.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

বুধবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১২

হাসির কবিতা

                                                      



                                                
                                                        ১  

           কাঁচি হাতে তাড়া করে বাস্তবের দত্যি ঘ্যাঁচ করে কেটে দ্যায় আমার স্বপ্নের প্যানোরামিক দৃশ্যমালা। চুকেবুকে যায় আমার বিস্ময়ের পালা। শিল্পসন্ধানী চোখ হারিয়ে যায় বিকিকিনির ভীড়ে, হাইটেকের চাপ, দড়ি টানাটানিতে ক্লান্ত আমি বুঁদ থাকি প্রতিবেশীর ঈর্ষায়। আজ আমি এক মজুর, খাটনি খাটতে কারখানায় চলে যাই। দিনশেষে সস্তা আমোদ স্বপ্নের কফিনে শেষ পেরেক ঠুঁকে, আমার আমির শেষকৃত্য নিশ্চিত করে।


আবার আরেক সন্ধ্যেবেলায়, লকলকে জিভ নিয়ে বিপণনতন্ত্রের আনাচে-কানাচে লালা ঝরাই। নাগরিক জঞ্জালে এঁটোকাঁটা কুড়িয়ে গৃহকোণ সাজাই। অব্যবহারে পেনসিলটা ভোঁতা, কোথায় স্কেচ, কোথায় বলিষ্ঠ হাতের টান? অপুষ্টিতে ধুঁকতে ধুঁকতে শুকিয়ে কাঠ আমার আখর বাগান। যে যার বাক্সে সেঁধিয়ে পড়ে, এ যুগে এটাই সংসার। আমি সিঁধেল চোর, সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ইচ্ছে করব পাচার।

হর্মোনের মাত্রায় বেজায় গরমিল, এলাকাজুড়ে দেখতে পাচ্ছি জোম্বিদের মিছিল। খুবলে নেওয়া মাংস, লালা ঝরানো না-মানুষি প্রেমের পথ বেজায় পিচ্ছিল। ছবির মৃত বুড়ো চোখ রাঙান,"শৃঙ্খল ছাড়া তোর কিছুই হারাবার নেই!" হ্যালোজেনে ঝলসে যায় চোখ, বিড়বিড় করি,"দলছুট চড়ুই বেঁচে থাক তুই।"


                                                         ২

দু’দিকেই হাতুড়ি পেটার শব্দ, ভাঙচুর-নির্মাণে দালানবাড়ি
হিমেল দুপুরের এক শূন্যতা এতেই খুঁজছে উষ্ণতা
নেওয়া যায় নির্জনে পাতাপোড়া মায়াবী ধোঁয়া এলোপাথাড়ি
দৌড়ানো যায় মগজ, আখর সাজিয়ে দু’চার পাতা।
বহুদিন হয়নি কথা, বন্ধুরা চৌকো বাক্সে খেলছে পুতুল
সেই বাক্সে দমবন্ধ লাগে আমার—হাওয়া চাই একরাশ
স্নায়ুজুড়ে ইলেক্ট্রনের প্রবাহে অনুভূতির ক্ষণিক ভুল
ঘুম যায় দেয়ালঘড়ি শবাসনে যায় এক নিশ্চুপ লাশ।
পোষা কুকুরটা দেখে মনিবের ছিঁড়ে ফেলা একগাদা কাগজ
কী বুঝে চিবিয়ে ফেলার চেষ্টা, জান্তব গর্জনে স্নেহের আকুতি
কিছুতেই মেলানো যাচ্ছে না এই জীবনের বীজগণিত রোজ
চেপেচুপে দৈন্য ঢাকলেও মননে সংক্রমণের ঘুমতাড়ানো ভীতি !

ক্লান্তিকে রেখেছি লুকিয়ে ড্রয়ারে, অগুনতি ফাইলের তলায়
দেখছে, কে-ই দেখবে হিমেল শূন্যতায়, এই অবেলায়।




মঙ্গলবার, ৩০ অক্টোবর, ২০১২

শুধু কবিতার জন্য ভুবন পেরিয়ে এই হিম সন্ধ্যেবেলা


স্বপন সেনগুপ্ত 

              কবিতার বাইরে অমরত্ব চাননি কখনও সুনীল। তাঁর বন্ধুত্বের পরিধি যেমন ছিল বিশাল, লিখিত গ্রন্থও প্রায় তিন শতাধিক। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের পর সুনীলই  ছিলেন সব্যসাচী লেখক। যদিও কবি হওয়াই একান্ত বাসনা ছিল তাঁর, কিন্তু তাঁর গদ্য সত্তার কাছে চপা পড়ে গিয়েছিলেন কবি সুনীল। আমাদের যৌবনে, সবে যখন লেখালেখি শুরু করি, তখন দুটি নামেই আমরা ছিলাম নেশাগ্রস্ত। শক্তি-সুনীল। যেন আমাদের যৌবনের দেবদূত। একটু সজাগ কালে শক্তি-সুনীল ঝাপসা হয়ে বড়ো হয়ে উঠেছিলেন সুভাষ, শঙ্খ ঘোষ। এখন তো কতজনের লেখা ভালো লাগে। ভালো লাগে সুবোধ সরকার থেকে ভাস্কর চক্রবর্তী হয়ে রণজিৎ দাশ এবং আরো অনেকের কবিতাই।

           একবার গুয়াহাটিতে বিশিষ্ট গবেষক ঊষারঞ্জন ভট্টাচার্যের বাড়িতে বসে আলোচনা হচ্ছিল, বাংলা সাহিত্যে এই সময়ের সৃষ্টিশীল কথা-সাহিত্যিকদের মধ্যে কার লেখা কালজয়ী হয়ে থাকবে ? ঊষাবাবু প্রয়াত গবেষক সুজিত চৌধুরীর কথা টেনে বলেছিলেন, শীর্ষন্দু মুখোপাধ্যায়। সুনীলের নাম উচ্চারণও করেননি। শক্তি-সুনীলরা জাত বহেমিয়ান হলেও লেখার টেবিলে প্রচন্ড শৃঙ্খলাপরায়ণ। রোজ নিয়ম করে ভোরবেলা লেখার টেবিলে তাঁরা বসতেন, পড়তেন। শীর্ষেন্দুও লেখেন ভোরবেলা বাড়ির অন্যরা সব জেগে উঠার আগে। সবাই জেগে গেলে তিনি বদলে যান, হয়ে ওঠেন ঘোর বৈষয়িক। সুনীল নাস্তিক, শীর্ষেন্দু আস্তিক। দু’জনের বন্ধুত্ব ছিল নিবিড়, কর্মক্ষেত্রও ছিল একই জায়গায়। তবে সুনীল যে রকম লোকপ্রিয়, শীর্ষেন্দু ততোটা নয়। জীবনানন্দও তো জীবদ্দশায় একশো টাকার বেশি কোনও পুরস্কারই পাননি।

             প্রতিষ্ঠান-বিরোধী সুনীল কিন্তু শেষে নিজেই হয়ে ওঠেছিলেন একটা প্রতিষ্ঠান। কলকাতাকে উদ্দাম যৌবনকালে শক্তি-সুনীল-সন্দীপনরাই তো শাসন করে গিয়েছেন। সাহিত্যের সব শাখাতেই তিনি ছিলেন সাবলীল। ১৯৬০-এ ‘আত্মপ্রকাশ’ দিয়েই তাঁর উপন্যাসের সূচনা। ‘সেই সময়’, ‘প্রথম আলো’, ‘রাণুভানু’, ‘পূর্ব-পশ্চিম’ যেমন তাঁর স্মরণীয় হয়ে তাকবে, আবার অনেক আবোল তাবোল লেখাও লিখেছেন প্রচুর। বেশি লিখলে বোধহয় এমন হয়। দেশে ধারাবাহিকভাবে যখন তাঁর ‘অর্ধেক জীবন’ প্রকাশিত হচ্ছিল গোগ্রাসে গিলছিলাম, দেশের পাতা কেটে কাটিং রাখতাম। পড়ে বই হয়ে প্রকাশ হলে আনন্দ থেকে সংগ্রহ করি। যেমন পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম, অশোক মিত্রের ‘আপিলা চাপিলা’। ভাবতাম বাকি অর্ধেক জীবনটাও বোধহয় লিখে পূর্ণ করে যাবেন। কিন্তু তা করেননি। কারণ ৫০ বছরের পরবর্তী জীবনকাল নিয়ে তো রবীন্দ্রনাথও লেখেননি।

            বুদ্ধদেব বসুর মতো প্রথম দিকে ছিলেন ঘোর ‘রবীন্দ্র-বিরোধী’, পরে অকান্ত রবীন্দ্র-অনুরাগী। একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন, যেন একজন পূর্বসুরি অন্যজন উত্তরসুরি। রবীন্দ্রনাথের কোনও কবিতাই পচ্ছন্দ ছিল না সুনীলের। বরং তুলনায় ছোটগল্পগুলোকে বলতেন, মন্দের ভালো। এধরণের বিরোধিতার নজির তো সব কালেই দেখা যায়, বুদ্ধদেব বসুর কবিতাকে অপাঠ্য বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তেমনি বুদ্ধদেব বসু সুনীলের কবিতাকে বলেছিলেন দুর্বোধ্য। উগ্র বিরোধিতাই পরবর্তীকালে মোড় নেয় অনুরাগে। সুনীলও ক্রমে হয়ে ওঠেন রবি-অনুরাগী। রবিগানের প্রেমিক। রবীন্দ্রনাথের কবিতা অপছন্দ হলেও গান ভালবাসতেন, আপন মনে গাইতেন।

         জীবনানন্দের বনলতা আর সুনীলের নীরা। ভালোবাসার মানুষ চলে গেলেও এদের কিন্তু বয়েস বাড়ে না, তারা অনন্ত যৌবনা। জীবনানন্দ দাশ বনলতার আংশিক উৎসের সন্ধান দিলেও সুনীলের নীরা কিন্তু অ্যাবস্ট্রাক্ট। সুনীল কিন্তু তাঁর যৌবনে একদল লেখককে নিয়ে একটা বৃত্ত রচনা করেছিলেন। যাঁরা ছিলেন ‘কৃত্তিবাস’-এর অশ্বারোহী। শক্তি-শরৎ-তারাপদ-সন্দীপন-আনন্দ বাগচী সহ এই কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর মধ্যমনি ছিলেন সুনীল। কৃত্তিবাসে ছাপা হতো তরুণ কবিদের কবিতা এবং প্রবীণদের গদ্য। নিঃসন্দেহে সুনীল খুব খোলা মনের সাহসী কবি। সাদা জুলপির অর্ধেক জীবন। দিলখোলা, পরিশ্রমী ও আড্ডাবাজ। একসময় বিস্তর হইচই পড়েছিল, ‘তিন জোড়া লাথির ঘায়ে রবীন্দ্র রচনাবলি লুটোয় পাপোষে’ পঙক্তি নিয়ে। আসলে তিন বন্ধু শুয়েছিল খাটে, ঘুমন্ত তিনজনের পায়ের আঘাতে রবীন্দ্র রচনাবলিই পড়ে গিয়েছিল মাটিতে। অথচ তিনিই শেষ বয়সে লিখছেন, ‘কয়েকদিন ধরে মনটা ভারি আনন্দে ভরে আছে। শুধু রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ছি’। ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে পরিচয় ঘটেছিল অ্যালেন গিন্সবার্গের সঙ্গে। তখন তরুণ কবিদের সর্দার সুনীল। হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে যুক্ত। শৈলেশ্বর ঘোষ, মলয় রায়চৌধুরী, সমীর রায়চৌধুরী, প্রদীপ চৌধুরী সহ অনেক তরুণই ওই আন্দোলনের পথিক। ‘হাউল’ দিয়ে জগৎসংসার মাতিয়ে গিন্সবার্গ তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন কলকাতা-বারাণসী, মিলেমিশে গিয়েছেন ‘কৃত্তিবাস’-এর কবিদলের সঙ্গে। অ্যালেনের মূলভাষ্য ছিল, যা কিছু তুমি অনুভব করো তাকে ঠিকঠাক বলে যাওয়াটাই হল কবিতার কাজ। যেখানে ধরা পড়বে তুমি ঠিক কেমন। ‘একা এবং কয়েকজন’-এর কবি তাই হয়ে উঠলেন, ‘আমি কী রকম বেঁচে আছি’-র কাহিনিকার। সুনীলের কবিতা তাঁর বেঁচে থাকার যেন ধারভাষ্য। তিনি বামপন্থী, কী নকশালপন্থী, কী হাংরি—এসব বাহ্য বিষয়, তাঁর কবিতা আর কিছু নয়, তাঁর আত্মস্বীকারোক্তি। এবং তাই স্বাভাবিক। তাঁর এই বেঁচে থাকা তো একার বেঁচে থাকা নয়, চারপাশের মানুষজন এবং চারপাশের পৃথিবীকে নিয়েই বেঁচে থাকা। ঘুরেছেন দেশবিদেশ। আমেরিকার আইওয়া শহরে এক বছর প্রবাসজীবন কাটিয়ে যখন ফিরে এসেছেন তখন গাঢ় পরিচয় ঘটেছে সমসাময়িক বিশ্ব কবিতার সঙ্গে। অনুবাদ গ্রন্থ বের হয়েছে ‘অন্যদেশের কবিতা’। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পল এঙ্গেলের আমন্ত্রণে আন্তর্জাতিক লেখক কর্মশালায় যোগ দিয়েছিলেন সুনীল। তখনই সালভাদর দালির সঙ্গে পরিচয়। ফেরার পথে ব্রিটিশ সরকারের আমন্ত্রণে বিলেত। স্টিফেন স্পেন্ডার এবং টি এস এলিয়টের সঙ্গে পরিচয়, ফরাসি বান্ধবী মার্গারেটের সঙ্গে প্যারিস ভ্রমণ। লিরিকের পথে নয়---গদ্যপন্থায়, কখনও কাহিনি কখনও নাটকীয়তায় চলেছে তাঁর কবিতা। তিনি চিহ্নিত হয়ে উঠেছিলেন ব্যাক্তিকেন্দ্রিক, রবীন্দ্রবিদ্বেষী ও অতিযৌনকাতর কবি হিসেবে। ক্ষুৎকাতর কবি গোষ্ঠীর সঙ্গে পরে তাঁর অনেকটা যেন স্বার্থপর দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। যৌনতা তাঁর কবিতার প্রধান ভর কেন্দ্র হলেও তাঁর কবিতায় নিবিড়ভাবে তাকালে ভেসে ওঠে এক আর্ত-মুখচ্ছবি। সুনীলের কবিতার ছত্রে ছত্রে তো ভালবাসার কথাই ছড়ানো। অর্থাৎ ‘আমি কীরকমভাবে বেঁচে আছি’। আসলে ওর বিদ্রোহ তো রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে নয়, ছিল তথাকথিত রাবীন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে। মধ্যবিত্তসুলভ কূপমণ্ডূকতা তাঁর মধ্যে বিরল। জাহাজের খালাসি হৌয়ার স্বপ্ন ছিল ছোটবেলায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পরিণত মননের নীললোহিতকে আমরা পেয়েছি। যিনি ছিলেন দিকশূন্যপুরের যাত্রী। বইপড়ার নেশা তাকে ধরিয়েছিলেন মা, মীরা দেবী।

            ডি-কের পরামর্শ ও সহযোগিতায় যখন ‘কৃত্তিবাস’ (শ্রাবণ ১৩৬০) প্রকাশিত হয়, কলকাতায় রাজনৈতিক আবহাওয়া তখন উত্তাল। কৃত্তিবাসের তরুণ ব্রিগেডই তখন  দাপিয়ে বেড়াতো মধ্যরাতের কলকাতায়। ওই তরুণ কবিদের বহু পঙতি তখন যেন প্রবাদে পরিণত হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে দেশে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘আত্মপ্রকাশ’। এরপর বের হয় ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘প্রতিদ্বন্ধী’। আশির দশকে লেখা বৃহৎ উপন্যাস ‘সেই সময়”। ক্রমান্বয়ে ‘পূর্ব পশ্চিম’ থেকে ‘প্রথম আলো’। তাঁর ভাষা সুখপাঠ্য, ঘরোয়া, কথনভঙ্গি জনপ্রিয়। কবিতা এবং গদ্যের ভাষায় ছিল নিখাদ তফাত। কবিতার জন্য তিনিই পারেন অমরত্বকে তাচ্ছিল্য করতে। তাঁর লেখা কালের রাখাল হবে কিনা তিনি ভাবতেন না, সমকালের পাঠক যদি পড়ে আনন্দ পায়, ভাবে, তাহলেই খুশি। বিবেকানন্দ-নিবেদিতাকে নিয়ে তাঁর কাঙ্খিত উপন্যাস আর লেখা হয়ে ওঠেনি। তিন ছদ্মনামের আড়ালে তিনি বিচিত্র স্বাদের নীললোহিত, নীল উপাধ্যায়, সনাতন পাঠক। ইন্দিরা গান্ধিকে নিয়ে সামনাসামনি দেখার পর তাঁর শুষ্ক ওষ্ঠ, অপ্রেমের চিবুক নিয়ে লেখা বিতর্কিত অথচ বিখ্যাত কবিতাটির কথাও কী ভোলা যায় সহজে। সুনীল একমাত্র সুনীলেরই তুলনা।
(C) Picture:ছবি



রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১২

ঘুমিয়ে থেকো


চাঁদ দেখা বারণ আমার। তাই আজকাল চুরি করেই দেখি চাঁদের আলো।
চাঁদ দেখার চেয়ে ঢের ভালো হলুদ প্রজাপতি বা হিমেল ঘাসেদের চুমু খাওয়া।
চুরি আমি করবোই, পারলে আটকে রেখো। বেশী সুন্দরী হলে সাবধানে থাকাই ভালো!
 
যেমন থাকে চাঁদ। অনেকদূরের আকাশে সাবধানে একাকী।
সবাই বলে চাঁদের কলঙ্ক, আমি বলি চাঁদের কপালে লাল চন্দনের প্রলেপ। যেমন নতুন বৌঠানের কপালে ছিল বিয়ের রাতে।

তোমায় নীরা হতে বলিনি তো! বলিনি বৌঠানের মতো আত্মহত্যা করো।

আমার সহ্য হয়না তোমারই ঐ রূপ, তাই তো ভালবেসে ফেলি অজান্তেই বারবার।
যেমন ভালোবাসে কুয়াশারা সকালের শিউলিকে। অথবা সবুজ ঘাসেদের হৃদয়কে। চলো কোন এক সকালে তোমায় আকাশ থেকে ঝড়ে পড়া কুয়াশায় স্নান করিয়ে দেই।

শেষ দুদিন লিখতে পারিনি। লিখতে পারলে তোমাকেও আমার সাথে কড়া নাড়তে হতো মৃত্যুপুরীর।
হয়তো বেঁচে যেত বৌঠান। অথবা চাঁদ বেছে নিতো আত্মহত্যার পথ!

আমায় পথ দেখিয়েছে হাজার হাজার আলোকবর্তিকা তোমার ঘরে উঁকি দেয়ার। এরপর চোর হওয়ার সাধও আমার গেছে।
মনে হয়েছিল এতো অহংকারী শরীর ঘুমিয়ে থাকে কী করে!

তুমি ঘুমোলে তো পৃথিবী জড়বৎ হয়ে যায়, আকাশ হাসে না, বৃষ্টি থেমে যায়, পাহাড় শান্ত হয়ে যায়, নদীর দিক পাল্টে যায়।
আবার মনে হয়েছিল, ঘুমিয়ে আছো বলেই বেঁচে গেলাম আমি অথবা এই বঙ্গোপসাগর।

আগুনের কাছে বন্ধক রেখে এসেছি তোমায় পবিত্র করতে , প্রতিমুহূর্তের সুদ আমায় নিঃস্ব করে প্রতিদিন। আর সেই আগুন তোমার কপালে টিপ হয়ে ভয় দেখায় আমায়! দখল নিয়েছে অজান্তেই।
আমি কয়লা হই।
চুরি আমি করবোই। পারলে রুখে দিয়ো।
তুমি চুপ থাকলেই আমার ইচ্ছে করে অবাধ্য হতে। আবার আরেকটা অপরাধ করতে। তোমায় ভালবাসতে।
বলেছিলাম তো...

চাঁদের আলো তবুও আমাকে ছুঁয়েই যায়, জানি ভাঙ্গনের রাতে বড় নির্দয় তুমি, তবে হৃদয়হীনা তুমি নও।  তাই ভালবাসবোই।

তবুও আমার জন্য নিষিদ্ধ ঐ চাঁদ, তুমি এবং তোমার হিমেল রাত।



বৃহস্পতিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০১২

শিলচরের দুর্গাপূজো: পূজো পরিক্রমা


প্রথম অংশ :
 দ্বিতীয় অংশ:
তৃতীয় অংশ :
চতুর্থ অংশ :




রবিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১২

বলি প্রদত্ত...


ঠিক এই মুহূর্তে আকাশটা একটু লালচে নীল। আমি বসে আছি রাঙ্গামাটির ভুবনেশ্বরী মন্দিরে। নীচে দিয়ে বয়ে চলেছে মজা গোমতী। অসম্ভব শান্ত জল,শ্যাওলা সবুজ। আশেপাশে শুধু টুপ টুপ করে শিশির পড়ার শব্দ। অনেকদূরে কোথাও মাইকে বাজছে, ও লো সই, তোর চোখ কেন ছলছল... আজ জয়ের মালা কাকে দিবি বল...!

একটা সময় এই ভুবনেশ্বরী মন্দিরে নরবলি হতো। শোনা যায় শরীরে কোন ক্ষত নেই এমন মানুষদের ধরে এনে বলি দিত রাজরাজারা। কখনও কখনও যুদ্ধে পরাস্ত সেনাকেও দেয়া হতো বলি রাজার কল্যাণে।এই রক্তের স্রোত উঁচু টিলা গড়িয়ে গোমতীর জলে মিশে যেত। রবীন্দ্রনাথের বিসর্জনের পটভূমিও নাকি ছিল এই ভুবনেশ্বরী মন্দির। রাঙ্গামাটিতেই ছিল ত্রিপুরার পুরনো রাজবাড়ী। পরবর্তী সময় রাজা এই রাঙ্গামাটি থেকে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যান আগরতলায়। একসময় আগরতলায় প্রচুর আগর গাছ ছিল। তাই নাম আগরতলা। আজ সেই গাছ নেই, আগরতলা আছে অবশ্য।
        আগরতলার রাজবাড়ীর দুর্গাপূজার বয়স প্রায় আড়াইশ বছর হবে। তবে এনিয়ে মতভেদ রয়েছে। রাজবাড়ীর পুজায় এখনও মহিষ বলি হয় নবমী পুজার দুপুরে।রাজচন্তাই স্বর্ণ পৈতা পরে মহিষ বলি শেষে মদ, আদা আর ডিম বলি দেন। এটাই রাজণ্য প্রথা। অথচ দেবী শুনেছি বলি চান না। পুরাণে কথিত আছে রামচন্দ্র পশু বলির পরিবর্তে ১০৮ টি নীল পদ্ম দিয়ে দেবীর আরাধনা করেছিলেন রাবণকে পরাস্ত করতে।
রাজা সুরথ শত মহিষ আর পাঠা বলি দিয়েও দেবী কৃপা না পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। শেষে দেবী স্বপ্নাদৃষ্ট হয়ে আদেশ দিলেন, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ আর মাৎসর্য বলি দেয়ার।

           বলছিলাম ত্রিপুরার রাজবাড়ির দুর্গাপুজার কথা। এই রাজবাড়ীর দুর্গা ঠাকুরের দুই হাত প্রসারিত। কার্ত্তিক ঠাকুরের মাথায় পাহাড়িদের সাদা গামছার পাগড়ি আজও দর্শনীয়। মিষ্টি মুখ ঠাকুরের। এই সবই রাজণ্য প্রথা মেনে। জানা যায় ত্রিপুরার মহারাণী সুলক্ষণা দেবী দেবীর দশ হস্ত আর মহিষাসুর মর্দিনীর রূপ দেখে ভয় পেয়ে মূর্ছা যান মহারাণী। এই অবস্থায় দেবী স্বপ্নে আদেশ দিলেন দুই বাহু দৃশ্যমান করতে। বাকি আট হস্ত ছোট আকারে অদৃশ্য রাখতে দেবীমূর্তির পেছনে।এখনও সেই রীতি মেনেই ঠাকুর গড়া হয় দুর্গাবাড়ির।
          ত্রিপুরার পুজা মানেই একটা মিশ্র সংস্কৃতির উৎসব। এখানে দেবী কখনও রাজনন্দিনী, কখনও লাল বেনারসীতে আবার কখনও রিয়া আর পাছড়া পরিহিতা। উপজাতি আর হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ভীড় করেন দুর্গোৎসবে। মনে হয়না একবারও গত কয়েক দশক ধরে চলা বাঙালি আর উপজাতিদের মধ্যেকার কোন বৈরিতার কথা।
        সরকারি পরিসংখ্যান বলছে গত দুই দশকেই প্রায় হাজার দুয়েক মানুষ নিহত হয়েছে এই হানাহানিতে। এবারও পুজা হচ্ছে, কিন্তু কোথায় যেন একটা আশংকা, সন্দেহ। সামনেই নির্বাচন বলে হয়তো! কিন্তু রাজনৈতিক নেতারা ঠিক এই সময়টাকেই বেছে নিলেন তাদের প্রচারের জন্য। কেউ বলেন উনারা দিচ্ছে উগ্রপন্থীদের মদত, কেউ বলছেন তিনি নিজেই উগ্রপন্থী। হামলা, পাল্টা হামলা হতে পারে যেকোন সময়! মাথা পিছু নিরাপত্তারক্ষী রাজপথে।

                আমার আশেপাশে কিছু ছাগ শিশু এই মাঝরাত্তিরের স্বপ্নে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। আসলে এরা জানে তারা বলি প্রদত্ত। মানুষের কল্যাণে। তাই শেষবারের জন্য হয়তো জিবনভিক্ষা চাইছে মানুষের কাছে।মানুষের কল্যাণে পশু, ডিম, আদা সবই বলিপ্রদত্ত। এই সময়ে পৃথিবীকে বাঁচাতে গেলে দরকার পশু আর জীবের বেঁচে থাকা। কিন্তু রীতি এটাই। নিধন চাই উৎসবেও যুদ্ধেও।
       মানুষ কি করবে বিনিময়ে! কিছুই না উৎসব, শুধু উৎসব।
      কিছু কুমারী মেয়ে গত কদিন ধরে কৃচ্ছসাধন করে চলেছে। মহাষ্টমীতে তাদের পুজা হবে তাও মানুষেরই কল্যাণে! তৈরি হচ্ছে এই বালিকা হৃদয় কাল সারাদিনের জন্য উপোস থাকার। সবই উৎসব।আরও বিসর্জন চাই!! না এবার মানুষের ঘুরে দাঁড়ানো দরকার! একবার অন্তত বলি প্রদত্ত হতেই পারি আমরা সবাই ঐ পশু আর শিশুদের জন্য! ছাগ শিশু আর ঐ কুমারী দেবীরা আজ সারাদিন কাঁদছে, খিদেয়। উপোষ না করলে বলি প্রদত্ত হওয়া যায়না যে!




শনিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১২

কলাবউ



জ ষষ্ঠী।
স্নান শেষে মণ্ডপে ফিরেছে কলাবউ। এবার শুরু হবে পুজা। ঘিয়ের প্রদীপ, ধূপ ধুনোর গন্ধে আজ মাতোয়ারা এই পট্টি। কাশর বাদ্যির শব্দে খুনসুটি আর অশ্লীল  গালাগাল আজ অনেকটাই কানে আসে না।
সবাই আজও সেজেছে। অন্ধকারের থেকে কালী নিয়ে চোখে পড়েছে কাজল।
কলাবউ স্নান শেষে লাল পাড়ের আটপৌরে শাড়ীটায় জড়িয়ে নিল নিজেকে কোনমতে। হাটের রদ্দি মাল। কলাবউয়ের শরীরে বেড় পায়না। শায়া নেই, শেমিজ নেই, ব্লাউজ নেই।

কাল সপ্তমী।
আজ এই পট্টিতেও কাপড়ের অভাব নেই। ক্ষণে ক্ষণে লাইন ধরিয়ে দিনভর চলছে বস্ত্র বিতরণের পালা। সৌজন্যে লাল বাবু, সবুজ বাবু, তার বাবু, পাড়ার বাবু, কর্পোরেশনের বাবু, সব বাবুর ফিনফিনে আদ্দির সাদা পাজামা পাঞ্জাবী আজ পতপত করে উড়ছে। ফ্ল্যাশের ঝলকানি, ক্যামেরা, ক্লিক।
ক্যামেরার চোখও মেয়েমানুষের শরীর দেখলে তিড়িং করে বেড়িয়ে যায়। স্পীড কন্ট্রোল হয়না। আর যা হবার তাই হয়। ছবি সব ঘোলাটে, আর নাহয় ঝাপসা।

কলাবউয়ের পুজো শুরু হয়েছে।
এই পট্টির পুজোয় ভিড়ও হয়। মানুষেরা ঠাকুর দেখতে আসেনা। শরীর দেখতে আসে।
এই পাড়া দেখে ঠাকুর। কলাবউয়ের অস্বস্তি আরও বাড়ে। রাত আরও বাড়ছে।
লাল পট্টির মানুষেরা সব যে যার ঘরে। যে বাবু বস্ত্র বিতরণ করছিল এতক্ষণ এখন সে নাঙ্গা। ইস।

কাল সপ্তমী সকাল।
নবমীনিশিতে কে বলি হবে কে জানে! ভালো করে শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে নেয় কলাবউ। নীলকণ্ঠের লতাতেই জড়িয়ে নিল নিটোল সবুজ শরীর তার। লাল সিঁদুরে অন্তর্জলী যাত্রা আজ সাঙ্গ হলো।

আজ ষষ্টি।
আসছে বছর এই পট্টির কলাবউয়ের কাপড় হবে কমপক্ষে দশহাতি। শরীর দেখা যাবে না কোন বউয়ের। এটাই পুজোর থিম হোক না আসছে বছর!

আর্টিকেলটা এখুনি পাঠাতে হবে প্রেসে। নাহলে খাবে না ঠিকঠাক।

শুভষষ্ঠী বন্ধুরা।



শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১২

কাবেরির তীরে



ফুলের বাগিচায় হার মানে যুদ্ধ হৃদয়
হৃদয়ের রক্ত বালিয়াড়ি হয়ে গেলে
স্বর্ণ রেণু হাসে দোজখে

অজন্মা মাঠ, ঘুমহীন সুরমা চোখ
গঙ্গা মাটির তিলক, জবাকুসুম আলতা
সব নিলামে কাবেরীর তীরে

বাঁদি বাজারে অক্ষত সলমাচমক চাঁদ

অসূর্যস্পর্শা নারী সেজেছে আজ দুর্গা
রাজা, বাদশার উপাদেয় শরীর

পদ্ম পাতায় ভাসান দেয় শরৎ মেঘ
হৃদয় কর্পূর হয়ে পাড়ি দেয় বান্দার ঘাড়ে
চেপে মরা নদীর কাছে

নিহত গোলাপের কাছে

হৃদয়ের সব রক্ত জমাট বেঁধে গেলে
অসুর নিধন হয়, ত্রিশূল বিঁধে যায়
লাল হৃদয়েই হাজারবার, বারবার



শনিবার, ১৩ অক্টোবর, ২০১২

উপন্যাস ‘কমলিনী উপাখ্যান’: একটি সহজ পাঠ

“এই মেয়েটিরে লইয়া তাহার ভিতরে ময়ূরপঙ্খের তুল্য আকাশ; বৃষ্টির বিন্দুমাত্র চিহ্ন নাই, অথচ কান্দিতে আছে—যা এই হাৎকা হইয়া উঠা নাগরেরা চোখের নাগালে পায় না। তাই মস্করা ইত্যাদি, মণ্টু ঘোষের দোকানে, বিপ্রকে স্পর্শে না। গ্যাঁজাইবার বিষয় অভাব হইলে , যদিও ইয়েনান বক্তৃতা হইতে লোডশেডিং পর্যন্ত হাজার বিষয়, তবু মেয়েটির বৃত্তান্ত একা ঘুরিয়া বেড়ায়। এবং গ্যাঁজাইবার আবেগ ক্ষীণ হইলে, বিপ্র ভূমিকাহীন প্রস্থান করে। ঘোষের দোকানে ইহা নিত্য ঘটনা, বিশদে বলিবার কিছু নাই। যদিও পরবর্তী ঘটনা সকলের গোচরে ঘটেনা, উহা কমলিনীর পাঠক্রম।”—এভাবেই শুরু হয়েছে পল্লব ভট্টাচার্যের উপন্যাস ‘কমলিনী উপাখ্যান’ । উপন্যাসটি কমলিনীর পাঠক্রমই বটে। আশির দশকের মাঝামাঝি ১৯৮৫-৮৬তে পল্লব যখন সদ্য কৈশরোত্তীর্ণ তরুণ, তখন লেখা এই উপন্যাস ছেপে বেরিয়েছে এই সেদিন ফেব্রুয়ারি, ২০১২তে। বের করেছেন ত্রিপুরার বিখ্যাত প্রকাশক ‘অক্ষর’। কিছু কিছু লেখা আছে লোককথার সেই কচ্ছপের মতো এগিয়ে গিয়ে পাঠকের দরবারে পৌঁছোয়। আর আমাদের পূর্বোত্তরের কোনো প্রকাশনা হলেতো আর কথাই নেই।সবারই প্রায় ভাগ্য সেই একই। পল্লবের উপন্যাসটি তাই। খুব পরিচিত নয়, কিন্তু আমি নিশ্চিত যারা পড়ে ফেলেছেন একবার কমলিনীর প্রেমে পড়ে গেছেন, নিশ্চিত। কমলিনীর তাঁর ভাবনাকে গ্রাস করবে, এবং ‘বৃত্তান্ত একা’ ঘুরে বেড়াবে। আমাদেরও তাই হয়েছে। কেন, বলছি।
                  তার আগে জানিয়ে দিই, পল্লব ত্রিপুরা নিবাসী। পূর্বোত্তরের বাংলা কথা এবং কবিতা সাহিত্যে তিন দশক ধরে এক পরিচিত এবং সম্মানিত নাম। যারা সাহিত্য পাঠ করেন নিত্য, তাঁরা পল্লবের লেখা না পড়ে ফেলে রাখেন না। নিত্য পাঠ যাদের অভ্যাসে নেই তাঁরা হয়তো তাঁর নাম জানেন না তেমন, কেননা পল্লব প্রচার যেদিকে-- হাঁটেন তাঁর উল্টো পথে। যে পথে কমলিনী হাঁটে । একা নিঃসঙ্গ।
                  কী নিয়ে লিখেছেন উপন্যাস? ওই যে লিখেছেন ‘উহা কমলিনীর পাঠক্রম।” এইটেই উপন্যাসের বিষয় বটে।কমলিনীর পাঠক্রম। ‘...তবু মেয়েটির বৃত্তান্ত একা ঘুরিয়া বেড়ায়।’ সেই বিপ্র আর কমলিনীর প্রেমের কথাতে কথাতে আসছি পরে। কিন্তু এ মন্টু ঘোষের চায়ের দোকানে বসে যে আড্ডা, সেই আড্ডার কাহিনিও বটে। আড্ডার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা, আড্ডার থেকে বেরিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর জীবন বৃত্তান্ত। পড়তে পড়তে মনে হয় যেন, এই জীবন এক বৃহৎ আড্ডাশালা। আমাদের কোন অসুবিধে নেই যদি পাঠকের মনে পড়ে যায় সেই বিখ্যাত শব্দটি , ‘মধুশালা।’ হরিবংশরাই বচ্চনের সেই বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থটির নাম। সেই আড্ডাতে ‘গ্যাঁজাইবার আবেগ ক্ষীণ হইলে’ বিপ্রের মতো কেউ কেউ কমলিনীর সন্ধানে ‘ভূমিকাহীন প্রস্থান করে’ মাত্র। উপন্যসের শেষে বাসে চড়ে বিপ্র সেই বৃহৎ আড্ডাশালা থেকে তাই করে।
                এবারে, আড্ডার কাহিনি লেখক লিখবেন কী করে? আড্ডার কি আর কোনো পুনরুপস্থাপন সম্ভব? সেতো এক মহা বিশৃঙ্খল ব্যাপার। আড্ডাতে বসে আমরা করি বটে গল্প। কিন্তু সে গল্পের কি আর কোনো শুরু আছে, না শেষ? দ্বিতীয় ব্যক্তিটি এসে কথা বলতে শুরু করলেই শুরু, এবং শেষ ব্যক্তিটি উঠে গেলেই শেষ। মাঝের খেই কে কবে ধরতে পেরেছে? সেখানেতো কথা হয় ‘ইয়েনান বক্তৃতা হইতে লোডশেডিং পর্যন্ত হাজার বিষয়’ নিয়ে। সেই অসাধ্য সাধনের এক পরীক্ষা করেছিলেন সদ্য কৈশরোত্তীর্ণ তরুণ লেখক। এবং আমাদের অভিমত তিনি আশ্চর্যরকম সফল হয়েছিলেন।আড্ডার সমস্ত রং রূপ এনে এই উপন্যাসে তিনি হাজির হয়েছেন। এমনকি তার ভাষাটিও। তাই কিছু কিছু পাঠকের মনে হবে বড় বিশৃঙ্খল বয়ন এর। সে অর্থে কোনো কাহিনি নেই। চরিত্রগুলো গল্পের টানে গড়ে উঠেনা, লেখকের সৃজনী ইচ্ছার টানে গড়ে উঠা চরিত্রগুলো যখন খুশি তখন এসে হাজির হয় এসে । লেখকও যদি আড্ডা দিতেন পাঠকের সঙ্গে তবে তিনি যে বিশৃঙ্খলার সূত্র মেনে চলতেন, পল্লব তাই করেছেন। ফলে যে পাঠক আড্ডার মেজাজে না বসবেন , তিনি বইটা হাতে নিয়েও মাঝপথে পড়া ছেড়ে দিতে পারেন। তাই বলে, সত্যিই কিন্তু বিশৃঙ্খল নয় এই উপন্যাস। এমনটা হয় না, যদি লেখক পাকা হন। কেউ কেউ আজকাল কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে বলেন বটে, জীবন বড় বিশৃঙ্খল, সুতরাং সাহিত্যও হবে সেরকমই। কিন্তু সে হচ্ছে অর্ধবিজ্ঞান এবং অর্ধ সাহিত্য তত্ত্ব। বিশৃঙ্খলার যে তত্ত্বটি রয়েছে বিজ্ঞানে, ইংরেজিতে যাকে বলা হচ্ছে ‘কেওস থিয়োরি’, সে কিন্তু শেষ অব্দি এক শৃঙ্খলার কথাতে এসেই শেষ হয়, না হওয়া অব্দি তৃপ্ত হয় না। পল্লবের উপন্যাসটিরও রয়েছে সেরকম শৃঙ্খলা। তাঁর এক চরিত্র অশেষ গুপ্ত এক জায়গাতে বলছিলেন, “ তত্ত্বের সৌন্দর্য বড়ো কথা নয়। পরীক্ষার সঙ্গে না মিলিলে সেটা ভুল তত্ত্ব।” আমরা জানিনা, পল্লব সেরকম কিছু তত্ব্ব নিয়ে পরীক্ষা করছিলেন কিনা, কিন্তু তার উপন্যাস ‘বিশৃঙ্খলা’র তত্ত্বকে সত্য প্রমাণিত করে যেন। বস্তুত তাঁর উপন্যাসটি জীবনের সেই শৃঙ্খলারই সন্ধানের গল্প। কমলিনী সেই শৃঙ্খলারই নাম। আমরা কমলিনীর কথাতে আসব পরে। সেটি থাক শেষ পাতে আকর্ষণের মতো। আপাতত আড্ডার মানুষগুলোকে চেনা যাক। আড্ডা বলেই কথা। একে ধরতে গেলে আমাদেরকেও পল্লবের পথেই বুঝিবা হাঁটতে হবে, বহু কথা ধরা দেবে, বহু কথা নয়।
             কারা আসেন মন্টু ঘোষের দোকানে? বিপ্র আসে সেতো জানাই গেল। আসে যুধিষ্ঠির, হিমাদ্রি, শ্যামল, পার্থ, সৌরীন আরো অনেকে। অবনীমোহন যেমন বিপ্রের বাবা, লাবণ্য মা--তেমনি নানা চরিত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যাদের দেখা মন্টু ঘোষের দোকানে পাওয়া যাবে না। কিন্তু উপন্যাসে রয়েছেন। যেমন, প্রসন্ন চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী দীপালি, উপপত্নী মীনারানি, অখিল, বিনয় মন্ডল, অশেষ গুপ্ত, রঞ্জন, জবা, নুনু, গরিবা, নিরাপদ, প্রতিমা, আব্বাস আলি ইত্যাদি। এরা কোথাকার লোক, কোন শহর কিম্বা প্রদেশের কোনো তথ্য নেই। কিন্তু অধিকাংশ চরিত্র পাহাড় ঘেরা সমতলের এক আধাশহরের বাসিন্দা বলে মেনে নিতে কোনো অসুবিধে নেই। তার উপর, ভাষাতে ওমন পূর্বোত্তরীয় প্রচুর নাম-ক্রিয়াপদের অনুপ্রবেশ দিয়েও লেখক নিজেই ইঙ্গিতটি দিয়ে রেখেছেন যে এটি আসলে ত্রিপুরারই গল্প।
              “মণ্টু ঘোষের দোকানের যা হাল, তাহাতে কীই বা বেচিবার থাকে। আর এই দোকানে যাহারা কিনিতে আসে তাহাদেরও যে হালৎ, তাহাতে কেনাবেচা দুটোই হাস্যকর চেষ্টা। যুধিষ্ঠির তাই বলে, ঘোষের দোকানে তো কাস্টমার নাই, সব কাস্টকুমার” এই হলো সেই দোকান যেখানে আড্ডাটি বসে। বিপ্র এই আড্ডার পার্শিক চরিত্র, কিন্তু উপন্যাসের কেন্দ্রীয়। সে অবনীমোহন লাবণ্যের চতুর্থ সন্তান। তাঁর বড় ভাই ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে কাজ করে। বাড়িতে থাকা না থাকার সময় অসময় নেই। মেজো ভাই দূরে কোথাও থেকে ব্যক্তিগত কোম্পানিতে কাজ করে। ব্যস্ততা এতোই যে অবনীমোহনের মৃত্যুতেও বাড়ি আসার ছুটি পায় নি। আর সেজোটি অনেক কিছুই করে, কী –সেটি কেউ জানে না, মা লাবণ্যও না। তবে টাকা বানাচ্ছে এটা বোঝা যায়। কিন্তু বিপ্র বৈষয়িক অর্থে কিছু করে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার ছাত্র ছিল এখন চিন দেশের লংমার্চের কাহিনি পড়ে। আর কমলিনীর সন্ধান করে। বিপ্র কী করে খাবে, ভেবে মায়ের চোখের জল ঝরে। বাবা অবনীমোহন কিছু একটা চাকরি করতেন, তিরিশ বছর চাকরি করে লোয়ার থেকে আপার ডিভিশনে উঠেছিলেন। কিন্তু শ্বাস ফেলে টের পেলেও বেঁচে যে ছিলেন সেটি টের পেতেন না। বিড়িতে তেতো টান দিতেন, মানে খুব একটা স্বচ্ছল জীবন ছিল না। তাঁর শেষ জীবনে বেকার বিপ্র যখন ভাতের গ্রাস মুখে তুলত মনে হতো বাবার হাড় চিবুচ্ছে। নিজেকে মানুষ ভাবতে ঘেন্না করত। লেনিনের ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে কী করিতে হইবে?’ পড়তে পড়তে বিপ্রের মনে হয়, কোথায় পৌঁছুবেন না জেনেও বাবা কিন্তু বেঁচে থাকতে চান। না চাইলেই কি আর অনর্থক মরে যাওয়াটাও উচিত? এর মধ্যে কি আছে কোনো বীরত্ব? এই সব প্রশ্ন তাকে কিম্বা লেখকে তাড়া করে। ওদিকে গোপন বিপ্লবী দলের কর্মী কবি অশেষ গুপ্তের লাস যখন পথের পাশে পড়ে থাকতে পাওয়া গেল, তখন তাঁর প্রতি সমস্ত শ্রদ্ধা নিয়েও কৃষ্ণসুন্দরের মনে হয়, এও এক অর্থহীন অপরিপক্ক মৃত্যু। দেশের জন্যেও মরবার সঠিক মুহূর্ত সেটি ছিল না। তবে কিনা বিপ্রের এই জিজ্ঞাসা উত্তরাধীকার সূত্রেই পাওয়া। কোন এক মুহূর্তে অবনীমোহনের মনেও প্রশ্ন জাগে, ‘মায়া যাহাকে জড়ায় সে অবনীমোহন হয়। অবনীমোহন হইয়া কী পাওয়া গেল?’ তাঁর আক্ষেপ, ‘...ফুরাইবার আগে একবার দপ করিয়া জ্বলাও হইল না।’। সেই জ্বলার আশাপ্রদীপ, তিনি বিপ্রের মধ্যে জ্বলে উঠবে বলে মনে করেন। বিহারি গরিবা গাঁজাও বিক্রি করে। তার সঙ্গে বিপ্রকে দেখে তাঁর সন্দেহ হচ্ছিল, তিনি যে তাকে স্বপ্নের সফরি ভেবে নিশ্চিন্ত থাকতে চাইছিলেন, সে চাওয়া কি ভুল ছিল? এ তাঁর সন্দেহ ছিল মাত্র। বিপ্র বস্তিবাসীদের জীবনের আঁচ নিতে গিয়ে গাঁজাতে টান দিয়েছিল বটে, হাত জোড় করে গরিবাই মানা করেছিল। যাতে করে নিজেকে তার মনে হয়েছিল, সে গরিবারও সন্তান। সেই গরিবাই পথে পেয়ে তাকে একদিন বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার সংবাদ দিয়েছিল।
                কৃষ্ণসুন্দর বয়সে প্রবীণ। খুব যে বয়স তা নয়, ছেচল্লিশ। এই বয়সেই যেন মনে বুড়িয়ে গেছেন। শ্মশানে দাঁড়িয়ে অবনীমোহনের শরীরে পুড়ে যাওয়া দেখে মনে হচ্ছিল, ‘কত কিছু হইতে চাওয়া আর না পারা একটি শরীর ধোঁয়াতে মিশিয়া যাইতেছে...পুড়িয়া যাইতে আছে। মনে মনে তিনিও পুড়িতেছেন।’ বিপ্রের ভাবগুরু কি অনেকটা? না হলেও পরিপুরক। মানে তাঁর জিজ্ঞাসা যেখানে থৈ পাচ্ছে না, সেখান থেকেই বিপ্রের শুরু। মন্টু ঘোষের দোকানের ধুলিকালির বেড়াতে বহুদিন ধরে ঝুলন্ত উড়ন্ত এরোপ্লেনের ছবি ওয়ালা ক্যালেণ্ডারের দিকে তাঁকালে তাঁর বিষন্নতা বাড়ে। গতির এমন স্থির চিত্র এ জীবনে আঁকা হবে না ভেবে, পাক ধরা চুলে হাত বুলিয়ে তিনি আন্মনে বলে উঠেন, “যৌবন যায়...” । ছেলেবেলা কিচ্ছু না বোঝে ‘ভুলো মৎ, ভুলো মৎ’ স্লোগানে গলা মিলিয়ে জেঠার হাতে মার খেয়েছিলেন। বোধকরি, ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’ স্লোগানের দিকে লেখকের ইঙ্গিত। রাতে বিধবা মা তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, ‘সত্য কথা কহিতে নাই।’ ছোটবেলার স্বাধীনতা মানেই রিফিউজি কলোনির স্কুলে চকলেটের দিন। বন্দেমাতরম বলে চিৎকার করবার দিন। স্বাধীনতার মানে বুঝবার দিন নয়। বোঝেনও নি । জেঠার গলগ্রহ হয়ে বড় হয়েছেন। বড়বেলাতে বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়া দেখেছেন। কিন্তু স্বাধীনতার যে মানে তিনি বোঝেছেন, তা দেখেন নি কোথাও। কলকাতাতে (নামটি নেই, মহাকরণের উল্লেখ থেকে আমাদের অনুমান) কলেজ পড়া কৃষ্ণসুন্দরের জীবন থেকে একে একে চলে গেছে বন্ধুরা, উৎপল, ত্রিদিব, খুকু, শুভেন্দু...। কেমিস্ট্রির ছাত্র ত্রিদিব সত্তরের নকশাল আন্দোলনে সময়ের আগে বোমা ফোটাতে গিয়ে ‘ঠুণ্ডা জগন্নাথ।’ বোমা ফুটুক, কিন্তু সমস্ত প্রস্তুতির পর --এই ছিল কৃষ্ণসুন্দরের মনের বাসনা, যা তিনি এখনো মনে মনে লালন করেন। তাই জীবনের সমস্ত শ্লোগান মুছে ফেলে উৎপলের শেক্সপিয়র পড়াতে ফিলাডেলফিয়া চলে যাওয়া, তাঁকে ম্লান করে। খুকু ভালো গান করত, এখন হারমোনিয়ামে , ‘কিচেনের ভারে, গয়নার ধারে’ ধুলো জমেছে বহুদিন। শুভেন্দু করে মানবাধিকার সংগঠন সি আর পি সি। কৃষ্ণসুন্দর কোথায় তারা কেউ জানে না। তাঁর ধারণা, জানে হয়তো জবা। জবাকে নিয়ে রঞ্জনে তাতে এক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। এবং জবাকে নিয়ে গেছিল রঞ্জন। সেই রঞ্জন যে তাঁকে প্রথম বুঝিয়েছিলেন, ‘তাড়াহুড়া করে,বাইরে থেকে চাপ দিয়ে কিছু পাল্টানো যায় না...ভেতর থেকে পাল্টানোর জন্যে সময় দিতে হয়। ঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে হয়।’ বোঝাই যায় এই তর্ক তাঁর যৌবনের মার্ক্সবাদী কম্যুনিষ্ট দলের দুই লাইনের তর্ক। এবং রঞ্জনের পক্ষ কিছুদিন পরেই শাসনে বসেছিল। তার জন্যে কোনো সময়ের অপেক্ষা করে নি। ‘কী এক কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান হইয়া সেই রঞ্জন দত্ত, আজকাল তাহার সাদা অ্যাম্বাসেডরের ভিতরে বসিয়া কালো কাচ দিয়া বাহির দেখে।” জি-কে পরীক্ষাতে পাঁচ নম্বর ছেড়ে দিয়ে ছেলে সন্তানটি তার সমস্ত পরিশ্রমে জল ঢেলে দিয়েছে বলে লিপস্টিকে কদাকার ঠোঁট উল্টে জবা এখন দুঃখ করে। এখন সকাল থেকেই তিনি ‘জর্ডনের বিশুদ্ধ জল’ গলায় ঢালেন, এই কৃষ্ণ সুন্দরের নিত্য সঙ্গী। ‘সকল কিছুর পর উহাতেই মুখ দেখিতে হয়।’ অথচ এক কালে ইনি ভালো বাঁশি বাজাতেন। এখন মদ্যপানও তাঁকে উদাস করে। জীবনের নদী এখন মরে গেছে, মাছ দূরেই থাক , কাদাখোঁচাও আসবে না। শুধু ‘ঘুম আসিবে মৃত্যুতুল্য আচ্ছন্নতায়...।’ ভাবতে ভাবতে কান্না পায় তাঁর কখনো...অধ্যাপক বুদ্ধিজীবি প্রশান্ত কুমার দেবের সভাতে বক্তৃতা শুনে পার্থ যখন কাগজের খবর পড়ে বোমা মারবার ইচ্ছেতে উত্তেজিত হয়, তাঁর তখনো মনে হয় নিজেকে পুড়িয়ে আলো হতে চেয়েছিলেন। এখন পড়ে আছে শুধু ছাই আর ধ্বংসস্তূপ। পিকেডি-র বক্তৃতা শুনতে শুনতে তার মনে পড়ে কলেজের দিনগুলোর সেই মূর্তিভাঙার বিপ্লবীআনার রাজনীতির কথা। বাস্তবতার বাইরে যা আজও মনকে লোভায় তেমনি এক অন্যতর মূর্তি যেন আজ আবার তৈরি করছেন পিকেডি আটটি খণ্ড দলিল জুড়ে জুড়ে। পাঠকের বুঝতে অসুবিধে হয় না, চারু মজুমদারের আটটি দলিলের কথা হচ্ছে। সেই বক্তৃতা শুনতে শুনতে তাঁর মনও যে আবার এতোদিন সামান্য উত্তেজিত হচ্ছিল না তা নয়। কিন্তু আবার মনে পড়ে যায় সৌরীণদা এখন পাগলা গারদে। নির্বাক। তিনি যেন সেই ভেজা দিয়াশলাই কাঠি যাতে আর কোনো অগ্নিগুণ থাকে না। ‘পুনরায় যদি রৌদ্র হইতে উষ্ণতাপ সংগ্রহ করা যায়, তবে জ্বলিলেও জ্বলিতে পারে এক আধটা কাঠি।’ সেই কাঠি যেন উপন্যাসের শেষে এসে তিনি খুঁজে পান বিপ্রের মধ্যে। কমলিনীর সন্ধানে বিপ্র যখন বাসে চড়ল, বিদায় জানাতে এসে কৃষ্ণসুন্দরের মনে হচ্ছিল বাসের ভেতরেও আসলে বসে আছে কৃষ্ণসুন্দর।
                 প্রসন্ন চৌধুরী আরেকটি বেশ বড় চরিত্র এই উপন্যাসে। তাঁরই যেন পরোক্ষ কিম্বা প্রত্যক্ষ শাখা প্রশাখা অখিল, রঞ্জন ইত্যাদিরা এবং তাঁর স্ত্রী দীপালি অবশ্যই। তাঁকে না বুঝলে আসলে বিপ্র কৃষ্ণসুন্দরের এহেন হতাশার কিছুই বোঝা হবে না।যদিও ইনি ঘোষের দোকানের আড্ডার কেউ নন।বাংলার শিক্ষিকা স্ত্রী দীপালি আর কলেজের হোস্টেল ছেড়ে আসা মেয়েকে নিয়ে তাঁর ছোট সংসার। পার্টি করতে করতে আর নির্বাচন লড়তে লড়তে , মেয়ে বৌএর দিকে নজর দিতে পারেন নি খুব। তাই মেয়ে যখন হোস্টেল ছেড়ে আসে, পাশে বসিয়েও কারণটি জিজ্ঞেস করে উঠতে পারেন নি ভালো করে। যৌবনে স্বাধীনতার জন্যে লড়েছিলেন, কিন্তু স্বরাজ আসেনি বোঝেন। জীবনানন্দের কবিতা বুঝতেন, কিন্তু এখনকার জীবনের মানে বোঝেন না। কিন্তু ইনি কৃষ্ণসুন্দর নন। ‘বহুৎ মাছ খাইয়া এখন বিড়াল তপস্বী হইয়া’ আছেন। জীবনের শেষ বেলাতে এসে এঁর ব্যর্থতা বোধ তাঁকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে যেন। মনে হয়, জীবনে সবই হয়ে গেল, যা চেয়েছিলেন তা নয় তেমন, যা চাননি তাই। তিনি কিছু করেন না যেন। নির্বাচনের সময় এলে পার্টি তার নাম নিয়েই ফেলে, তিনিও দাঁড়িয়ে পড়েন। জিতেছিলেন একবারই। তার নামে এক জমিও এসে গেছিল। কোন এক সেটেলমেন্ট বাবুর পেন্সিলের টানে বিনামূল্যেই। নির্বাচনের সময়ে নিজের কিছু নেই দেখাবার জন্যে সমস্ত স্থাবর সম্পত্তিই লিখে দিয়েছিলেন দীপালির নামে। আজ তাঁর সত্যি মনে হচ্ছে, কিচ্ছুটি নেই। তিনি নিঃস্ব। সেখানে তিনি নুনু-যতন-গরিবাদের বসিয়েছিলেন। যতনার মতো অনেকে তাই তাঁকে দেবতা জ্ঞান করে। দীপালির বড় ইচ্ছে এই জমির একটা হিল্লে করা, দালাল নিরাপদকে জুটিয়েছেন। এখন সেখানে এক ফ্যাক্টরি বসবে। প্রসন্নের ইচ্ছে নুনু-গরিবাদের লিখে দিয়ে দেয়া। গণি মিঞা উকিল তাঁর বন্ধু ছিলেন, মারা গেছেন। তিনি থাকলে বুদ্ধি দিতেন। এখন বৌ বলে কিনা, ‘বিনবায় ধরছে, ভূদান করবা? তা চুপে চুপে ক্যান, পত্রিকায় দাও, যাতে খবর হয়।’ জমি বিক্রির জন্যে দীপালি দালাল নিরাপদের সঙ্গে নিরাপদ যোগযোগ গড়ে তোলেন। নুনুদের বস্তিতে বিপ্রের যাতায়াত ছিল। তাদের মধ্যে গিয়ে সে এক তথ্যচিত্র করে, ‘পভার্টিঃ কজ অফ ইণ্টারনেল মাইগ্রেশন’। ব্যয় কোত্থেকে আসবে, বিনয় সেই প্রশ্ন উঠলে শ্যামল, যুধিষ্ঠিরেরা জবাব দেয়, চাঁদা তুলে হবে সেই চিত্র। ‘বস্তি উন্নয়ন কমিটি’ সম্প্রতিই শুধু বানিয়ে রেশন কার্ড পাইয়ে দেবার ব্যবস্থা করেছে সে এবং তার সঙ্গীরা । জমির মালিক প্রসন্ন চৌধুরী , এ কথা জেনে বলেছিল, ‘যারই হোক, জমি ছাড়বে না।’ জমি তাঁকে জমিদার বানিয়েছিল বটে। ইয়ার দোস্ত চ্যালাও ভাল জুটেছিল। তাদেরই কেউ তাঁর কাছে নিয়ে এসছিল সদ্য বিধবা মীনারানিকে । এসছিল কাজ চাইতে, তিনি ঠাই দিলেন খামার বাড়িতে। খামার বাড়িতে ধান তোলা, সেদ্ধ করা ছাড়াও আর যা কাজ তাকে করতে হয়েছিল, তাতে শরীর ছিঁবড়ে হয়ে এসছিল। শেষ কালে প্রসন্নের পায়ে পড়ে মীনারানি ভিক্ষে করেছিল , মরলে যেন তিনি মুখে আগুন টুকু দেন। দেন নি। সকালে যে খবর দিতে এসছিল তার হাতে টাকা কটা ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘দায় সারো’। তখনই আসছিল দীপালির সন্তান, মাতৃসদনে। এখন যখন মেয়ের ক্ষোভ বুঝে উঠতে পারেন না, ইচ্ছে জাগে, ‘সব যদি আবার নতুন করে শুরু করা যাইত...বড়ো ভুল হয়ে গেছে , মা...।’ বস্তুত প্রসন্ন চৌধুরীই বোধ করি সেই ব্যক্তি যিনি ‘কমলিনী’র বৃত্তান্তকে অনেক বেশি স্পষ্ট করেন। তিনি শাসক শ্রেণি এবং দলের লোক বটে, ব্যবস্থার ভেতরের লোক। কিন্তু ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক নন। ইচ্ছে করলেই সব পালটে দিতে পারেন না। বিপ্রের মনে একবার প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল, ‘নিজের জীবন কি সত্যই রচনা করিতে পারিতেছে! পারা যায়? পূর্বে রচিত না হইলেও, পারিপার্শ্বিক দ্বারা রচিত হইবার নানাহ সম্ভাবনা লইয়া, জীবন রচিত হইয়া চলিতেছে। ইহাতে হয় স্রোতে ভাসিতে হইবে, নয় প্রতিস্রোতে। প্রায় সকলেই বলে, সে প্রতিস্রোতে ভাসিতেছে, কিন্তু ইহা যে আদতে স্রোত নয়, একথাই বা কে নিশ্চিত বলিবে?’ সেই প্রতিস্রোতের স্রোতকে ভয় করছিল বিপ্র। কিন্তু সেই স্রোতেই গা ভাসিয়ে বিপন্ন প্রসন্ন চৌধুরী আসলে এই উপন্যাসের এক ট্রাজিক চরিত্র। তাঁর প্রতি ঘৃণার উদ্রেক ঘটিয়ে নায়ক খলনায়কের দ্বন্দ্বে জমিয়ে তুলতে যান নি পল্লব এখানেই তাঁর মুন্সিয়ানা। বরং প্রশ্নগুলোকেই আরো ঋদ্ধ করেন। তিনি হতে চেয়েছিলেন এক ‘না-পারা স্বপ্নের সওয়ারি।’ শৈশবে অক্ষম হাতে গোরা সৈন্যের দিকে ঢিল ছুঁড়েছিলেন। মড়কের রোগীর পথ্য কিনতে গিয়ে বাবার পকেট কেটেছিলেন। আখড়াতে লাঠি খেলা, ছুরি খেলা শিখেও বিশ্বাস করতেন ‘চরখা আর খাদিতে আত্মনির্ভর হইবে পচা পানার ম্যালেরিয়া গ্রাম।’ কিন্তু মাঝ বয়সে এসে স্বাধীনতার যে চেহারা দেখলেন এবং নিজেও আঁকলেন তাতে নিজেই অবাক হন। ‘তিনি ভাবিয়াছিলেন স্বাধীন সমাজের সেনা -পুলিশের দরকার হয় না। আজ স্বাধীনতাই সেনা ও পুলিশনির্ভর। হয়তো সেই চাওয়া এক শতাব্দীর কাজ ছিল না, তবু তাহারে মূর্তি বানাইয়া, তাহার ভাবনা সহ দেশকে এমন এক অটোমোবাইলে তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে, যাহার ব্রেক নাই। ছুটিতে আছে এক অনিবার্য ধ্বংসের দিকে।’ ভয় হয়, আজকের ছেলেরাও কি সেই যৌবনের প্রসন্ন হতে গিয়ে বার্ধক্যের প্রসন্ন হয়ে পড়ছে? এখনো ইচ্ছে করে নিজেকে পাল্টাবার , কিন্তু চৌধুরী বংশের আভিজাত্যকে মরতে দিতে মন সায় দেয় না। তাঁর এই দ্বন্দ্বের শরিক নন স্ত্রী দীপালি। তাঁর সমস্যা অন্য। নষ্ট প্রসন্নের সঙ্গিনী ছিলেন আজীবন। নিজেকে এক সময় মনে হতো প্রসন্নের হাতের পুতুল। সেই পুতুল জীবন থেকে বেরিয়ে আসতেই তাঁর প্রয়াসগুলো সবল হয়েছে, যখন প্রসন্ন নিজেও আর পুতুল নাচাবার সামর্থ্য রাখেন না কোনো, চানও না। তাঁর গর্ভে মেয়ে এসছিল জ্যোতির্ময়ের সৌজন্যে। অপঘাতে সে মারা যায় । তার কাটা ছেঁড়া শরীরের ফুলে ওঠা, পচা টুকরোগুলো দিন দুই পরে পাওয়া গেছিল এক পুরোনো কুয়োতে। স্পষ্ট নয়, বোধকরি এর জন্যে প্রসন্নকেই দায়ী করেন দীপালি। ওদিকে মেয়ে একান্তে একদিন মায়ের পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে আবিষ্কার করে মাকে লেখা জ্যোতির্ময়ের চিঠি। সেই থেকে তাকে আর বোঝেন না, প্রসন্ন। শহরের কলেজের হোস্টেল ছেড়ে সে অন্য বাড়িতে গিয়ে উঠে। কোথায়, কেন –কেউ জানে না। ব্যর্থজীবন প্রসন্ন ইচ্ছে করলেই জিজ্ঞেস করতে পারতেন, “এ কী কৌতুক নিত্যনূতন/ ওগো কৌতুকময়ী ,/আমি যাহা কিছু চাহি বলিবারে/ বলিতে দিতেছ কই ।/অন্তরমাঝে বসি অহরহ/মুখ হতে তুমি ভাষা কেড়ে লহ ,/মোর কথা লয়ে তুমি কথা কহ/ মিশায়ে আপন সুরে।” জীবনের শেষ বেলাতে এসে মনে হয় এই প্রসন্নই শুধু নুনু-গরীবাদের মধ্যে পেয়েছিলেন কমলিনীর সন্ধান। কিন্তু তখন আর তাঁর করবার বেশি কিছু ছিল না বিশেষ। শুধু উপন্যাসের শেষের দিকে নিরাপদের জবানীতে বিপ্র জানতে পায়, যে মেয়ের সন্ধানে শহরে যাবার আগে চুপিচুপি তিনি জমির সবটাই নুনু-গরিবাদের লিখে দিয়ে গেছেন। বিপ্রও এই প্রথমই মনোযোগ দিয়ে জানতে এবং বুঝতে পারে, জমিটি তাঁর। নিজের বাড়িটি , যে টুকু বোঝা যায়, তাঁকে তুলে দিতেই হয় গোল্ডেন রিসর্ট কনস্ট্রাকশনের হাতে।
               এবারে আমাদের কমলিনীর কথাতে আসতেই হবে। রাধা প্রসঙ্গে শব্দটি অজস্রবার উচ্চারিত হয়েছে বাংলা কবিতায়, গানে। নিধু বাবুর টপ্পাতে আছে, “কমলিনী অধিনী তোমার, শুন অলিরাজ।সদত তোমারে, ভাবি হে অন্তরে, এই মোর কায।” উপন্যাসের শেষের দিকে রয়েছে, বাসে চড়ে বিপ্রের চলে যাবার পথের দিকে তাকিয়ে কৃষ্ণসুন্দর ভাবছেন, “ যাচ্ছিস, যা। জানি না, সেখানেও পাবি কিনা। তবে মনে রাখিস, কমলিনীর দিকে যাওয়ার চেষ্টাটাই আসল।”
                    কিন্তু কমলিনী কি কিছু করে না? সেও কি যায় না? উপন্যাসের শুরু হয়েছে কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে। ‘কমলিনী আমার নাম। আমারে দেখিতে সহসা আয়নার দরকার হয় না। যদিও অই ফুলটি, যাহা জাতীয়, আজ অবধি দেখিলাম না। তবু, নিজেরে যখন দেখি অই ফুলটির মনোলোভা টের পাই বিপ্রের চোখে।’ সে মেয়ে মেয়ে নয়, যে কমলিনী বা কমল ফুল দেখেনি। এই কথাটা এখন বলবার সময় এসে গেল। গুরুগম্ভীর শৈল্পীক কুশলতার সঙ্গে লেখক এক রসিকতাপূর্ণ চালাকি করেছেন পাঠকের সঙ্গে। পাঠকের মনে এক বাসনা জাগে বিপ্র-কমলিনীর প্রেম কাহিনি পড়বেন বলে। কথা যত এগোয়, তিনিও সেই ভ্রমের থেকে বেরুতে থাকেন বিপ্রের সঙ্গে সঙ্গে। অথবা বেরোন না। কমলিনী এক ভাবের নাম। অথবা এক মেয়ের নাম। এর সঙ্গে বিপ্রের আলাপ হয় বিনয়ের পাল্লাতে পড়ে। ভাব হলেও তার আবির্ভাব হঠাৎ হতে পারে নাতো। কেউ আলাপ করিয়ে দিতে হবে। লেখক পরিপক্কতার সঙ্গে কথাটি মনে রেখেছেন। বিনয় মন্ডল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিস্কের ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয় বলতে মনে পড়ল, ত্রিপুরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা কিন্ত ১৯৮৭তে । উপন্যাস লেখা হয়ে উঠবার পরের বছর। তাতে ক্ষতি বৃদ্ধি কিছু হয় নি। বিপ্রের সঙ্গে যেচে এসে ক্যান্টিনে আলাপ। সেই আলাপ সাত মাসের ঘনিষ্ট বন্ধুত্বে পরিণত হলো। এই সাত মাসে, ‘কমলিনী কীরূপে থাকিয়া গেল, গড়িয়া উঠিল। গড়িয়া যে উঠিল, ইহাতে তাহার তেমন ভূমিকা নাই। হয়তো সময়ের জটিলতা। যে জটিলতা লইয়া আজিকাল ঘোষের দোকানেও সে বেমানান।’ বিনয় সপ্রতিভ তরুণ। তার ভেতরে বিপ্রের চোখে ধরা পড়ে যেন যেন এক স্বপ্নের দেশ। চুম্বকের মতো টানে বিপ্র তার অনুগামী হয়ে গেল। মন্টুঘোষের দোকানে একদিন যখন সব্বাই এক জ্যোতিষকে নিয়ে ব্যস্ত হয়েছিল। বিপ্রও খেলার ছলে হাত দেখিয়েছিল, জ্যোতিষ যা বলেছিল, উপন্যাসে সেও অর্থবহ, “আপনার কিছুই পাওয়ার নেই।’ শুনে বিনয় বলছিল, ‘ কিন্তু...বৈষম্য যতদিন থাকবে,...অন্তত হাত চেপেতো আর বসে থাকা যাবে না।” তার টেবিলে তখন গুয়েভারার ডাইরি। বিপ্রের মনে হলো বিনয়ের চোখে লেগে আছে আলো। বিনয়ের সঙ্গে করেই নুনুদের বস্তিতে যায় বিপ্র প্রথম। ‘মিডলক্লাস জীবনের বাইরে যাচ্ছি।’ এই ছিল বিনয়ের উত্তর।
                  এবারে, এই মিডিলক্লাস বাইরের জীবনটি কেমন? ‘গ্রামের বাইরে, বোধ হয় খাসভূমিতে, ঘর নয়, কতগুলা ঝুপড়ি, কোনমতে বান্ধিয়া রাখা, ভাল করিয়া বাতাস আইলে লণ্ডভণ্ড হইয়া যাইবে মনে লয়; এইগুলিতে উহারা থাকে। ভিতরে খাট পালঙ্ক দূরে থাক, একটা কাঁথা কী বিছানাও নাই। দেখিয়া অবধি তাহার মনে হইতেছিল, এমন জীবন আগে দেখে নাই। ঘুমায় কোথায় জিজ্ঞাসা করায়, নুনুর বৌ অবাক চাহিয়া মাটির দিকে আঙুল দেখাইল।’ এই ‘অবাক চাহিয়া’ কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। কৃষ্ণসুন্দর একজায়গাতে ভেবেছিলেন, ‘এ-ই ভারতবর্ষ। এইখানে আসিয়া নিজেরে স্ট্রেঞ্জার বলিয়া বোধ হয়।’ বিনয়রা জানেনা তারা মাটিতে শোয় ---এই তথ্যটাই নুনু তেলেঙ্গার বৌএর কাছে অবাক কথা। বিপ্রও ভাবে, এদের সঙ্গে বিনয়ের পরিচয় কী করে! ‘নুনুদের জীবনে ঢুকিয়া যাওয়া কি সম্ভব, বিনয়ের পক্ষেও? ভাবিয়া পায় না।’ কে কবে এই নুনুদের চা-বাগানের শ্রমিক করে এনেছিল নুনু নিজেও জানে না। মালিক বাগান বেচে দিলে থাকার কোন জায়গা নেই বলে নুনুরা এখানে এসে উঠে। আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি, এই জমি খাস হয়ে নেই। এ জমির মালিক প্রসন্ন চৌধুরী। চাষের কাজ জানে না বলে দিনমজুরি করে। যেদিন কাজ জুটে না পাখি শিকার করে পুড়িয়ে খায়। এই বস্তিতে গরিবারাও থাকে । সে তিনপুরুষের প্রাচীন এখানে। উপন্যাসের শুরুতে আছে কিন্তু দিন তিনেক আগেও একটি লোক বিহার থেকে এসছে। জমি ছিল না। ‘জমিদারের খেতিতে বেগার খাটুয়া বাপ, ভুখ মিটাইতে না পারিয়া উহারে ভাগাইয়াছে।’
             বিনয় আর বিপ্রকে খাওয়াবে বলে বড় আনন্দে নুনু ছুটতে ছুটতে দুটো পাখি মেরেছিল তিরে। সেই মাংস বিনয় খায় নি। বিপ্রেরও উদ্গার এসছিল। কিন্তু বিনয়, বুঝতে না দিয়ে যখন বলল, ‘মাংস বাচ্চাদের দাও নুনু। আমি খাব না...’ তখন নুনুর বকলমায় আসলে বিপ্রেরই মনে হয়েছিল, ‘বাবু, যতই চেষ্টা করো, নুনু হইতে পারিবে না। নুনু হওয়া যায় না।’ সেদিন ফিরবার পথে প্রথমে ধুলি ঝড় এবং বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছিল এদের দু’জনকে। কাছেই টিলার উপর শাদা বাড়ি। প্রসন্ন চৌধুরীর বাড়ি এটা বিপ্র বিনয় কেউ জানত না। ‘বৃষ্টিতে ভিজিতে ভিজিতে দেখে , ক্রমশ আকাশ মাঠ শাদা হইয়া যাইতেছে। সমস্ত নীলাভ কালো মুছিয়া, শাদা বাড়িটিও আর স্পষ্ট নয়, জলরঙে ধুইয়া গিয়াছে।’ বিপ্র দেখছিল দাঁড়িয়ে। বিনয় বলল, ‘বৃষ্টি আর থামবে না, চল যাই।’ কিয়ৎক্ষণ পরে বিপ্রের উত্তর, ‘ চল, অই বাড়িতে যাই।‘ ‘কী করবি গিয়ে? কাউকে চিনিস, না কেউ তোকে চেনে?’ বিপ্র তখন নিজেতে মগ্ন। বুঝিবা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়। বিনয়ের আবার জিজ্ঞাসা, ‘ তুই চিনিস?’ নিজের ভাবনা বলয়ের ভেতর থেকে অস্ফুট উত্তর ‘কমলিনী’।
             বাস্তবে বাড়িটি প্রসন্ন চৌধুরীর। তাঁর একটি মেয়ে আছে। যার কোন নাম নেই উপন্যাসে। ওদিকে কমলিনীর নেই কোন শরীরী অস্তিত্ব। সেই কি কমলিনী? দুই কি এক? তাকে যে কোথাও ভালো করে দেখেছে বিপ্র, পাশে বসে দুটো মনের কথা বলেছে কোনদিন-- সেরকম একটিও তথ্য নেই গোটা উপন্যাসে। এর কি দুটো ইঙ্গিত? এক , দু’জনের সত্যিই বাস্তব সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তাই উপন্যসের শেষে সেই মেয়েটি যেমন নিরুদ্দেশ, বিপ্রও যাত্রা করে সেই নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে। কিন্তু প্রবল অস্পষ্টতা আছে সেই সম্পর্কের। এমন কি, বিপ্রতো এও জানতো না বাড়িটি প্রসন্ন চৌধুরীর। যেদিন জেনেছিল, সেদিনই শুধু সে সব ছেড়ে বাসে চড়ে বসে। সুতরাং প্রথম সম্ভাবনাটি নাকচ হয়ে যায়। দুই, তেমন প্রবল না হলেও অস্পষ্টতা প্রসন্ন চৌধুরীর মনেও রয়েছে নিজের মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে। তিনি জানেনও না সে তার নিজের ঔরসজাত নয়। তিনও শহরে ছুটছেন মেয়ের সন্ধানে। পাচ্ছেন না। বিপ্র প্রসন্ন দু’জনেই তখন সন্ধান করছেন জীবনের মানে, দু’জনেই কিন্তু দুভাবে জুড়ে গেছেন নুনু তেলেঙ্গাদের জীবনের সঙ্গেও । নুনুদের জমির অধিকারের প্রশ্নে দু’জনের অবস্থানের কোনো ভিন্নতা নেই। এই অধিকার সাব্যস্ত করা নিয়ে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে লড়ছেন যখন তখনই নিজেকেও প্রসন্ন চৌধুরীর মনে হচ্ছে নিঃস্ব, তিনি যেন জানেন ভুল কোথায় হয়ে গেছে। জীবনে প্রথমবার মেয়েকে দিয়ে সেই ভুল শুধরাবার চেষ্টা নিচ্ছেন। আর ওদিকে নুনুদের গ্রামে গিয়ে বিনয়ের সেই উদ্গারের পর থেকেই বিপ্রের মনে আঁকা হচ্ছে ছবি , ‘কমলিনী’র। এ কমলিনীকে বিনয় চেনে না। বিনয় সম্পর্কে এর পর থেকে বিপ্রের উপলব্ধি হচ্ছে, ‘ উহার কোনো ঠায় ঠিকানা আদৌ ছিল না। তিক্ত বিতৃষ্ণায় চক্ষু বুজিয়া আসিল।’ এক বিকেলে বিপ্র জানছিল, গবেষণার কাজে বিনয় বিদেশ যাবে। তার ইচ্ছে হলো জিজ্ঞেস করে, ‘কোথায় যাইবেন বিনয়বাবু, সে কোন দেশ? উহাতে কি বদলাইবার থাকিবে না?’
             প্রসন্ন, বিনয়, বিপ্র এবং কমলিনীর সংযোগের অনেকগুলো ইঙ্গিত আছে উপন্যাসে । সংযোগ রেখাটি যেমন হয় না সরল সোজা, তেমনিই। বাঁকা। পড়তে হয় মন দিয়ে, ধরতে হয় ‘সৃজনশীলতা’ দিয়ে। কথাটি বিনয়েরই, “ অধরাকে ধরতে হয়। ধারণাকে বাস্তব রূপ দিতে হয়। ইহাই সৃজনশীলতা।” নুনুদের জমি বাঁচাবার জন্যে উকিল বন্ধু গণি মিঞার অভাবে যখন হাহাকার করছিলেন প্রসন্ন। তার ঠিক পরের অধ্যয়টি শুরু হচ্ছে এই বাক্য দিয়ে, ‘ এই হাহাকারটি কাহারেও বুঝাইবার নয়। হয়ত বিনয়ই বুঝিত...’ কিন্তু এরপরেই বাক্যটি ঘুরে যায়, ‘ এখানে আইলেই বিপ্রের গতি কেন শ্লথ হয়।’ নুনুদের বস্তিতে যাবার পথেই টিলার উপর প্রসন্ন চৌধুরীর শাদা বাড়ি। ‘নুনুদের গ্রামে যাইবার পশ্চাতে যে এই আকর্ষণটি কম নয়, ইহাই অস্বীকার করে কীরূপে?’ জমি চলে যাবে জেনেও যখন যতনবুড়া, চধরি ‘নিশ্চিন্তে হাড়িয়া লইয়া বয়, টানিতে টানিতে ঘনঘন মাথা নাড়ায় আর হাসে’ বিরক্তি ভরে বিনয় বিপ্রকে বলে, ‘ভাব , এদের অবস্থা।’ কিন্তু এই উদ্বেগবিলাস নিয়েইতো বিনয় বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে। কোন আলো ধরতে যাচ্ছে সে? এতেই কি বেঁচে থাকার কোন সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যাবে? বিপ্র জানে না। ‘শুধু ছাই উড়াইতে থাকে। একদিন এই ছাইয়ের ভিতর হইতে, কমলিনী উঠিয়া আইবে। বহুদিন পর, সে মনে মনে ডাকিয়া উঠিল, ---কমলিনী।’ নানা রূপে নানা চেহারাতে কমলিনী ধরা দেয় তার কাছে। পূর্ণস্বরূপে কক্ষনোই না। জরাগ্রস্ত অবনীমোহনকে দেখে বিপ্রের মনে হয় কমলিনী এক সাগর, নদী যেমন সাগরের দিকে ছুটে, ‘ এই জীবন কী তবে কমলিনীর দিকে যাইবার জন্যই রচিত?’ তার পরেই আছে সেই স্রোত –প্রতিস্রোতের কথা—যেগুলো আমরা আগে লিখছি। যেখানে বিপ্রের মনে জাগে এই জিজ্ঞাসা, প্রতিস্রোতটিই যে ‘আদতে স্রোত নয়, একথাই বা কে নিশ্চিতে বলিবে?’ নিজের জীবনকে অর্থহীন মনে হয়। অর্থ বুঝিয়ে দিতে পারত আবার সেই কমলিনী। আর কেউ না। কিন্তু তার সঙ্গেই ‘অই দূরত্ব আজিও ঘুচিল না।’ ভাবতে ভাবতে সে যেদিকে এগোয় সে গরিবাদের বস্তি।
         
