.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

শুক্রবার, ২৮ জুন, ২০১৩

সূর্যের নিকটবর্তী নক্ষত্রে তিনটি 'সুপার পৃথিবী' আবিষ্কৃত


(যুগশঙ্খ পত্রিকায় প্রকাশিত।জুন ২৮, ২০১৩)

।। হিমাদ্রি শেখর দাস।। 



প্রাণের স্পন্দন থাকবে তো?
বিজ্ঞান সাময়িকী 'এস্ট্রোনমি অ্যান্ড এস্ট্রোফিজিক্স'-এ গবেষণা পত্রটি প্রকাশিত হবার পর মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে শুধু এই প্রশ্নটিই সম্প্রতি সূর্য থেকে প্রায় ২২ আলোকবর্ষ (২০৭ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার) দূরে 'গ্লিসে ৬৬৭ সি' নামক নক্ষত্রে পৃথিবীর মত তিনটি বসবাস যোগ্য গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে এই গ্রহ তিনটিতে জল থাকার সম্ভাবনা প্রবল আর জল থাকলেই প্রাণ ...
               এই বিশাল মহাবিশ্বে শুধু পৃথিবী নামক একটি ক্ষুদ্র গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকবে সেটা কখনোই মেনে নেওয়া যায়না! অগণিত নক্ষত্র খচিত রাতের আকাশে তাকালেই নানা প্রশ্ন মনের জানালায় উঁকি দেয় এই মহাবিশ্বে কি আমরা একা? সৌরজগতের বাইরে কি কোনও গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে না? যদি ভিনগ্রহী মানুষ থেকে থাকে, তবে কি অতীতে তাদের পদার্পণ ঘটেছিল এই গ্রহে? বহির্বিশ্বের উন্নত প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা কি সম্ভব হবে? প্রশ্নগুলির উত্তরের সন্ধানে বিজ্ঞানীরা তাঁদের গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন, কিন্তু এর উত্তর আমাদের কাছে আজও অধরা উত্তর না মিললেও কল্পনার জগতে কিন্তু আমরা রচনা করে চলেছি নিত্য নূতন সৃষ্টি উপন্যাস, গল্পে তাই আবির্ভাব ঘটেছে ভিনগ্রহী মানুষ বা 'এলিয়েন'-দের যারা নাকি মানব সভ্যতা থেকেও উন্নত আর্থার সি ক্লার্ক, কলিন হার্ভে, উইলিয়াম হিগস্মিথ ইত্যাদি কল্পবিজ্ঞান খ্যাত লেখকদের কলম থেকে সৃষ্টি হল রোমহর্ষ কারি অবিশ্বাস্য গল্প সাহিত্যের অঙ্গন থেকে ধীরে ধীরে তাঁদের ঠাই হতে লাগলো সেলুলয়েডের পর্দায় হলিউডের ম্যাজিক স্পর্শে 'ই টি', 'সুপারম্যান', 'ম্যান ইন ব্ল্যাক' ইত্যাদি মুভি বিশ্বের বাজার দাপিয়ে বেড়াতে লাগল পিছিয়ে নেই বলিউড...'কোই মিল গয়া' মুভিটিও সবার হৃদয় স্পর্শ করল
                দূরবীক্ষণ যন্ত্রের আবিষ্কার রাতের রহস্যভরা আকাশকে নিয়ে এলো কাছে ধীরে ধীরে মহাবিশ্বের রহস্য আমাদের কাছে পরিষ্কার হতে লাগল কিন্তু সৌরজগতের বাইরে কোনও নক্ষত্রে গ্রহের উপস্থিতি পরীক্ষামূলক ভাবে প্রমাণ করা যাচ্ছিলো না আর এর মূল কারণ হচ্ছে দূরত্ব আসলে নক্ষত্রের আলোতেই আলোকিত হয়ে ওঠে গ্রহ আর দূরত্ব বাড়লে অতি শক্তিশালী দূরবীন দিয়ে পৃথিবী থেকে দূরবর্তী গ্রহকে চিহ্নিত করা মুশকিল তখন পরোক্ষ উপায়ের উপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় থাকেনা বিজ্ঞানীরা উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে ১৯৮৮ সালে প্রথম সৌরজগতের বাইরে গ্রহের সন্ধান পান শুরু হয় এক নতুন অধ্যায় বাকিটা ইতিহাস সৌরজগতের বাইরে নূতন গ্রহের অস্তিত্ব জানার তাগিদেই 'কেপলার'-এর জন্ম এখন পর্যন্ত ১৩২টি গ্রহ আবিষ্কারের কৃতিত্ব তার ঝুলিতে ওহ! বলতেই ভুলে গেছি, 'কেপলার' আসলে কোনও মানুষ নয়, সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা 'নাসা' প্রেরিত একটি মহাকাশযান, যার মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক দূরবীক্ষণ যন্ত্র এছাড়াও রয়েছে নানা সূক্ষ্ম যন্ত্রাদি জার্মানির বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলারের নামানুসারেই তার এই নাম, যাকে গত ৭ মার্চ ২০০৯ সালে পৃথিবী থেকে প্রেরণ করা হয়েছিল তারপর থেকেই তার জয়যাত্রা অব্যাহত কেপলার বেঁচে থাকলে এই আবিষ্কারের খবরটা পেয়ে উল্লাসে তিনি মেতে উঠতেন সন্দেহ নেই! প্রতি মাসেই নিত্যনুতন গ্রহের খবর কেপলার আমাদের উপহার দিচ্ছে আর নূতন গ্রহ আবিষ্কার হলেই আমাদের মনে সেই চিরাচরিত প্রশ্ন জাগে-'প্রাণ আছে তো গ্রহটিতে'?
           বিজ্ঞানের তত্ব মতে জল বিনা কোনও প্রাণ টিকে থাকতে পারেনা তাই কোনও গ্রহে প্রাণ থাকতে হলে তরল জল থাকা আবশ্যক গ্রহে জল থাকবে কিনা তা নির্ভর করে নক্ষত্র থেকে সেই গ্রহের দূরত্বের উপর কারণ জল তরল থাকতে গেলে তাপমাত্রা অবশ্যই শূন্য ডিগ্রী সেলসিয়াস থেকে একশো ডিগ্রীর ভেতরে হতে হবে আমাদের এই সৌরজগতের খুব কাছের গ্রহ বুধ আর শুক্র সূর্যের খুব কাছে থাকার জন্য জল বাষ্পীভূত হয়ে যায় আর পৃথিবীর পরে যে গ্রহগুলি রয়েছে যেমন মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি ইত্যাদি গ্রহে তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রী থেকে কম হওয়ায় সেখানেও জল তরল অবস্থায় থাকতে পারেনা সূর্য থেকে প্রায় পনেরো কোটি কিলোমিটার দূরত্বে জল তরল অবস্থায় থাকতে পারে আর আমাদের পৃথিবী রয়েছে তেমন দূরত্বে যে বলয়ের মধ্যে জল তরল অবস্থায় থাকতে পারে তাকে 'হেবিটেবল জোন' বা 'বসবাস যোগ্য বলয়' বলা হয় বলা-বাহুল্য যে এই সৌরজগতে শুধু পৃথিবীই এই বলয়ের মধ্যে রয়েছে, তাই প্রাণের বিকাশ সম্ভব হয়েছে এই গ্রহে নক্ষত্রের ভর বেশি হলে সেই বলয়ের দূরত্বও বাড়তে থাকে, আর কম হলে দূরত্ব কমতে থাকে      
              সম্প্রতি সূর্যের নিকটবর্তী নক্ষত্র 'গ্লিসে ৬৬৭ সি'-তে ছয়টি গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে এই গ্রহগুলির মধ্যে তিনটি রয়েছে বসবাস যোগ্য বলয়ে আমাদের প্রিয় নক্ষত্র সূর্য ঐ নক্ষত্র থেকে প্রায় তিনগুণ বড় হলেও গ্রহ তিনটি পৃথিবী থেকে কিন্তু সামান্য বড় প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে যে এদের ভর পৃথিবী থেকে প্রায় তিন থেকে চার গুণ বড় হবে বসবাস যোগ্য বলয়ে থাকার সুবাদে গ্রহ গুলিতে জল থাকার সম্ভাবনা প্রবল আর জল থাকলে প্রাণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায়না কেপলারের এই আবিষ্কারে নাসার বিজ্ঞানীরা উল্লসিত এ যেন প্রত্যাশা থেকেও অনেক বেশি! বিজ্ঞানীদের পরবর্তী কাজ হবে ঐ গ্রহগুলির গঠন প্রকৃতি আর বায়ুমণ্ডল নিয়ে অধ্যয়ন এছাড়া ঐ গ্রহগুলিতে রেডিও তরঙ্গ প্রেরণ করেও উন্নত প্রাণী আছে কি না এও সন্ধান করা যাবে আসলে কেপলারের নিত্যনুতন আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষদেরও বহির্বিশ্ব নিয়ে আগ্রহ বাড়াচ্ছে হয়তো সেই দিন আর দূরে নেই যখন বহির্বিশ্বের কোনও গ্রহে এলিয়েনদের সন্ধান আমরা পেয়ে যা
কেপলারের এই সাফল্যে নাসার বিজ্ঞানী জন গ্রুনসফেল্ড তো আবেগে বলেই ফেললেন-'কেপলার মহাকাশযান তো বিজ্ঞানের রকস্টার হয়ে উঠল' আপনারা কি বলেন?




বুধবার, ২৬ জুন, ২০১৩

আমি আর দুধ খাইনা...

