.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

রবিবার, ২৯ জুলাই, ২০১২

পেশির উল্লাসে মত্ত পুরুষতন্ত্রঃ ধিক্‌, তোরে শত ধিক্‌

                (লেখাটা গেল ২৮শে, জুলাই, ১২ দৈনিক যুগশঙ্খে প্রকাশিত )
চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়,তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল ----- রণদীপম বসু


সংসার সুখের হয় রমণীর গুণেঃ

            “সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে, শুধু গেরস্তালি সংসার নয়, তাবৎ জগৎসংসার।  মেগা সিরিয়্যাল হোক কিংবা বলিউড সিনেমায় দৌর্দন্ডপ্রতাপ জমিদার-মাফিয়ার আসরে মুজরোর আসর, সবখানেই সুখ সন্ধানে রমণী চাই। জাত্যাভিমান বজায় রাখা থেকে শুরু করে, মিইয়ে আসা পৌরুষ উদ্ধারে সফ্‌ট টার্গেট মেয়েমানুষ। রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচেও নারী নির্যাতনের ফোড়ন না দিলে সংসদীয় রাজনীতির আসর জমে না। এসব আমরা ভালোই বুঝি, শুধু বলতে গেলেই খানিকটা দ্বিধাবোধ। গোছানো সোশ্যাল স্ট্যাটাস, মনোহরী কথোপকথনের ইয়ার দোস্তদের হারানোর ভয়। তাই সনি সরি ইস্যুতে মুখে কুলুপ আঁটতে হয়। পাঠ্যপুস্তকের সৌজন্যে পাওয়া দেশাত্মবোধ আর কলেজ রাজনীতির শহিদ-শহিদ আস্ফালন সেই কবেই অম্বলের চোঁয়া ঢেঁকুর আর ইসবগুলের শরবতে ধুয়ে গেছে। ঝিঙ্গে-পটলের দৈনিক বাজারের চিন্তাওলা মগজে সব বদলের উচ্চমার্গীয় দর্শনের ঠাঁই নেই। তাই জাতীয় স্তরে আলোচিত নারী নির্যাতনের ঘটনায় আমরা মিনমিন করে প্রতিবাদ করি। ঘটনার বর্বরতা তেমন দাগ কাটে না বরং রসালো বিশেষণে পাকানো কাগুজে প্রতিবেদন উপভোগ করি। আহা, ওই মহিলার চরিত্র, নিদেনপক্ষে পূর্ব ইতিহাস দেখতে হবে না নাকি? গোছের প্রতিক্রিয়া দিয়ে গোঁফটা চুমরে পুরুষত্ব ঝেড়ে নিই। একদল চরম অসভ্য মাস্তানদের ততোধিক অসভ্য মারধোর-শ্লীলতাহানির পরও আমাদের হাতে থাকে চারিত্রিক স্খলনের টেক্কা!  দোষীদের জনতার কাতারে রেখে আমরা বলি এ হচ্ছে জনরোষের বহিঃপ্রকাশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বহাল রাখতে মহান গণতন্ত্র চলে যায় ডিসেস্টার কন্ট্রোল মোডে। তারপরও আমরা মানুষ বৈকি। এই সুইডো-মনুষ্যত্ব দেখে ধরণী দ্বিধা হও বলার মতো কেউ থাকেন না। আবার ঘটনা ঘটে, মোটা চোখে দুএকটা আমাদের দৃষ্টি কাড়ে। অন্যথায় বিশ্ব জুড়ে আকচার ঘটেই চলেছে নারী নির্যাতন। মেয়েটি রাজপথে নির্যাতিত হল। সদ্য গোঁফ গজানো চ্যাংড়া যুবক, পুর্ন সাবালক, সব মিলিয়ে এক দঙ্গল তথাকথিত রাজপথের গার্জেনরা সমাজ সংস্কারের নমুনা পেশ করলেন। আধুনিক পোশাক-আশাক, বারে গিয়ে জন্মদিন পালন, ডিস্কোথেক ইত্যাদি বরদাস্ত করা হবে না! ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে পাপড়ি-মিতালি-সুইটি-রা চোখ রাঙ্গানিটা দেখে নিল। পুরুষতন্ত্রের গো-ধরা কাপুরুষ আর নিজেদের ভারতীয় সংস্কৃতির একমাত্র পরিবেষক-বিতরক-রক্ষক দাবি করা পিউরিটানরা ব্যাপক পুলকিত হলেন। 

          অনেক সময় দেখা যায় জননেতারাও আম-আদমিকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উৎসাহ দিচ্ছেন, ভিন ধর্মাবলম্বীকে বিয়ে করা ছেলে-মেয়েদের বাঁশ দিয়ে পেটান, আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে ইউপি, হরিয়ানার অনার কিলিং আর এ হেন বিবৃতির মধ্যে গুনগত তফাৎ কোথায়? এই তো সদ্যই উত্তর প্রদেশের বাগপথ অঞ্চলে গ্রামীণ খাপ পঞ্চায়েত চল্লিশ বছরের নিচের মহিলাদের জন্য একগুচ্ছ তালিবানি নীতি-নিয়ম জারি করেছেন। মাথা অনাবৃত রাখা যাবেনা, মোবাইল ফোনে কথা বলা নিষিদ্ধ এবং সন্ধ্যের পর বাড়ির বাইরে বেরুনো বরদাস্ত করা হবেনা। এমনকি লাভ ম্যারেজ করা ছেলে-মেয়েদের গাঁয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যতোই তালিবানি হোক, এও একধরণের সোশ্যাল গার্জেনশিপ। তাই ঘাঁটাঘাঁটি নৈব নৈব চস্থানীয় খাপ পঞ্চায়েতের তরফে বলা হয়েছে, ভালোবেসে বিয়ে করাটা হিন্দি সিনেমার কু-প্রভাব। এই নোংরা প্রেমজ বিবাহ বরদাস্ত করা হবে না। পঞ্চায়েতের আইন অমান্য করে বিয়ে করলে সমাজে স্থান দেওয়া হবে না। মোবাইলে ফোনে কথা বলা নিষিদ্ধ করা নিয়ে যে যুক্তি পেশ করেছে পঞ্চায়েত তা এরকমঃ প্রেমজ বিয়ের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনের ভূমিকা থাকে। এই ফোনের সাহায্য নিয়ে অপহরণের ঘটনাও সংগঠিত করা হয়। এই মোবাইল ফোন দিয়েই ছেলেরা মেয়েদের উত্যক্ত করে। কমবয়েসি মেয়েরা যদি মোবাইল ব্যাবহার বন্ধ করে দেয় তাহলে ওই ভাবে উত্যক্ত করা সম্ভব হবে না। তরুণীরা একা একা বাজারে-হাটে গেলেও উত্যক্ত করার ঘটনা ঘটে। সেজন্যই একা বেরনো নিষেধ। চল্লিশ বছরের নিচে সকল মহিলাকে তাই মাথামুখ ঢেকে বাইরে বেরতে হবে।

             এভাবেই সমাজে সুস্থিরতা বজায় রাখতে শুধুমাত্র মেয়েদের ওপর চাপানো হয় কড়া আইন কানুন। এতে ফুটে উঠে পুরুষশাসিত সমাজের এক মালিকানাবোধ। শৈশব থেকে মেয়েরা দেখে যান যে তাদের ঘিরেই রয়েছে যতো সব নিয়ম কানুন। বলা না বলা, এক অদৃশ্য গণ্ডি। এটা বহাল থাকে স্কুলে, কলেজে, গেরস্তালিতে, কর্মক্ষেত্রে। সরাসরি না বলা হলেও মেয়েরা যেন ভোগ্যপণ্য। ভোগ করো এবং সুরক্ষা দাও। মালিকানা বিহীন স্বাধীন নারী আজ তাই নড়বড়ে পুরুষতন্ত্রের ত্রাস। সমান অধিকার চাইতে গেলেই আদর-অনুরাগ এবং ঘৃণার মধ্যে থাকা সরু লাইনটা উৎকটভাবে প্রকট হয়ে পড়ে।

স্যরি, বন্ধু হতে পারলাম নাঃ

            “আছেন বাৎস্যায়ন আর খাজুরাহো / ভাদ্র মাসের বেয়াড়া উৎসাহ, এমনসব বিষয় নিয়ে ভাবনাচিন্তা করে সময় কাটাতে ভালোবাসেএমন একজনের সঙ্গে কথা হল। তার মতে, বিশেষ ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিমণ্ডলে বড় হওয়াতে সে মজে আছে ঘেটো কমপ্লেক্সে উনিশকুড়ি-র এই যুবক খানিকটা মজার ছলে জানায়ঃ       আমি বা আমরা ঠিক কী চাই, তা স্বয়ং খোদাতাল্লার বুঝে ওঠার জো নেই। খুব সামান্য কটা দিন হল ইন্টারনেটের সঙ্গে দোস্তি পাকিয়েছি । সেই সূত্রেই ফ্লার্ট করার স্থূল মানসিক চাহিদা প্রশ্রয় পেয়েছে। কারণ কি শুধুই পুঁজিবাদি-সাম্রাজ্যবাদি প্রলোভন? আসলে মেয়েদের সঙ্গে ভালো করে বন্ধুত্ব করার সুযোগ হয়না অনেকেরই,মেয়েরা থাকে সেই মেয়েদের মতোই,লজ্জার শামুকখোলের নিচে। সমাজের কুশিক্ষা পেয়ে মেয়েদের দেখেছি-শিখেছি মেয়েদের মতো করেই,মানুষ হিসেবে দেখিনি। চারপেয়ে প্রাণী যাঁরা। ওদের বিয়ে দিতে হয়,নিজেদের (আমাদের) একখানা যোগাড় করতে হয় এবং তা ওই বিয়ের মাধ্যমেই। বিয়ের আগে বন্ধুমহলে রোয়াব দেখাতে কিংবা মনের সুড়সুড়ি মেটাতে সাময়িকভাবে একখানা প্রেম যোগাড় করতে হয়---বাজারচলতি মানসিকতার শিক্ষা এই। তবে, বিধিসম্মত সতর্কীকরন পালিয়ে বিয়ে করলে যৌতুক জোটে না!

            আশেপাশে মেরিকম,জ্বওয়ালা গুট্টু, সানিয়া মির্জা,নিদেনপক্ষে ডবল্যু ডবল্যু ই-র রগচটা মেয়েদের দেখিনি আশেপাশের জীবনে। কলতলায় জল নিতে আসা ঝগড়ুটে মাধবী আর বিকেলবেলা এন্ডিং লটারি,তীর খেলার রেজাল্ট মেলাতে আসা কুলসুমের মা কে দেখেছি, যাদের মেয়েমানুষ বলে গণ্য করেন না আমার লেখাপড়া জানা মা-মাসিরা। তাই ধারনা হয়েছে মেয়েমানুষ মানে নিতান্তই একধরনের কোমল-মিহি জীববিশেষ,যাদের কাজ হচ্ছে যৌবনে যুবকদের মনোরঞ্জন করা আর পরবর্তীকালে মা-মাসি হয়ে হেঁসেল ঠেলা। কো-অ্যাডুকেশন না হওয়ার সাইড এফেক্টও রয়ে গেছে। ছোটবেলাই সব ধারনা গড়ে ওঠে কি না ! সাধেই কি লোকে স্বীকার করে যে নারীর মন বোঝা হল না ! আপনারা বলবেন বোন-দিদি ওরা গেল কই? আরে কন্যা সন্তান জন্মাবার পরেই মা-বাবার গবেষনা শুরু হয় মেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে,মেয়ে কালো-না ফর্সা? বিয়ের টাকা জমানোর জন্য দুতিনটে ইন্স্যুরেন্সের কিস্তি দেওয়া আরম্ভ। রাখঢাক না রাখা অভিবাবক আগেই শুনিয়ে রাখেন,এই মেয়ে ফর্সা,ভালোয় বিক্কিরি হবে! (খাঁদা নাক,কালো রঙ হলে সমস্যা আছে)। রান্নাবাটি আর পুতুল নিয়ে খেলতে খেলতে বালিকারাও জেনে যায় তাদের সাফসুতরো থাকতে হবে। লম্বা চুল রাখতে হবে,ঠোঁটে-নখে রঙ লাগাতে হবে। ছোটবেলার বান্ধবী হঠাত একদিন আর ফুটবল-ক্রিকেট খেলতে আসে না। জবরদস্তি রুটি বেলা,ভাতের ফ্যান গালা (মধ্যবিত্ত বাড়িতে) শেখানো হয়। উচ্চবিত্তের দিকে তাকিয়েও হতাশপি এইচ ডি করা ডঃ বেগম অমুক,হিজাব ধারন করেন ! শুকুর আলহামদুলিল্লাহ । তখন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে যাবার কথা উঠলে বান্ধবীদের না বলেন আর মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দেন এই ভেবে যেঃ  দুনিয়াবি আমোদ-আহ্লাদ ইহুদি-নাছারাদের জন্য,আমাদের জন্য আল্লাহ বেহেস্তে রেখেছেন বেশুমার বিনোদন। হ্যাঁ,তখন জোকার নায়ক মাথায় বাসা করেন বলে নিজেকে বিপ্লবী মনে হয়।
              অজানা পুরুষ ধর্ষক-সম, তাই মেশামেশি নৈব নৈব চ। অতএব দুরত্ব বাড়ে। এই দূরত্ব থেকেই বোধহয় পুরুষদের পিশাচ মনে হয়। আর পুরুষরা ওদের খাদ্য হিসেবে দেখতে শুরু করে
পরম্পরাগত নীতি-নিয়ম, মূল্যবোধ, আধ্যাত্মিক চেতনার সঙ্গে আজকের আমেরিকান পাই-ম্যাকডোনাল্ড সংস্কৃতির ঠোকাঠুকি শুরু হয়েছে। ঘাত প্রতিঘাতে বিদ্যমান থাকছে মহান হেগেলীয় দ্বন্দ।

সাহায্য করুন নয়তো জীবনটা শেষ করে দিতে দিন

            সোনালী মুখার্জির সরকারের প্রতি আবেদন মন খারাপ করে দিয়েছে। দোষীরা আজও সাজা পায়নি। বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা। টিভিতে খবরটা দেখানোর পরই মেজাজটা বিগড়ে গেল। ভাবতে গেলে করিমগঞ্জ-গুয়াহাটি-বাগপথ সবই যেন একসূত্রে গাঁথা। এই প্রসঙ্গে উঠে এসেছে উপমহাদেশে অ্যাসিড ছোঁড়ার ঘৃণ্য প্রবণতার বিষয়টি, সোনালী এই বর্বরতার শিকারবিতর্কিত নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিন নো কান্ট্রি ফর উইম্যান বা নারীর কোনও দেশ নেই শীর্ষক ব্লগের সাম্প্রতিক পোস্টে লিখেছেন, আমাদের জখম করা বা চেহারা-ছবি বিকৃত করার উদ্দেশ্যে পুরুষরা আমাদের উপর অ্যাসিড ছোঁড়েতারা আমাদের গায়ে অ্যাসিড ফেলে, চোখ জ্বালিয়ে দেয়, নাক থ্যাঁতলে দেয়, চোখ গলিয়ে দেয়, এবং সুখি মানুষের মতো চলে যায়। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, আফগানিস্তান, নেপাল, কম্বোডিয়া এবং অন্যান্য কয়েকটি দেশে এমন অ্যাসিড হামলার ঘটনা সচরাচর ঘটে। নির্যাতনের প্রতিবাদ করায়, যৌন হেনস্তায় সায় না দেওয়ায়, বিয়ের প্রস্তাব, যৌতুকের দাবিতে, স্কুলে যাওয়া নিয়ে, বোর্খা না পরায়, হিজাব না রাখায়, ভালো আচরণ না করায়, খুব বেশি আপন মনোভাব ব্যক্ত করায় কিংবা শুধুমাত্র নির্ভেজাল আনন্দের জন্য ক্ষিপ্ত পুরুষরা আমাদের উপর অ্যাসিড ছোঁড়ে।
              ঝাড়খণ্ডের ধানবাদে বছর আঠারোর কলেজ পড়ুয়ার ওপর তিনজন প্রতিবেশী দুবছরেরও বেশি সময় ধরে যৌন হয়রানি করে, এবং পরে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারে। ওর মাথার খুলি, চেহারা, গলা, বুক এবং পিঠের চামড়া গলে গিয়েছিল। ধানবাদ উইম্যান্স কলেজের সোসিওলোজি অনার্সের প্রাক্তন ছাত্রী এবং এনসিসির সিনিয়র সার্জেন্ট সোনালী মুখার্জি, আজ সম্পূর্ন অন্ধ এবং আংশিকভাবে বধির। ওর বাবা লাখ লাখ টাকা খরচ করেছেন মেয়ের চিকিৎসায়। ওদের কাছে এখন আর টাকা নেই। হামলাকারীরা হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে চলেছে। ওই হামলার নয় বছর পরও সুবিচার মেলেনি। এবার তিনি সরকারের কাছে সাহায্য দেওয়া হোক, নয়তো তাকে মরে যেতে দেওয়া হোক ’—এমন অনুরোধ রেখেছেন। কম্বোডিয়াতে এক অ্যাসিড হামলায় সক্রেউন মিন পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যান। তার মুখমণ্ডল সহ শরীরের উর্ধাংশ বিকৃত হয়ে যায়জার্মান সাংবাদিক এবং ফটোগ্রাফার কার্স্টেন স্টর্মার জানান, অ্যাসিড আক্রান্তরা তাদের চেহারা-ছবি এবং দৃষ্টিশক্তি ছাড়াও অনেক কিছু হারিয়ে বসেন। পরিবার ভেঙ্গে যায়। স্বামীরা পত্নীদের ত্যাগ করে। শিশুরা তাদের মা-বাবার থেকে আলাদা হয়ে পড়ে। রাতারাতি চাকরি চলে যায়, পেশাদাররা পরিণত হয় ভিখিরিতে। অনেক আক্রান্তদেরই ক্রমাগত অন্যের সাহায্য ছাড়া একটা দিনও গুজরান করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। যার দরুন তারা পরিবারের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ান।...  কাউকে সারাজীবনের জন্য কষ্ট-ভোগান্তি দেওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ হচ্ছে ব্যাটারি অ্যাসিড । রাস্তার পাশে যে কোনও দোকানে এক ডলারে লিটারের সামান্য বেশি অ্যাসিড অনায়াসে মেলে। কদাচিৎ-ই দোষীদের শাস্তি হয়। নিজের স্বামীর হাতেই হামলার শিকার হন পাক মহিলা ফখরা ইউনুস। স্বামী বিলাল খার পঞ্জাব বিধানসভার প্রাক্তন সদস্য এবং পাকিস্তানি রাজনীতিক গোলাম মোস্তাফা খারের পুত্র। দুজনের মধ্যে বিচ্ছেদ হওয়ার পরই বিলাল স্ত্রীর মুখে অ্যাসিড ছোড়ে। মাই ফিউডাল লর্ড বইয়ের লেখিকা এবং বিলালের এককালের সৎ মা তেহমিনা দুরানি ফাখরাকে সারিয়ে তোলার অনেক চেষ্টা করেন। ফাখরাকে সাহায্যের জন্য ইতালিতে পাঠানো হয়। উনচল্লিশটি পুনর্সংস্থাপনা মূলক সার্জারির পর ফাখরা আত্মহত্যা করেন।
গোটা পৃথিবী জুড়ে এমন ঘটনার অভাব নেই। পারিবারিক কলহ, যৌতুক, কন্যা সন্তানের প্রতি বিদ্বেষ, প্রেমে সাড়া না দেওয়া, ইভ টিজিং-এর প্রতিবাদ---প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে অ্যাসিড ছুঁড়ে। সামাজিক সুশিক্ষাই পারে এই বর্বরতার প্রাথমিক বিকাশকে রুখে দিতে। চাই কড়া আইন। নারী-পুরুষে সমানাধিকার, বিশ্বাস, সহানুভূতি এবং সবচেয়ে বড় ব্যাপার বন্ধুত্বের শক্ত বাঁধন।
                   সংবিধান প্রদত্ত সমানাধিকার স্থাপিত করতে, একে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের সবাইকেই মুখ খুলতে হবে। লিঙ্গ বৈষম্যের সাপকে ফণা তোলার আগেই থ্যাঁতলে দিতে হবে। করিমগঞ্জের ঘটনায় বরাক উপত্যকা প্রতিবাদ-মুখর হয়েছে। জি এস রোডের সেই নির্মম রাতের পর গোটা দেশে বিরাট প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। চর্চার বিষয় অনেক , ওই গুন্ডা-লোফারদের পশুও বলা যায় না। সুবিচার দিতেই হবে। বৈঠকখানার বিনোদনে ন্যায্য ভাগ বসিয়েছে ঘৃনা-প্রতিবাদতীব্র প্রতিক্রিয়ায় ফেটে পড়েছেন সমাজকর্মীরা। উই ওয়ান্ট জাস্টিস শ্লোগানে রাজধানী কাঁপালেন কালো পোশাক পরা বিরাট সংখ্যক ফেসবুক ফ্রেন্ডরা। আমাদের মনুষ্যত্ব সত্যিই ন্যায়ের পথ খুলে দিয়ে সমানাধিকার স্থাপনের ক্ষমতা রাখে। তবে এখনো অনেক বন্ধুর পথ হাঁটার বাকি।   

                                                      (সোমবার ১৬ জুলাই ২০১২)



ফিরে দেখা...



             সংখ্য ছোটো ছোটো মশার প্রেকটিক্যাল চলছিল, লাশকাটা ঘরে একা আমি। পায়ের দিকে অস্বাভাবিক মনোযোগ আর ট্রায়াল অ্যান্ড এরর মেথড লাশটাকে খাড়া করতে যথেষ্ট ছিল। আর তখনি ভুত কিংবা উলঙ্গ পাগল দেখলে দৌড়াদৌড়ি আর ঢিল মেরে খোঁচাবার আদিম প্রয়াসে মেতে উঠলো সারা তামিল মশারা। লক্ষণীয় যে এদের গানের সুর হুবহু আমাদের সিলেটী স্বজাতিদের মতই। আমি নৈরিতে ক্ষেপে গেলে ঈশান, অগ্নি, বায়ু থেকে ত্রিমুখী হামলা, আর বসলে মুখ ভেংচিয়ে অট্টহাসির সাথে মুখের তওয়াফ। মনে হল ওদের দলবদ্ধ আক্রমণের নির্দিষ্ট কোন উদ্দেশ্য নেই বা এখন ও আসেনি ওদের কাছে, তাই “যত পারো খেপিয়ে তোল শ্যালাকে” মন্ত্রে দীক্ষিত ওই তরুন হামলা বাজদের হামলায় করুন হয়ে বসে বসে ভাবছি সেহরির কথা।

নাম না জানা বাইং মাছের মত এক জাতিও তামিল মাছ দিয়ে ফরাশি বিচির ঝোল বানাবো বলে আড়াইটার অ্যালার্ম লাগিয়ে শুয়েছিলাম ক্লান্ত চোখে ঘুমের কুঁড়ি নিয়ে, কলি হয়ে ফুল ফুটার আগেই সব ছারখার। ঘুম পালিয়েছে জানলা দিয়ে। এখন ও প্রায় তিন ঘণ্টা বাকি সেহরি শেষ হতে। 

এখানে সেহরির জন্য মসজিদ থেকে কেউ ডাকে না বা ডাকলেও শুনা যায় না আর শুনলেও কিছু বুঝা যাবে না। তাই ওই ডাকের অপেক্ষা বেশ যুক্তি সঙ্গত নয়। সময়ের গলা চেপে হত্যা করা তো আমার নিত্যদিনের কাজ, তাই এই কাজ টা না হয় আজ আরেক দিন হল, কি ক্ষতি? এক খুনের যে সাজা, সাত খুনের ও সেই সাজা। আর সময় কে হত্যা কর আর কাজে লাগাও, কথা তো এক ই, সময় চলে যায়, বেঁধে রাখা যায় না। আমি কত ভালবেশেছি ওই সময়কে, কিন্তু কই সে তো আমায় পাত্তাই দিল না। আমাকে কখনও বলে ও নি যে ও চলে যাবে। নইলে সব শক্তি দিয়ে বেঁধে রাখার চেষ্টা করতাম সেই সেহরি করার দিন গুলো কে। 

                শীতকালের রোজা, ভোর তিনটে থেকে আমার এক নানার মসজিদে মধুর সুরের গজল আর অতি সাহিত্যিক ভঙ্গীতে গ্রামবাসীকে ডাকার সেই মধুর স্মৃতি এখনও মন কে নাড়া দেয়। “বাজিলো কি রে ভোরের ও সানাই, নীদ মহলার আঁধার ও রাতে...” গান টা শুনলেই ওই নানার কথা মনে পড়ে। তখন রোজা রাখার খুব শখ ছিল, যদি ও ফর্য হয় নি তখন ও। সেহরিতে সবার সাথে উঠে ঠাণ্ডার মধ্যে সেহরি খাওয়ার মজা টাই ছিল অন্যরকম। বাড়ির সব ঘরে আলো জ্বলছে মধ্যরাতে, কুয়াশা আর ঝির ঝির বাতাসে টুং টাং বাসনের আওয়াজ, টুকটাক বার্তালাপ আর মসজিদ থেকে কখনও সেই নানা বা ইমাম সাহেবের মধুর সুরের গজলে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে রইতাম। সেহরি শেষে ফজরের নামাজে আমার প্রিয় বন্ধুকে দেখে আরও উৎফুল্ল হতাম। নামাজ শেষে সবাই যখন ঘরমুখি, আমরা তখন ঠাণ্ডার মধ্যে দাড়িয়ে বা বসে গল্পে মেতে উঠতাম। কত যে গল্প হতো... তারাবিহির নামাজে মানুষের দলবদ্ধ যাত্রা তো সত্যিই কাব্যিক লাগতো আমার কাছে। ইফতার পর্ব শেষ করে আরও কিছু সময় পর ছাঁদে গিয়ে বসে থাকতাম গ্রামের লোকদের তারাবিহিতে আসা দেখতে। বয়স্ক আর কচি কাঁচার ছোটো ছোটো দল নানান গল্পে মেতে মেতে বাড়ির সামনে দিয়ে যেত। আমাদের ঘরের সামনেই এক উঠোন আর তারপর মসজিদে যাওয়ার পথ, আর তারপরেই পুকুর। পুকুরপাড়ে আরও কিছু গাছের সাথে একটা নারকেল গাছ আর ওই নারকেল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে দূর আকাশে আমার এক প্রেয়সী পূর্ণিমার চাঁদ। যেন এক স্বপ্নিল যাত্রার লাইভ টেলিকাস্ট দেখতাম। বয়স্ক লোকেরা চাঁদর মুড়ি দিয়ে পান খেতে খেতে যেত আরা ছোটদের দল আগামীকালের ক্রিকেট ম্যাচের পরিকল্পনায় মশগুল থাকতো। আমাদের ওই সামনের উঠোন টা ও ছিল গ্রামের কয়েকটা মাঠের একটা। সবাই ঘুমিয়ে থাকতো বলে সকালে নাগাড়ে প্রায় চার/পাচ টা ম্যাচ হয়ে যেত। যাইহোক, ওই সব দেখে আমি যখন মসজিদে পৌঁছতাম তখন নামাজ প্রায় শুরু ই হয়ে যেত। আমরা ছোটো ছিলাম তাই পেছনের সারিতে থাকতাম। আমার বয়সি যদি ও আরও অনেক ছিল কিন্ত আমি সবার সাথে বেশ মিশতে পারতাম না, তাই আমি মনে মনে আমার সেই বন্ধুকে খুঁজতাম আর দেখা পেলে দুজনেই মুচকি হাসি দিয়ে জায়গা বদল করে একসাথে থাকতাম। সবচেয়ে বেশি মজা হতো ইমাম সাহেবদের টিফিন পেলে, খুলে দেখতাম কি কি আছে, আর সুবিধা হলে খুলে নিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগ করতাম, সে ছিল ইফতার শেষের বেঁচে যাওয়া জিলেপি, খেজুর আর ডালের বড়া। আমাদের থেকে ছোটো কেউ হাঁ করে তাকিয়ে থাকলে চোখ রাঙাতাম আর তারপর ভদ্র ছেলের মত আবার নামজে যোগ দিতাম। নামাজ শেষে এক মায়াবি জোছনায় সারা মসজিদ প্রাঙ্গন এক অপরূপ রূপ নিত, দূর আকাশের ওই ছাঁদে দেখা চাঁদ এখানেও যেন আমার চোখাচোখির অপেক্ষায়। আমি উন্মুক্ত প্রাঙ্গনে সবার মাথার উপর দিয়ে বাশ ঝাড় আর সুপারি গাছের ফাঁকে ফাঁকে সেই চাঁদের সাথে চোখ মেলাতাম আর চাঁদ টা ও যেন আমার চাহনিতে মুগ্ধ হয়ে আরও আলো ছড়াত চারিদিকে। চোখাচোখি পর্ব শেষে যখন নিচে ফিরতাম, দেখতাম ৫/৬ জনের ছোটো ছোটো বিভিন্ন বয়সি দল বিছিন্ন ভাবে আলাপ আলোচনায় মশগুল। গ্রামের সবার এক মিলনভুমিতে পরিণত হওয়া সেই মসজিদ প্রাঙ্গন, যেখানে একে অন্যের খবরাখবর নিচ্ছে আর শীতের রাতের এক বেহেশতই হিমেল হাওয়া সবাইকে যেন পবিত্র করে তুলছে। 

                          এখন সেই বয়স্কদের দলের প্রায় কেউ ই নেই, সবাই কবরবাসি, কচিকাচার দল গুলো বেশ বড় হয়ে গেছে। আমি আমার সেই বন্ধুকে ফোনে প্রায় ই জিজ্ঞেস করি এখনকার রোজা, তেরাবিহির কথা। ও দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ে, বলে “নেই রে, আগের মত কিছুই নেই, সব বদলে গেছে, এখন আর সেই দল বেঁধে মসজিদে আসা নেই, নেই সেই মিষ্টি কথোপকথন, সব্বাই ব্যস্ত এখন। কারুর ই সময় নেই, মানুষ গুলো সব কেমন যান্ত্রিক হয়ে গেছে, শুধু ওই চাঁদটা মাঝে মাঝে খুঁজে বেড়ায় কিছু চেনা মুখ আর না পেলে মেঘের আড়ালে মুখ লুকায়”। 

২৯ জুলাই, ২০১২



সোমবার, ২৩ জুলাই, ২০১২

কুশীলব



সে প্রায় পনেরো কুঁড়ি বছর আগের কথা। আমরা তিন ভাই বোন, আমি, পপি আর তপু। বিনোদন বলতে বড় চাচার ঘরের টিভি তে বাংলা নাটক আর মাঝে মাঝে সিনেমা। বেশি ঝোঁক টা ছিল নাটকের প্রতি। ও হ্যাঁ, বলা হয়নি, টিভি বলতে “বিটিভি” বাংলাদেশ টেলিভিশন। যেহেতু তখন এপারে “ডি ডি ওয়ান” ছাড়া আর কিছুই ছিল না তখন আর অপারে “বিটিভি”, আর আমাদের বাড়িটা ও একদম কুশিয়ারার কাছাকাছি, তাই টিভি খুললেই বিটিভির পর্দা টা আসতো সুন্দর ঝকঝকে, “ডি ডি ওয়ান” টা ছিল একটু ঝাপসা। আর সেই হেতু আমাদের প্রথম টিভি ই ছিল বিটিভি। 

“এক সাগর ও রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলব না...” গানটার সুরে যখন “রাত আট টার বাংলা সংবাদ” শুরু হতো তখন সবার ই অপেক্ষা থাকতো কবে খবর শেষ হবে আর আমদের প্রিয় নাটক শুরু হবে। ততক্ষনে যার যার পছন্দের জায়গা বেছে নিয়ে আমরা বসে আছি। দর্শক বলতে আমরা তিনজন, বড় চাচার তিন মেয়ে, খালাম্মা আর মাঝে মাঝে আমদের আব্বা ও মা। খবরের মাঝখানে আমরা টিভির বিজ্ঞাপন গুলো নিয়ে আলচনা করতাম, কার কোন টা ভালো লাগে। “বউরানি প্রিন্ট শাড়ির” ঘরের খবর পরে জানলো কেমনে, এই যে এমনে, কিংবা “রূপসা রূপসা রূপসা, নরম নরম হাওয়াই চপ্পল রূপসা” আবার কখন ও “মাছের রাজা ইলিশ আর বাত্তির রাজা ফিলিপ্স” চিৎকারে যখন ঘর টা তুলে ধরতাম তখনি হটাত খালাম্মা বলে উঠতেন ঐ দেখ “পানি এ কিতা করসে” আর আমরা হা করে তাকিয়ে দেখতাম বন্যার জলে টাইটুম্বুর বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। সেই নাম গুলো এখন ও আমার কানে বাজে, গাজিপুর, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, চাপাই নবাবগঞ্জ, মীরপুর, মাদারিপুর, ফেনী, ভোলা, কিশরগঞ্জ, ময়মনশিঙ এর অনেক গ্রাম জলে প্লাবিত। লোকগুলো কাঁথা, বালিশ, কলসি, আর বেতের তৈরি ঝুড়ি তে মোরগ ছানা ইত্যাদি নিয়ে ভেলায় চেপে যাচ্ছে, করুন মুখ হা করে তাকিয়ে আছে কেমেরার পানে। বন্যায় ওদের দুর্গতি আমার একটু ও খারাপ লাগতো না, আমার খুব ই ভালো লাগতো, আমি ও হা করে তাকিয়ে থাকতাম টিভির পানে। কলকল বেয়ে চলত নৌকো, আর আমি ও ডুব দিতাম স্বপ্নে, ইশ আমি ও যদি এরকম নৌকোয় থাকতাম। 

ত্রান বণ্টন এর খবর সহ আরও কিছু খবরের পর যখন দেখতাম আবাহনী আর ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং এর গোলের খবর দিতে দিতে “আগামি চব্বিশ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাষ” শুরু হয়ে গেছে, তখন বসা টাকে আরেক টু যুত করে নিতাম আর খেয়াল রাখতাম যাতে বাকিদের স্বর টা একটু নিচে নেমে আসে। কারুর জল তেষ্টা বা অন্য কিছু পেলে এক দৌড়ে গিয়ে সেরে আসতাম। খবর শেষ হওয়ার পর দু একটা বিজ্ঞাপনের পর ই এক হাস্যজ্জল রমণী ঘোষণা দিতেন একটু পরেই দেখবেন ধারাবাহিক নাটক...কিংবা ইদ উপলক্ষে বিশেষ নাটক...। বোনেরা ঐ রমনীর সাজগোজ নিয়ে একটু আধটু আলোচনা সেরে নিত ঐ ফাঁকে, যেখানে আমার আর তপুর একটু ও কনট্রিবিউশন থাকতো না। মনে মনে ভাবতাম ঐ মহিলা বোধ হয় শুধু আমাদেরকেই নাটক দেখার মিষ্টি নিমন্ত্রন টা দিয়ে গেলেন। 

এবার শুরু, সব চুপচাপ বসে আছি। এক এক করে অভিনেতা-নেত্রিদের নাম দিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা গড় গড় করে সব নাম পড়ে যাচ্ছি। ওরা যেন আমাদের চির পরিচিত আপনজন। আবুল হায়াতের নাম আসতেই সবাই বলে উঠতাম “কাশেম আলি”, ওই নাম দিয়েই যে আমাদের কে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এক বিশাল নাট্য শিল্পীর, নাট্যকার হুমায়ুন আহমদ। তারপর একে একে বাকি নাম গুলো আসতো...আসাদুজ্জামান নুর (আনিস ভাই/ বাকের ভাই), হুমায়ুন ফরিদি (কান কাটা রমজান), জাহিদ হাসান, আজিজুল হাকিম, টনি ডায়েস, পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়...ফেরদৌসি মজুমদার (হুরমতি),সুবর্ণা মোস্তফা, শমি কায়সার, বিপাশা হায়াত, তারানা হালিম, বিজরী বকতুল্লাহ, আরও অনেক। সব্বার সাথে যেন আমাদের রক্তের পরিচয়। আমাদের পরিচিত সব শিল্পীদের দেখে আমাদের ও খুশির সীমা নাই, সবার ই মুখে মুচকি হাসি। কিন্তু একটা নাম আমাদের কারুর ই জানা ছিল না, প্রতিটা নাটকের প্রথমেই আসতো নামটা, কুশীলব। আমারা নিজের নিজের মত করে খুঁজে বেড়াতাম, কার নামটা হতে পারে কুশীলব? এক এক করে প্রায় সব্বাইকে ই তো চিনি, তবে এই কুশীলব টা কে? উত্তর আমরা কেউ ই পেতাম না, আর ভাবতাম হতে পারে কেউ একজন কুশীলব, যিনি প্রায় সব নাটকেই অভিনয় করেন। তারপর একদিন আব্বা কথাটা শুনতে পেরে বললেন, কুশীলব হচ্ছে, যারা যারা আভিনয়ে আছেন তাদেরকে কুশীলব বলা হয়। আর এক মহা উল্লাসে বোকার মত আমারা সবাই সেই অজানা চরিত্রটাকে চিরদিনের জন্য বিদায় দিলাম। 

এরকমই হাসির স্রোতেই কেটে গেল জীবনের সেই সোনালি দিনগুলো। কত নাটক দেখা হল, অয়ময়, সংসপ্তক, বহুব্রীহি, কথাও কেউ নেই, স্বপ্নের শহর, আজ রবিবার, আরও কত নাটক, ইদ উপলক্ষে বিশেষ নাটক।। নাটকগুলোর ডায়লগ ও মনে থাকতো অনেক কাল, এখন ও আছে কিছু কিছু। “সে এক বিরাট ইতিহাস”, কিংবা “আমি হইলাম নেত্রকোনার পোলা, থুথু রে কই ছেপ” এবং এমন অনেক যা এখন ও ভীষণ ভাবে মনে পড়ে। 
এই তো সেদিন, ২০১০ এর প্রথম দিকে যখন ল্যাপটপ টা কিনলাম, ইউ টিউব এ গিয়েই সেই নাটক গুলোর নাম স্মরণ করে করে খুঁজতাম, দেখে আনন্দ হতো, বাড়িতে ফোন করে বলতাম, মা বলতেন তোর এখন ও মনে আছে? তারপর বোনের সাথে শেয়ার করতাম নাটক গুলোর টুকরো টুকরো ঘটনা...

আজ আমার সেই বোন টি ও নেই। আর ওই অবিস্মরণীয় নাটক গুলোর রচয়িতা সেই হুমায়ুন আহমদ ও নেই।

২৩ জুলাই, ২০১২;              (C) Picture:ছবি



শুক্রবার, ২০ জুলাই, ২০১২

রক্তস্নাত একুশে জুলাই


         ২১শে জুলাই, ১৯৮৬ সকালে বাবা আর আমি খেতে বসেছি । মেনু – কাঁচকলা আর আলু সেদ্ধ ভাতবাবার খুব তাড়া, সার্কিট হাউসে যেতে হবে । কারণ জিজ্ঞাসা করতেই  বাবা গম্ভীর হয়ে একটি কথাই বললেন – “ভাষা আন্দোলন” হঠাৎ বাবার বিষম উঠলো । ভালো করে খাওয়া হয়ে উঠলোনাএর স্বল্পক্ষণ পর কয়েকবার গুলিচালনার শব্দ শুনতে পেলাম ।  বাবাকে বলতেই ব্যাপারটা তিনি পাশ কাটিয়ে বললেন যে পটকার শব্দ হতে পারে । বাবা আঁচ করতে পেরেছিলেন যে হয়তো কিছু ঘটতে চলেছে । তাড়াহুড়োর মধ্যেই তিনি বেরিয়ে গেলেন তারপর দু’ দু’টো রাত কেটে গেল, বাবার কোন খবর নেই ।


     ক্লাস ফাইভের ছাত্র হিসেবে করিমগঞ্জের নীলমনি উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সদ্য ইংরেজী শিখতে শুরু করেছিবাংলা ভাষার পাশাপাশি আরো দু’টি ভাষা হিন্দি আর ইংরেজী শিখতে পারবো বলে কত আনন্দ । বাবার মুখেই শুনতাম বিদেশে যেতে হলে অনেক ভাষা জানতে হয় । কারণ ভাষা শেখার বিকল্প নেই । “ভাষা আন্দোলন” শব্দটা আমার কাছে কেমন জানি বাঁধো ঠেকলো ! ভাষার জন্য আবার আন্দোলন করতে হয় না কি ? এখানে  তো সবাই দিব্যি বাংলা বলছে২১শে জুলাই-এর রাতে মা এর মুখেই শুনতে পেলাম বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এই আন্দোলনে দু’দুটো তাজা প্রাণ শহিদ হয়েছে, আর আহতের সংখ্যা অগনিত । কার্ফ্যু হয়ে যাওয়ায় পর বাবার কোন খবর পাওয়া যাচ্ছিলনা । বাবাও কি তবে ...আমরা কেউ ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতেই পারছিলাম না । পরদিনও সারাক্ষণ উৎকন্ঠায় কাটলো । একদিকে সেনার ফ্ল্যাগ মার্চ আর অপরদিকে পুলিশের ঘন ঘন টহল, পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছিল । ২৩ শে জুলাই সকাল বেলা খবর পেলাম যে বাবা সিভিল হাসপাতালে রয়েছেন । এক ঘন্টার জন্য কার্ফ্যু উঠার পর তড়িঘড়ি মা আর দিদি হাসপাতালে বাবাকে আহত অবস্থায় দেখে এলেন
     ভাষা আন্দোলনের অতীত যে অনেক পুরানো তা পরে জেনেছিলাম ১৯৬০ সালে আসাম রাজ্যভাষা আইন চালু হওয়ার পর থেকেই বরাক উপত্যকার বাংলাভাষীদের উপরে অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে সামিল হয় মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহার সরকার । এর ফলস্বরূপ ১৯৬১ এর ১৯শে মে-এর  ভাষা আন্দোলনে শিলচরে পুলিশের গুলিতে এগারো শহিদের রক্তে রাঙ্গা হয়ে উঠে শিলচর রেলস্টেশন চত্বর । চালিহা সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়কিন্তু চক্রান্ত চলতেই থাকে । ১৯৭২ সালে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় একটি চরম সিদ্ধান্ত নেন যে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম হবে একমাত্র অসমীয়া ভাষাতদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী শরৎচন্দ্র সিংহ ও ঝোপ বোঝে কোপ মারলেন । উনার মন্ত্রীসভাও ১৯৭২ সালে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো যে মাধ্যমিক পর্যায়ে অনসমীয়া ছাত্রছাত্রীদের জন্য অসমীয়া ভাষা বাধ্যতামূলক করা হবে ।  এই সিদ্ধান্তের বিরূদ্ধে বরাকে আবার আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠলো অবশেষে সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়, আর অনির্দিষ্ট কালের জন্য গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অসমীয়া ভাষাকে একমাত্র মাধ্যম করার প্রস্তাবটি স্তগিত রাখা হয় এবং সঙ্গে ভাষা সার্কুলারটিও । ১৯৮৫ এর ডিসেম্বর মাসে প্রফুল্ল কুমার মহন্ত ক্ষমতায় বসেই ভাষা সার্কুলারের “মাইন” আবার নুতন করে পুঁতবার প্রস্তুতি শুরু করলেন । দিসপুর থেকে বরাক উপত্যকায় নির্দেশ আসলো অসমীয়া ভাষা এখন থেকে বাধ্যতামূলক হবেআবারও গর্জে উঠার পালা এই উপত্যকার অবহেলিত মানুষদের । ১৯৮৬ সালের ২১শে জুলাই মুখ্যমন্ত্রীর করিমগঞ্জ সফরে ভাষা সার্কুলারের বিরূদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দেওয়ার জন্য শতশত মানুষ সামিল হলেন ভাষা আন্দোলনে ।
২১শে জুলাই, ১৯৮৬ সকাল ন’টা । তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লকুমার মহন্তের হেলিকপ্টার করিমগঞ্জ শহরের অদূরে মাইজডিহিতে অবস্থিত সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হ্যালিপেডে এসে নামলো । সার্কিট হাউসের সামনে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় আসার পর দেখা গেল কালো পতাকা নিয়ে অগনিত মানুষের জটলা । জেলা প্রশাসনের মদতে জনতার ভিড় ঠেলে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় সার্কিট হাউসের দিকে চলে গেল । ততক্ষণে আন্দোলনকারীদের  পালে হাওয়া লেগেছে । ‘অগপ সরকার মূর্দাবাদ’, ‘প্রফুল্ল কুমার মহন্ত মূর্দাবাদ’ ধ্বনিতে কেঁপে উঠলো সার্কিট হাউসের আশপাশ । উত্তপ্ত হয়ে উঠলো আন্দোলনের পরিবেশ । এরই মধ্যে পুলিশের কাজ শুরু হয়ে গেল । ‘কেলা বঙালি’ বলেই আন্দোলনকারীদের উপর লাঠি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো আসাম পুলিশের বর্বর ব্যাটেলিয়ান । সার্কিট হাউসের বারান্দায় এসে মুখ্যমন্ত্রী মহন্ত পর্যবেক্ষণ করে গেলেন তার সরকারী বাহিনীর দাপট । এদিকে পুলিশের লাঠিচার্জে বিক্ষোভকারীরা বেসামাল হয়ে পি ডবলিউ ডি অফিসের সামনে জমায়েত হতে লাগলেন । এর অল্পকিছুক্ষণ পর মুখ্যমন্ত্রী মহন্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়ে আন্দোলনকারীদের পাত্তা না দিয়ে নিমিষে বেরিয়ে যান পরবর্তী গন্থব্যস্থল ফকিরাবাজারের দিকে । নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের মধ্যে কেউ কেউ পুলিশের দিকে ঢিল ছোঁড়তে শুরু করে । ব্যস – তারপর অগ্নিশর্মা পুলিশের দল গুলি চালনা শুরু করে দেয় । সময় তখন সকাল ন’টা পঞ্চান্ন । বুলেটের ছোবলে জগন্ময় দেব (জগন) আর দিব্যেন্দু দাস (যীশু) লুটিয়ে পড়লেন পি ডবলিউ ডি অফিসের সামনে । শহিদের রক্তে করিমগঞ্জের মাটি পবিত্র হয়ে উঠলো । আহত মানুষদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠলো । 
‘প্রতিক্ষণ’ ম্যাগাজিনের (১৭ আগষ্ট, ১৯৮৬) রিপোর্টের একটি অংশ ।

“ঘর থেকে বের হবার পর আমি খবর পেলাম পুলিশের লাঠি চার্জ আর ফায়ারিং-এ শহরের পরিস্থিতি থমথমে রেডক্রস আর সরকারি হাসপাতালে আহতদের ভিড় । তাই হাসপাতালে ছুটে গেলাম আহত আন্দোলনকারীদের সাহায্যে সুপারিন্টেনডেন্টের ঘরে যখন আহত মানুষদের খবর নিচ্ছি তখন হাসপাতাল চত্বরে প্রবেশ করলেন করিমগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার মহন্ত । এসেই তিনি আমাকে দেখে বললেন ‘দুলাদা আপনাকে আমি গ্রেফতার করলাম । চলুন গাড়িতে ।’ হাসপাতালের সীমানা থেকে বের হবার আগেই মহন্তের সেনাবাহিনী আমার দিকে ছুটে আসলো, আর এলোপাথারি লাঠির আঘাত করতে লাগলো হাত দিয়ে আটকাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু গাড়িতে উঠার পর সেটা যেন বেড়ে গেল । বুটের লাথি আর লাঠির আঘাতে জর্জরিত এক বৃদ্ধকে ক্ষমা দেখাবার ন্যূনতম সৌজন্যবোধ দেখালো না আসাম পুলিশের বর্বর দল । পুলিশের গাড়িতে অন্যান্য আন্দোলনকারীদেরও একই অবস্থা । অবশেষে থানায় এনে আমাদের বস্তার মত ফেলে দেওয়া হল । অনেক অনুরোধের পর আমাদের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হল । ডান হাতটা ভীষণ ব্যথা করছিল । ভাবতেই পারিনি যে হাত ভেঙ্গে গেছে । হাসপাতালে আসার পর চশমা না থাকায় খুব অসুবিধে হচ্ছিল । চশমার কথা জনৈক অসমীয়া পুলিশকে বলতেই অশ্লীল গালি আমার দিকে ধেয়ে আসলো যাই হোক এক বাঙালি পুলিশ কর্মীর বদান্যতায় অবশেষে চশমাটি পেলাম ।” বক্তা আমার বাবা হিমাংশু শেখর দাস (দুলা)এই ঘটনার রোমন্থন অনেকবারই তিনি করেছেন । প্রতিবারই আমার মনে হতো নুতন ঘটনা শুনছি । কারফিউ উঠার পর রোজ হাসপাতালে বাবার ওখানে যেতাম আর শুনতাম নানা গল্প । পুলিশের অকথ্য অত্যাচারের গল্প তখন ঘরে ঘরে মা বোনদের আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছিল । অনেক নেতারাও বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন । এদের মধ্যে রথিন সেন, রণেন্দ্রমোহন দাস (দুলুবাবু), নৃপতি চৌধুরী, সুজিৎ চৌধুরী, লোপামুদ্রা চৌধুরী প্রমুখ । বর্তমান কংগ্রেস সরকারের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়ও সেসময় করিমগঞ্জ সফর করেন আর বাবার সঙ্গে আন্দোলন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয় । কলকাতার পাক্ষিক পত্রিকা “প্রতিক্ষণ” বিস্তারে ২১শে জুলাই এর ঘটনা নিয়ে ১৭ আগস্ট, ১৯৮৬ সালে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে । সেই সংখ্যার ম্যাগাজিনে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাবার একটি সচিত্র (চিত্রঃ ১) রিপোর্ট বের হয় যা বাবা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত একখানি কপি আগলে রেখে ছিলেন । বাবা ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী । বৃটিশের বিরূদ্ধে আন্দোলনের অনেক কথাই উনার মুখে শুনেছি । বাবা কখনো আক্ষেপ করে বলতেন যে স্বাধীন ভারতে এখন স্বদেশী ভাইদের বিরূদ্ধে ভাষার অধিকার নিয়েই লড়াই করতে হচ্ছে । বাবার অবশ্য এক আলাদা রাজনৈতিক পরিচয়ও ছিল প্রথম জীবনে তিনি জনসঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন । পরে যখন জনসঙ্ঘ বিভক্ত হয়ে ‘জনতা পার্টি’ আর ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ হয় তখন বাবা জনতা পার্টিতে যোগ দেন । দীর্ঘকাল তিনি জনতা পার্টি (পরে জনতা দল) এর সম্পাদক আর সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করেন । বাবা করিমগঞ্জ থানার ও সি মহন্ত এন্ড কোম্পানীর বিরূদ্ধে মামলাও করে ছিলেন । মহন্ত এবং আর এক পুলিশ অফিসার বদরুল হক লস্কর আমাদের বাড়িতে প্রায়ই এসে বাবাকে কেস তুলে নেবার জন্য কাতর অনুরোধ করতো । কিন্তু বাবা তাদের কথায় কর্ণপাত করেননি ।  অনেকদিন সেই মামলা চলার পর দেখা গেল শেষে সাক্ষী দেবার লোক নেই । মহন্তের চোখ রাঙ্গানিতে ওরা ভয় পেয়ে গিয়েছিল । কেসের গতি রুদ্ধ হয়ে গেল । সাক্ষী হিসেবে বাবা উনার সেদিনের পরিহিত রক্তরাঙ্গা কাপড়ও রেখেছিলেন । কিন্তু ২১শে জুলাইয়ের ভিলেনদের কোন বিচার হলনা !  সেই আক্ষেপ বাবা বাকী জীবন বয়ে গিয়েছিলেন         
২১শে জুলাই এর ঘটনা বাংলা ভাষার প্রতি আমার এক আলাদা তাগিদ সৃষ্টি করে । ১৯৬১ এর ভাষা আন্দোলনেও বাবা একজন সৈনিক ছিলেন । সেসময় করিমগঞ্জ রেলষ্টেশন চত্বরে পুলিশের লাঠির আঘাতে বাবার পা ভেঙ্গে যায় । “যুগান্তর” পত্রিকায় বাবার একখানি ফটো আর উনাকে নিয়ে একটি রিপোর্টও বেরিয়ে ছিল । পত্রিকার কাটিং রাখার এক বিচিত্র শখ ছিল বাবার । প্রচারবিমুখ বাবা উনার ফাইলে ১৯৬১ সালের ভাষা আন্দোলনের অনেক দুর্লভ কাটিং সংগ্রহ করে রেখেছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ আজ সেই সব আমার কাছে কিছুই নেইএই উপত্যকার প্রতিটি মানুষের বাংলা ভাষার প্রতি এক তাগিদ আসলে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করা । প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে বরাকের সর্বস্তরের মানুষই ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল । তাই ভাষা আন্দোলন নিয়ে যখন কোন আলোচনা হয় তখন প্রচারবিমুখ বাবার অবদানের জন্য  নিজেকে বড় গর্বিত মনে হয় ।



সোমবার, ৯ জুলাই, ২০১২

করবী মালা

কিছুক্ষণের মধ্যেই পটলচেরা চোখ ভয়ঙ্কর। কালো তুলসী চোখে গুঁজে শেষ যাত্রা।
সীতার অভিশাপে সংসারে নিষিদ্ধ ছিল তুলসীর প্রবেশ। ফল্গুর বুক আজও খালি। এতো নিষ্ঠুর হতে পারেন সীতা! রাম রাজত্বেও ছিল আত্মহত্যায় প্ররোচনা।

মানুষ অসম্ভব সুখী থাকলেই বেছে নেয় স্বপ্ন মৃত্যুকে। শুধু মাত্র সুখেই ব্যাথা পায়। নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করে শান্ত হয়, সুখ পায়। অথবা স্বপ্ন সম্ভব কোন প্রেম বা ঈশ্বর দেখে ভেবে নেয় নিজের মুক্তির পথ। আশ্রয় চায় সৃষ্টির কাছে, সুখের কাছে। 

মানুষ জানেনা আত্মহত্যার প্রথম এবং শেষ কারণ। কোন বিষে শরীরের মৃত্যু হলেও, আত্মা আশ্রয় চায় সুখের কাছেই। যেমন ভালবাসে মানুষ। প্রত্যাখাত হয়। আবার ভালবাসে। 

আত্মহত্যার পর নিহত শরীরের বুক চিরে লাশ কাটা ঘরে অনুসন্ধিৎসু চোখে হয়ত পেলেও পাওয়া যেতে পারে কোন সুখের কণা। আঁশটে পিঞ্জল  বিষের গন্ধ অথবা বিষক্রিয়ার কারণ ঐ একটাই, সুখ। কিন্তু মনের নিহত  হওয়ার কোন কারণ বা কোন হদিশ কেউ পায়নি কোনদিনই। প্রতিদিন কতবার যে মানুষ আত্মহত্যা করে!

পোস্টমর্টেম শেষে বর্ণালীর ভিসেরা টেস্টে পাওয়া যায় করবী ফলের কষ। কালো চুলে ছড়িয়ে ছিল হলুদ করবী ফুল। হৃদয় ছিল অক্ষত। এখনও লজ্জাবনত বুক নুইয়ে পড়েনি, আক্রোশে জমাট বেধেছে নীল শিরা উপশিরা। পাহাড়ের ভালবাসা আর বব ডিলানের বৃন্দগানের কলিতে এখনও নেচে ওঠে সমুদ্র। মেঘে ঢাকা যোনি পথ তেমনি নরম, কোমল আর অসম্ভব ঠান্ডা। ফল্গু নদীর মতো গভীর। নিহত শরীর এখনও উসকে দেয় অভিশাপগ্রস্ত  ইন্দ্রের সহস্র চোখ। কাঁচা হলুদ গায়ের রঙে গড়িয়ে পড়েছে অলস দুপুরের রোদ। ঠোঁটে সেই সিন্ধু সভ্যতার খনন।
আত্মহত্যার ঠিক আগে যেমনটা ছিল পৃথিবী এখনও ঠিক তেমনটাই আছে। শুধু চাঁদ আর সূর্যের অদল বদল হয়েছে।

পাড়াতুতো তপন'দা কোমরে গামছা বেঁধে আড়চোখে দেখে গেছে হলুদ শরীর। এরপর গামছাটা খুলে আবার ঠিকঠাক পরে নিয়েছে। এতেও কি মানে পৌরুষ! উচু হয়ে থাকে বিদ্ধস্ত বৌদ্ধ ঢিবি। ব্রাহ্মণ তেল মাখাতে গিয়ে বেশ কয়েকবার চাপ দিয়েছে নরম স্তনে। অন্য হাতে ছ্যাঁকা লাগে মোহন বিড়ির। তাতে কি! মাসি খুলে নিয়ে গেছে সোনার কানের দূল। প্রিয় নাকছাবিটা কিছুতেই ছাড়তে চায়না শরীর। মরার সাথে সোনা লাগে। তাই থেকেই গেল পরকালের জন্য। বোকা আকাশ অনেকদূরে বসে। পিঁপড়েদের খাওয়ার সন্ধান করে যাচ্ছে এখনও। একবারের জন্যও এমুখো হয়নি। পিঁপড়ের সারি পথ ধরেছে মধু তেলের সন্ধানে। আকাশ আজও দেখল না একবারের জন্যও বর্ণালীর নিটোল ঐশ্বর্যের চাবিকাঠি। সেই একইরকম নির্লিপ্ত চাহনি তার। অহং!
আমগাছের কাঠ, একশ গ্রাম চন্দন, আড়াইশ গ্রাম ধূপ আর টাল থেকে কেনা দেড়শ টাকার একটা সুতির কাপড়। কেউ হয়তো কাপড়টা মায়ের পুজায় ঘটের উপর দিয়েছিল। অন্তর্জলী যাত্রায় শেষ উপহার প্রিয় মানুষদের কাছে। কাঠ আর পাটশলা নিয়ে সাকুল্যে পাঁচশ কুড়ি টাকা। কাল রাতেও সাতশ টাকার বন্ধু পানীয় আকন্ঠ ঢেলে ঘুমিয়েছিল রাজা সেন। এতদিন একসাথে ঘর করেও তার স্বামী বুঝল না এই ক্যাটক্যাটে লাল রঙটা তার পছন্দ নয়! একটা গোলাপি শাড়ী আজ পেতেই পারতো বর্ণালী।
ধারে কাছে কোথাও মা নেই। জানেই না কিছু। সক্কাল থেকে কাঁচা দুধ নেই বলে রাগারাগি করছে। শিবপুজায় দুধ চাই প্রতিদিন। অম্বুবাচীর তিনদিন উপোস থাকবে জেদ ধরে হাসপাতাল বাড়ি করেছে সাত দিন। বাবা চলে যাওয়ার পর মা আজকাল কিচ্ছু বুঝতে চায়না।

বর্ণালীর এই আত্মহত্যা এই পৃথিবীতে কোন সতী পীঠের নির্মাণ করবেনা কোনদিনই। কোন বিশেষ প্রহরে কোন নদীর শরীরে বয়ে যাবে না কোন শরীর খারাপের স্রোত।
তবে আগুন জ্বলবে এবার আকাশে। সেই আগুন ছুঁয়ে যাবে মেঘেদের। কালো তুলসী পুড়ে ছাই হবে। ওলটপালট হবে সিন্ধু নদীর সভ্যতা। বর্ণহীন কোন আদুরে মেয়ে এবার কাছে গিয়ে বসবে ফল্গু নদীর। কথা হবে দুজনার। বর্ণালির পিন্ড দেবে দাশরথী। রাজা সেন এবার ফল্গু নদীতে উদোম হবে। মায়ের জেদ কমে যাবে, কাঁচা দুধের জন্য আর বায়না করবে না কোনদিন। মায়ের বেঁচে থাকার সব সম্বল ফুরিয়ে গেল। সুখের কাছে যাওয়ার সব চাবিকাঠি আজ পথ ভুলেছে। সব নিয়েছে মানুষ, শুধু থেকে গেছে ঐ নাকছাবিটা। আকাশের দেয়া একমাত্র উপহার। মৃত মানুষের শরীরে হীরেও চমকায় না।
বর্ণালির পোড়া শরীরের ছাইয়ে উর্বর হবে এবার মাটি, জন্ম নেবে লক্ষ লক্ষ উদ্ভিদ আর প্রাণীকুল। তারা ভালোবাসবে। প্রজনন করবে। মাটির কাছেই মাটির সুখ। সুখেই থাকে মানুষ আত্মহত্যার প্রহর গুনতে গুনতে। চোখের সামনে শুধু খেলা করে অজস্র ঈশ্বর কণা। একসময় সব মিলিয়ে যায়। চোখে নেমে আসে কালো তুলসীর শিরা উপশিরা।

শুধু মন ভালো নেই আমার। আমার উঠোনে চাই একটা সবুজ তুলসীর চারা। আমার দুচোখ যাকে দেখবে আমার সুখ যাত্রায়, চিনতে পারবে পরিচিত সেই সবুজ তুলসীর গন্ধ। আর বর্ণালীর সুখমৃত্যু। নীরবেই থেকে গেলে। আকাশে এবার মেঘেদের বাড়াবাড়ি। আকাশ প্রদীপ নিভে গেছে সেই কোন কালে, হদিশ রাখেনা কেউই।



শুক্রবার, ৬ জুলাই, ২০১২

শান্তির বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে


(অরূপা মহাজনঃঅরুণোদয়ের জন্য)

শান্তির আদর্শ

           “শান্তির দ্বীপ” কথাটি বহুচর্চিত। এই রাজনৈতিক উপমাটি চালু করেছিলেন ভারতীয় শাসকশ্রেণির দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এরমধ্যে বরাক উপত্যকার সাংস্কৃতিক গরিমা খুঁজে পান অনেকেই। শান্তির এই পরিমণ্ডলকে বরাকের গৌরব হিসেবে দেখাতে পিছিয়ে থাকেন না বামপন্থী বলে পরিচিত একাংশ বুদ্ধিজীবীরাও। এই শান্তি আসলে কীসের ইঙ্গিত বহন করে তা আমরা তলিয়ে দেখতে চাই না। আমরা কায়মনোবাক্যে কামনা করি এই শান্তি সম্প্রীতি যেন অটুট থাকে আবহমান কাল ধরে। শাসক শ্রেণির প্রতিভূর ছুঁড়ে দেওয়া এই উপমাটি কী এমনই নিরীহ যে নিরীহ ছা-পোষা সাধারণ বরাকবাসীকে একেই আদর্শ হিসেবে মেনে নিতে হবে?

মতাদর্শগত কাঠামো

           আমাদের উপনিবেশিক অতীত আমাদের সভ্য হয়ে ওঠার বাসনাকে চাগিয়ে দিয়ে সভ্য করে তোলার দায়িত্বে নিয়োজিত উপনিবেশিক প্রভুদের গ্রহণযোগ্যতার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো গড়ে তুলে। এই অধিপত্যবাদী কাঠামোই পুরুষত্বের বিপরীতে গুণহীন ক্লীবত্বের মতাদর্শ গড়ে তুলে নারীত্বকে পুরুষত্বের অধীনে সামিল করে নেয়। অর্থাৎ এমন একটি মতাদর্শগত কাঠামো যেখানে আধিপত্যের দৃষ্টিকোণ থেকেই কোন গুণকে বিচার করার বাতাবরণ সৃষ্টি হয় – বিপরীতটি হয় হারিয়ে যায় নতুবা বিপদজনক হিসেবে বিবেচিত হয়। শাসক শ্রেনির জারি করা “শান্তির দ্বীপ” উপমাটি এরকমই এক আধিপত্যবাদী মতাদর্শ থেকে উদ্ভূত যেখানে শোষিতের অশান্ত হয়ে ওঠার ধারণাকে নাকচ করে তাদেরকেও সহাবস্থানের এই অমোঘ শান্তির কাঠামোয় সামিল করে নেয়। বৌদ্ধিক চর্চার দৌড় এই কাঠামোর গণ্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় শোষিতের দৃষ্টিকোণ থেকে শান্তির প্রশ্নটিকে দেখতে চায় না বা দেখার সাহস করে নাসাহস করে না এই কারণে যে এই মতাদর্শগত কাঠামোটি এই বোদ্ধাদেরও সামাজিক প্রতিষ্ঠা দেয়

শান্তির মাহাত্ম

           তাহলে এই “শান্তির দ্বীপ” কথাটির মাহাত্মটা কী?  এর সোজাসাপটা মাহাত্ম এই যে বরাক উপত্যকায় শাসক শ্রেণির দল এবং দিল্লি-দিসপুরের হুকুম তামিল করা রাজনৈতিক নেতৃত্বরা কখনওই কিন্তু তেমন কোন বাধার সম্মুখীন হয়নি, তাদের অপ্রতিরোধ্য স্রোতে সামান্য প্রতিস্রোতের হাওয়া লেগেছিল জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে ‘জরুরি অবস্থা বিরোধী’ আন্দোলনের পরবর্তী ১৯৭৭-এর নির্বাচনে। কেন এই অপ্রতিরোধ্য গতি তা বিচার করার জন্য বরাকের বুদ্ধিজীবীদের যুক্তির কাঠামো কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় তা দেখে নিতে হবে। সাম্প্রতিক ভারতে যে দু’টি বিষয়ের উপর সবচাইতে বেশি চর্চা হয়েছে ও হচ্ছে তা হলো – জাতপাত ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা। এই দু’টি বিষয়ের উপর আলোচনাকে কেন্দ্রীভূত করলেই আমরা “শান্তির দ্বীপ” প্রসঙ্গের উপর অনেকখানি আলোকপাত করতে পারব।