    যা বয়ে যায় সেতো নদী। কিন্তু যা স্থির গভীর? ভাসায় না ডুবিয়ে দেয়—তার কী নাম? ‘ভাবিয়া কি কমলিনীও উন্মনা হয় না?’ কখনো বা দূরের আকাশের তারাকে দেখেও ‘কমলিনীরেও বিন্দু বলিয়া ভ্রম হয়। যেরূপ স্নিগ্ধতায় তারারা আলো ছড়ায়, তেমন স্বপ্নবৎ’ তথ্যচিত্রের পাণ্ডুলিপির লেখক বিপ্রের তেমনি কখনো আবার কমলিনীকে মনে হয়, ‘...ফ্রিজশট; স্থির হইয়া আছে। অথচ জীবন ক্রমাগত বদলাইতে আছে।’ এ আসলে বিপ্রের উদ্বেগ। জীবনের দিশা সন্ধানেই যদি জীবন যায়, তবে চলমান জীবনকে ধরে সে এগুবে কবে? করে খাবে কী , এই ভাবনাও তাকে বিব্রত করে। গরিবাদের বস্তিতে গিয়েও চরস গাঁজায় ডুবে লুম্পেন জীবন না বরণ করে নিতে হয় এই উৎকণ্ঠাও কম নয় তার। ‘কিন্তু এই হওয়াটাও যে কত কঠিন, অন্তত আজকের জন্মভিত্তির উপর দাঁড়াইয়া, একথা গরিবাই তাহারে বুঝাইয়া গিয়াছে। ভিত্তিকে মুছিয়া দিবার, হারাইয়া যাইবার প্রচেষ্টা যে ভুল, তাহা বুঝিয়াও, বুঝিবার ইচ্ছা লয় না। মনে হয় নিজেরে মুছিয়া দিতে পারিলেই, কমলিনী আসিয়া দাঁড়ায়।’ এমন অজস্র কঠিন সত্য দার্শনিক জিজ্ঞাসার সামনে লেখক পাঠককে দাঁড় করান গোটা উপন্যাসে। এবং উত্তরে ভুল- শুদ্ধের এমন দ্বান্দ্বিকতা নিয়েই পাঠকের সামনে, ‘কমলিনী আসিয়া দাঁড়ায়।’ কমলিনী নিজেই কখনো প্রশ্ন করে, ‘আমি কি কোনও দিনই স্পষ্টতা পাব না?’ বিপ্র ভেবে পায় না, ‘কমলিনী নাই বলিলে, কমলিনী থাকিবে না, এতটা কি মানিয়া লওয়া সম্ভব?’ দিনের শেষে বাড়ি ফেরা লোকের হাতে ব্যাগ দেখলে বিপ্রের মনে হয়, সেসব আগামী দিনের সঞ্চয় তাদের। ‘যত সামান্যই হোক, ইহা কি কিছুই নয়?’ অথচ নিজের দিকে তাকালেই দেখে, ‘ বাড়ি নাই, ঘর নাই, উপাধি নাই, উত্তরাধিকার নাই। এক অপরিচয়ের ভূত তাহার ভিতর ঢুকিয়া যায়।’ অস্বস্তিতে চঞ্চল কমলিনী জিজ্ঞেস করে, ‘আমি কে? বলো আমি কে?’ বিপ্রের উত্তর, ‘তুমি কমলিনী।স্থিরতা’
                 মন্টু ঘোষের আড্ডা থেকে উঠে একদিন গরিবাদের বস্তিতে গিয়ে বিপ্র এবং কৃষ্ণসুন্দর দেখেন দালাল ঘোরাঘুরি করছে। নিরাপদ। বিপ্রদের জিজ্ঞেস করে, ‘দাদাদের কী কোন কোম্পানি? হাড়িয়াতে মত্ত কৃষ্ণসুন্দর জবাব দেন, ‘টো-টো কোম্পানি।’ নিরাপদ নুনুকে বলে, ‘জমিটা বেচলে জানিও নুনুভাই।’ ‘কোন জমি?’ বিপ্রের জিজ্ঞাসা। এর পরে প্রতি প্রশ্ন আসে, ‘এটা নুনু বেচবে কী করে? এটা তো প্রসন্ন চৌধুরীর।’ কথাটি বোধকরি কৃষ্ণসুন্দরের। আগে কখনো উচ্চারণ করবার দরকার বোধ করেন নি, বললে বিস্ময়ে তাকাতো না বিপ্র। নিরাপদের মনে হয়, ‘আমি নিরাপদ, এরা দেখছি বিপদ- আপদ। সব জানে। জমির মালিকানাও।’ হাত জোড় করে সে বলে, ‘তিনিতো ভগবান মানুষ। যাওয়ার আগে, এই জমি এদের নামেই লিখে দিয়ে গেছেন।’ ‘গেছেন মানে?’ আরে না না, শহরে চলে গেছেন। যাওয়ার আগে এই জমি এদের দিয়ে গেছেন, তা কাক পক্ষীতেও জানতে পারে নি।’ ‘চৌধুরী কি এখানেই থাকতেন?’ বিপ্র আবার জিজ্ঞেস করে, এবং প্রথম জানতে পায় ‘কমলিনী’র সেই শাদা বাড়িটিতেই থাকতেন প্রসন্ন চৌধুরী। ‘মুহূর্তে তার পৃথিবী দুলিয়া উঠে। একটা শাদা বাড়ি; কাগজের মতো টুকরো টুকরো হইয়া যাহা ছড়াইয়া পড়িল। কিছুই লেখা নাই। শাদা শূন্য। এই শূন্যতায় একটি ছবি আঁকা হইয়াছিল, অথবা শূন্যতা সেই ছবি আঁকিয়া দিয়াছিল। এখন টুকরা টুকরা হইয়া সেই ছবি ভাসিতে আছে। বিপ্র দেখিতে চেষ্টা করে, সেই মুখ, সেই চোখ। কিন্তু কিছুতেই সামগ্রিকতায় মিলাইতে পারিতেছে না।” কিয়ৎক্ষণ ঘোরের পর কৃষ্ণসুন্দর জিজ্ঞেস করেন, ‘বাড়ি যাইবি না?’ বিপ্রের উত্তর, ‘ খুঁজতে হবে।’ ‘কী?’ ‘একটা বাড়ি।’ তারপরেই হচ্ছে বিপ্রের সেই বাস যাত্রা। পাঠক নিশ্চয় মুচকি হেসে ভাবতে বসবেন, ওহ! এই তাহলে কথা। তবে বাপু ঝেড়ে কাশো না কেন? প্রসন্ন চৌধুরীর মেয়েটির পেছনে ছুটছতো? কৃষ্ণসুন্দরও জিজ্ঞেস করেছিলনে, ‘খুঁজবি কীভাবে? ঠিকানা আছে?’ বিপ্র জবাব দেয়, ‘ ঠিকানা একটা নির্দিষ্ট ছাঁচ, ইহাতে কমলিনীরে আঁটিবে কেন! কমলিনী ছড়াইয়া থাকিবে ঠিকানার বাইরে। সেখানেই তাহারে খুঁজিতে হইবে। এই কথা কাহাকে বলিবে, আর বলিলেই বা কে বুঝিবে?’... শেষে গিয়ে তাই কৃষ্ণসুন্দর এই বোধে গিয়ে থামেন, ‘কমলিনীর দিকে যাওয়ার চেষ্টাটাই আসল।’
                 পল্লব যখন এই উপন্যাস লিখছিলেন, সাহিত্যে উত্তরআধুনিকতাবাদ কিম্বা যাদু বাস্তবতার কথা বেশ শোনা যাচ্ছিল। অনেকেই এই ছাঁচে ফেলে দিতে চাইলেও চাইতে পারেন উপন্যাসটিকে। পুরাকথার থেকে নেয়া কমলিনীর নামও তাদের প্ররোচিত করলেও করতে পারে। এই অব্দি এসে সব্বাই আশা করি, মেনে নেবেন যে এমন কোন আধা চেনা প্রতীচ্য তত্ত্বের আলো না ফেলেও এই উপন্যাস বেশ বুঝে ফেলা যায়। ধরেও ফেলা যায়। কোন যাদু টাদু নেই । নেই কোন বাস্তবাতিরিক্ত গল্প কথা। ছাঁচের বাইরে ঠিকানা খুঁজতে হবে বলেই কমলিনীও নয় কোন বিশৃঙ্খলার প্রতীকী নাম। সে আসলে এক নবতর শৃঙ্খলার নাম। গতির ভেতরে নবতর স্থিতির নাম। যাকে অনুধাবন করাটা আপাতত যেকোন পাঠকের বিপ্রের মতোই, লেখকের মতোই, ব্যক্তিগত কাম।
                লেখকের কথা বয়ন কৌশল নিয়ে আলাদা করে বলা যেত। কিন্তু বোধকরি ইতিমধ্যে আমরা সে পরিচয় দিয়েছি অনেক। কিন্তু এ কেমন ভাষা, ‘কান্দিতে আছে’, ‘গ্যাঁজাইবার’? একেবারে শুরুর উদ্ধৃতিটি দেখুন। এহ বাহ্য! আরো আছে। এই যেমন, “...পরনের ফিরোজ লুঙ্গিটি হাঁটুর উপর গোটানো , খালি গা, মাথায় গামছা বান্ধিয়া, তাহার বয়সি যে, এই মাত্র চাউলের বস্তাটি ট্রাক হইতে নামাইয়া, উহাদের মধ্যে আইয়া বইল, কয়দিন আগে মাত্র বিহার হইতে আইয়াছে।” কিম্বা “...বুজিবা চুকুমবুদাই, দূর রাস্তার দিকে চাহিয়া , কিছুই দেখিতেছে না, এমন দাঁড়াইয়া রহিল।” নজির লিখে গেলে তালিকা দীর্ঘ হবে। ইতিমধ্যে প্রচুর দেয়াও হয়েছে। প্রশ্নটা উঠবেই। এ কেমন ভাষা? তাই লিখছি, যিনি পড়বেন তাঁর ‘বৃত্তান্ত একা’ ঘুরে বেড়াবে। যিনি লিখেছেন তাঁরতো বটেই।
               এখন যখন এই সহজপাঠ লিখতে বসেছি তখনো মনে হচ্ছে এই জবাবদিহির দায়িত্ব এড়িয়ে এক পাও এগুনো যাবে না। আমাদের এলাকার, একালের পাঠক এই ভাষার সঙ্গে পরিচিত বটে । কিন্তু তিনি জানেন এই ভাষাতে আজকাল আর উপন্যাস কেন, কোনো কিছুই লেখা হয় না তেমন। তার উপর তিনি যে বাংলা সাধু ভাষাকে জানেন সেটি সংস্কৃতপ্রায় তৎসম শব্দ বহুল। সেই ভাষাটিকে বিদ্রূপ করে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ সেই আদ্যিকালেই লিখেছিলেন“সংস্কৃত বাংলা অর্থাৎ যাকে আমরা সাধুভাষা বলে থাকি তার মধ্যে তৎসম শব্দের চলন খুবই বেশি। তা ছাড়া সেই-সব শব্দের সঙ্গে ভঙ্গির মিল করে অল্প কিছুকাল মাত্র পূর্বে গড়-উইলিয়মের গোরাদের উৎসাহে পণ্ডিতেরা যে কৃত্রিম গদ্য বানিয়ে তুলেছেন তাতে বাংলার ক্রিয়াপদগুলিকে আড়ষ্ট করে দিয়ে তাকে যেন একটা ক্লাসিকাল মুখোশ পরিয়ে সান্ত্বনা পেয়েছেন; বলতে পেরেছেন, এটা সংস্কৃত নয় বটে, কিন্তু তেমনি প্রাকৃতও নয়। যা হোক, ওই ভাষা নিতান্ত অল্পবয়স্ক হলেও হঠাৎ সাধু উপাধি নিয়ে প্রবীণের গদিতে অচল হয়ে বসেছেন। অন্ধভক্তির দেশে উপাধির মূল্য আছে।”(বাংলা শব্দতত্ত্ব ; বানান-বিধি) চলিত ভাষা , যাকে আমরা ভুল করে কখনো বা ‘মুখের ভাষা’ বলেও জানি, তাকে সাহিত্যের এবং সভার ভাষা হিসেবে দাঁড় করাবার কৃতিত্বটাও আসলে রবীন্দ্রনাথেরই, সঙ্গে ছিলেন প্রমথ চৌধুরী। এই জুটির প্রায় এক শতক পরে সেকালের সেই কৃত্রিম ভাষাতে উপন্যাস লেখা উচিত কী?-- এই প্রশ্নটি পল্লবের উপন্যাস পড়তে গেলে শুরুতেই উঠবে। তার উপর ওই ‘চাউল’, ‘চুকুমবুদাই’, ‘মাজাকি’র মতো শব্দগুলো দেখে এই প্রশ্নও উঠবে , তিনি বাংলা ভাষাটি জানেন তো?
                পল্লব নিশ্চয়ই জানেন, আমরাও জানি। শুধু জানাটা লুকিয়ে গেছে প্রতাপ লব্ধ কিছু অভ্যাসেই আড়ালে। চারপাশের বাস্তবতা । চাউল, কয়দিন, আইয়া বইল –এগুলোর সবটাই আমাদের নিত্যদিনের ব্যবহৃত বাংলা ভাষারই শব্দ। আর রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত ভাষাটিও আমাদের মুখের বাংলা নয় আদৌ। যেখানকার এ মুখের ভাষা সেখানকার বই পত্তর পড়তে পড়তে সংস্কারটা আমাদের দাঁড়িয়ে গেছে মাত্র। এমনিতেও সাধু বাংলার ব্যবহার কমে গেলেও উঠে কোনদিনই যায় নি। শরৎ চন্দ্র , তারাশঙ্কর , বিভূতি ভূষণেরা দিব্যি চালিয়ে গেছিলেন এর ব্যবহার। ফুরিয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছিল যখন তখন একে প্রায় পুনরুজ্জীবিত করলেন এসে প্রথমে জীবনানন্দ এবং পরে কমলকুমার। কমলকুমার ফিরে গেলেন, মাইকেলী যুগে—এমনটা অনেকে বলে থাকেন। আমাদের সন্দেহ আছে। তত দাঁত খটমট যুক্তাক্ষর বহুল মাইকেলী বাংলা তিনি তেমন ব্যবহার করেন নি, বরং তাঁর পরীক্ষা নিরীক্ষা ছিল সাহেবী বাংলার বাক্য গঠন অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার। কতটা পেরেছেন,সে অন্য বিতর্ক। কিন্তু করেছিলেন সেরকমই।
                রবীন্দ্রনাথ এবং প্রমথ চৌধুরী আশা করেছিলেন ‘কলকাতা’তে যেহেতু ভিড় করেন গোটা বাংলার বাঙালি, তাই ওখানকার ভাষা হয়ে উঠবে বাঙালির ভাষা। কিন্তু এটি হয়ে উঠেনি তেমন। দেশটিও ভাগ হয়ে দু’ভাগ হয় নি শুধু চার বা তারও বেশি ভাগ হয়েছে। এখনা আর বাংলার বৈচিত্র শুধু নয়, জেলার । বরং রাষ্ট্রের এবং প্রদেশের। অসম-ত্রিপুরার বাঙালিও যে বাঙালি—পুথিপত্তর সেই সত্য আড়ালে ঠেলে দিতে চাইলেও কথাটা সত্য। কলকাতার বাংলা পড়ে-শোনে বোঝেন যারা তাঁরা বিদ্বান। কিন্তু লিখতে বলতে পারেন না, অধিকাংশ বাঙালি। তাদের কাছে চলতি কিম্বা ‘মুখের ভাষা’টিও আসলে এক কৃত্রিম ভাষা, চাপানো ভাষা। আমাদের এলাকার, একালের বাঙালি সম্পর্কেও কথাটা খুবই খাঁটি। যিনি পড়েন মাও-ৎসে-তুঙের ‘ইয়েনান বক্তৃতা’ কিম্বা লুসুনের কবিতা, কিম্বা তথ্যচলচ্চিত্র করেন, ‘পভার্টিঃ কজ অফ ইণ্টারনেল মাইগ্রেশন’ নামে তিনিও ‘চলিত বাংলা’ বিশুদ্ধ বয়নে উচ্চারণে বলতে বা লিখতে পারেন না মোটেও। সেই বাঙালির গল্প ‘কমলিনীর উপখ্যান’। তাই তাঁরা যখন তাঁর উপন্যাসে চরিত্র হয়ে উঠে আসেন, তখন রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে নিজেদের ভাষাকে ছেটে উঠে আসেন নি, এসছেন সঙ্গে নিয়ে। অবিকল , অকৃত্রিম। উপন্যাসের আর প্রতিটি উপকরণ যেমন শিল্পের দাবি মেনে এসছে, মিশেছে, নবরূপ নিয়েছে –এর ভাষাটিও তেমনি। ঠিক তাই, কি? আমরা কি তবে সাধু বাংলাতে কথা বলি? নয় বটে, কিন্তু ‘সাধু বাংলা’ কথাটাও উনিশশতকী নির্মাণ ।ভাষাটি তার আগেও ছিল। আমাদের বৈষ্ণব সুফি কাব্যের ভাষা দেখুন, দেখুন পাঁচালী-মঙ্গল কাব্যগুলোর ভাষা। এ যেন প্রাদেশিক বৈচিত্রকে এক সুতোতে বাঁধতে বাঁধতে আপনিই গড়ে উঠছিল সারা বাংলার সাহিত্যের ভাষা হিসেবে। না ছিল কোনো ব্যাকরণের নির্দেশ, না ছিল কোনো শুদ্ধিকরণের সূচিবাই। তার নাম ছিল, দেশি ভাষা। বানান, শব্দপ্রকরণ, বাক্যগঠনের চরিত্রের সবটাই ছিল দেশি।সংস্কৃত বা তৎসম নয়। পল্লব সেই রীতি মেনে লিখেছেন উপন্যাস। মুখের শব্দ তিনি বসিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথও না বসিয়ে থাকেন নি। সেই যে ‘দেখলুম, খেলুম, গেলুম’ ক্রিয়াপদগুলো—নিতান্তই ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘উপভাষা’ থেকে নেয়া। পল্লবের ‘চাউল’, ‘চুকুমবুদাই’ তবে করেনি অপরাধ কোনো। যে বাঙালির এগুলো মুখের শব্দ তাঁরাও বরঞ্চ এখনো চিঠিতে, বিজ্ঞাপনে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন এহেনো বাংলা লিখতে এবং ‘কান্দিতে আছে’র মতো প্রচুর ব্যাকরণের ভুল সহই। সুতরাং এই সিদ্ধান্ত নিতেই পারি যে ‘চলিত’ সংস্কারের বাইরে বেরিয়ে এলে দেখব, যে পল্লব উপন্যাস লিখেছেন আমাদের আদি অকৃত্রিম গুরুচণ্ডালি ভাষাতেই। বরং ভাষা যখন তার অর্থবহ বর্ণনাতে বাস্তবতার ছবি আঁকে, পল্লবের ভাষা সেখানে বাস্তবতার সেই বর্ণগন্ধ ধারণ করেছে নিজের শরীরে। বোঝা যায় উপন্যাসটি আসলে ত্রিপুরার তথা পূর্বোত্তরের এক আধাশহরের মধ্যবিত্ত জীবনের গল্প। কমলিনী সেই মধ্যবিত্তের সন্ধান কিনা, এই প্রশ্ন আমরাও খোলাই ছেড়ে দিলাম। শুধু এইটুকুন মনে রাখলে চলবে, যে রাধারমণ যখন এই ভাষাতেই গেয়েছিলেন, ‘আমার ছিলো আশা দিলো দাগা রে সুবল।।/আমার এই পিরিতের কার্য নয়/কেমন আছে কমলিনী রাই।' তখন সেই গানের তালে দোলেন যেসব সিলেট টিপেরার লোক তারা কিন্তু অধিকাংশই জানেন না, ডকু ফিল্ম মানে কী,আর ফিজিক্স কোন স্কুলে পড়ানো হয়। তারা সব টুনু-গরীবার আত্মীয়, হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্তের দেশের লোক।

                              *******************************




মায়ের কাছে লেখা চিঠি

প্রতি,
       প্রধান শিক্ষিকা
        ৯২৩ মবারকপুর এল পি স্কুল।
        করিমগঞ্জ, আসাম

মা,    

       প্রথমে আমার শতকোটি সালাম নিবেন, আশা করি আপনারা সবাই আল্লাহর ফজলে ভালো আছেন, আমারা ও একপ্রকার কুশলেই আছি। পর সমাচার এই যে... 
ব্যাস আর মনে নেই। ভাবছ হঠাৎ করে এ কি, রোজ ই তো দু/তিন বার ফোনে কথা হয়, আজ হঠাৎ এমন চিঠি আর তা ও একেবারে খাঁটি সিলেটী ট্র্যাডিশনালে, মফঃস্বলইয়ানা কায়দায়। আরে আছে আছে, ব্যাপার একটা আছে। আর জানিয়ে রাখি যে এই চিঠি টা তুমি পড়ার আগে আরও অনেকে পড়ে নিয়েছে। কিভাবে পড়লো আর কেনই বা পড়লো সে না হয় পরে বলব।
         ভেবেছিলাম চিঠির শুরু টা আমার মত করেই করবো, কিন্তু শুরু করতে গিয়েই ওই ‘শতকুটি’ ওলা লাইন আর ‘পর সমাচার...’ যেন বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল চারপাশে, যেন বিলুপ্তপ্রায় “চিঠি জনজাতিরা” খবরটা আগাম পেয়ে গেছে, যে আজ বহুকাল পর কেউ তাঁদের মনে করেছে, কেউ তাঁদের কে আবার লিখছে, একটা অস্রুসিক্ত চাঁপা আনন্দ ভাব যেন বেরিয়ে আসছে রঙ বেরঙের পকেট সাইজের টেলিফোনে গাঁথা কবর খুঁড়ে। আর আকশে বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে সেই প্রথম দুটি লাইন, ঐতিহাসিক সেই লাইন দুটো, যার একটার শুরু হতো এক কারখানা সালামের সাথে কুশল বিনিময়াদি দিয়ে আর পরেরটাতে থাকতো আজকালকার সংবাদ পত্রের “ঘটনার বিবরণে প্রকাশ” এর ন্যায় অতি সামান্য কোন ঘটনার অসামান্য আবেগ, পর সমাচার...দিয়ে যার শুরু। আর তাই কুনো কিছু চিন্তা করার আগেই লাইন দুটো আপনা আপনিই এসে ঠিক জায়গা করে নিয়েছে, আর আমি ও সসম্মনে ওদের বসিয়ে রেখে এগিয়ে চলেছি।
         জানি তুমি মুচকি হাসছ আর এও জানি যে তুমি মোটেই ভাবছ না যে আমি পাগল হয়ে গেলাম কি না। তুমি তো ভালো করে জানো যে আমার কাণ্ড, দুনিয়ার বাকিদের কাছে যার  আরেক নাম “খাইয়া কাম নাই”, কিন্তু তাতে আমার কিছুই যায় আসে না। তোমার মুচকি হাসিতেই আমার ভুবন জয়। আরে হ্যাঁ ব্যাপার টা বেশ সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে, তাই আসল কোথায় আসি। কেন এ চিঠি? আসলে ব্যাপার টা কাল হঠাৎ করে মাথায় এল। জুম্মার  নামাজে যেতে যেতে কোত্থেকে যে হঠাৎ মোবাইল ফোন গুলোর উপর এমন রাগ উঠলো, ভাবতে লাগলাম কি এমন যন্ত্রণা, কথায় কথায় ফোন টেপা, এতো দূরে থেকেও ও সেকেন্ডের মধ্যে পৌঁছে যাওয়া, আর জত্র তত্র এই যন্ত্রটার উপস্তিতি দেখে কেন জানি শুধু রাগ ই উঠছিল, ভাবতে লাগলাম কত ভালোই না ছিল আগের দিনগুলো, এরকম কুনো যন্ত্রণাকে পকেটে নিয়ে ঘুরতে হতো না। আর এমনটা ভাবতে ভাবতেই চিঠির কথা মাথায় এল। নামাজে কতটুকু খেয়াল ছিল বলা মুশকিল আর ফেরত পথে ঠিক করে নিলাম তোমাকে চিঠি লিখবো। ঘরে ফিরে মুচকি হাসিতে বউ এর কৌতুহলি প্রশ্ন, বললাম মা কে চিঠি লিখবো, ও একটু থতমত খেয়ে বলল আমার মা কে ও একটা লিখো।
          এবার বল, কেমন আছ? আজ স্কুলে গিয়েছিলে? আচ্ছা আমার এই চিঠিটা তোমার কেমন লাগছে? ভালো লাগছে তাই না? তোমার সাথে এখন আমি ও হাসছি। এ এক মজার অনুভুতি। রোজ ই তো কথা হয়, কই এমন টা তো হাসনি কোনদিন? আজ এই যে হাসছ, তাঁর যে কোন তুলনা হয় না, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর এই হাসি। কি? বুঝলে এর রহস্য? রহস্য টা হচ্ছে এই চিঠি মা।  এই চিঠি। মনে পড়ে তোমাকে লেখা মেজ মামার চিঠি, কোনটা ফেব্রুয়ারির বাইশ তারিখে তো পরের টা নভেম্বরের সতেরয়। আর কখনও বছরে একটা মাত্র। কিন্তু কি সে আনন্দ সেই চিঠি গুলো তে, তুমি স্কুল থেকে ফিরে এসে ব্যাগ থেকে বের করে পড়তে আর পরে আমার পালা আসতো। আমি পড়তাম, আর আবার ও পড়তাম, বার বার পড়তাম। কিছুদিন পর আব্বার জরুরি কাগজ খুঁজতে গিয়ে বাজারের লিস্টের সাথে আবার ও সেই চিঠির সাথে দেখা, আবার পড়া শুরু। সেই তো আমার চিঠির সাথে প্রথম পরিচয়। “রাশিয়ার চিঠি” তে কবিগুরু আর “লেটারস ফ্রম ফাদার টু ডটারে” নেহেরু ততটা ভালো লাগেন নি, যত টা ভালো লাগতো মামার ওই চিঠি গুলো। আব্বার কাছে যে গুলো আসতো তাঁর তো বেশির ভাগই পোস্ট কার্ডে। হয় বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের, নয়তো ঐকতান কিংবা আর কোন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী থেকে। সেই চিঠি গুলোতে শুধু আব্বার নামের বানানটা মজার লাগতো। আব্বার অনুজরা আব্বাকে লিখত “মৈন্দা” বলে। আমার খুব হাসি পেত। আর কখনও কোন নব্য প্রতিষ্ঠিত মসজিদ মাদ্রাসার গৃহ নির্মাণের চাঁদার জন্য। কিন্তু আব্বার এমন চিঠিতে কোন আনন্দ হতো না যত টা হয়েছিল আব্বাকে লিখা উনার এক সহ শিক্ষকের চিঠি। সুদুর “চিটাগং ইন্টার মেডিয়েট কলেজ” থেকে যার এখনকার নাম বোধ হয় মহসিন কলেজ। যাই হোক সে চিঠিটির সবচেয়ে মজার ব্যাপার টা হয়েছিল চিঠিটা ভুলক্রমে বাংলাদেশেরই কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ মহকুমার এক স্কুল শিক্ষকের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। আর উনি চিঠিটা নিজের মনে করে পড়ে যখন বুঝলেন এটা ইন্ডিয়ার কোন এক করিমগঞ্জের, তখন নিজের সাফাই দিয়ে আরেকটা চিঠি যোগ করে আমাদের ঘরে পোস্ট করলেন। আব্বা তো পড়লেনই, অনেক খুশি ও হলেন। কিন্তু আমার জন্য এ যেন এক বাড়তি পাওনা। এ যেন একটার সাথে আরেকটা ফ্রী এর মত। কি সুন্দর ছিল সেই চিঠি দুটো আর কি ভাষা। বার বার পড়তে মন যেত। প্রথম চিঠিতে আব্বার সেই বন্ধুর নষ্টালজিক ভাবনা মেশানো প্রত্যেক টা লাইন যেন আমাকে নস্টালজিক করে তুলত। ভাবতে লাগতাম ইশ আমি যদি আব্বার জায়গায় থাকতাম।  আর ভালো লাগতো যখন তুমি বলতে তোমার ছোটবেলার চিঠি লেখার গল্প। দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর নানা বসতেন তোমাদের নিয়ে মুককচঙ্গে থাকা নানার বাকি দুই ভাইকে চিঠি লিখার জন্য। আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতাম চিঠিতে বাকি দুই খালার বানান ভুলের কথা আর তোমার নির্ভুল বানানের জন্য নানার আদর। আজ ও হাসি পায় যখন তুমি বলেছিলে যে তোমার এক মামা চিঠির শেষে লিখেছিলেন “ইতি তোমাদের মামা তোতন”।
            কি মজার দিন গুলো সে না মা?  তাই ভাবলাম চলো আজ একবার ফের সেই পুরনো দিনগুলো কে তাজা করি। এবার বলি কি ভাবে এই চিঠিটা আর ও কয়জন পড়ে নিয়েছে। আসলে তুমি তো জানোই আজকাল নতুন একটা নেশায় দেশ মত্ত। ফেসবুকের নেশা। তাই ভাবলাম চিঠিটা ফেসবুকে দেব। আমার কিছু বন্ধুরা আছে যারা হয়তো এমন চিঠিতে আনন্দ পাবে। হয়তো দু একজন ব্যস্ততার ফাঁকে কলম হাতে নিয়ে দু চার লাইন লিখে ফেলবে তাঁদের প্রিয়জনের উদ্দেশে। সাহস করে পোস্ট অফিসে গিয়ে পোস্ট ও করে ফেলবে, যেমন আমি এই চিঠিটি করবো। আর এভাবেই হয়তো এক হারিয়ে যাওয়া অভ্যাস কে কেউ কেউ ফের তাজা করবে। যাই হউক আর বিশেষ কি লিখিব। গতকাল কিছু চিংড়ি মাছ কিনেছিলাম, আজ রাত টা ওতেই কেটে যাবে। দুদিন থেকে এখানে আবাহাওয়া টা একটু ভদ্র। কিন্তু গরম পড়লেই মেজাজ ছেঁড়ে, ভাবি কেন বেঙ্গালোর ছাড়লাম। চেষ্টায় আছি আবার ফিরে যেতে। ভালো থেকো, আর আব্বাকে অতিরিক্ত লবন খেতে মানা করবে।
                                                                     ইতি
                                                                    । অপু।
                                                                     মাদ্রাজ
                                                                     ১৩ অক্টোবর, ২০১২
                                                     (c) Picture:ছবি



দু'টো গাছ এবং এক দেবদূতীর গল্প

সে অনেক দিনের কথা। গাঁয়ের পরে ছিল এক হিনা গাছ, আর তার পাশে একটা বেল গাছ। কেউ জানে না কে তাদের পুঁতেছিল, কে-ই বা তাদের মালিক। আনমনে গাছ দুটো বেড়ে উঠেছিল তরতরিয়ে। হিনার মনে প্রশ্ন, “মোরা কাদের গাছ?” বেল বলে, “ভাই কেউ যখন আমাদের দেখে না, তাহলে আমরা উপরওয়ালার গাছ।“ এ কথা শুনে হিনা বড় খুশি, দিন-রাত বাতাসে পাতা নাচায় আর বলে, “আমরা উপরওয়ালার গাছ।"

That was a long back time. On d outskirts of a village, there grew up a Henna tree and a Bael tree. Nobody knew who planted them, or who their owner was. They grew up together like two brothers. They faced the bad weather, fought the floods and the draught, and stood erect in the stormy nights, holding each other’s hands. The Henna always asked, “To whom do we owe?” Someday, the Bael replied, “Bro, since nobody cares for us here, I am telling you, we only owe to our God.” The Henna was happy, and since then, whole day it played with the wind and repeated, “We only owe to our God.”

God listened to him someday, and sent an angel to meet them. The angel was a beautiful lady, and she came down like a butterfly. Her wings, her dress, her style-everything was just wonderful. The two plants looked at her with amazement. She walked up to them and said, “Do you believe that you are the master’s sons?” The Bael said, “Yes we do.” The Angel said, “Master is happy to know that, he told me to bring him two branches from both of you.” The Henna was so excited, and it said, “We are shedding our two branches. Please let him know that we love him so much, and miss him at tough times.”

The Angel was about to pick up the branches when some people said in a very harsh tone, “Don’t dare to touch them.” She looked back, and saw some angry village people standing there. They were two groups. One group said, “She is surely a Muslim Hoorie. She came here to kill our sacred Bael tree. Once she touches them, all our children will die of unknown diseases. We take oath in the name of our God; we won’t allow her to do that.” Another group shouted, “She is surely a Hindu Pari. She came here to ruin the Henna tree, whose leaves our ladies use as Mehendi. Once she touches the leaves, all our ponds and lands will dry out. We take oath in the name of our God, she won’t be successful in her evil motives.”

The Angel’s eyes filled with tears. She said, “I came down from your God’s home only. There nobody talks like you. These two trees are the true sons of him, as they never caused any harm to anybody, and kept their faith on the Master. I am just taking these leaves as a token of love to him.” But the angry villagers refused to believe her. They attacked the innocent angel and she died immediately. The Henna tree and the Bael tree cried whole night. In the morning, they left each other’s hands. They said the same thing to each other, “The Angel came from my Master’s home, and your people killed her. I can’t stay with you anymore, because this shows that my religion is better than yours.”