সুগ্রীব! না রামায়ণ বা মহাভারতের সেই কাল্পনিক চরিত্র নয়। বানর মুখো শক্তিশালী কোন বীর যোদ্ধাও নয়।
         ত্রিপুরার প্রত্যন্ত মিশ্র জনবসতির এক কিশোর। স্রেফ বিস্কুট চুরি করে খেয়েছিল খিদে সহ্য করতে না পেরে। তাই প্রকাশ্যে গণপিটুনি দিয়ে তাকে হত্যা করে কিছু মানুষ।
         তাদের মধ্যে কে নেই! যুব ফেডারেশনের কমরেড থেকে শুরু করে কংগ্রেস দলের নেতা, তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, এবং এলাকার প্রবীণ নবীন সহ অত্যুতসাহী কিছু মানুষ। তাদের সামনেই ঘটেছে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড। তাদের উৎসাহেই নৃশংসভাবে নারকীয় উল্লাসে রাতভর তাকে পিটিয়ে মেরেছে কিছু মানুষ।
          তখন বেশ ছোট ছিলাম মনে আছে একবার পাউডার দুধ খেয়েছিলাম চুরি করে, ধরা পড়েছিলাম মায়ের হাতে। মারধোর করেননি, তবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এই শেষবার ক্ষমা করে দিলাম। এরপর থেকে আর দুধ খাইনা। আজও খাইনা।
         টাইমস ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে এবার বিষয় 'দ্য ফেস অব বুদ্ধিস্ট টেররিস্ট' (এক বৌদ্ধ সন্ত্রাসীর মুখ)। গল্প একটাই বৌদ্ধ আর মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের নেপথ্য!
         আমার প্রিয় বন্ধু এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। সকাল এগারোটা। আর কোনদিন জেগে না উঠলেও আশ্চর্য হবো না। কারন, কাল এক কলামের নিউজ হবে পাঁচ বা ছয়ের পাতায়। এইটুকুই। এরপর দিন থেকে সবকিছু আবার ঠিকঠাক চলবে।
          সুগ্রীব নামে যে কিশোরটি মরে গেছে গণপিটুনিতে সে আর কোনদিন বিস্কুট চাইবে না। অথচ প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ বিস্কুট ডাস্টবিনে যাবে এবং ফ্যাক্টরি তে উৎপন্ন হবে। রামায়ণ মহাভারতের সুগ্রীব চরিত্রটি বানর এবং কাল্পনিক হলেও তিনি পুজিত। আর আমাদের সুগ্রীব জ্যান্ত মানব কিশোর হলেও তার মৃত্যু হয় গণপিটুনিতে।
            একটি বিস্কুটের দাম ও নেই সুগ্রীবের জীবনের। ঐ ঘটনার পর আমি বলেছিলাম তোমরা তোমাদের ভগবান কে হত্যা করেছো। সুগ্রীব হিন্দুদের দেবতা। তোমরা সবাই হিন্দু।       শুনেছি এরপর সেই এলাকার কিছু মানুষ প্রায়শ্চিত্য করেছে মাথা মুন্ডন করে।
       টাইমস ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ নিয়ে সে দেশের সরকার চিৎকার করলেও এটাই সত্যি, মিন্দালেই প্রদেশের বৌদ্ধ ভিক্ষু ভিরাতুর সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের পর মুসলিম বিরোধী মন্তব্য করেছিলেন, তাই তিনি আজ টেরর অনেকের কাছেই, বিশেষ করে মুসলিম দুনিয়ায়। আর সেই দুনিয়ায় কাগজের বিক্রি বাড়বেই।
        এবং এটাও আজ সত্যি আমি আজকাল আর দুধ খাইনা। এক চামচ দুধ আমার জন্য, আমার পরিবারে বরাদ্দ থাকতেই পারতো।
       আমিও অনেকদিন দুধ খাইনি, আমিও দেখেছি অনেকেই শিশুর দুধ চুরি করছেন জন্ম হওয়ার আগেই।
আমার যে বন্ধুটি ঘুমিয়ে থাকতে থাকতে আর জেগে উঠবেনা কোনদিন, তার সাথেও গতকাল রাতে চলেছিল চূড়ান্ত সন্ত্রাস। সভ্য ঘরের আসবাব তার সাক্ষী। যামিনী রায়ের ডুপ্লিকেট ফটো ফ্রেমের কাঁচে সেই সাঙ্ঘাতিক সংঘর্ষের কিছু রঙ এখনও লেগে আছে।
         তার স্বামী এখন অফিসে বসে লেবু চা খাচ্ছেন।
     ঈশ্বর, হনুমান, সুগ্রীব আর আমি একই দেশের ধর্ম আর নাগরিক। আমাদের মৃত্যু বা হত্যা শেষে প্রায়শ্চিত্য তবু হয়। সন্ত্রাসী কোন ভিক্ষু বা সন্ন্যাসী বা মোল্লার জন্যও হয়ে থাকে বিরোধ বা একটি বিশেষ ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতিবাদ।
       কিন্তু আমার বন্ধুটির জন্য তা হয়না। কারন আমার বন্ধুটি দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক এবং তিনি মেয়ে এবং রক্ষনশীল হিন্দু পরিবারের।
      কোরান, ত্রিপিটক, রামায়ণ আর বাইবেলে বন্ধুত্বের কোন সংজ্ঞা নেই। মেয়েদের বিপ্লব করারও কোন পথ বাৎলে দেয়া হয়নি।
     তাই দুধ চুরি করে আমি খাবোই। বিস্কুট খাও তুমি। টাইমস তুমি চিৎকার করে যাও প্রচ্ছদে, সংঘাত চলবেই, প্রতিটি ধর্মে, রাষ্ট্রে, ঘরে, মন্দিরে, মসজিদে, বৌদ্ধ বিহারে অথবা বেডরুমে, মানুষ আর সন্ত্রাসীদের।
     সব ধর্মেই দুধ খাওয়ার কথা বলা আছে। তবুও আমি দুধ খাবোনা, কারন আমি আফিং বনে যাইনা, এই পাহাড়ের কাছেই ধার নেই সভ্যতার, পাঠ নেই ভালোবাসার।





চাতলা হাওর ছুঁয়ে গেল সাহিত্যের ঢেউ; ছোট কাগজ প্রতাপ-এর ২য় সংখ্যা উন্মোচন



শিলচর শহরের অদূরে অবস্থিত বরাকবাসীর স্বপ্নের আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিমাংশ জুড়ে যে বিস্তৃত অঞ্চল বর্ষার সময় জলে টইটম্বুর থাকে এবং শীতের খিটখিটে শুকনো জলাভূমি ধীরে ধীরে সবুজের সমারোহ থেকে সোনালী রূপ ধারণ করে তার নাম চাতলা হাওর। ভৌগোলিকভাবে চাতলার উত্তরাংশ ছুঁয়ে আছে শিলচর শহরকে। চাতলার পূর্ব পার ধরে চলেগেছে শিলচর-হাইলাকান্দি রোড, পশ্চিমাংশ এসে লেগেছে কাঁঠাল রোড এবং হালটিয়া বাগানের সড়কের সাথে। দক্ষিণ দিকে শিলচর-হাইলাকান্দি রোড এবং হালটিয়া বাগানের সড়ক সংযোগী রাস্তাই শেষ সীমানা চাতলা হাওরের। চাতলা হাওরের এই দক্ষিণ সীমানায় অবস্থিত রতনপুর গ্রামের 'ময়নাবাবা' কমিউনিটি হল-এ গত ২৩শে জুন ২০১৩ রবিবার সকাল ১১টায় একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকাশিত হল 'প্রতাপ-সমাজ ও সাহিত্যের প্রতিভাস' এর দ্বিতীয় সংখ্যা। 
                  মনোরম গ্রামীণ পরিবেশে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট লোকসঠ্গীত শিল্পী বারীন্দ্র কুমার দাস কর্তৃক উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশনের পর 'প্রতাপ-সমাজ ও সাহিত্যের প্রতিভাস' এর দ্বিতীয় সংখ্যা উন্মোচন করে প্রাসঙ্গীক বক্তব্য রাখেন রতনপুর গ্রামের বিশিষ্ট সমাজকর্মী বেণীমাধব চক্রবর্তী, কবি-সাংবাদিক বিমলকান্তি দাস, পূর্ব আলগাপুর জেলা পরিষদ সদস্যার প্রতিনিধি নবদ্বীপ দাস, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক রতন চন্দ্র দাস, আইনজীবী সুবীর চন্দ্র দাস, নীহার রঞ্জন দাস, সমাজকর্মী তপন দাস, দিলু দাস, বিমল দাস প্রমুখ। অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন বীথি দাস, সুলেখা দাস, বিশ্বকল্যাণ পুরকায়স্থ, রাধেশ্যাম দাস, রাজেশ শর্মা, সুশীল দাস, নীলাদ্রী ভট্টাচার্য, শৈলেন দাস ও বিমলকান্তি দাস। রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়ে শুনান অলকা দাস, বিশখা দাস ও বীথি দাস। অমর ঊনিশের শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে যৌথ নৃত্য পরিবেশন করেন স্বরূপা দাস ও নিবেদিতা দাস। এছাড়াও একক নৃত্যে অংশ গ্রহণ করেন বুল্টি দাস, অলকা দাস ও নিবেদিতা দাস। শতাধিক সাহিত্যানুরাগী মানুষের উপস্থিতিতে জমজমাট অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন খগেন্দ্র দাস ও 'প্রতাপ' এর সম্পাদক তরুন কবি শৈলেন দাস।



রবিবার, ২৩ জুন, ২০১৩

শরীরের ময়ূর - মহলে ঋতুপর্ণ

 (লেখাটা আজ ২৩শে জুন, ২০১৩ শিলচরের দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গে বেরুলো)

                                                        ।।মৃন্ময় দেব।।
(c)সাময়িক প্রসঙ্গ
বাংলা চলচ্চিত্রের প্রায় দু’দশকের ‘ম্যাটিনি আইডল’ ঋতুপর্ণ ঘোষ-এর অকাল মৃত্যু বাঙালি নাগরিক মানসকে প্রায় বিবর্ণ বিবশ করে দিয়ে গেছে বলা যায়। অন্তত বিভিন্ন গণমাধ্যমের বয়ান সেরকমই। বিগত প্রায় দু দশক জুড়ে  চলচ্চিত্রের অন্তর ও বাহির মহলে প্রয়াত ঋতুপর্ণের তুমুল উপস্থিতি অনস্বীকার্য নিশ্চয়। এমন নয় যে মানুষটি হঠাৎ করে  উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন। তবে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় যে জুড়ে বসেছিলেন সেকথা অস্বীকারের মানে হয় না কোনও।  ঊনিশটি সিনেমা তৈরি করে বারোটি জাতীয় পুরস্কার, চাট্টিখানি ব্যাপার নয় নিশ্চয়ই। এর আড়ালের রহস্য ও রসায়ন    নিয়ে ভাবতে গেলেই ধন্দ লাগে, সন্দেহ জাগে। বাঙালি দর্শক তবে কি রাতারাতি এতটা দীক্ষিত হয়ে উঠল যে ঋতুপর্ণকে প্রায় নগদ মূল্যেই অভিবাদন জানাতে এগিয়ে এলো। খটকা লাগে বৈকি! লাগে, কারণ তিনি তো আবার  ‘সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল’-এর যথার্থ উত্তরসূরী বলে কোন কোন মহলে স্বীকৃত ও প্রচার-প্রাপ্ত। এমনতর প্রচারে তাঁর  নিজেরও যে ভূমিকা তুচ্ছ ছিল তা নয়, বরং তাঁর সচেতন প্রশ্রয় এজাতীয় প্রয়াসকে উসকে দিয়েছে। সন্তান পিতৃসদৃশ হবে, সেটাই বাঞ্ছনীয় –এরকম মন্তব্য শুনেছি তাঁর মুখে, (অথচ তিনি নাকি সিনেমায় নারীর ‘নাড়ির যন্ত্রণা’ প্রকাশে তৎপর ছিলেন) এবং এও বলেছেন যে সত্যজিৎ রায়-ই তাঁর চলচ্চিত্র-গুরু, থুড়ি অভিভাবক । অর্থাৎ, সাদৃশ্য যা তা ‘বাপ-বেটা’র (চেহারার) মিলের মতোই। এই দর্পিত আত্মপ্রচারের আড়ালে এই অসতর্ক স্বীকারোক্তিও বুঝি রয়ে গেছে, যে, মিলটুকু শুধু বহিরঙ্গেই, অন্তরঙ্গে নয়। সত্যজিৎ-ঋত্বিক তো বহুদূর, মৃণাল সেনের ‘দায়বদ্ধ সিনেমা’ নির্মাণের ব্যর্থ প্রয়াস সমূহের সঙ্গেও কি ঋতুপর্ণ কোনও ভাবেই তুলনীয়?   

                     প্রশ্নটা পাঠকের দরবারে আপাতত পেশ করা গেল শুধু। পরবর্তী অংশে এর উত্তর মিলবে তেমন দুরাশা, শ্রদ্ধেয় পাঠক, না করাই সমীচীন। কেননা, এ নিবন্ধকার আদৌ সমালোচক কিংবা শিল্পবোদ্ধা নন এবং এ নিবন্ধের উদ্দেশ্যও তা নয়। এর উত্তর কেবল দিতে পারে ভবিষ্যৎ , দেবেও হয়ত। আমরা বরং বাংলা চলচ্চিত্রে খুব দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এই সদ্য প্রয়াত পরিচালকের চলচ্চিত্র-পরিক্রমার প্রেক্ষিতটি অনুধাবনে প্রয়াসী হব। তাঁর নির্মাণের নেপথ্যের চাবিকাঠিটি   ঠিক কী ছিল যার দৌলতে এমন ঈর্ষণীয় গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা হাসিল করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি! এখানে একটা বিষয় স্মরণ রাখা ভালো যে, সিনেমা নির্মাণের যে কলাকৌশল (technicalities) সেটা ঋতুপর্ণ আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন কম বয়সেই, পিতার কর্মসূত্রেই। যে কারণে অনায়াসে বলেছেনও যে সিনেমা বানানোটা তেমন কিছু কঠিন বলে মনে হত না তাঁর। (জানিনা, ‘সিনেমা বানানো’ নিয়ে এরকম ভাবনার সময় ‘শোলে’ আর ‘পথের পাঁচালী’র মৌলিক প্রভেদ বিষয়ে তিনি কতটা সচেতন ছিলেন! সাতবার ‘শোলে’ আর পাঁচবার ‘পথের পাঁচালী’ দেখার মধ্যে একটা ফারাক  তো নিশ্চয়ই রয়েছে)। সে যা হোক, নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিচালক হিসেবে, অন্তত বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রে তিনি যে প্রায় একশ’ শতাংশ পেশাদারিত্বের দাবি করতে পারেন সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ মাত্র নেই। এই পেশাদারিত্ব (professionalism) বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রে নেহাৎ আনকোরা, এবং ঋতুপর্ণের দ্বারাই আমদানীকৃত সে বিষয়ে সন্দেহ মাত্র নেই। এর যতটা সুফল কুড়নো সম্ভব টলিউড তা কুড়িয়েছেও। ঋতুপর্ণের আবির্ভাব তাই টলিউড ফিল্ম ইণ্ডাস্ট্রীর কাছে ছিল সত্যি সত্যিই এক ‘শুভ মহরৎ’। তবে বাংলা সিনেমায় ঋতুপর্ণীয় ঋতুবদল নিয়ে কিছু চিন্তা-ভাবনা জরুরি বলেই  মনে হয় আমাদের। এ লেখার কৈফিয়ত কেবল এটুকুই। 

            ঋতু-র প্রথম ফিল্ম হীরের আংটি’ (১৯৯২), দ্বিতীয় ফিল্ম ‘উনিশে এপ্রিল’ (১৯৯৪) এবং দারুণ ‘হিট’। সময়টা লক্ষ্য করুন, উত্তমকুমারের প্রয়াণ ঘটে গেছে, সত্যজিত-ঋত্বিক লিগ্যাসি ফিকে হয়ে আসছে,–সবকিছু মিলিয়ে আশির  দশককে বাংলা সিনেমার খরার দশক বলা যায় অনায়াসে। ‘শ্বশুর বাড়ি জিন্দাবাদ’, ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’দের দাপটে বাংলা ফিল্মের ঘর-বার জেরবার, নাভিশ্বাস উঠছে। অন্যদিকে, নব্বুইয়ের দশক থেকেই আমরা বৃহত্তর সামাজিক ক্ষেত্রেও এক পট পরিবর্তনের সাক্ষী। গ্লোবেলাইজেশন-এর তোড়ে পালটে যাচ্ছে ধ্যান-ধারণা, জীবনযাপনের ধরন- ধারণ, আধুনিকতার বাণের তোড়ে যৌথ-পরিবার ভেঙেছে আগেই, এবারে নয়া-সাম্রাজ্যবাদী নীতি ও পরিকল্পনা   পরিবারকেও টুকরো করে ফেলতে উদ্যোগী হয়ে ভোগবাদী দর্শনের পাশাপাশি নিয়ে এল এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ। বলা বাহুল্য, চলচ্চিত্রে তার করাল ছায়া অনিবার্য ছিল। পুঁজিবাদ যে নাগরিক শ্রেণীর জন্ম দিয়েছিল তার বিনোদনের প্রয়োজন মেটানোর স্বার্থে ও তাগিদেই মুখ্যত উদ্ভব হয়েছিল প্রযুক্তি নির্ভর সিনেমার। নয়া ‘উদারনীতি’ পুরনো মূল্যবোধকে হটিয়ে দিতে নিয়ে এল আত্মভুক এক ভোগবাদ -‘খাও-পিয়ো-মৌজ মানাও’। মতাদর্শের প্রশ্ন-টশ্ন    হাসির খোরাক হয়ে পড়ল উত্তর-আধুনিক ডামাডোলে। পালে হাওয়া যোগালো হরেক প্রচার মাধ্যম। সিনেমা সে প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা নেবে তা নিতান্ত স্বাভাবিক। আর এই তত্ত্ব চালান করার উপযুক্ত কাউকে দরকার হয়ে পড়েছিল টলিউডেরও। ঋতুপর্ণের আবির্ভাব সেই মাহেন্দ্র ক্ষণে, বিজ্ঞাপনের জন্য ভিস্যুয়াল নির্মাণের অভিজ্ঞতার পুঁজি নিয়ে। সামান্য প্রারম্ভিক সতর্কতা অবলম্বন ব্যতীত বিশেষ বেগ পেতে হয়নি তাঁকে। মাঠ ফাঁকা ছিল, গোলটা করা গেল সহজেই। উনিশে এপ্রিল, দহন, অসুখ, বাড়িওয়ালি’র মত ফিল্মগুলি সেই সতর্ক নির্মাণের সাক্ষী। পরিচালক মাপজোখ- করা হালকা ঝুঁকি নিয়েই উপোষী দর্শকের হাততালি কুড়িয়ে নিলেন। বিষয় কিংবা গল্প বলার অভিনবত্বে ততটা নয়, যতটা ‘চাহিদা পূরণের সুপরিকল্পিত আয়োজনে, কারিগরি দক্ষতায়’। ন্যাকা-ন্যাকা সংলাপ ও দৃশ্যের বদলে ফিল্মে এল  স্মার্ট কথাবার্তা, ভিস্যুয়াল ইত্যাদি। জায়গাটা পাকা হল, জাতীয় পুরস্কার আর আন্তর্জাতিক উৎসবের ছোঁয়ায় একলাফে ‘সেলিব্রিটি’, ক্যারিয়ার গ্রাফ তারপর  নিম্নগামী হয়নি আর।

                  তবে কি তিনি গল্প বলার ধরণে কোন নতুনত্ব আমদানি করেছিলেন ? না, বরং বাঙালি দর্শক ফিল্মের যে ন্যারেটিভে চিরকাল অভ্যস্ত ঋতুপর্ণ তা থেকে এক পা-ও সরে আসেন নি, বরং সচেতন ও সতর্ক ভাবে সেই অভ্যস্ত ন্যারেটিভের উপর নির্ভরশীল থেকেছেন। বিষয়বস্তুতেও তো নূতনত্ব দেখিনা সে অর্থে, তাহলে! হ্যাঁ, একটা নতুনত্ব অবশ্যই আমদানি করেছেন ঋতুপর্ণ, আর তা হল যৌনতা। বাংলা সিনেমায় যৌনতার এই অভিষেক এক কথায় অভূতপূর্ব। যৌনতা ‘শিল্পের বিষয় হতে পারে না বা হওয়া উচিত নয়’- মার্কা ছুঁৎমার্গিতা আমাদের অবশ্যই নেই। যৌন-   জীবন জীবনেরই অংশ, কাজেই তা শিল্পসাহিত্যের বিষয় হতেই পারে, হওয়া দরকারও। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এও স্মরণ  থাকা প্রয়োজন যে শরীরী সঙ্গম অথবা সংঘর্ষই জীবনের সার কথা নয়, শেষকথা নয়। শরীর ঘিরে সংস্কার হয়ত স্বাস্থ্যকর  নয়, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে উদোম-শরীর মানেই সংস্কারমুক্তি। যে শরীরী সম্পর্ককে ঘিরে ‘আবহমান’ কাল ধরে বিবর্তিত হয়েছে মানুষ-মানুষীর সম্পর্ক, প্রবাহিত ও প্রভাবিত হয়েছে সভ্যতা ও সংস্কৃতির স্রোতস্বিনী তা নিয়ে শিল্প- সৃষ্টি বড় একটা সহজ কাজ নয়। অথচ এই দুরূহতম কাজটিই ঋতুপর্ণ করতে চেয়েছেন অবলীলায়, ‘খেলা’চ্ছলে। ঋতুপর্ণ  কী নিয়ে সিনেমা করেন সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যেতে পারে দ্বিধাহীন দুটি মাত্র শব্দে - নারী এবং যৌনতা। এতে তাঁর একান্ত অনুরাগী কেউও আপত্তি করবেন বলে মনে হয় না। 

               আসলে ঋতুপর্ণের ক্যামেরা যে গল্প বলে তার কেন্দ্রে থাকে নারী, আরো সঠিক ভাবে যদি বলি তাহলে বলতে হয় নারীর যৌন-কামনা (sexual desire) -ই  তাঁর ফিল্মের  বিষয়বস্তু। আর যে গল্প তিনি বলেন তার সারাৎসার তো এই যে, নারী মাত্রই পিতৃতন্ত্রের দ্বারা পিষ্ট, আর পরিচালক সে নারীদের মুক্ত ও স্বাধীন বিচরণের জন্য একটা ‘স্পেস’ (space) তৈরি করে দিতে চান (যদিও সেই ‘স্পেস’টা যে কী, তার স্বরূপ সম্পর্কে সামান্য ধারণা তিনি দিতে চেষ্টা   করেন না কখনোই, প্রয়োজনও বোধ করেন না ), আর সে জন্যই তিনি যৌন-স্বাধীনতার দাবি তোলেন এবং সেই সূত্রে ও অবকাশে যৌনতার অভিষেক ঘটান। বলা বাহুল্য, ভারতীয় বাণিজ্যিক ফিল্মে নারীর যে আদল প্রতিষ্ঠিত সে আদল ভাঙতে চেয়ে তিনি ‘নহ মাতা, নহ কন্যা, নহ বঁধু...’ সম্বোধনে আপ্লুত হলেন বটে, কিন্তু বিকল্প সম্বোধনের অবর্তমানে   নাম-গোত্র-হীন এই নব্য নারীদের যৌন-বাজারে এনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। খোলা বাজারে খোলা শরীর নিয়ে খোলামেলা বিচরণের (?স্বাধীন) ‘স্পেস’ তৈরি করে দিলেন। ‘খুলে দে মা লুটে পুটে খাই’ নীতির পরিপূরক ‘শিল্প’ প্রয়াস। তথাকথিত ভদ্র-শিক্ষিত-মার্জিত-রুচিবান-আধুনিক (নাকি উত্তর-আধুনিক!) বাঙালি আহ্লাদে আটখানা হল।  আর্ট সিনেমার(?) বোদ্ধা কিংবা শিল্পিত দর্শক সেজে হলিউডি যৌনতার সস্তা টলিউডি-সংস্করণের আস্বাদে মাতোয়ারা হল - ‘সাবানের সঙ্গে শেভিং ক্রীম ফ্রী’ পাওয়ার আনন্দে। মন্দ নয় অবশ্যই।     

             কাজটা ঋতুপর্ণ করেছেন চরম চাতুর্যের সাথে। বাঙালি দর্শক সে অর্থে ততটা সাহসী নয়, আধুনিক সাজ পরিধানের পশাপাশি ঐতিহ্যের পিছুটানও তার কম নয়। আসলে আমাদের আধুনিকতার গোড়াতেই রয়ে গেছে গলদ।  আমাদের আধুনিকতার ধার-করা-ধারণাটির জন্ম পুঁজিবাদের ঔরসে সামন্তবাদের গর্ভে। ঋতুপর্ণ তা বিলক্ষণ জানতেন, তাই স্লো ডোজ দিয়ে ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হয়েছে তাঁকে – উনিশে এপ্রিল, দহন, অসুখ, তিতলি-র মত ফিল্ম দিয়ে  শুরু করে। পরবর্তী পর্যায়ের ঋতুময়তায় পৌছনোর আগে ‘অ্যাসিড টেস্ট’ সেরে নিতে হয়েছে ‘চোখের বালি’ নামিয়ে, বাঙালি  দর্শকের চোখ কতটা কচকচ করে অথবা আদৌ করে কি না তার আন্দাজ পেতে। তবে রিস্ক নেন না মোটেই, ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন রবীন্দ্রনাথকে, আবার বাজার মাত করতে ব্যবহার করেন ঐশ্বর্য রাই-এর শরীরী আবেদনকে। আর খাপ খাইয়ে নিতে ‘নয়া উদারনীতি’ অনুসরণে ফিল্মের পরিণতিকে উপন্যাসের পরিণতি থেকে পৃথক করতেও পিছপা হন না (এই  যুক্তিতে যে, উপন্যাসের পরিণতি নিয়ে রবিঠাকুর পরবর্তীতে তাঁর অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন। তা   হয়ত করেছিলেন, কিন্তু  সংশোধন  করেন নি, সে দায়িত্বও বোধহয় কাউকে দিয়ে যান নি)। সে যা হোক, এ অবধি দর্শকের মেনে নিতে অসুবিধে হয়নি তেমন। একটা নয়নসুখকর মোড়কে নারীমুক্তির বিজ্ঞাপন সহকারে যৌনতাকে  বাজারজাত করার ক্ষেত্রে এ পর্যায়ে মোটামুটি পারদর্শিতা দেখিয়েছেন তিনি। বাণিজ্যিকরণের জরুরি অনুষঙ্গ হিসেবে  সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়েছেন ‘আনন্দলোক’ মার্কা গসিপ ম্যাগাজিনের, মগজ ধোলাইয়ের পন্থা হিসেবে ‘কলাম লিখিয়ে’ সেজেছেন, প্রচারমাধ্যমকে ব্যবহার করতে ও প্রচারের আলোয় থাকতে টিভি চ্যানেলের অ্যাঙ্কর নিয়োজিত করেছেন নিজেকে – এসব কিছুর মধ্যে যোগসূত্র তো এই যে, এগুলো সবই বাজারের সংজ্ঞায় ‘প্রোমোশন্যাল অ্যাক্টিভিটি’ মাত্র। প্যাকেজিং-এর মতই প্রয়োজনীয় ভীষণ। এই দারুণ ‘প্যাকেজিং’এর জন্যই দর্শকের বাহবা যেমন পেয়েছেন, প্রচার মাধ্যমের পিঠ চাপড়ানোও উপভোগ করেছেন। বলিউড স্টারদের নেকনজরে থেকেছেন। আর সেটাই কাল হয়েছে, ক্রমশ ‘দুঃসাহসী’ হয়ে উঠেছেন তার পর থেকে।

                      বাজার দখল করে ফেলার পর বিজ্ঞাপন একটা নিয়মমাফিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ঋতুপর্ণের বেলায়ও তাই ঘটেছে। নারীমুক্তির মহানাগরিক বৌদ্ধিক আচ্ছাদন আস্তে আস্তে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে, ঘোমটা খসে পড়ার পর জমে ওঠে যৌনতার ভরপুর আসর, ‘অন্তরমহল’-এ বাঙালি দর্শকদের একাংশ মেতেছেন সে ‘উৎসব’-এ। সমালোচনাও করেছেন অবশ্য কেউ কেউ। সেখান থেকে ‘চিত্রাঙ্গদা’ পর্যন্ত একই চিত্র, একই পরিভ্রমণ। বিষয় কেবল যৌনতা, যৌনতাই কেবল । বিষয় হিসেবে ‘বিষ’ নয় হয়ত, কিন্তু যৌনতা ‘অবসেশন’-এ পরিণত হয়ে পড়ায় পরিবেশটা বিষাক্ত হয়ে যায়। যৌনতা প্রদর্শনের জন্য নারীচরিত্রের প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে এল এরপর। স্বাভাবিক যৌনতার পরিবর্তে এবার হাজির করলেন  অস্বাভাবিক যৌনতা। বিষয় হিসেবে উঠে এল সমকামীতা। হবে না-ই বা কেন, বারাক ওবামা পর্যন্ত যখন ক্ষমতাবান আসনটি অক্ষত রাখতে সমলিঙ্গ-বিবাহের সমর্থনে প্রকাশ্যে বয়ানবাজি করছেন, দিল্লি হাইকোর্টের রায়ে এদেশেও যখন সমকামীতার অপরাধমুক্তি (decriminalization of homosexuality) ঘটছে (যদিও সমস্যাটি আইনি নয় মোটেই) সে সময় ঋতুপর্ণের মত তুখোড় পরিচালকেরা যে ‘যৌনগন্ধী রুমাল’ শুঁকিয়ে দর্শকদের বুঁদ করে ফেলার সুযোগ লুফে নেবেন সে আর আশ্চর্য কী!

                   এবারে দেখা যাক ঋতুপর্ণের নির্মাণে যৌনতার প্রকাশ কীভাবে ঘটেছে ও সিনেমাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে। ভারতীয় জাতিয়তাবাদী চিন্তাচর্চায় নারী-পুরুষ (female-male) বিভাজনের সামাজিক প্রতিরূপটি হচ্ছে ঘর-বাহির (home-world)-এর বিভাজন, আর সে বিভাজনে নারীর স্থান নির্ধারিত ও নির্দিষ্ট হয়েছে গৃহকোণে, অন্দরমহলে। যৌনতার  ভাল-মন্দও (good sex-bad sex) এসেছে সেই সূত্রে - বাণিজ্যিক সিনেমায় ‘হিরোইন-ভ্যাম্প’ মেরুকরণের মাধ্যমে যার প্রকাশ স্পষ্ট। বাণিজ্যিক ফিল্মের good sex হচ্ছে নায়িকা বা হিরোইনের সেই (যৌন)ধর্ম, যা বস্তুত  পিতৃতন্ত্রের কাছে সমর্পণ ছাড়া কিছু নয়। পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে যৌনতাকে ব্যবহার করতে গিয়ে ঋতুপর্ণ এই সরল  সমীকরণটিকে উলটে দেন ও প্রোটাগোনিস্ট নারীচরিত্রকে জুড়ে দেন বাণিজ্যিক সিনেমার মন্দ-যৌনতার (bad sex) সাথে, যা আসলে কামনার  (desire) প্রতীক এবং ভ্যাম্পদের বৈশিষ্ট। শুধু তাই নয়, কৌশলে দর্শকের সমর্থন আদায়ের জন্য এক নারী-দৃষ্টিকোণও আমদানী করেন কাহিনি-বিন্যাসে। নারী চরিত্রের সঙ্গে যৌনতার সংযুক্তি (association) ঋতুপর্ণের ফিল্মে এক আপাত বিদ্রোহের আবহ তৈরি করে মাত্র, যেহেতু পিতৃতন্ত্রের গণ্ডির মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকে। পিতৃতন্ত্রকে প্রত্যাহবান করে না কদাচ। বরং অন্তিমে পিতৃতন্ত্রের কাছেই সমর্পণ করে বহু ক্ষেত্রে। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতিরোধ (resist) করার প্রয়াস করে মাত্র এবং তার ভেতর দিয়ে আরেকটু বাড়তি স্পেসের জন্য দর কষাকষি (negotiate) করে কেবল। সেও ওই আরেকটু প্রশস্ত গৃহকোণের (domestic space) আকাঙ্ক্ষায়, ঘরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াবার স্বপ্ন দেখতেও বস্তুত অপারগ এই ‘বিদ্রোহী’ নারীচরিত্ররা। (‘ঘরে বাইরে’র বিমলাকে মনে পড়ে!)।  বাণিজ্যিক সিনেমায় নারীর যে আদল (woman ideal) তার সঙ্গে যেমন বাস্তবের নারীর (real woman) মিল নেই, একই সরলীকরণের পথ বেয়ে উঠে আসা ঋতুপর্ণের নারীচরিত্রগুলোও সেরকম অবাস্তব। আর সে কারণেই মনে হয়, যৌনতার এই উপস্থাপনার মূলে শিল্পের দায় যত না বাণিজ্যিক প্রয়োজন তার চেয়ে অধিক। একারণেই চরিত্রকে ছাপিয়ে ওঠে যৌনতা, voyeurism-এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়।  

               স্মরণ করুন,‘চোখের বালি’-র সেই দৃশ্য যেখানে সাদা থান পরিহিত সালঙ্কারা বিনোদিনী হাজির হয়েছে বিহারীর দুয়ারে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে (বিবাহ নামক পিতৃতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহ’ করে পিতৃতন্ত্রের ধারক ও বাহক পুরুষের কাছে শরীর সঁপে দিতে), পরিচালকের ব্যাখ্যায় অলঙ্কারগুলো অবদমিত কামনার প্রতীক, এর সঙ্গে মিলিয়ে নিন অনুরূপ সাজে পরিচালকের আত্ম-প্রদর্শনী। ‘রীল লাইফ’ তবে বদলে দিচ্ছে ‘রিয়াল’ লাইফকেও! নাকি  লিঙ্গ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ঋতু নিজেই তাড়িত হচ্ছিলেন কোন ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’-এ! হয়ত তাই, হয়ত নয়, কিন্তু অবসেশনে যে ভুগছিলেন সে অবধারিত। ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ কিংবা ‘মেমোরিজ ইন মার্চ’এ অভিনয়ের সূত্রে কে জানে নিজের সঙ্গে নিজেই যুদ্ধে মেতেছিলেন কি না, কোন এক অন্তিম বোঝাপড়ার আশায়! একটা অস্থিরতা যে ছিল তা বহুক্ষেত্রে ফিল্মের ট্রিটমেন্ট লক্ষ্য করলেও বোঝা যায়। আর সে কারণেই বোধহয় মাঝখানে ‘রেনকোট’, ‘নৌকাডুবি’-র রিলিফ প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। নতুবা ‘চোখের বালি’-র পর ‘নৌকাডুবি’তে  প্রত্যাবর্তনের  মানে হয় না।  পরিচালক নিজেও তা স্বীকার করেছেন। অবশেষে ‘চিত্রাঙ্গদা’-পর্ব, তাঁর নির্মাণপর্বের(!) পূর্ণাহুতি, যৌন চিন্তনেরও। তা আত্মজৈবনিক কি না সে তর্ক অবান্তর, অপ্রাসঙ্গিক। ব্যক্তি ঋতুপর্ণের ‘নারীসুলভ’ আচরণ নিয়ে কানাঘুষো ছিল, এবারে শুরু হল সচেতন ভাবে নিজেকে পূর্ণ(?) নারী করে তোলার বিবিধ আয়োজন –সাজসজ্জা থেকে সালঙ্কারা বিচরণ, মায় ‘হরমোন থেরাপি’ পর্যন্ত। চিত্রাঙ্গদা রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী, তাই যোদ্ধা যু্বকের সাজে সাজিয়ে তোলা হয়েছিল তাঁকে, আর ফিল্মে সব রকম যৌনতার সপক্ষে  বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক যুক্তি হাজির করতে ঋতুপর্ণকে ভিন্নবেশ ভিন্নসাজ ধারণ করতে হয়েছে। ক্ষমতার স্বার্থে চিত্রাঙ্গদাকে পুরুষোচিত করে তোলার প্রয়াস, আর শিল্পের বাণিজ্যিকরণের স্বার্থে  ঋতুপর্ণ নিজেই বাজারে এসে দাঁড়ান শরীর ‘সম্বল’ করে। পরিণতি? ট্র্যাজিক তো বটেই, স্রষ্টা এবং সৃষ্টি দুয়ের ক্ষেত্রেই। 

             সিনেমা শেষ পর্যন্ত technical art , কিন্তু তার মানে এই নয় যে একজন দক্ষ technician আর স্রষ্টার মধ্যে পার্থক্য নেই। অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, পর্যবেক্ষণক্ষমতা, চিত্রনাট্য রচনা থেকে শুরু করে গল্প বলা সহ ফিল্মের যাবতীয়  শৈলী আয়ত্তাধীন থাকা সত্বেও ঋতুপর্ণ শেষ পর্যন্ত ‘কারিগর’ ও ‘শিল্পী’-র মধ্যবর্তী আলপথ ধরেই বরাবর হেঁটে গেলেন, অন্য কোন কৌণিকতায় পা বাড়াবার সযত্ন প্রয়াস করলেন না। এক সময় মার্গো সাবানের  বিজ্ঞাপন তৈরি করেছিলেন ঋতুঃ ‘দেখতে খারাপ, মাখতে ভালো’। বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রেও ঋতুপর্ণ তার চেয়ে বেশিদূর এগোতে   পারলেন না। সাধ্য ছিল না এমন নয়, সে সাধ তাঁর ছিল না। ‘He had blurred the distinction between commercial and art cinema’ - ঋতুপর্ণের বহু গুণগ্রাহী এমন প্রশংসাবাণী বিলিয়েছেন বিভিন্ন সময়। এতে আমরা দ্বিমত পোষন করি না মোটেই, হালের বাজারকেন্দ্রিক মূল্যায়নের এটাই রীতি। তবে মুড়ি-মুড়কির এক দর সাব্যস্ত হওয়া বাঞ্ছনীয় কি না তা অবশ্যই বিবেচ্য। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির পরিবর্তে সাহিত্য কিংবা ইতিহাস নিয়ে পড়লে সিনেমা পরিচালক   হিসেবে লাভবান হতেন বেশি - এরকম কথা বলেছিলেন একটি সাক্ষাৎকারে। অর্থনীতি নিয়ে পড়লেও নয়ের দশকে শুরু  হওয়া অর্থনৈতিক সংস্কার-জনিত সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণে অসমর্থ হয়েছেন তিনি। একটি পরিবর্তনশীল সময়ে শিল্পীর ভূমিকা কী হওয়া উচিত তা নিয়ে সংশয় ছিল হয়ত, আক্রান্ত সময়ে প্রতিরোধের যথার্থ পথ খুঁজে পাননি। তাই চিন্তা ও মননের দৈন্য এবং যাপনের আত্মঘাতী রীতি ও প্রবণতা তাঁর শারীরিক মৃত্যুকেই কেবল ত্বরান্বিত করেনি, যাবতীয় শিল্প-সম্ভাবনারও করুণ পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি  পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ‘সতর্কীকরণের চিহ্ন’ হিসেবেই নিশ্চয় সনাক্ত হবে।  

   



লাল চন্দন
















জ আহ্লাদে আহ্লাদে মেঘ করেছে সকাল সকাল স্নান।
 আর চাঁদ হাঁসফাঁশ করছে নীলাচলের আলিঙ্গনে
লাল চন্দন কিছু পাঠিয়ে দিলাম রেখে দিও তোমার দু'বুকের সন্ধিতে
আমার চলে যাওয়ার দিনে ফিরিয়ে দিও।
#
আমি,আমার ধোঁয়া আর তোমার সুগন্ধি মাখা লাল চন্দনপৌঁছে দেব ঈশ্বরের কাছে
খুলে দেবো কামাখ্যার দরজা
এবং রেখে যাবো কিছু স্বর্গীয় ফুল নামহীনা, তোমার বন্ধ দরজার চৌকাঠে।
যেখানে গত কয়েক বছর ঘরকন্না করছে দুটি সুখী পায়রা।




বুধবার, ১৯ জুন, ২০১৩

চুপ


চুপ! কথা নয়, কারন মসনদে আমি আছি।
আমার রঙ পৃথিবীর রঙ হবে। আমার আত্মা হবে সক্রেটিসের।
আমার সাম্রাজ্যের দেয়ালে পিকাসো ছবি আঁকবেন সাদা কোরা শাড়ীর ক্যানভাসে।

যে শাড়ী দিয়ে কামদুনির মেয়েটির ঘায়ে ব্যান্ডেজ বাধা হয়েছিল সেটি অসংরক্ষিত এবং সবুজ নয়।

আগামী তিনদিন রাষ্ট্রপতি ঘুরে বেড়াবেন কোন পাহাড়ি সরকারের বিশ্ববিদ্যালয়ে। দীক্ষান্ত ভাষণ দেয়ার জন্য যে গাউনটা বানানো হয়েছে তার রঙ নির্ধারণ করবে সেই মেয়েটি। আমি সেই অসংরক্ষিত অসবুজ কাপড়ের টুকরো
দিয়ে ব্যাচ বানাবো এবং পড়ে যাবো দীক্ষান্ত ভাষণের অনুষ্ঠানে।
কারন এই কামদুনীর পথ দিয়ে বহুবার হেটে গেছেন রাষ্ট্রপতি। তিনিও পুরুষ।

এই চুপ! কথা নয়।

আমার সাম্রাজ্যে এমনটা হবেই। আর এমনটা হওয়ার জন্য তোমাদের তৈরি থাকতে হবে। কারন সেদিন আমার রাস্তায় একটি সবুজ বা হলুদ পতাকাও ছিলনা।
লাল শাড়ী বিছিয়ে দিয়েছিল কিছু মানুষ। তাই তোমায় চুপ থাকতে হবে।
জল কর দাও, মাটির জন্য পয়সা গোন। নিরাপত্তার জন্য কোন ট্যাক্সো কিন্তু দাওনা ভায়া! তাই তোমার শরীরকে যেকোন সময় তৈরি থাকতে হবে।
তৈরি রাখতে হবে তোমার ব্যাগে লিপস্টিক। ঠোঁট পালিশের রঙটাও হবে সবুজ। লাল ক্ষতর উপর সবুজ লিপস্টিকের টাচ। লালের উপর সবুজের রঙ। যেমন হয়না সিঁদুরে আকাশে কালো মেঘের ইতিউতি।
বৃষ্টি আসবে বলেই সেই সিঁদুররঙা আকাশ মিলিয়ে যায় সান্ধ্য আড্ডায়। সৌর মণ্ডলের রকে বসে আড্ডা দেয় তখন বৃহস্পতি।

লাল গ্রহের কাছে বলে যেও তোমার কথা।

চুপ!
আমার নিঃশ্বাস, কার্বন ডাই অক্সাইড হয়ে তোমায় সাহায্য করবে বেঁচে থাকতে।
গাছেরা যেমন রাতের অন্ধকারে রান্নাবাটি খেলে, ঘর গৃহস্থী করে, তেমনি তোমার জন্যও বরাদ্দ ঐ রাতটুকু। অজস্র লতাপাতা আর ঘাস ফুলেদের নিয়ে বাগান বানাও কমরেড।
কামদুনির আকাশকে ভুলে থাকাই ভালো। সেখানে শুধু লাল শালুর শামীয়ানা। সীমা মাহাতো কে চিহ্নিত করে রাখো। সালোক সংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় তাকে দরকার পরবে কাল অথবা পরশু।
তাই চুপ করে থাকো কামদুনী।

চুপ!



মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৩

আমি ছুঁয়ে নেব তোমার হৃদয়


মি ছুঁয়ে নেব তোমার হৃদয়...
পংক্তির পর পংক্তি সাজিয়ে
আমার অপ্রাপ্তির কথামালা
আন্তর্জালে ছড়িয়ে দেব
নীরব চিৎকার যেমন হয়।
পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে
পৌঁছে যাবে বেদনার ঢেউ
বৈদ্যুতিন সঙ্কেতে দ্রুত
তোমার চোখের মণি হয়ে
আমি ছুঁয়ে নেব তোমার হৃদয়।



সোমবার, ১০ জুন, ২০১৩

কবি রণজিৎ দাশের পরিচয়ে আজ আমাদেরও ‘আত্মপরিচয়’


(লেখাটি ১০ জুন, ২০১৩ তারিখে দৈনিক যুগশঙ্খে বেরিয়েছে)
ঠাৎই মানসপটে ভেসে উঠলো উত্তর-পূর্বের এক অন্যতম সুসন্তান প্রয়াত সুজিত চৌধুরীর করিমগঞ্জ শহরের চিত্তরঞ্জন লেনের  বাড়িতে বছর ছয়েক আগের এক ঘরোয়া আড্ডার ছবি । সেই আড্ডায় হঠাৎই সুজিতদা বলে উঠেছিলেন যে রণজিৎ দাশ তাঁর অন্যতম প্রিয় একজন কবি । সেই প্রসঙ্গে তিনি উষারঞ্জন ভট্টাচার্যকে (যিনি নিজেই সেদিন সুজিত চৌধুরীর বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন সঙ্গে ছিলেন সুলেখক মদনগোপাল গোস্বামী এবং গৌতম ভট্টাচার্য) একটা কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন যে রণজিৎ দাশের বহুপঠিত ও সমাদৃত ‘শ্মশান ছবি’ কবিতার সেই বিখ্যাত পঙক্তি—“মায়ের মুখাগ্নি করে সন্তানের অকৃতজ্ঞ হাত” মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আর কোন বিখ্যাত লেখকের কোন  পঙক্তি বা কাছাকাছি কিছু মনে পড়ে কিনা । কিছুক্ষণ পরে তিনি নিজেই বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অপরাজিত’-তে অপু যখন তার মায়ের মৃত্যু সংবাদ পায়, সেই মুহূর্তে তার প্রাথমিক মানসিক প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল লেখক তার যে বর্ণনা দিয়েছিলেন এবং তার পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যে রণজিৎ দাশের উপর্যুক্ত পঙক্তিটির মতো বা কাছাকাছি কিছু লেখা হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে তাঁর নিজের সন্দেহ প্রকাশ করে সুজিতদা বলেছিলেন “এরকম আর কোন পঙক্তি আগামীতে বহুদিনের মাঝে বাংলা সাহিত্যে লেখা হবে কিনা সে বিষয়ে তাঁর যথেষ্ট সন্দেহ আছে । সঙ্গে আরো একটি কথা তিনি বলেছিলেন—“বল দেখি উষা, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস-সমূহের মধ্যে রণজিতের সবচেয়ে প্রিয় উপন্যাস কোনটা ?” উপস্থিত যে ক’জন ছিলেন, তাঁরা ভাবছিলেন অনেক কিছুই, কিন্তু কেউই মুখ খুলছিলেন না । কিছুক্ষণ পরে সুজিতদা নিজেই তার জবাব দিলেন “আদর্শ হিন্দু হোটেল”। সবাই খুব চমকিত হয়েছিলেন এইটুকু মনে আছে । সঙ্গে আরো একটি কথা বলেছিলেন যে তাঁর মতে এই মুহূর্তে বাংলার শ্রেষ্ঠ কবি রণজিৎ দাশ । পরে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘কবিসম্মেলন’ কবিতা পত্রিকায় কবি এবং কবিতা নিয়ে লেখা একটি ধারাবাহিকে দেখেছি লেখক লিখছেন যে “কবি রণজিৎ দাশ এই মুহূর্তে বাংলা কবিতার অহঙ্কার” ।          

    আমাদের অতি প্রিয় আরেকজন কবি আগরতলাবাসী প্রবুদ্ধসুন্দর করের কাছ থেকে ফোনে যখন খবর এলো যে কবি রণজিৎ দে'জ প্রকাশিত 'রণজিৎ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা'র জন্যে  'রবীন্দ্র পুরষ্কার -২০১৩' পাচ্ছেন, তখন আচমকা মনে হচ্ছিল যে সমস্ত জাগতিক ঝুট-ঝামেলা-কূট-কচালির হাত থেকে মুক্তি পেয়ে আমরা সবাই শুধুই যেন শুধুই রণজিৎ দাশের কবিতার বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছি আর সেই সঙ্গে মনে হচ্ছিল যে এতো শুধু কবি রণজিৎ দাশের সম্মান নয়, তাঁর সঙ্গে বরাক-ব্রহ্মপুত্র-গোমতীর সন্তানরাও এই সম্মানের সমান ভাগীদার ।     

                কবি রণজিৎ দাশের রবীন্দ্র পুরস্কার প্রাপ্তিতে গত ৩১ মে, শুক্রবার সন্ধ্যায় বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি সমাজ, গুয়াহাটি  আয়োজিত এক বৈঠকে আনন্দ প্রকাশ করে বিভিন্ন আলোচক কবিকে অভিনন্দন করেন । বৈঠকটিতে সভাপতিত্ব করেন বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি সমাজ-এর কার্যকরী সভাপতি গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় ।  

              ২০০৬ সনের ডিসেম্বর মাসের শেষে দ্বিতীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলনের কালে প্রধান অতিথিরূপে উত্তর-পূর্বের গৌরব কবি রণজিৎ দাশ সস্ত্রীক গুয়াহাটিতে এসেছিলেন । আগের থেকে যোগাযোগ থাকলেও তখন থেকেই এখানকার কবি-সাহিত্যিক-পাঠককূলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দৃঢ়তর হয়ে ওঠে । রণজিতের গৌরবে স্বাভাবিকভাবেই সকলে উদ্দীপ্ত । 

               অভিনন্দন সভা শুরু হয় রণজিৎ দাশের  কয়েকটি কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে । গৌতম ভট্টাচার্য অতি সম্প্রতি প্রকাশিত গুয়াহাটির কাগজ নাইনথ কলামের ১০ম সংখ্যা 'দেশভাগ-দেশত্যাগ--প্রসঙ্গ উত্তর পূর্ব ভারত'-এ প্রকাশিত কবি রণজিৎ দাশের কবিতা ‘আত্মপরিচয়’ আবৃত্তি করেন । এছাড়াও ‘ক্ষত’, ‘শ্মশান ছবি’, ‘বাবুই ঘাসের ন্যূনতম দাম’, ‘পূর্বজ বন্দনা’ এবং ‘এক উন্মাদিনীর কথা’ শীর্ষক একটি গদ্য-কবিতা আবৃত্তি করে শোনান ।     

              কবি রণজিৎ দাশ ও তাঁর কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উষারঞ্জন ভট্টাচার্য গত শারদ সংখ্যা ‘ব্যতিক্রম’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁরই লেখা ‘সূরি-সমাচার’ নামক নিবন্ধের অংশ বিশেষ পাঠ করে মেধাবী কবি রণজিৎ দাশের অধ্যয়ন ও সূক্ষ্ম জিজ্ঞাসার একটি অনবদ্য পরিচয় তুলে ধরেন । এক যথার্থ আধুনিকতা-মনস্ক কবি রণজিৎ দাশের রবীন্দ্র অধ্যয়নের বিস্তার ও গভীরতার দিকটি উষারঞ্জনের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে । তিনি বলেন, কবি  রণজিতের এই সম্মান প্রাপ্তি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উদীয়মান সাহিত্যিকদের প্রবলভাবে উদবোধিত করবে । মহানগরের মহাশান্তির সঙ্গে আমাদের মতো প্রান্তবাসীদের এক প্রচ্ছন্ন লড়াই হয়তো বা লেগেই আছে । আজকে আমরা সবাই সেক্ষেত্রে রণজিৎ হয়েছি ।     

                এবার কবি সঞ্জয় চক্রবর্তী আস্তে আস্তে আলোচনায় ডুকে পড়লেন রণজিৎ দাশের বেশ কয়েকটি কবিতা পাঠের মধ্য দিয়ে । এরপর সেইসব কবিতাগুলিকে কেন্দ্র করে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য ডালপালা মেলে দেয় । তাঁর মতে, বিষয় নির্বাচন থেকে শুরু করে প্রকাশভঙ্গিতে রণজিৎ যে অসামান্য কাব্যরীতি আয়ত্ত করেছেন, সে বোধহয় শুধু তাঁর ক্ষেত্রেই সম্ভব । কাব্যসুরের বিচিত্র এই গায়ন-পদ্ধতির তুলকালাম রোমান্টিক অভিধার জন্যই বোধহয় আজ তিনি কবিদেরও কবি আবার একই সঙ্গে জনসাধারণেরও কবি । যে কথাগুলোর সঙ্গে আমরা বাল্যকাল থকেই অভিন্নভাবে জড়িত, সেই কথাগুলোকে পুনরাবিষ্কার করে তিনি এমন এক উচ্চারণ দিয়েছেন, যা শুধু তিনিই দিতে পারেন । ‘বিনাপ্রেমে নাহি দিব সূচ্যগ্র শরীর’ অথবা ‘সংসার সুখের হয় রমণের গুণে’—কোথাও একটু কেঁপে যাওয়া নেই, একেবারে সুসংবদ্ধ সত্য এবং দৃঢ় উচ্চারণ । একেবারে বুকে লাগা শব্দশর । একই সঙ্গে রণজিৎ দাশ আবার সাংঘাতিক রোম্যান্টিক কবি । তাঁর ভাবজগতে সুন্দর এসেছে অন্যতর সুন্দর হয়ে । কবিতায় একাধারে তিনি সৎ এবং সাহসী । অনেকসময় আমরা সত্যকে দৃঢ়ভাবে উচ্চারণ করতে গিয়ে সোজা কথাকে কাব্যিক সুষমা ও ব্যঞ্জনা দিয়ে অযথা আড়াল করবার চেষ্টা করি, কিন্তু রণজিৎ দাশ তাঁর নিজের কাব্যজগৎকে এর বিপরীতে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করান অথচ এই উচ্চারণ একই সঙ্গে ভীষণ কাব্যময় এবং দ্যুতিময় । এই প্রখর অন্তর্দৃষ্টি ও ভাবজগতের দিকে তাকিয়ে থাকলে বিস্মিত হতে হয় । অনেক মনখারাপের রাতে রণজিৎ দাশের কবিতা তাই আমাদের কাছে এক দুর্মর আনন্দময় উড়ান হয়ে ওঠে।

               কবিতার সঙ্গে আমাদের আরেক বন্ধু রজতকান্তি দাশের সম্পর্ক বেশ কিছুদিন ধরেই অত্যন্ত ক্ষীণ, তাই সসঙ্কোচে আলোচনায়  ঢুকে গিয়ে বলেন যে রণজিৎ দাশের কবিতারাজির সঙ্গে  যদিও তাঁর যথেষ্ট পরিচয় ঘটেনি কিন্তু তাঁর সঙ্গে কবির একান্ত আলাপচারিতার সুযোগ ঘটেছিল ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসের একেবারে শেষের দিকে । কবির সস্ত্রীক শিলং ভ্রমণের সঙ্গী হয়েছিলেন রজতকান্তি । রজত তাঁর নিজের লেখা একটি বিজ্ঞান-বিষয় বই কবিকে এর দুদিন আগে পড়তে দিয়েছিলেন । রজতের আশা ছিলনা যে তিনি বইটি মনযোগ দিয়ে পড়বেন । আর যদিওবা পড়েন তবে হয়তো কোলকাতা গিয়ে উল্টেপাল্টে দেখবেন, এবং যেহেতু বইটির বিষয়বস্তু কবিতার আশেপাশের নয় তাই বইটির স্থান হবে অযত্নে-অবহেলায় ঘরের কোন এক কোণে । কিন্তু বিস্মিত রজত আবিষ্কার করেন যে রণজিৎ দাশ এরই মধ্যে খুঁটিয়ে শুধু বইটি পড়েই ক্ষান্ত হননি, সেই যাত্রায় বইটির বিষয়বস্তু এবং লেখনশৈলী নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন । সেই সঙ্গে বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ কীভাবে লিখতে হয় সেই বিষয়ে কিছু উপদেশও দিয়েছিলেন, রজতকান্তির স্বীকারোক্তিতে পরবর্তীকালে সেই উপদেশরাজি লেখালেখির ক্ষেত্রে রজতকান্তির খুব কাজে এসেছিলো । কথায় কথায় কবি রজতকে তাঁর নিজের অত্যন্ত একটি প্রিয় বই সুব্রমনিয়ম চন্দ্রশেখরের লেখা ‘Truth and Beauty, Aesthetics and Motivations in Science’  পড়তে বলেছিলেন । রজতকান্তির হিসাবে কবি রণজিৎ দাশ এই ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যথার্থ উত্তরসূরি কারণ রবীন্দ্র-মানসও বিজ্ঞান ভাবনা থেকে মুক্ত ছিলনা কখনও । সেই হিসাবে কবি রণজিৎ দাশও সেই পথেরই পথিক, কবি হিসাবে যে পথের পথিকৃৎ ছিলেন কবীন্দ্র রবীন্দ্র স্বয়ং ।          

               এরই মাঝে মাঝে আলোচনায় ঢুকে পড়ছিলেন কখনো নিশুতি মজুমদার, কখনো বা  গীতেশ দাস । কোন এক ফাঁকে প্রসূণ বর্মণের মুচকি হাসিও আলোচনায় অন্য মাত্রা নিয়ে আসছিলো আবার কখনও জয়ন্তলাল দাশগুপ্ত তাঁর মুখ বাড়িয়ে দিচ্ছেলেন আর এভাবেই বৈঠক জমে গিয়েছিলো । বৈঠকে স্থির হয় সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সৌমেন ভারতীয়া কবি রণজিৎ দাশকে সংস্থায় উপস্থিত লেখকদের তরফ থেকে একটি অভিনন্দন পত্র প্রেরণ করবেন ।    

               তুমুল বৈঠকী আড্ডার শেষে এবার বাড়ি ফেরার পালা । সবারই মনে গুঞ্জরণ তুলছিলো কবি রণজিৎ দাশের কবিতার কোন না কোন পঙক্তি । মনে পড়ে যাচ্ছিলো কবির সম্পর্কে কিছু পড়া এবং অনেক শোনার টুকরো টুকরো কথা, বিশেষ করে শিলচরের অতন্দ্র গোষ্ঠীর কথা, একদা তাঁর কৈশোরে যে গোষ্ঠীর কনিষ্ঠতম সদস্য ছিলেন আজকের কবি রণজিৎ দাশ । সঙ্গে অগ্রজ, বন্ধু এবং এবং পথপ্রদর্শক-অভিভাবক হিসাবে পেয়েছিলেন বরাক উপত্যকার আর এক স্বনামধন্য শক্তিমান কবি প্রয়াত শক্তিপদ ব্রহ্মচারীকে । সেই টুকরো কথাগুলোকে কুড়িয়ে মালা গাঁথতে গাঁথতে হঠাৎই একসময় নিজেকে আবিষ্কার করি নিজের বাড়ির কলিং বেলে হাত রেখে  দাঁড়িয়ে রয়েছি ।      

গৌতম ভট্টাচার্য

০৬ জুন ২০১৩



রবিবার, ৯ জুন, ২০১৩

সাগরকন্যা


ক সাগর কন্যার সাথে আজ দেখা। নীল চোখ। লালচে গাল আর সবুজ শাড়ী। নাম তার রাই।

আমি আমার বাসর ঘরে তাকে দেখেছি। আমার প্রথম কৈশোরে তাকে আঁকড়ে ধরেছি বহুবার ভয় পেয়ে।

আমি যৌবনে তার কাছে একটা সকাল চেয়েছি। সারারাতের ক্লান্তি শেষে বাঁশের বেড়া দিয়ে উঁকি মারা সূর্যালোক থেকে তাকে বাঁচাতে কম্বল মুড়ি দিয়েছি তার এলোমেলো সুডৌল পায়ের হলদে রঙে।

'নাইন ও ক্লক' ফুলের কাছে বলেছি আজ তুমি প্রস্ফুটিত হবে না। ওর ঘুম ভেঙ্গে যাবে।
আমি লজ্জাবতি লতাদের বিছিয়ে রেখেছি ওর আসা যাওয়ার পথে। কাঁটা ফুঁটুক, রক্তাক্ত হোক তার পায়ের পাতা, তবু জানবো কোন পথে সে চলেছে রাত্তির শেষে সমুদ্র ফেনায় নিজেকে আহত করতে।
এক পালহীন নৌকোর সাথে সঙ্গম করেছি। একটাই কারন ছিল, তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া সেই মাঝ সমুদ্রে।

এরপর জগন্নাথ মন্দিরে এসে ধ্বজা উড়িয়ে অনভস্ত পায়ে নেমে আসবো সূর্য মন্দিরের সবচেয়ে উঁচু চূড়া থেকে পুরীর সমুদ্রে। জন্ম সুত্রে আমি শূদ্র নই। আমি ব্রাহ্মণ ও নই। আমি নাম গোত্রহীন এক অকাল সন্তান।

১৯শে শ্রাবনের মাসে বৃষ্টি ছিল বলে আমি আকাশ দেখতে পারিনি। সূর্যের রাগ আমি বুঝিনি।
সমুদ্রকন্যার কাছে তবুও আমি শেষ রাত্তির।

এক সাগর কন্যার সাথে আজ আমার দেখা। যে চেয়েছিল, আজ আমার মৃত্যু হোক, সে আমায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সমুদ্র সৈকতে। এরপর সিক্ত বসন ছাড়িয়ে, সারারাত সংগ্রহ করবে আমার সফেদ রক্ত।
যা সংরক্ষিত হবে কোন গবেষণাগারে।
এরপর সে মা হবে। এবং ফিরে আসবে পৃথিবীতে অথবা আমার পাহাড়ে।

একটা নতুন ছোট পাহাড়ে অকারনেই পড়বে চাঁদের আলো শেষ রাত্তিরের।



খেলা



যে তোকে ভয় পায়,
সে আমি নই।
তাই তো দামিনীর চপলতা হয়ে জেগে উঠি বারবার,
তোরই বুকের গভীরে।
ভয় মানে যদি হয় রুদ্রের জটাজাল,
কুলুকুলু গঙ্গা হয়ে বয়ে চলি,
সাগরের টানে।
অথবা চাঁদের মতন ঝলসে উঠি ,
আঁধারের দিনগুনা শেষে।
আসলে তোর আমার এই খেলা চিরদিনের,
জন্ম জন্মান্তরের,
তবু জয় আমারই ,
কারণ আমি বেঁচে থাকি,
এই খেলাকে আঁকড়ে ধরে ।



রাইনের মারিয়া রিলকে : নবীন কবিকে লেখা চিঠি - ২

ছায়া অনুবাদঃ দেবব্রত আচার্য

© ছবি

ভিয়ারগিয়ো, 
পিসার নিকটে ( ইতালি )
এপ্রিল ৫, ১৯০৩
  

   তোমার ২৪শে ফেব্রুয়ারি লিখা চিঠির উত্তর আজই দেয়া সম্ভব হচ্ছে । অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্বের জন্য ক্ষমা প্রার্থী । বেশ কিছুদিন থেকে শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপে কাবু হয়ে পড়েছি ।বলা যায় কার্যত আমাকে অচল করে দিয়েছে । শেষ পর্যন্ত দক্ষিণের সমুদ্র তটে হাওয়া বদলে এসে চেষ্টায় আছি শরীরটাকে একটু সুস্থ করার। আগেও এখানে একবার এসেছিলাম এমনি শরীর খারাপ নিয়ে। সেরেও উঠেছিলাম সে বার ।  এই অসুস্থতা হেতু ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও  বড় করে চিঠি লিখা সম্ভব হবে না। লেখাটা এই মুহূর্তে বেশ কষ্টকর কাজ আমার জন্য।

      তোমার প্রতিটি চিঠি যেমনি আমাকে আমোদিত করে, তেমনি আমার উওর গুলো পড়তে পড়তে তুমিও নিশ্চয় হারিয়ে যাও । হয়ত বা তোমাকে কখন কখন সেগুলো নিরাশ করে। সত্যি বলতে কি জীবনের সবচেয়ে সুগভীর বিষয়গুলোতে আমরা সবাই ভীষণ রকমের একা। অনেক কিছু ঘটে যাওয়ার পর, অনেক পথ হেঁটে , সহস্র নক্ষত্র ঘটনার সাক্ষী হয়ে তবেই একজন মানুষ পারে অন্য এক মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে। সাহায্য করতে।

তোমাকে আজ  দুটি জিনিস বলতে চাই:

 এক.

     আয়রনী : একজন সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য এটি ক্ষতিকর হতে পারে । তোমার সৃষ্টি সত্তা কে কখনো এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে দিও না। বিশেষ করে যখন ভালো কিছু লিখতে পারছো না; তখন আয়রনীর আশ্রয় নিতে যেওনা । অন্যদিকে যখন তুমি পুরো মাত্রায় সৃজনশীল , তখনই এটিকে ব্যাবহার করতে পারো বাচনভঙ্গি হিসেবে। যদি বিশুদ্ধতার সাথে একে ব্যবহার করা যায় তবে আয়রনীও বিশুদ্ধ হয়ে ওঠে। এতে লজ্জার কিছু নেই। যদি এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহার তোমাকে চিন্তিত করে তুলে তবে অন্য কোন মহৎ কিংবা সিরিয়াস বিষয়ে মনোনিবেশ করো। যাতে নূতন এই বিষয়ের সামনে আয়রনীকে নিতান্তই ছোট আর অসহায় মনে হয়। বস্তুর গভীরে গিয়ে খোঁজো । তারপর ও যদি তোমার লেখায় আয়রনী থেকে যায় তা হলে ধরে নিতে হবে তোমার জীবন কে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অন্যসব মহৎ ও সিরিয়াস বিষয় নিয়ে কাজ করতে করতে হয়ত এটা থেকে মুক্ত হয়ে যাবে ( যদি এটি  সাময়িক ভাবে এসে থাকে ) । আর যদি এটি তোমার ব্যক্তি স্বতন্ত্রতার  সাথে একীভূত হয়ে থাকে তবে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে ।  শিল্প-সৃষ্টির নূতন এক হাতিয়ার হিসেবে যুক্ত হবে তোমার ঝুলিতে। 


দুই.

      চারপাশের হাজারো বইয়ের ভীড়ে, কটা বই আছে যাদের ছাড়া আমার চলে না । তার মধ্যে দুটি বই আমার সাথে সব সময়ই থাকে। যেখানেই যাই না কেন, বই দুটি আমার সঙ্গে যায়। এর একটি হল বাইবেল আর  অন্যটি ডেনিশ কবি জেন্স পিটার জ্যাকবসনের লিখা। তুমি উনার  লেখা পড়েছ ? জ্যাকবসনের  লেখাগুলো খুব সহজেই তুমি সংগ্রহ করে নিতে পারবে ।  রিক্লেমস ইউনিভার্সাল লাইব্রেরি তার বেশ কটি বইয়ের সাবলীল অনুবাদ করে প্রকাশ করেছে । তার 'ছয়টি ছোটগল্প' এবং ‘নিলস লিহনি’ নামক উপন্যাসটি সংগ্রহ করে নাও । গল্পগ্রন্থের  প্রথম গল্প ‘ম্যাগনেস’ থেকে পড়া শুরু কর। গল্পটা পড়তে পড়তে তুমি হারিয়ে যাবে আশ্চর্য এক পৃথিবীতে। আনন্দময়ী এই  পৃথিবীর প্রাচুর্য আর বিশালতা তোমাকে ছুঁয়ে যাবে বার বার। কিছু সময় নিয়ে বইগুলো পড়।  যা কিছু শেখার বা আহরণ করার করে নাও। সব থেকে বড় কথা তুমি বইগুলো পড়ে আনন্দ পাবে।  তোমার জীবন যে পথেই যাক না কেন অনাগত দিনগুলোতে এই  নির্মল আনন্দ তোমার কাছে ফিরে ফিরে আসবে শতগুণে । বার  বার । এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত । এই পাঠ পরিক্রমা তোমার হাজারো  দুঃখ-বেদনা, আনন্দ-বিষাদের,  এই সব দিনরাত্রির থেকে অনেক বেশী তাৎপর্যপূর্ণ  ।

     যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয় আমি এই অনন্ত নিঃসঙ্গ নির্মাণের দীক্ষা পেয়েছি কোথায় ? উত্তরে আমি দুটি মাত্র নাম বলব, একজন এই কবি জ্যাকবসন আর অন্যজন অগাস্টি র‌্যদাঁ, সেই অনন্য ভাস্কর, সমসাময়িক শিল্পীদের মাঝে যিনি প্রবাদ প্রতিম।

তোমার  এই পথচলা  সফল হোক।
                                                                    
তোমারই,                                                         
রাইনের মারিয়া রিলকে




বুধবার, ৫ জুন, ২০১৩

অনন্তশয্যা


শীর্ণ চাঁদের শরীর থেকে উপচে পড়া আলোর
কাছে তোমার মৃত্যু ভিক্ষা করি আমি।
বনকুমারী দেবীর কাছে
ভিক্ষে করি একটা আস্ত সবুজ পাহাড়।

যে পাহাড়ের শরীর তোমায়
দেবে এক অনন্তশয্যা ফুলের গোছা

এরপর নামহীন, গোত্রহীন এক পুরুষ
তোমার কাছে ভিক্ষে চাইবে, হারিয়ে যাওয়া
পাহাড়ী নদীর তীরে গড়ে ওঠা সভ্যতার ইতিহাস

এরপর!
নিস্পাপ এক হৃদয় জন্ম নেবে ত্রিপিটকের পাতায়,
যাকে তুমি আগলে রেখেছ এতকাল।

সবুজ বনভূমিতে অসূর্যস্পর্শা আম্রপালি
এবং তোমার অলিগলি...
অন্তশলীলা এক নদীর ইতিহাস,
হলুদ আর লাল অনন্তশয্যা, আজ এলোমেলো।