যুক্তির কাঠামো

           বরাক উপত্যকার বুদ্ধিজীবীরা বিশেষ করে বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা কিছুদিন আগে পর্যন্তও পশ্চিমবাংলাকে দেখিয়ে বড়াই করে বলতেন ‘বাঙালির মধ্যে জাতপাত নেই’। কীভাবে তাঁরা বুঝলেন যে সেখানে জাতপাতের বিভাজন নেই – কারণ বিহারে ভূমিহার-রাজপুত-ঠাকুর-দলিত-যাদব-কুর্মী ইত্যাদির মধ্যে সহিংস সংঘাত লেগেই থাকে, কিন্তু পশ্চিমবাংলায় অপার শান্তি। সেখানে যেমন রণবীর সেনা রয়েছে – তেমনি রয়েছে দলিত সেনা – পশ্চিমবাংলায় তো তেমন নেই। তাঁরা সম্পত্তি-সম্পর্ক বিচার করার দিকে না গিয়ে বহিরঙ্গের শান্তি-অশান্তির রূপ দিয়ে জাতপাতের বিচার করলেন। বিহারে উচ্চবর্ণের জমির মালিক সরাসরি জমির সাথে যুক্ত থেকে সস্তায় শ্রম শোষণকে সুনিশ্চিত করতে শারীরিক নিগ্রহ চালাত। দলিতরা তার প্রতিরোধ করলে কিংবা যে কোন শ্রেণি সংগ্রাম সেখানে শুরু থেকেই হিংসাত্মক রূপ নেয়। দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এই সম্পত্তি সম্পর্কের খানিকটা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে – কিন্তু তা এখানে আলোচ্য বিষয় নয়। পশ্চিমবাংলায় বর্ণহিন্দু আধিপত্য যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্যেই বিরাজ করছিল তা এখন সবার কাছেই পরিষ্কার। সাচার প্রতিবেদন প্রকাশ পাওয়ার পর “পশ্চিমবাংলায় সাম্প্রদায়িকতা নেই” এই দাবিও যে ঠুনকো তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া গরীব মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার হিংসাত্মক রূপ পরিগ্রহ করার প্রয়োজন পড়ে না, কারণ বর্ণহিন্দু আধিপত্য যেখানে শান্তির বাতাবরণেই সবচাইতে সুরক্ষিত থাকে সেখানে অশান্তি ডেকে আনা আধিপত্যের পায়ে কুড়োল মারার সামিল। বরাক উপত্যকার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জনসংখ্যাগত ভারসাম্যের চিত্রটি বাদ দিলে শান্তির এই একই যুক্তি ক্রিয়াশীল থাকে।

রাজনীতি ও মতাদর্শ সম্পর্ক

             উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণের সম্পর্ক, হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক পরস্পর সম্পৃক্ত। সম্পত্তির সরাসরি মালিকানা তা      কৃষি-অকৃষি যে কোন উৎপাদনের ক্ষেত্রে কিংবা সরকারী দপ্তর ও প্রশাসনের মাধ্যমে সম্পত্তির অমলাতান্ত্রিক মালিকানার হিসেবে সংখ্যালঘু বর্ণহিন্দু আধিপত্য প্রশ্নাতীত। নীতি নির্ধারণে বর্ণহিন্দুদের সংখ্যাধিক্য তাদের আধিপত্যকে বজায় রেখেছে এবং নিম্নবর্ণীয়দের কায়িক শ্রমশক্তি শোষণের উপযোগী পিরামিডাকৃতি শ্রম বিভাজনের কাঠামোর চূড়ায় তাদের অবস্থান রয়েছে। অনুরূপভাবে মতাদর্শ – মূল্যবোধ গড়ে তোলার সকল প্রতিষ্ঠানও তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় লোকায়ত প্রাক-ব্রাহ্মণ্যবাদী বস্তুবাদী মতাদর্শ ক্রমশঃ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বর্ণবাদী মতাদর্শের অধীনস্ত হয়ে পড়েছেমতাদর্শের সাথে রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে ‘পারস্যে’ রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “...যে বাস্তবের পরে মানুষের স্বাভাবিক মমতা, সে যখন ঝাপসা হয়ে আসে তখন মমতারও আধার যায় লুপ্ত হয়ে। গীতায় প্রচারিত তত্ত্বোপদেশও এই রকমের উড়োজাহাজ – অর্জুনের কৃপাকাতর মনকে সে এমন দূরলোকে নিয়ে গেল, সেখান থেকে মারেই-বা কে, মরেই-বা কে, কেই-বা আপন, কেই-বা পর। বাস্তবকে আবৃত করবার এমন অনেক উড়ো জাহাজ মানুষের অস্ত্রশালায় আছে, মানুষের সাম্রাজ্যনীতিতে, সমাজনীতিতে, ধর্মনীতিতে। সেখান থেকে যাদের উপর মার নামে তাদের সম্বন্ধে সান্ত্বনাবাক্য এই যে, ‘ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে’। কঠ উপনিষদ থেকে গীতায় উদ্ধৃতি – ‘ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে’ – হত্যা করলেও তাকে সত্যি হত্যা করা যায় না। কাকে? পরমাত্মাকে। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় লিখছেন, “ যে-দার্শনিক তত্ত্বের উড়োজাহাজ অর্জুনের কৃপাকাতর অনেক ধ্যানধারণার এমনই ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে গেলো যেখানে বাস্তব পৃথিবীর সত্তা অস্পষ্ট, তার অস্তিত্বের দাবি বিলয়ের মহাশূন্যে বিলীন – ধ্যানধারণার সেই উর্ধ্বলোকই দার্শনিকদের ভাষায় ভাববাদ ...” সেখান থেকে মারেই বা কে, মরেই বা কে! কঠোর শ্রমই বা কে করে – তার শ্রমশক্তিকে শোষণই বা কে করে। এই দর্শনের বিশ্বাসেই এসব নিয়ে প্রশ্ন তোলা অজ্ঞানের ঘোর, পাওনা-গণ্ডা নিয়ে সোরগোল পাকানো – এসবই নেহাত বেকুবের লক্ষণ। এই বিশ্বাসই দ্বিজ-শূদ্রে বিভক্ত এই সমাজ আদর্শের ভিত। কোশাম্বী ভারতীয় বর্ণকে বর্ণণা করেছেন অনগ্রসর পণ্য উৎপাদনী ব্যবস্থায় একধরণের শ্রেণি হিসাবে, সামাজিক সচেতনতা নির্মাণে এমন এক ধর্মীয় পদ্ধতি হিসাবে যেখানে প্রকৃত উৎপাদকরা ন্যূনতম বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাদের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত থেকে বঞ্চিত হয়”। এই ন্যূনতম বলপ্রয়োগের পরিস্থিতির নামই শান্তি। এই শান্তির কাঠামোর বাইরে যারা রইল – তারাই অ-হিন্দু। মতাদর্শগত স্তরে এই অ-হিন্দুদের উপর বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা সবসময়ই থাকে, কারণ বর্ণবাদী মতাদর্শ দিয়ে তাদের আচ্ছন্ন করে রাখা যায় না, তারা তাদের পাওনা-গণ্ডার দাবি করেই ফেলে এবং তাতেই তাদের উপর নেমে আসে আক্রমণের খড়গ। এই আক্রমণকে বৈধতা দিতেই নানাধরনের অপপ্রচার চালানো হয়। হিন্দুত্ববাদীরা যেমন নাগরিক ও সম্প্রদায়গত বহুত্ববাদকে খণ্ডন করে এক সমসত্তাবিশিষ্ট রাজনৈতিক শক্তি কায়েম করতে চায়, ঠিক তেমনি অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিশেষ করে মুসলমানদেরও এধরনের এক সমসত্তা হিসেবে জনসমক্ষে তুলে ধরতে সচেষ্ট থাকে। কিন্তু বাস্তবে অন্যান্য দেশের মত ভারতীয় ইসলামও নাগরিক ও সম্প্রদায়গত বহুত্ববাদ রয়েছে, যদিও ধর্ম হিসেবে ইসলাম সম্প্রদায়গত বৈষম্য ও শ্রম-বিভাজনকে বৈধতা দেওয়ার বিপরীতে সাম্যের কথা বলে। এই সমসত্তার ধারণা ও আধিপত্যের কাঠামো যতক্ষণ অটুট থাকে ততক্ষণ শান্তির উপমাটি খুব যুৎসইভাবে রাজনৈতিক পরিভাষা হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। কিন্তু সংরক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে এই কাঠামোতে ইতিমধ্যে বেশ জোরালো আঘাত পড়েছে। সাচার ও রঙ্গনাথ কমিশনের সুপারিশের পর মুসলিমরাও সংরক্ষণের দাবির সপক্ষে সাংবিধানিক বৈধতা পেয়েছে। হিন্দুত্ববাদীরা তাতে শঙ্কিত হয়ে উঠছে। বুদ্ধিজীবীদের একাংশ হিন্দুত্ববাদীদের সক্রিয়ভাবে মোকাবিলা করার মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিকে আরও একধাপ অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে শান্তির বারি বর্ষণ করার প্রতি যে বেশি আকর্ষণ বোধ করছেন তা প্রতিক্রিয়ার সাথে আপসকামী ও দুর্ভাগ্যজনক।

অর্থনীতিবাদের গাড্ডা

           তবে এই আচরণ যে প্রতিক্রিয়ার সাথে আপসের ও আধিপত্যবাদের পক্ষে যায় তা তাদের উপলব্ধিতেই আসে না, বরঞ্চ তাঁরা ভাবেন যে শান্তির জন্য এই কামনা সমাজের কল্যাণেই। তাঁরা মনে করেন যে অর্থনৈতিক অধিকার ও উন্নয়নের দাবিতে শোষিত-বঞ্চিত মানুষের আন্দোলনের মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতাকে মোকাবিলা করা সম্ভব। আজকের উদার আর্থিক নীতির পরিপ্রেক্ষিতে আর্থিক অসাম্য যখন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মানুষের মনের মধ্যে ক্ষোভ ধূমায়িত হচ্ছে, তখন এই ধরনের ধারণা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আরও জাঁকিয়ে বসছে। জনগোষ্ঠীগত সমতার প্রশ্নকে এড়িয়ে গিয়ে গরীব-মেহনতি মানুষের ঐক্যবদ্ধ লড়াই যে দানা বাঁধতে পারে না – এই সত্যকে তাঁরা দেখতে পান না। অর্থনৈতিক প্রশ্নকে অনৈতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করার জন্যই এই বিভ্রান্তি ঘটে – মার্কস যাকে আখ্যায়িত করেছেন অর্থনীতিবাদ হিসেবে। রাজনীতিকে অর্থনীতি থেকে আলাদা করা বা অর্থনীতিকে ইতিহাসের আলোকে বিচার না করাই আসলে পুঁজিবাদী অর্থনীতি কিংবা তার নব্য রূপ উদারবাদী অর্থনীতির গ্রহণযোগ্যতার মুল চাবিকাঠি। বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের একাংশ অর্থনীতিবাদের এই ফাঁদে পা দিয়েছেন। ফলে তাঁরাও জনগোষ্ঠীগত অধিকারের প্রশ্নকে আড়ালে রেখে তথাকথিত শান্তি বজায় রাখার পক্ষে ওকালতি করেন, কারণ তাঁরা মনে করেন যে শান্তির পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক আন্দোলন গড়ে উঠে এবং তা দিয়ে হিন্দুত্ববাদকে মোকাবিলা করা যেতে পারে। তাদের এই ধারণা যে ভ্রান্ত বরাকের সাম্প্রতিক ঘটনা তাই প্রমাণ করল।
সাম্প্রতিককালে বরাক উপত্যকার উন্নয়নের প্রশ্নে, অর্থনৈতিক-নাগরিক ও মানবিক অধিকারের প্রশ্নে বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন গড়ে উঠছেহিন্দুত্ববাদী আধিপত্যবাদ তাতে শঙ্কিত হয়ে উঠাই স্বাভাবিক ছিল। তাদের এই শঙ্কা দূর করার এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দিল হাই-প্রোফাইল ভিন-ধর্মী বিয়ের ঘটনা। প্রগতিশীল শক্তি তাদের এই সুযোগের সদ্ব্যবহারের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে খাট করে দেখল এবং এর সক্রিয় প্রতিরোধের বদলে নিষ্ক্রিয় শান্তির পক্ষে ওকালতি করল। তাদের এই অবস্থান এই বোধ থেকে উদ্ভূত হয়েছে যে অর্থনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সম্প্রদায়গত ও শ্রেণিগত যে ঐক্য গরে উঠেছে হিন্দুত্ববাদের সক্রিয় বিরোধিতা এই ঐক্যকে বিনষ্ট করতে পারে। তাদের এই ভূমিকা যে সুবিধাবাদের নামান্তর ও বাস্তববোধ বর্জিত তা আবারও প্রমাণ হলো। আর্থিক সংকটের ফলে নড়বড়ে আধিপত্যবাদী কাঠামোয় কোণঠাসা হতে থাকা হিন্দুত্ববাদী শক্তি এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠল। আমরা যদি অতিসত্বর এই অর্থনীতিবাদী মোহ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারি তাহলে পরাজয়ের গ্লানি আমাদেরকে আরও বহুদিন বহন করে বেড়াতে হবে।

সংকট, বিশৃঙ্খলা ও পরিবর্তন

          বিশ্ব-পুঁজিবাদী সংকট ও ভারতীয় উদারবাদী অর্থনীতির কুফলের পরিণতিতে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ধূমায়িত হচ্ছে এবং তা হিন্দুত্ববাদী আধিপত্যের কাঠামোকেও দুর্বল করে তুলছে। কিন্তু এই অর্থনীতিতে লাভবান একাংশ উচ্চশ্রেণি-বর্ণের লোকের সমর্থনে ও ক্রমবর্ধমান বেকার যুবকদের বিপথে পরিচালিত করে এক আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদ যে গণ-সমাজের উপর জাঁকিয়ে বসতে পারে না তা হলফ করে বলা যায় না। আধিপত্যকামী শক্তির শান্তির শ্রুতলিপিকে মান্যতা দিয়ে এই আগ্রাসনকে মোকাবিলা করা যায় না, বিশেষ করে আজকের পরিস্থিতিতে যখন মধ্যপন্থার জায়গা ক্রমশঃ সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। সুতরাং আমাদেরকে এর মোকাবিলা করতে হবে এক সম্পূর্ণ র‍্যাডিক্যাল অবস্থান থেকে।
‘রুমি কাণ্ডে’ যে এক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। আবার তীব্র অর্থনৈতিক সংকট থেকে উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকটেরও প্রতিফলন এই শ্লীল-অশ্লীল, ঔচিত্য-অনৌচিত্য, হিংসা-ভালবাসা, অন্তর্ঘাত-সম্মুখ সমর ইত্যাদি মহাকাব্যিক গুণে ভরপুর এই কুনাট্য। শাসক শ্রেণির অভ্যন্তরিণ দ্বন্দ্বে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা যে আগামী দিনে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি ঘটবে তা হলফ করে বলা যায়। অর্থনৈতিক সংকট থেকে এই রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার কীভাবে উদ্ভব ঘটে তা সাধারণ পাঠকের জন্য একটু ব্যাখ্যা করে বলা যাক। রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা সম্ভব হয় মতাদর্শগতভাবে মোহাচ্ছন্ন ও শাসকীয় অর্থনৈতিক নীতিতে পরিচালিত শাসিতের প্রচ্ছন্ন সম্মতির বলে অথবা শাসিতরা যদি অসম্মতি প্রকাশ করে তাহলে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সম্মতি আদায় করে। প্রথম অবস্থা বজায় রাখার জন্য আর্থ-সামাজিক অসাম্যকে একটি সহ্যের সীমার মধ্যে ধরে রাখা প্রয়োজন, প্রয়োজন শ্রমশক্তি লুণ্ঠনের এক নমনীয় কাঠামো। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট অসাম্যের তীব্রতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সামাজিক ভারসাম্যকে বিনষ্ট করে। আর্থিক সংকটে জর্জরিত মানুষ বিদ্রোহ করতে চাইলে – শাসক শ্রেণি দিশেহারা হয়ে পড়ে। এই দিশেহারা অবস্থাতেই রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। স্বাভাবিকভাবেই যে কোন অবস্থার দ্বিমুখী গতি সম্ভব। তাই এক্ষেত্রেও এই বিশৃঙ্খলার         নব্য-উপনিবেশিক পরিণতি হিন্দুত্ববাদী–আক্রমণাত্মক-শৃঙ্খলার দিকে যাওয়ার প্রবণতা যেমনি থাকবে – ঠিক তেমনি আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন সমাজ গড়ার প্রবণতাও থাকবে। এই দ্বিতীয় পথকে উন্মোচিত করার জন্যই হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে ও সমান-অধিকার, সমান-মর্যাদার দাবিতে তীব্র ও প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের লড়াই গড়ে তুলতে হবে। ‘সাম্প্রদায়িকতা শান্তি বিনষ্ট করে – তাই বর্জনীয়’ – এধরনের প্রচারের মাধ্যমে শান্তি বজায় রাখা যাবে না। আমাদের দুর্ভাগ্য যে তথাকথিত বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও বাস্তবকে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়ে শান্তির বারি ছিটিয়ে দেওয়ার একধরনের ক্লীব অবস্থান নিয়েছেন।

র‍্যাডিক্যাল অবস্থান

           রাজনৈতিক ক্ষেত্রে র‍্যাডিক্যাল অবস্থান সুনিশ্চিত হবে প্রতিটি জনগোষ্ঠীর সমান-অধিকার, সমান-মর্যাদার নীতির ভিত্তিতে জনসংখ্যার অনুপাতে সংরক্ষণের দাবিতে জোরদার অন্দোলন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। সংখ্যালঘু তোষণের হিন্দুত্ববাদী প্রচারকে জোরালোভাবে খণ্ডন করে সংখ্যালঘুদের সংরক্ষণের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর ভাষিক-সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্নকে গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। হিন্দুত্ববাদী ইতিহাস পাঠের বিপরীতে দলিত-নিপীড়িতের সংগ্রামের ইতিহাসকে উর্ধে তুলে ধরতে হবে। নমঃশূদ্রদের আন্দোলন – কৈবর্ত বিদ্রোহ – সিধু-কানুহ, বিরসা মুণ্ডার বিদ্রোহ – নাথ পন্থের ইতিহাস – তেভাগা – নানকার বিদ্রোহের ইতিহাস এবং সর্বোপরি বরাক-বাংলাদেশের ভাষা সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাসকে সামনে এনে পরিচিতির সংগ্রামকে হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। অর্থনৈতিক অধিকার – গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও শোষিতের ক্ষমতায়নের প্রশ্নকে যুগপৎভাবে পরিচালিত না করে অসাম্য ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার দিকে এককদমও অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। বরাকের বুদ্ধিজীবীরা যত তাড়াতাড়ি এই বাস্তব সত্য উপলব্ধি করতে পারেন ততই মঙ্গল। শোষণ – বঞ্চনা – অনুন্নয়নের কাঠামো বজায় রেখে তথাকথিত ‘শান্তির দ্বীপের’ চেয়ে তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ভবিষ্যতের প্রকৃত শান্তির আশায় অশান্ত বরাক হাজারো গুণ কাম্য।      

                                           (c) Picture: ছবি




মঙ্গলবার, ৩ জুলাই, ২০১২

চাঁদের সুখে...


বড়ো খেবড়ো চাঁদকে দেখলে হাঁসফাঁস করে আকাশের শরীর। 
গুরুপূর্ণিমার চাঁদ যেন বেশ্যার উলঙ্গ যোনী। 
গান্ধির মাথা ছুড়ে দিয়ে এই পৃথিবীর মানুষ, উল্লাসে দখল নেয়  নিজের জন্মদ্বার। 
পিতার অশৌচেও বীর্য স্খলন হয় পুরুষের। 

অনেকদূরে কোথাও শোনা যায় গুরু পূর্ণিমার আরতি।

আজ ক'দিন আমার পাহাড়ের চাঁদ অসম্ভব গম্ভীর। আস্কারা দেয় না আমার প্রেমকে। আসলে অহংকারি হয়ে উঠেছে খুব। হয়তো কোন  অভিযোগ বা অভিমানও থাকতে পারে। অনেক পড়ে বুঝলাম দেমাকি হয়েছে। রমজান মাসের চাঁদ নাকি বেশ অহংকারী আর সুন্দর!

ভরা বর্ষায় গোমতীর বুক উপচে গড়িয়ে পড়ে হলুদ সালদুধ। নরম সবুজ রঙা শাড়ির আচল দিয়ে কোনমতেই ঢাকা যায়নি উদোম নদীর গাভিন শরীর। 
কে জানে কবে পেট বাজি রাখল, পোয়াতি হল! 
আকাশের আজকাল অসহায় লাগে চাঁদের ছায়া নদীর বুকে পড়লে। অভিমানে উথলে ওঠে নদীর ঠোঁট। চেপে ধরে নিজের  গভীর নাভিমূল। নদীর সব গোপন কথা নাভিমূলে গচ্ছিত। 

খারচি পুজা শুরু হলে গোমতীর রূপ যেন ঠিকরে পড়ে। খারচি'র প্রথম দিনে বৃষ্টি হবেই। 
শ্রাবণের স্পর্শ পেয়েই লাল হয়ে ওঠে গোমতীর গাল। আকাশ থেকে ঝড়ে পড়া বৃষ্টি ফোঁটা 
গড়িয়ে পড়ে গোমতীর বুকে। এরপর আস্তে করে নেমে যায় নিচের দিকে কোন সমুদ্র শরীরের প্রতীক্ষায়। 
নুন বালিতে মেদ জমেছে সমুদ্র পেটে। 

আজ চাঁদ নেই আকাশে। গ্রাস করেছে মেঘের দল। পৃথিবীর রক্ষিতা, আকাশের ঘরণী আমার চাঁদ।
হিজড়ে সমাজে মৃত্যুর পর শব নিয়ে চলে আনন্দ উল্লাস। যেমনটা হয় চাঁদের সাথে। 
পূর্ণিমার রাতে রুপ থাকলে মনে ধরে, অমাবস্যায় ঘোমটা তুললেই বেড়িয়ে আসে হলুদ শরীরের নীচে 
ফুলে ফেঁপে থাকা নীল স্তন। 
অমাবস্যা চলে যায়, ধকল শুকোতে সময় লাগে। 

আকাশে নিলাম হোক দ্রৌপদী। বাজি রাখবো নিষ্পাপ চোখ। তাকাবো না আর চাঁদের দিকে।