সেই আলো আসলে কিনা যুগপৎ অসংখ্য কণা আর তরঙ্গের সমাহার। এই বইএর কবিতাগুলো পড়তে গিয়েও কথাটা মনে রাখতে হবে। এই ইঙ্গিত দিয়েই শুরুর দুই চরণের কবিতা ‘প্রেল্যুডে’ তিনি লিখেই দিয়েছেন, “ছুটছে নদী ছুটছে ঘোড়া আলোর পিছে পিছে/আকাশ জুড়ে হঠাৎ শ্যামা সন্ধ্যা জাগরিছে।” এর মাঝে কোনো দুর্ঘটনার চমক নেই, আছে বৈপরীত্যের মুগ্ধতা! শুরুতেই একটা প্রত্যয়ের সংবাদ। নতুবা কি আর কেউ লেখে ‘সন্ধ্যা জাগরিছে”!   ‘চিঠি’ কিম্বা ‘তিমির ও নেটওয়ার্কপ্রণালী’র মতো কবিতা    সাহায্য করবে সে আলোর সন্ধানে আর গভীরে যেতে। “তথ্যের অধিক যাহা, সি এন এন যে কথা বলে না/ সে জ্ঞান অর্জন করতে বলয়ের বহির্বিশ্বে এসে/ মৃততারাটির লুপ্ত প্রসন্নতারেখাগুলি চেনো...” ‘বলয়ের বহির্বিশ্বে’ পা ফেলে যাত্রা শুরুতো করেন কবি কিম্বা বিজ্ঞানী। মৃত তারাটির ‘আলোতম’ প্রসন্নতারেখাগুলো চেনার কাজটি কবির। এই সব পংক্তি আমাদের প্রসন্ন করে বলেই সৌম্যের বইটি পড়াবার লোভ সামলানো গেল না।
                 বইটি সৌম্যের থেকে আদায় করেছিলাম আজ বহুদিন হলো। পড়লাম বেশ ক’বার। ভাবতে সময় নিলাম। বহু ভাবনাই খেলে গেল। শেষে মনে হলো আমাদের ভাবনা ভার দিয়ে  আক্রান্ত করা কেন? আগ্রহ বাড়িয়ে দিতে যেটুকু বলার সেটুকু বলে বাকিটা  কবিতার উপরেই চাপানো থাক। আশা করছি, আপনাদের ভালো লাগবে।
              শুধু সৌম্য সম্পর্কে দুই এক কথা না বললেই নয়। এই কবির সঙ্গে প্রথম আলাপ ‘অগ্রবীজ’ কাগজের পাতায়। কাগজটি আমরা কাঠের নৌকোতে তুলে রেখেছি। এর তিনি শেষ সংখ্যার সম্পাদক। সেখানে তাঁর কোনো লেখা পড়বার সুযোগ বিশেষ হয় নি, কিন্তু সম্পাদনার পরিকল্পনা আমাদের মুগ্ধ করেছিল। ‘প্রবাসে দৈবের বশে’ থাকেন বলেই বোধহয় বাংলা ভাষা সাহিত্যের ‘কলকাতা’ কেন্দ্রিকতার যন্ত্রণা তিনি হাড়ে হাড়ে আঁচ করেন। তাই আরো কোথায় কেন্দ্র আছে, কেমন আকার, কেমন প্রকার তার— সন্ধানে নেমেছিল অগ্রবীজের সেই সংখ্যা। সেখানে ফরহাদ মজহরের একটি মূল্যবান সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তিনি। সেটিও বাংলা ভাষা , সাহিত্য এবং সমাজের  এক অন্যস্বরের সঙ্গে আমাদের আলাপ করিয়ে দেয় বলেই দলিল বিশেষ।  তারপর তাঁর সঙ্গে আমাদের আলাপ হয় সরাসরি। এবং পড়া হয় বেশ কিছু কবিতা আরো। যাতে করে, এই সুন্দর বইখানা পড়তে পাওয়া।
         কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের স্নাতকোত্তর সৌম্য পেশায় এখন ক্যালিফোর্নিয়ার পিটার ড্রাকার স্কুল অব মেনেজমেন্টের অধ্যাপক। নেশায় কবিতা লেখেন , অনুবাদ করেন, নিজের চিন্তা গদ্যেও নামিয়ে রাখেন। এ অব্দি চারটি কবিতার বই বেরিয়েছে। ৪৯টি কবিতা নিয়ে বর্তমান বইটি ২০১১তে  প্রকাশ করেছে কলকাতার ‘হাওয়া কল’। তার আগে ১৯৯৫তে ‘রাজার জামা পরা মায়াবী সাতদিন’, ২০০০এ ‘কবিতা, ডালাস’, ২০০৪এ ‘মহাপৃথিবীর ওয়েবসাইট। এছাড়াও সুব্রত অগাষ্টিন গোমেজ এবং অঙ্কুর সাহার সঙ্গে ২০১০এ অষ্ট্রেলীয় কবিতা অনুবাদ করে ছেপেছেন, ‘ কাবিতা ডাউন আণ্ডার।’
             বইটি পড়তে পাবেন নিচে। আপনার কম্পিউটারে নামিয়ে নিতে পারেন নাও নিতে পারেন, পড়তে পারেন পুরো পর্দা জুড়ে। নিচের বোতাম গুলো দেখুন। আপনার শুধু দরকার পড়তে পারে ফ্লাসপ্লেয়ারের। নামিয়ে নিন এখান থেকে।
Alo Alotaro Alotamo

কোন মন্তব্য নেই: