.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

বুধবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৩

আবোল-তাবোল





















।। ধ্রুবজ্যোতি মজুমদার।।

                অচল

ই পঙ্কিল পথে মোড় নিও না,
রাজপথে চালাও
তোমার সচল জীবন-চাকা।
স্থবিরতা সকলকে মানায় না
আমাকে থমকে থাকতে দাও
দেখতে দাও "সময়"টাকে-
.....................একটু দেখার মতো দেখা।।
সময়ের সাথে প্রতিযোগিতায় যারা
তাদের কারো হও অনুসারিণী
দিগন্তে উড়াও বিজয়-পতাকা।
প্রতিযোগী হতে যে স্পৃহা নেই মোর
হতে চাই পর্যবেক্ষক,
স্থবির "সময়ে" বসে লিখতে দাও মোরে-
......................"সময়ের ইতিকথা"।।

~~~~০০০~~~


.ত্রাস

অপরিচিত সখা হে
কোন সিটে আছো বসে?
আমার রক্তচালিত বাহনে-
ধরো স্টিয়ারিং,চালক আসনে এসে ।।
দূর্গম পথের নিরন্তর ঘর্ষনে
ক্ষয় হয়ে ঝড় ঝড় ঝড়ছে জীবন,
নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ী,অদক্ষ হাতে টালমাটাল
মুহুর্মুহু শিহরিত হই দূর্ঘটনার ত্রাসে ।।
ওহে সখা, সকল দম্ভ গর্ব চূর্ণ আজি
মিটে গেছে সাধ, খেলা সাঙ্গ করো,
দ্রবিত করে দাও "আমিত্ব" তো্মাতে
দাড়াও হে মহাপ্রাণ জীবন সকাশে ।।

~~~~০০০~~~

        জমিদারী
বলিতে পারো-
দৈহিক আকারভেদে প্রাণেরও কি তারতম্য হয় ?
ছোট বড় মাঝারি, অথবা
হালকা বা ভারী ??
কেমনই বা হয়
অনুভূতিগুলো, শীত-গ্রীষ্মাদি, রাগ-ভয় ?
অথবা প্রকারভেদ?
ইতর প্রাণীগুলিতে কোন প্রাণ রয় ???
তোমরা যারা পৃথিবীর বুকে দাগ টেনে
যে যার অধিকার ফলাও,- সীমা নির্ধারণ করো,
কাউকে করো এপার ওপার দু'পার বঞ্চিত;
বলতে পারো----
----- কোন খাজাঞ্ছিখানায় তো্মাদের খাজনা লয়???
জগতের দলিল কে রেখেছো-- কোন্ সিঁদুকে ?!
কেই বা সেই মহামহিম !
যার এই জমিদারীতে----
প্রাণীকূল গর্তে মুখ লুকিয়ে রয় ?
~~~~০০০~~~

      শাশ্বত প্রেম

জ়ানি তুই ফিরবি যেদিন, শুধাবি মোরে
এই ক'দিনে তো্র কথা মো্র- পড়েছিলো কি মনে?
ভাবছি আমি সত্য তো্রে- বলব কেমনে,
সেই ভালো, বলব না হয়--"বেশ ছিলাম মো্র কর্মযজ্ঞ-ধ্যানে" ।
সত্য তো্রে বলতে নারি,নিজেই বা কই সইতে পারি !
সত্য যে তো্র ও সইবে নাকো প্রাণে,
পক্ষকালের এক লহমা মন থেকে তুই যাসনি সরে
ছিলি যখন দূর আড়ালে কৃষ্ণা চাঁদের সনে ।।
অমাবস্যার আধাঁর ফুঁড়ে,আবার যে তুই এলি ফিরে
জানি আবার যাবি চলে,দিন পনেরো গুনে,
তবু আমি স্বপ্ন গাঁথি,তো্র সোহাগে ভিজে আঁখি
জানবি না তুই জ্যোৎস্না তো্রে,রেখেছি কোন্ স্থানে ।
যুগ-শতাব্দি চক্রাকারে,কেঁদেছে প্রাণ তো্রই তরে
"তুই অধরা চিরকালই"-,এই সত্য জেনে শুনে,
হৃদয় বনের গহন কোণে,খেলব আমি তো্রই সনে
থাক অধরা, হোক "না-বলা" ; ভাসব প্রেমের বাণে ।।
~~~~০০০~~~

         ধূমকেতু

পাল ছেঁড়া নৌকো আমি
বিধ্বস্ত সামুদ্রিক ঝড়ে,
দিকভ্রষ্ট, ভাসিতে ভাসিতে বন্ধু
তোমার জলসীমায়,বন্দর পাড়ে।
প্রথম দর্শনেই লাগে স্বপ্নবৎ
আভিজাত্যের ছোঁয়া সমস্ত বন্দর জুড়ে,
অবাঞ্ছিত,উপযাচক,বেমানান বলেই
লাগিল নিজেরে এই পারিপাট্যের ভীড়ে।।
আথিতেয়তার কার্পণ্য করলেনা তুমি
সকল শ্রান্তি ভেসে গেলো আপ্যায়নের তোড়ে,
কিন্তু……অহর্নিশ প্রশ্ন করে মন আমায়—
এতটা প্রাধান্য কি আমার যোগ্যতায় ধরে?!
আমাকে যে ফিরিতেই হবে,নিয়ে ছেঁড়া পাল
অপেক্ষায় আছে রণক্ষেত্র,ওই সুদূর ওপারে,
গ্লানির দহন এড়াতে চলে যাবো তাই-
তবু মনটা যে থেকেই যাবে বন্ধু- তোমার “স্বপ্নপুরে” ।।
~~~~০০০~~~

    হারিয়ে গেছি

 আমি হারিয়ে গেছি
তোমরা কেউ কি দেখেছো আমায়?
এইতো ছিলাম----
ভোরে-সকাল বেলায় !!
তোমরা কেউ কি দেখেছো
গুগলে অথবা ফেসবুকে
অথবা কোনো উত্তেজক স্লোগানে-
কোনো সাম্প্রদায়িক মেলায়?
নিশ্চিত হেথা কোথাও
হারিয়ে গেছি আমি,
খোঁজার সমস্ত প্রয়াস বৃথা
না জানি কোন্ অবহেলায় ?
একটু খোঁজে দেখো বন্ধু
ইন্টারনেটের ঘুপচি গলিগুলো,
লোভনীয় যৌবনদীপ্ত নারীদেহ…..
আর প্রতিষ্ঠার “দৌড়-খেলায়” ।।
হয়ত বা কোনো রূপসীর
চোখেতে হারাতে পারি,
শিগগীর খোঁজো বন্ধু
ফিরতে যে হবে বেলায় বেলায় !
যদি বা না পাও খোঁজে
দয়া করে বলো তবে-
কি করে স্থান নিব পুনঃ
মায়ের পবিত্র জঠর ছায়ায় ??

~~~~০০০~~~

       বাঁচতে হয় বলেই

কেমন আছি?
অনেকদিন পর হাসালে বন্ধু
ছোট্ট একটি প্রশ্নে----
অন্য কেউ হলে হয়ত বলতাম- “ভাল”,
নিজেকেই বা ফাঁকি দেই কি করে
আছি
বেঁচে আছি ।।
যেমনটা বেঁচে থাকে
শুকিয়ে যাওয়া নদী- পাতা ঝরা গাছ
একবুক হতাশা আর লাঞ্ছনা বয়ে
রুক্ষ ইতিহাস রূপে ।
যেমনটা বেঁচে থাকে ধ্বংসস্তুপ
দূর্গ-অথবা বটবৃক্ষ
একদার অনেক হট্টরোল কলরবের
নীরব সাক্ষীরূপে
শুধু স্মৃতি বয়ে বয়ে ।।
সময়ের ভারী বোঝাতলে কুঁজো
অশীতিপর বৃদ্ধসম নুয়ে নুয়ে চলা-একটা জ়ীবন
যেমনটা হয়- দাগ পড়ে যাওয়া ফিল্ম
তেমনই,
তবে যথেষ্ট সজীব
সভ্যতার সাথে রোজ পাল্লা দিই
এই সমাজের সু-সভ্য নাগরিক হয়েই বাঁচি ।
শুধু কখনও কখনও মায়া কেটে যায়
সত্যকে আর ফাঁকি দেওয়া যায়না তখন,
কেউ না জানলেও,আমিতো জানি
নিছক বাঁচতে হয় বলেই যে বেঁচে আছি ।।
~~~~০০০~~~~




মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৩

ভালো লাগা ও ভালো থাকা

(অভিনয় ত্রিপুরা জানুয়ারি'২০১৩-জুন'২০১৩ সংখ্যায় প্রকাশিত) 

।। জয়শ্রী ভূষণ ।। .
           ........বিবারের দুপুর বেলা, চারতলার উপর থেকে দেখছিলাম, সামনেই আরেকটি এপার্টমেন্ট এর সামনে নীচে কিছু মানুষ সবাই প্রায় আমার চেনাশোনা দাড়িয়ে আছেন , হয়তো কিছু কথা বলছেন, কিরকম জানি একটু খটকা লাগলো, মনের ভেতরে একটু অস্বস্তি ও হতে লাগলো, কেউ আবার মারা গেলো না তো? যদি যায়ই তো আবার কার ঘর খালি হল, এসব শত প্রশ্ন উত্তর আমার মনের ভেতর আনা গোনা করছিল, তবুও শুধু থেকে থেকে আমার ওই এপার্টমেন্ট এর চারতলার আমার এক পাড়াতুতো দিদির প্রায় নব্বই ছুঁই ছুঁই শ্বশুর মহাশয়ের কথাই মনে হচ্ছিল। আমার নয় বছরের দুরন্ত ছেলেকেও অনেক বার অনুনয় বিনয় করলাম, বাবা একটু দেখনা কী হোল কার? আমার ছেলের কাছে আবার সময় বাড়ন্ত, একে ছুটির দিন রবিবার, বলল ম্মাম্মা , আমার কাছে সময় নেই, ম্যাচ শুরু হয়ে যাচ্ছে, বলেই কোন মতে ব্যাট কাঁধে ছুটল, তার মাঝেই একবার হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বলে গেলো , হ্যাঁ ম্মাম্মা, তুমি সত্যি বলেছ, ওই ফ্ল্যাটে কে জানি মারা গেছে, তুমি একবার ফোন করে নাও কাউকে। 
                  আমার কেন জানি না বুকের ধুকধুকানি আরও বেড়ে গেলো, আমি তো তখন থেকে অনেককেই ফোন করেই চলেছি, কাউকেই পাচ্ছি না, তখনই আমার সন্দেহ হয়েছিল, এখন তো আর সেটাই সত্যি হল। ঠিক তক্ষুনি একজনকে ফোনে পেয়ে গেলাম, জিগ্যেস করতেই যে নামটি বলল, আমার মনে হল এই কি আমাদের নিয়তি, যে দিদির শ্বশুরের কথা ভাবছিলাম , উনি নন, উনার ছেলে অর্থাৎ সেই দিদির বর, মাত্র ৪৬ বৎসর বয়স, তিনি মারা গেছেন। উফফ্ আবার প্রকৃতির সেই উদ্ভট খেলা, আমাদের কোন কিছুই করার নেই, আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল, যে চলে গেলো তাকে নিয়ে ভাবছিলাম না, আমি ভাবছিলাম সেই দিদির কথা, কত হবে খুব বেশী হলে ৩৫/৩৬, ছেলেমেয়ে ও নেই, শুধু নব্বই বৎসর বয়সের ভারে নুব্জ এক বৃদ্ধকে নিয়ে একা ফ্ল্যাটে কি করে দিন কাটাবে। 
             এই হচ্ছে আমাদের পরিণতি,আমি আবার জীবনের চূড়ান্ত সত্য মৃত্যু কে কেন জানি না খুব সম্ভ্রম করি, এর ভয়ংকর রূপ সবার জানা নেই, আর যে জানে , বোঝে, সে জীবনের চরম মর্ম উপলব্ধি করতে পারে......। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। ছুটে গেলাম নিচে, কিন্ত কিছু করার নেই আমার। পরে একদিন দিদির সাথে দেখা করতে গেছিলাম...যাওয়ার আগে নিজেকে তৈরি করছিলাম মনে মনে আসলে বলতে পারেন নিজের মনে মনে ওর সামনে দাঁড়ানোর সাহস যোগাচ্ছিলাম...সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমার ছিল না,…..ও যখন ভেতর থেকে বেরিয়ে এল সেই রোজকার পরা লাল কালো একটি মাক্সিতে…...গিয়ে যা বলবো ভেবেছিলাম আর বললাম না,….. শুধু বললাম একমাত্র সময়ই তোমার এই ব্যথা কমাতে পারবে।...আমি নিজে ও একটু স্বস্তি পেলাম, যাক্ একেই সব হারানোর ব্যথা...তার উপর সাদা শাড়ি পরা আরও নানা কিছু না খাওয়া না বলা না পরা থেকে বোধহয় এই দিদি রেহাই পাবে। বলল কিচ্ছু ভালো লাগে না । আমি বললাম, এই হচ্ছে জীবনের আসল ছবি, আসল রূপ, সবার অজানা, কিন্তু সবাইকে একদিন না হয় একদিন জানতেই হবে। বলল আমি কি নিয়ে বাঁচব, আমার আর ঘরে থাকতে ভালো লাগে না, এই ফ্ল্যাটে দমবন্ধ হয়ে আসে, রাতে ঘুম আসে না, আমার ভেতরে তোলপাড় হচ্ছিল, খুব কষ্ট হচ্ছিল, বললাম তোমাকে এবার ভালো থাকার চেষ্টা করতে হবে, গৃহবধূ থেকে এবার তুমি একজন সম্পূর্ণ মানুষের মত বাঁচার যুদ্ধ শুরু করো, মনে মনে বললাম আসলে তো ভালো থাকার, ভালো লাগার অভিনয় শুরু করতে হবে, আর এই অভিনয় করতে করতে হয়ত সময়ের দৌলতে একদিন ভালো লাগাতে সক্ষম হবে।       
                এমনিতেই আমার…….কিছুদিন ধরেই কেন জানি না কিচ্ছু ভালো লাগছে না, ভালো না লাগার কারণটাও খুঁজে পাচ্ছি না..........আমার অবশ্য প্রায়ই মানে অনেকটা ঋতু পরিবর্তনের মতো ভালো না লাগার অসুখটা হয়, ডাক্তারীটাও আমিই করি, নিজেকে বোঝাবার,যুক্তি দিয়ে , অনুভব দিয়ে, সবার ভালো মন্দে মিশিয়ে নিজেকে ভালো লাগার মরশুমে নিতে নিতে মনে হয় আমাদের সবার মধ্যেই বোধহয় কিছুটা হলেও অল্প বিস্তর বোধের,গুণীর, ধ্যান-ধারণা বিরাজমান। না হলে রবিঠাকুরের জ্ঞানের কথা উনার গানের কলির মাধ্যমে যখন আমি গুনগুন করি... “অন্তর গ্লানি সংসার ভার, পলক ফেলিতে কোথা হাহাকার”......কেন যে চোখের কোল বেয়ে শ্রাবণের ধারার মত জলের ধারা বইতেই থাকতে, আর সবথেকে মজার কথা হল এই ধারাই আমাকে আমার মনের সমস্ত গ্লানিকে ধুইয়ে দেয়, আবার নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। মনে হয় সত্যি তো, এই পলকের পরের পলকে আমার কিছু আমাদের কতকিছু হারিয়ে যাবে চিরদিনের মত কেন অবুঝের মত মন খারাপ করা, এই পৃথিবীতে আমাদের সবার এত কম সময় তবু আমরা প্রায় কিছু না করেই জীবনটা বৃথা নষ্ট করি। আমার আজকাল মনে হয় জীবনে আমাদের একমাত্র কাম্য শুধুই আমাদের “ভালো লাগা” এবং “ভালো থাকা”। কিন্তু ভালো লাগা ও ভালো থাকা একা একা হয় না , সবাই মিলে ভালো থাকলেই, সবার ভালো লাগলেই নিজের ভালো লাগে, নিজেও ভালো থাকা যায়। আর নিজে ও সবাই ভালো থাকতে হলে , সবাইকে ভালো লাগাতে হবে। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য ভালো লাগাটা খুব জরুরী। ভালো না লাগাটা ও একপ্রকারের ভয়ংকর ছোঁয়াচে অসুখ, আর একেই বলে বিষণ্ণতা। শুধু কি আমার…. না আমার মত সবার,… ঠিক এরকম সময় বা এধরনের মুহূর্ত গুলিতেই এই ধরণের অনুভূতি হয়, এর সদুত্তর পাঠকরাই বেশী জানবেন। তাই সবাইকে ভালো লাগা তে হলে আমাদের “সমাজের থিয়েটার” ও “নারী” দুজনকে ভালো থাকতে হবে। 
                 আমার স্বল্প জ্ঞানে, --- থিয়েটার হচ্ছে এমন একটি স্থান যেখানে অভিনেতা ও অভিনেত্রীরা অভিনয় করেন ও দর্শক হচ্ছেন ...যারা, সেই থিয়েটারের খুব পাশে অবস্থান করেন ও সেই ঘটনা ও দৃশ্যাবলী সচক্ষে অবলোকন করেন । আমার মতে থিয়েটারের অনেক রকম আছে, কিন্তু মূল যে থিয়েটারের ধারণাটা গ্রহণ করা হয়েছে তা নেওয়া হয়েছে, আমাদের সমাজ নামক থিয়েটার থেকে , এমনকি যে ঘটনাবলী ও নাট্যরূপ আমরা মঞ্চে উপস্থাপন করি তা ও কিন্তু সরাসরি আমরা আমাদের দৈনন্দিন সমাজ থিয়েটারের থেকে প্রভাবিত হয়েই করে থাকি। সময়ের সাথে সাথে , সভ্যতা, বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশের সাথে সাথে থিয়েটার ও মঞ্চের অনেক “রকম” ও বেড়ে গেছে। মানব সভ্যতার বিকাশের আগে আদিম যুগে, যখন অক্ষর আবিষ্কার হয়নি, আগুন ও কৃষি ব্যবহারের ও আগে, মানুষ নিজের জীবনের ঘটনাবলী, আশেপাশের দেখা, কাল্পনিক ঘটনাবলী ইত্যাদি , বিভিন্ন ভাবে প্রকাশ করার একমাত্র পন্থা ছিল মানবিক অঙ্গ ভঙ্গি, পরে আস্তে আস্তে যখন ভাষার উৎপত্তি হল, অক্ষর, পুঁথি ইত্যাদির পর , বিদ্যুৎ, দূরভাষ, বেতার, টেলিভিশন, ও বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির বৈপ্লবিক পরিবর্তন ও বিকাশের ফলে, নাটক , মঞ্চ, অভিনয়ের সংজ্ঞা অনেকটাই বদলে গেছে। কিন্তু বদল হয়নি নাটকের, নাটকের বিষয়বস্তুর, এবং সবথেকে জরুরী হচ্ছে বিভিন্ন ধরণের নাটক, মঞ্চ, সবকিছুই এই সমাজ থিয়েটার ও এই সমাজ থিয়েটারের মানুষের জন্য কেন্দ্রীভূত , হতে পারে তা বিনোদনমূলক, শিক্ষামূলক, সমাজসংস্কার মূলক ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের। আর এই সমাজ থিয়েটারের উৎপত্তি, ব্যুৎপত্তি, ও বিকাশের শেকড় হচ্ছে নারী। তাই সমাজ থিয়েটার ও নারী এবং আজকের যুগের প্রজন্ম , সামাজিক বিকাশ , বিনোদন, আমাদের মূল্যবোধ, ও তার অবক্ষয় এবং আমাদের ভবিষ্যৎ ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। ছোটবেলায় দেখেছি, নিয়মিত নাটক ও কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে স্থায়ী বা অস্থায়ী মঞ্চের প্রয়োজন হত এবং সবাই মিলে সেই অনুষ্ঠান গুলি আমরা দেখতে যেতাম, উপভোগ করতাম। রেডিও নাটকে ও ঠিক একই রকম, জনে জনে সবার তো ছিল না, এক রেডিও তে প্রায় অনেকে মিলে সবাই রেডিও নাটক শুনতাম। যে কোন অনুষ্ঠান , পূজা , পার্বণ এলেই সেই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে গান,বাজনা, নাটক ইত্যাদির আয়োজন করা হত। কিন্তু নাটকের বিষয় বস্তু বা প্রেক্ষাপট আজকালকার টিভি সিরিয়েল গুলির মত বেশীরভাগই নারী কেন্দ্রিক ছিল না বলেই আমার মনে হয়। সব ধরণের ঘটনাবলী তাতে প্রাধান্য পেত। বেশ কয়েক বৎসর আগেও আজকালের মত এত টিভি চ্যানেলের ছড়াছড়ি ছিল না, আর টিভি সিরিয়েলের ও রমরমা ছিল না। 
                  আমার এখনও বেশ মনে আছে, যখন আমি শিলচরে আসি , ১৯৯৭/১৯৯৮ হবে, অফিসে বিশেষ করে মহিলা সহকর্মীরা টিভি সিরিয়েল নিয়ে আলোচনা করতো। আমি যদিও খুব বুঝতাম না, বা বোঝার চেষ্টাও করিনি বললেই সত্যি হবে, কিন্তু পরে স্টার প্লাস এ নীনা গুপ্তার অভিনীত সিরিয়েল “শ্বাস” এর জনপ্রিয়তার ব্যাপ্তি দেখেছিলাম, পড়েছিলাম, এবং কয়েকটি এপিসোড ও আমি দেখার চেষ্টা করেছিলাম , যদিও ইচ্ছা ও সময়াভাবে তেমন করে দেখা হয়ে উঠেনি। ভালো লেগেছিল নীনা গুপ্তা অভিনীত চরিত্রটি, সেখানে দেখানো হয়েছিল, যে একজন পুরুষ কিভাবে চট করে তার ভালো লাগা বা ভালোবাসাটুকু আহরণ করতে পারে, দায়দায়িত্ব বোধকে, ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে। সমাজ তা মেনে ও নেয় কিন্তু মেয়ে বা কারো বিবাহিত স্ত্রীরও কি সেরকম মানসিক চাহিদা থাকতে পারে না, আর যদি থাকেও তা কি অস্বাভাবিক? এরকম কিছু সম্পর্কের টানা পোড়েন নিয়েই ছিল নাটকটি। তার পরে চ্যানেলের সংখ্যা প্রচুর বেড়ে গেছে ও সেই সাথে সিরিয়েল ও টেলি নাটক, এবং সাথে সাথে টিভির দৌলতে ভালো ভালো আর্ট ফিল্ম গুলি ও বানিজ্যিক সিনেমার সাথে সাথে ভালো সিনেমা দেখার ও সুযোগ টিভি জনসাধারনের জন্য করে দিচ্ছে। আজ এত বৎসর পরে যখন বাংলা সিরিয়েলের রমরমা দেখি, আমার মার... আমার সাথে কথা বলার সময় নেই , কারণ সিরিয়েল শুরুর সময় হয়ে গেছে, মাঝে মাঝে রাগারাগি করি, বকাঝকা করলেও, মনে মনে ভাবি, থাক না আমার মার এই ভালো লাগাটুকু। মাত্র ৩২ বৎসর বয়সে বিধবা হয়েছেন। একটু বড় হওয়ার পর থেকেই মার মনের খুশীর, আনন্দের রঙ ফেরাতে যদিও আমি আপ্রান চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেই সময়ের সামাজিক , পারিবারিক ও মানসিক পরিস্থিতি আরও অনেকের মত আমার মায়ের মন কেও উদাসি বৈধব্যের রঙেই রাঙিয়ে ছিল। কালারস চ্যানলের “বাল বহু” সিরিয়েলটি শুরুতে মাঝে মাঝে দেখতাম, যারা অভিনয় করছেন, অনেকেই মঞ্চের মানুষ, অন্যরকম এবং একটি সামাজিক কুপ্রথা যা মেয়েদের নিয়ে, তাই আমি সময় পেলেই একটু চোখ রাখতাম, আস্তে আস্তে বাস্তব পরিণতি এবং পরে আনন্দির ডিভোর্স, এবং ডিভোর্সের পরেও মেয়ের মত শ্বশুর বাড়িতে স্থান পাওয়া, একটু অতিনাটকীয় হলেও আমি অপেক্ষা করছিলাম, এই ধারাবাহিকের লেখক কতটা সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারেন, আনন্দিকে কি সারাজীবন ওভাবেই ব্রাত্য হয়ে জীবন কাটাতে হবে, যা আজকের দিনেও বেশীরভাগ মধ্যবিত্ত পরিবারে অল্প বয়স্কা তরুনীরা স্বামী হারা , স্বামী পরিত্যক্তা হয়েই জীবন কাটিয়ে দেয়, কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখলাম, “বাল বহু” সিরিয়েলে আনন্দির শ্বশুর বাড়ির সবাই ওর ভবিষ্যৎ ওর বিয়ে নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছেন। আপনাদের জানাতে কুণ্ঠা বোধ হলেও সত্যি সেদিন রাতে ওই এপিসোডের অংশটি দেখার পর কেন জানি না, আমি ভীষণ খুশী হয়েছিলাম বললে ভুল হবে, যাকে বলে আমি রীতিমত খুশীতে টগবগ করছিলাম। পরে যখন আমি আমার এধরনের আভিব্যক্তি নিয়ে চিন্তা করছিলাম, আমার মনে হয়েছে, যে এই ধরণের টিভি জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক , সমাজ সংস্কারে এক বিশাল পদক্ষেপ যা বিপুল সংখ্যক জনসাধারণকে প্রভাবিত করতে পারবে। 
                যদিও ও আমি টিভি খুবই কম দেখি, তবুও আমার বিগত কয়েক বৎসরের পরিসংখ্যান বলে, যে বেশীর ভাগ চ্যানেলের ধারাবাহিক নাটক গুলি কিন্তু বিশেষ ভাবেই নারী কেন্দ্রিক এবং টিভি হচ্ছে এখনকার সময়ের সবথেকে বড় মঞ্চ যেখানে সমস্ত নাটক বা সিরিয়েল বা নাটকের ঘটনাবলী, এমনকি নাট্য চরিত্রগুলির পোশাক আশাক সমস্ত কিছুই বহুল ভাবে অনুকরণ হচ্ছে আমাদের সমাজের সর্ব স্তরের দর্শকদের মধ্যে। কয়েক মাস আগে সম্ভবত সেই “কালারস” চ্যানেলেই অন্য একটু নাটকের অংশ দেখছিলাম, পরে আরও কয়েকদিন দেখে আমার খুব ভালো লাগলো মনে হল হ্যাঁ, এই নাটকটিও আমার মনে হয় একটু অন্যরকম হতে পারে, একজন অল্প বয়সের বিধবা মহিলা না বলে মেয়েও বলা যায়, এক ছেলে ও মেয়ে কে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে থাকেন, এবং ওদের দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট নিয়েই নাটকের শুরু, মনে মনে ভাবছিলাম,এখানেও কি নাট্যকার সাহসী হচ্ছেন, পরে দেখেছিলাম ও ভালো লেগেছিল, যে এই নাটকের নাট্যকার একটি সাংবাদিক ছেলে সমাজ ও তাঁর পরিবারকে বোঝাতে পেরেছিল, বৈধব্য মেয়েটির জন্যই শুধু কেন আসবে শাস্তি রূপে, সারা জীবনের সমস্ত রঙ, হাসি, কেন ভুলে যাবে সে, এই নাটকের ছোট্ট মেয়েটির মাধ্যমে সাংবাদিক ছেলে ও সেই মহিলা উনার ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে আবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন সত্যি করে দেখিয়েছিল। অনেক অনেক বৎসর আগে প্রায় ২৫/৩০ বৎসর হবে, তখন আমি সীমান্ত শহর করিমগঞ্জে থাকি, লিখতে লিখতে হঠাৎ করে মনে পরে গেল “OSHIN” নামের মেয়েটির কথা। বাংলাদেশ টিভির দৌলতে এই “OSHIN” নামক ধারাবাহিক নাটকটি আমি নিয়মিত দেখতাম । ঐ নাটকটির মাধ্যমে জাপানের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের মেয়েদের সামাজিক এবং তার ফল স্বরূপ মেয়েদের মানসিক উত্তান পতন ও জীবন সংগ্রামের জটিল ও তৎকালীন পরিস্থিতির একটি পূর্ণ ছবি আমি দেখেছিলাম। সেই ধারাবাহিক নাটকে ছোট্ট ওশীণ ছোটবেলা থেকেই মা বাবা ছোট ভাই বোন, পরে যেখানে কাজ করত সেখানে মালিক ও পরে স্বামীর সাথে সমস্ত ঘটনাবলী একজনকে নাতিও হতে পারে, যে বৃদ্ধা বয়সে ওশীণকে দেখভাল করতো তাকে বলছে, ওশীণ নাটকটির সাথে সাথে ওশীণের সাথে সাথে আমিও বড় হয়ে গেলাম,শেষটা আর দেখা হয়নি, কিন্তু আজ মনে হয় শুধু জাপান নয়, পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই মেয়েদের সামগ্রিক অবস্থান একই । এত অপ্রতিকূলতার মধ্যে ও ওশীণ কিন্তু ভালো থাকতে আজীবন চেষ্টা করেছিল সবাইকে নিয়ে। টেলিভিশনের থিয়েটারের মঞ্চের মত বিশাল ব্যপ্তির মঞ্চের জন্যই ওশীনের মত বলিষ্ঠ চরিত্রকে জানতে পেরেছিলাম। নাটক বা থিয়েটার আমাদের সমাজের আয়না, আর টেলিভিশন হচ্ছে যেখানে অনেক রকমের আয়না লাগানো আছে, আমরা একই সাথে বিভিন্ন আয়নায় আমাদের সমাজের বিভিন্ন রূপ দেখতে পাই। 
              কোন আয়নায় আমরা নিজেকে দেখবো তা আমাদের জানতে হবে, আর সেই জানার মত শিক্ষার জন্য সমাজ থিয়েটার ও নারীকে ভালো থাকতেই হবে, কারণ নারী হচ্ছে এই সমাজের জীয়ণকাঠী। নারীরা শুধুমাত্র পুরুষের মন ভালো লাগার বস্তু নয়, ভোগ্য পণ্য নয়, মেয়েদের ও মন আছে, দুঃখ কষ্ট, ব্যথা বেদনা আছে, এই পৃথিবীতে যত প্রাণ আছে, সব এ সমাজ থিয়েটারের নারীর অবদান, এ সত্য গুলি আমাদের বারবার বিভিন্ন মঞ্চের মাধ্যমে, নাট্যকারদের নাটকের কথায়, বিভিন্ন আয়না সমাজ থিয়েটারের দর্শকদের দেখাতে হবে,বোঝাতে হবে, তবেই আমরা সবাই ভালো থাকবো। আমার এতসব লেখালিখি আপনাদের ভালো লাগলো কি না জানি না,এ মুহূর্তে কবিগুরুর কথায় বলতে ইচ্ছে করছে, ...... “আমার কীসের ব্যথা, যদি জানতেম তোমায় জানাতাম”... তবে লক্ষ্মণ ঘটক বাবু কে আবার ও ধন্যবাদ, যে উনি আমাকে আপনি লিখুন বলে যে আমার ভালো থাকার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছেন , কারণ লিখতে লিখতে আমার ভালো লাগছে, মনে হচ্ছে, এত সব সমস্যা সঙ্কুল ব্যবস্থা, পরিবেশ, অপরিণত মানসিকতা , এবং চতুর্দিকে হায়নার দঙ্গলের মধ্যে সমাজের নারীরা বেঁচে থাকলেও , মঞ্চ , নাটক , নাট্যকার ও আমরা যারা সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে চাই, তারা আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি ও যাবো। সবাই ভালো থাকুন।



সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৩

থিয়েটারে নারী...আমার অনুভবে,আমার ভাবনায়


( WOMAN IN THEATRE: লেখটি 'অভিনয় ত্রিপুরা' কাগজের জুলাই-ডিসেম্বর, ২০১২ সংখ্যাতে বেরিয়েছিল)

 
।।জয়শ্রী ভূষণ।।
             
                  
    শুরুটা ঠিক কোথা থেকে করবো বুঝতে পারছি না । তবু চলতে  চলতে একদিন পথ খুঁজে পাবোই এই আশায় কলম খুলে মনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করে আমার ভাবনা গুলোকে প্রকাশ করার প্রয়াস আরম্ভ করলাম। এবার,-- কাকে চয়ন করে  আমার কলমের চাকা চলবে ? “থিয়েটার” , “জীবন” , “আমি”, “আমরা” “নারী” না আরও “অন্যকিছু” । আসলে আমার ভাবনা, চিন্তা,  মননের অপার সাগরে আমি কখনও ডুবে যাই অতলে, আবার কখনও ভেসে উঠি , কিন্তু আজ অবধি কোনো পারেই পৌছুঁতে পারিনি , কিন্তু অবিরাম সাঁতার কেটে চলেছি।

                     আমাকে যখন লিখতে বলা হলো আঁতকে উঠেছিলাম ,আমি তো লেখিকা নই , কিছু একটা হয়তো লিখে নেবো, ভালো করে পারবো কি? এইসমস্ত কিন্তু পরন্তুর প্রশ্নে আমার আমিকে জেরবার করে আমার সাথে আমার আমির যে দ্বন্দ্ব তাকে অতিক্রান্ত করে অবশেষে আমি লিখতে শুরু করলাম। কি করি,  আমি কিছুতেই –‘পারবো না’ বলতে যে পারি না,বড্ড কষ্ট হয়। শুরু হলো আমার চেতন-অবচেতন মনের ভাবনা গুলোকে অক্ষরের মোড়কে বেঁধে লেখার পথ পাড়ি দেওয়া।

                           কোথাও ছোটবেলায় পড়েছিলাম আমরা নাকি সবাই “জীবন নামক রঙ্গমঞ্চের কাঠপুতুল”। খুব সত্যি যদিও ,কিন্তু আমার জানিনা কেন এভাবে নিজেকে কাঠপুতুল ভাবতে ভাল লাগে না।  তাই  জীবন থিয়েটারে যখন যে চরিত্রটি আমার জন্য বরাদ্দ হয়েছে তার সঠিক রূপায়নে আমি সদাই সদর্থক চেষ্টা করেছি, করছি ও করে চলবো। এখনো মনে পড়ে, ছোটবেলায় যখনই বড়রা কোন-কিছু নিয়ে হাহুতাশ করতো, তখন আমি বিজ্ঞের মত  নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে  বলতাম, আমার নিজের ভাগ্য আমি নিজেই গড়বো ,আমার কর্মই আমার হাতের রেখা বদল করবে,তাই শুধু কাজ করে যাও সময় মতো ফল পাবে---ও খুব গম্ভীর হয়ে বলতাম “যে শুয়ে থাকে তার ভাগ্যও শুয়ে থাকে”, --  বাংলা ব্যকরণ বইয়ের এই বাংলা Phrase টি মনের মধ্যে গেঁথে গেছিল---তাই নাটকের সংলাপের মত আওরাতাম ও নিজের জীবনে  সাহস সঞ্চয়ে ও অনেক পাহাড় ডিঙোতে এই ধরণের অনেক উপাদান অনেক দূর আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।

                            আমি-আমার উপলব্ধিতে থিয়েটারকে ভাগ করেছি দুইপ্রকারে। 1) জীবন থিয়েটার ও 2) থিয়েটার নামক জীবনদর্শন । প্রথমটিতে চরিত্রগুলো   নির্বাচনে  আমাদের কোনো ভূমিকা থাকে না ,Script ও জানা থাকে না ,কোনদিকে যে আমরা এগিয়ে চলেছি তাও আমাদের অজানা এবং সর্বপোরি উপসংহারটুকুও থাকে অজ্ঞাত। শুধুমাত্র যে চরিত্র বা পরিস্হিতি নিয়তির দ্বারা আমাদের ভাগ্যে জোটে সেটির সফল রূপায়ন কতটুকু করতে পারি –বা কতদূর ভালোভাবে জীবনে দর্শাতে পারি তাই বোধহয় জীবনের প্রধান উপপাদ্য। আর এই জীবন থিয়েটারের জীবনযুদ্ধে , যে ব্যক্তি , যত বড় যোদ্ধা, ব্যতিব্যস্ত ও সমস্যার জালে জড়ানো সত্বেও নিজের দুমরানো-মুচরানো জীবনকে আশার কিরণে স্বপ্নের আলোর আভায় ভাসিয়ে দেয় সেই মানুষই জীবন থিয়েটারের সফল নায়ক/নায়িকা  --কারণ বেঁচে থাকতে হলে এগিয়ে যেতে হবে আর চলার আর এক নামই হচ্ছে জীবন। আর স্বপ্নের আলোর আভায় ভাসতে হলে “আমি” র অনেক বড় ভূমিকা পালন করতে হয়। ঠিক যেন রূপকথার সেই সোনার কাঠির মতো।  তাই দুধরনের থিয়েটারেই “আমাদের বাঁচার স্বপ্ন দেখানোর জন্য”--  “আমি” --factor টি খুব জরুরী দায়িত্ব পালন করছে। “আমি” র জন্মও কিন্ত আমাদের আশেপাশের সবার প্ররোচনায়ই হচ্ছে। মা-বাবা, ভাইবোন, পাড়া-প্রতিবেশী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, বিভিন্ন সব সামাজিক চরিত্রগুলি মিলেই আমাদের মধ্যের এই “আমি” কে রোপণ ও বপন করতে সহায়তা করে। তাই আমি যতই “আমি”র কথা বলি না কেন—আমার “আমি” তে “আমরা” মিলেমিশে একাকার হয়ে আছি।  এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই “আমি”কে  আমরা কিভাবে বাড়তে সাহায্য করছি “পরিপূর্ণ মানুষ আমি” না শুধু “পুরুষ আমি”  না “নারী আমি” হিসেবে। সঠিক ভাবে সমাজে আমরা এই “পরিপূর্ণ মানুষ আমি” রূপায়নে, মূল্যায়নে কতখানি  পথ –পাহাড়-মরুভূমি- নদী-নালা –খানা-খন্দ পেরিয়েছি । গন্তব্য অনেকদূর এখনো, আরও অনেক পথ -অনেক  বাধা আমাদের অতিক্রম করতে হবে।

                                এখন যদি  ইতিহাস ও সমাজের বিভিন্ন পটে চোখ রাখি তাহলে আমরা দেখতে পাই, সেই আদিকাল হতে অজ্ঞতা,কুসংস্কার,প্রহসন,দুর্নীতি  ও এরকম আরও অনেক সামাজিক কুবিধি -সমাজের উন্নতির পরিপন্থী কুব্যবস্থা ও কুরীতিনীতির জন্য বিশেষ করে নারীরা মাতৃগর্ভ থেকে নাড়ীর পথটুকু পার হয়ে পৃথিবীর আলোয় চোখ মেলার আগেই ,ভ্রূণহত্যার মত জঘন্য অপরাধ আজও ঘটে চলেছে। শুধু তাই নয় মেয়ে, কিশোরী,মহিলা ,বা নারী-কে ,যে কোন স্তরেই, মানুষ হয়ে বাঁচার জন্য আজীবন সংঘর্ষ চালিয়ে যেতে হয়। আপেক্ষিক ভাবে যদিও আমাদের মনে হতে পারে যে মেয়েদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয়েছে কিন্তু যে ভাবে ,আমাদের খাদ্যাভ্যাস , দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে ,খোলামেলা পোশাকআশাক পরিধান আমরা মেনে নিয়েছি, সেই ভাবে কিন্তু --আমাদের মানসিকতার স্তরের ঊর্ধ্বগামী বিচারধারা,--সাম্যবাদী মনোভাব,  মূল্যবোধের অবক্ষয়ের স্তিমিত গতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না বলেই, অন্তত-- আমার মনে হয়। এক কথায় বোঝাতে হলে বলতে হয়, নারী এখনও এই বিশ্বায়নের যুগে সবথেকে কমদামী ভোগ্য ও সহজলভ্য পণ্য। শিক্ষা শুধুমাত্র পুঁথিগত বিদ্যায় পরিণত হয়েছে, একান্নবর্তী পরিবার ধারা প্রায় ভেঙ্গে পড়েছে, মানুষ আরও বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে, মানুষ হন্যে হয়ে শুধু ছুটছে আর ছুটছে ...যার আছে, তার আরও আরও চাই, যার নেই তার কিছুই নেই,...সে চোখের সামনে কেউ মরে গেলেও আমাদের কিছু যায় আসে না। কোথায়  তাহলে দাঁড়িয়ে আজকের নারী ? নিশ্চয় খুব সুবিধেজনক স্থানে নয়। কারন সুস্থ সমাজ গঠনে  নারী ও পুরুষ উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রয়েছে। বিশেষ করে নারীদের ভুমিকা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারন যখন একটি শিশু জন্ম গ্রহণ করে,  তার প্রথম বিকাশ ও শিক্ষার প্রথম ক্ষণটি শুরু হয় মাতৃগর্ভেই। জন্মের পরেই একটি মানবশিশুকে তার মানবিক বিকাশের পথে পা না বাড়িয়ে প্রথমে শুরু হয় লিঙ্গ নির্ধারণের মাধ্যমে ছেলে ও মেয়ে হিসেবে বিভাজন , যা সমাজের বিকাশের প্রধান অন্তরায়। এবং এরপর যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে তা আজও গতানুগতিক ভাবেই চলছে। পৃথিবী যদিও আমাদের হাতের মুঠোয়, কিন্তু দিনকে দিন বেড়ে চলেছে শিশু-শ্রম,দাসত্ব, যৌন-বৃত্তি, পণ প্রথার দরুন মৃত্যুর হার,মানুষ বেচাকেনা,আরও কত কী!   মেয়ে শিশুরা ছেলে শিশুদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ভাবে কম পরিচর্যা পেয়ে, অপুষ্টি,অশিক্ষা, অবহেলায়, অবাঞ্ছিত,উপেক্ষিত হয়ে বেড়ে উঠছে, ও ছোটবেলা থেকে প্রতি মুহূর্তে ওদের মনে রাখতে বাধ্য করা হয়, ওরা মানুষ নয়, ওরা মেয়ে, কিশোরী , নারী ,ও নিপীড়ন ও শোষণ ওদের প্রাপ্য সমাজ থেকে।  কিন্তু আমার মনে হয় প্রতিটি পরিবারে যতদিন শিশুর বিকাশে পিতা ও মাতা সম-ভূমিকা পালনে অপারগ থাকবেন ততদিন সুষ্ঠু, সুন্দর,ও গঠনমূলক সমাজের বিকাশের  জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এবং আমরা অপেক্ষা করছি কবে জীবন নদীতে নিজেদের গা না ভাসিয়ে সবাই কে পারে নিয়ে যাবার জন্য স্রোতে বিপরীতে সাঁতার কাটবো-- কবে আমরা  মানুষরূপী জীবের খোলস থেকে বের হয়ে  আসবো ও মান আর হুঁশ সম্পন্ন মানুষ হবো?                                            

                          আমাকে যদিও লেখার বিষয় নির্দেশ করা হয়েছে কিন্তু আমি এখনও বিষয়ের মূল উদ্দ্যেশে পৌঁছানোর জন্য অলিগলি হয়ে গুটিগুটি পায়ে বড় সড়কে পাড়ি দেওয়ার আপ্রাণ প্রয়াস করছি। ছোটবেলা থেকেই খুব স্বতঃস্ফু্র্ত ভাবে বড় হয়েছি। খুব খেলাধূলো করেছি, ছবি আঁকা,চুটিয়ে আড্ডা,গান,নাচ,যোগচর্চা,নাটক,ভরদুপুরে মাকে লুকিয়ে চুরি করে কাঁচা আম,জলপাই,আমলকী আরও কত কী খাওয়া,পড়ার বইয়ের ভেতরে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়,সত্যজিৎ রায়,তারাশঙ্কর,বাটুল দি গ্রেট,হাঁদাভোদা,অরণ্যদেব,ম্যানড্রেক ইত্যাদি ইত্যাদি অজস্র বই পড়া,আবার পরীক্ষার আগে 10/15 দিন  খাওয়া-নাওয়া বন্ধ করে,রুদ্ধশ্বাসে শুধুই পড়াশুনো করে দিব্যি ভালো করেই উতরে যাওয়া,---সবই করেছি,একজন অপ্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ হিসেবে,কিন্তু নিজেকে সেভাবে  নাবালিকা,মেয়ে বলে কখনও ভাবিনি বা ভাবতে হয়নি বা বাধ্য করেনি কেউ। সেই পারিপার্শিক অবস্হা আমার ছিল এবং সেইজন্য I feel proud and lucky too.কখনও কখনও বাবার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চেয়ে দেখতাম আমি অন্য একজন অচেনা পথচারীর হাত ধরে হাঁটছি। ভয় ও লজ্জা পেয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখেছি বাবা দূরে মিটিমিটি হাসছেন। আমিও  ছুটে এসে  বাবার হাত ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে শতশত প্রশ্নবান ছুড়ে গল্প  করতে করতে আবার পথ চলা শুরু করেছি। এখনও মনে পড়ে,-- বাবা খুব মিষ্টি করে বকুনি দিয়ে বলেছিলেন –“ মা, কতদিন বলেছি তোমায় ,আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটবে না, মাটীর দিকে তাকাও, নোংরাতে পা পড়বে যে ”। তখন কথাটা এত গ্রাহ্য  করিনি। কিন্তু পরে উপলব্ধি করেছি,সত্যি সবসময় আকাশের দিকে তাকিয়ে পথ চলা যায় না । একদিন ঝুপ করে আমার ছেলেবেলা নামক অঙ্কের যবনিকাপাত হল। বাসন্তী পূজার মহাষ্টমীর দিন সন্ধ্যা আরতির ঢাক  বাজছে, এর মধ্যে আমার প্রিয় খেলারসাথি, আমার সকল আবদার মেটানোর চাবি চিরকালের জন্য হারিয়ে গেল।  আমার বাবা  পার্থিব শরীর ত্যাগ করলেন। পায়ের নীচের থেকে  হঠাৎ যেন মাটি সরে গেলো, মাথার উপর যেন  বিশাল ছাদ ভেঙ্গে পড়ল,নিরাপত্তার ছায়া সরে গেলো মাথার উপর থেকে—হঠাৎ করে যেন বড় হয়ে গেলাম –বৃষ্টি এলেই মনে হত আকাশেরও  আমার মত মন  খারাপ, নিজের অজান্তেই নিজেকে গুটিয়ে নিলাম আস্তে আস্তে , নিজের চারিদিকে এক কঠিন আবরণের বর্ম পরিধান করে নিজেকে খোলসের মধ্যে পুরে দিলাম ঠিক যেন কচ্ছপের মত, আর সেইসাথে নিজের মনের ভেতরে অনেক গুলি দরজা খুলতে খুলতে এক অন্য দুনিয়ায় পৌঁছে গেলাম, পেয়ে গেলাম আমার এক অনন্য ও অবিচ্ছেদ্য বন্ধুকে—আমার বিবেক—বা অন্য আমি ।  সেই আমার মনের অনাবিল সাগরে যখন আমি ডুব দিলাম, অবাক হয়ে দেখলাম এ তো আরেক দুনিয়া, ঠিক যেন সমুদ্রের ভেতরের মতন। উপর থেকে সমুদ্রকে দেখলে মনের হয় শুধু জল আর জল—কিন্তু তার গভীর অতলে আছে আর এক অন্য জীবন –সেখানে অনেক নাম না জানা রংবেরঙ্গের বিভিণ্ণ সুন্দর প্রাণী—পাহাড়,গাছপালা ও আরও অনেককিছু আমাদের অজানা। সব মানুষের মনের ভেতরেরই এই গভীরতা বর্তমান। কিন্তু খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও অভাব অনটন, মৃত্যু লোভ, লালসা ,প্রতিহিংসা, অজ্ঞতা,  ইত্যাদি প্রতিবন্ধকতার জন্য জীবনের আকাশে শুধু অসীম শূন্যতা ও জীবন সমুদ্রের অপার জলরাশিকেই আমরা প্রত্যক্ষ করি। 

                                 জীবন থিয়েটারের এই প্রতিবন্ধকতার নিরসনের প্রয়াসই দ্বিতীয়টি, থিয়েটার নামক জীবনদর্শন বা নাটক  । দ্বিতীয়টিতে ঠিক উল্টো, এখানে আমরা জীবন নাটকের বিভিন্ন অংশকে  বিভিন্ন ঘটনাবলীকে, সমাজের বিভিন্ন চিত্রকে , নাট্যরূপ দিয়ে যথাসম্ভব বাস্তবভাবে জীবনদানে সচেষ্ট হই, ও বিভিন্ন নাট্য চরিত্রগুলি দর্শকদের মননে, আদর্শে মিলেমিশে একাত্ম হয়ে দর্শক নামক সমাজের একটি অংশের ভাবাবেগকে আলোড়িত করার জন্য সচেষ্ট হই। আর একজন পরিপূর্ণ মানুষ-একজন নারী ও একজন নাট্যকর্মী হিসাবে –সমাজের প্রতি আমার যে দায়বদ্ধতা, আমার আমিকে নতুন করে খুঁজে পাবার যে প্রচেষ্টা, মনের অতল গভীর থেকে ভেসে উঠে জীবন আকাশে পাখি হয়ে ভাসার যে স্বপ্ন দেখা---যে প্রান্তে আকাশ আর সমুদ্র মিলেমিশে একাকার হয়েছে, সেইপ্রান্তে পৌঁছে জীবন সূর্য উঠা – সূর্য ডুবার যে সন্ধিক্ষণ তার মায়াময় আলোয়- আবেগে অপূর্বকে আস্বাদ করা ও সেই উপলব্ধি অন্যদের সাথে ভাগ করে নিতে পারার মত অনুভুতি গুলোর অনুরণন……..  পেয়েছি থিয়েটারের  নামক জীবনদর্শনের মাধ্যমে ---তাই আমার কাছে , থিয়েটার/নাটক মানে --- বেঁচে থাকার রসদ, ---থিয়েটার/নাটক মানে --বাঁচিয়ে রাখার মাধ্যম,---থিয়েটার/নাটক মানে সমাজ গঠনের হাতিয়ার---নাটক মানে অজস্র ঘটনার সহস্র বিবরণ---থিয়েটার/নাটক মানেই জীবন আর জীবন মানেই নাটক।

                                  …আমার খুব ছেলেবেলার বিস্মৃতির স্মৃতিতে এখনও ঝলমল যে নাটকটির একটি দৃশ্য বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠে, … ছোট্ট মিনি  ডাকছে –কাবুলিওয়ালাকে …সেই আবেগ,---- বেদনা,---- ছোট্ট মিনির বড় হয়ে উঠা, ও কাবুলিওয়ালারূপী মানুষের ভেতরে তাঁর আর্ত পিতৃসুলভ আবেগতাড়িত  আচরণ আজও আমাকে বিষণ্ণ করে… একনিমেষে সেই ছেলেবেলায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়……। ছোটবেলায় অনেক ছোটদের নাটক ও বড়দের নাটক দেখেছি, বিভিন্ন সময়ে  অনেক ছোটদের নাটকে অংশ গ্রহণও করেছি  । লাল পরী ও নীল পরীদের সাথে ঠাকুমার ঝুলিতে অনেক মজাদার সব নাটকের সাথে একাত্ম হয়ে রূপকথার দুনিয়ায় ডানা মেলেছি। এই ভাবেই চোখের পলকে বড়বেলার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেলাম কবে নিজের অজান্তে। এরই মধ্যে স্কুলের গণ্ডি পেড়িয়ে কলেজের পাট শেষ করতে করতেই রত হয়ে গেলাম ব্যস্ত কর্মজীবনে।

                                 ... যদিও  “জীবন নাটক” ও “নাটক জীবন” দুই এরই সিংহভাগ  পুরুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হচ্ছে। দুই ক্ষেত্রেই পুরুষরাই সব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও গুরুভার বয়ে চলেছে। আরও স্পষ্ট ভাবে বলতে গেলে বলা যায় এখনো দুই ধরনের থিয়েটারই  বহুলভাবে পুরুষতান্ত্রিক । কিন্তু আমার বলতে দ্বিধা নেই সেই “ থিয়েটার পুরুষ” রাই আমাকে থিয়েটার নামক জীবন দর্শনের মঞ্চের উচ্চতার শিখরের উত্তরনের  প্রথম সিঁড়িতে পা দেওয়ার জন্য  সহযোগিতার হাত এগিয়ে দিয়েছিলেন । ...আমিও আস্তে আস্তে আমার আমির খোলস ছেড়ে কবে যে বেরিয়ে এলাম জানি না,...একদিন আবিস্কার করলাম আমি আরও সাহসী , দৃঢ় , আমি সদর্পে আমার অভিব্যক্তি প্রকাশ করছি, আমি উদ্দাম হয়ে হাসছি, আমি ভাসছি,নিজেকে সমৃদ্ধ পরিপূর্ণ মনে হয়েছে, ...মনে হয়েছে হ্যাঁ, আমি চোখ বুজে - হাতে হাত রেখে বসে নেই, আমি প্রতিবাদ  ও প্রতিরোধ করার ক্ষমতা অর্জন করেছি,-----কারন নাটক  আমার প্রতিবাদের ভাষা, নাটক  আমার মত করে আমার কথা বলার সাহস । নাটক আমাকে আবার স্বপ্ন দেখার বিলাস ফিরিয়ে দিয়েছে,নাটক আমাকে আবার প্রান খুলে গাইতে শিখিয়েছি ---নাটক আমাকে উদ্দাত্ত কণ্ঠে কবিতা আওরাতে উদ্বুদ্ধ করেছে----আমার সামাজিক বন্ধন আরও মজবুত করেছে, নাটক আমাকে আমার জীবনের টানাপোড়েন ,সাংসারিক ঝুট-ঝামেলাকে সহ্য করেও আশার ছায়াকে আঁকড়ে ধরে নতুন করে বাঁচার প্রেরনা দেয়, তাই নাটক এখন আমার কাছে সেই রূপকথার জীয়ন কাঠি, আর এই জীয়ন কাঠি আমায় দেখিয়েছে--নাটক সমাজের দর্পণ,---যে দর্পণে জীবনের প্রতিফলন ঘটে...মঞ্চে অভিনেতা ও অভিনেত্রীরা অভিনয় শিল্প স্বত্বার মাধ্যমে বিভিন্ন ঘটনার দর্শন, মননশীলতা ও নাটকীয়তার প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস করেন। কিন্তু এই সমাজ দর্পণে নারীরা এত মুষ্টিমেয় কেন? কেন আমরা শুধু নারী না হয়ে সম্পূর্ণা হয়ে উঠতে পারছি না। কবে একে অপরের হাত ধরে আমরা নারী পুরুষ সমভাবে দুই থিয়েটারে দাপিয়ে বেড়াবো ? এই প্রশ্ন গুলো নিয়ে আমাদেরকে আরও ভাবতে হবে , ও ভাবনাকে বাস্তবায়িত করার জন্য কাজ করতে হবে, বিশেষ করে “থিয়েটার পুরুষ” দের মুঠো থেকে নিয়ন্ত্রনের  চাবি কাঠির সূত্রটি “থিয়েটার নারী” দের হাতে কিছুটা হলেও ভাগ করে দেওয়ার দায়িত্ব পুরুষ নাট্য ব্যক্তিত্বদের নিতে হবে। তবেই বোধহয় আমরা জীবন নদীর চরে আবার সবাইকে নিয়ে খুশি ও উদ্দীপনার স্রোতের ছোঁয়ায় বয়ে যেতে পারব, আর এই স্রোতই একদিন আমাদের জীবন সমুদ্রের অপার আনন্দের গভীরে নিয়ে যাবে যার শেষ হবে দিগন্তের সীমানায়।

                                ...“Social revolution is impossible without active participation of women”…এবং এই ভাবনা দুধরনের থিয়েটারেই নারীদের জন্য প্রযোজ্য।  দুই ধরনের থিয়েটার জীবনেই নারীকে বাদ দিয়ে পরিপূর্ণতা পায় না,অসম্পূর্ণ । কিন্তু আমাকে আমার অভিজ্ঞতা বলে,  it is really very hard to be a woman because she must think like a man, act like a lady, look like a young girl and work like a horse, যদিও হাস্যকর ও অবাস্তব কিন্তু এটাই সত্যি। ঘরে বাইরে অফিস আদালতে, মা ,বোন, স্ত্রী, মেয়ে ,পরিচারিকা ইত্যাদি বিভিন্ন ভূমিকায় নারীদের সমাজের সবার প্রতি জীবন থিয়েটারে  যে অমানুষিক নিঃস্বার্থ অবদান , তাঁর সঠিক মূল্যায়ন আমরা কখনও করিনা , করতে জানি না, তাই থিয়েটার জীবনে নারীদের এত কম উপস্থিতি। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই একই কথা বলতে হচ্ছে নারীরা ভুলে যায় ওরাও মানুষ, ওদের ও মনের খোরাক চাই, ওদের দুঃখ, বেদনা , হাসি , কান্না, চঞ্চলতা, উচ্ছলতার প্রকাশ জরুরী। কিন্তু আমরা শুধু মাত্র মা, বোন , মেয়ে, পরিচারিকা, স্ত্রী, হয়েই জীবন কাটিয়ে দেই, ক্লান্ত ও অপাংক্তেয় ভাবে।

                                  এখানেই নাটক জীবনের সার্থকতা। নাটকের মঞ্চ এমন একটি জায়গা......অনেকটা খোলা আকাশের মত, অসীম অনাবিল সমুদ্রের ঢেউএর  গায়ে ঘেঁষা  ধূধূ সমুদ্র তটের মত, ......সেই মঞ্চ আমাদের মনকে সব আবেগের ঢেউ এর চাদরে উথাল পাথাল করাতে, পারে, আমাদের সেই শৈশবে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে, আমাদেরকে আমাদের কষ্টের কথা, যা কাউকে বলা যায় না, যে যন্ত্রণা, ব্যথা, অবিরত কুরে কুরে  খায়, নাটকের মঞ্চে আমরা  স্বাধীন, আমি ও আমরা চিৎকার করে বলতে পারি...... “ আমি বাঁচতে চাই... সবাই কে নিয়ে আমি বাঁচতে চাই...”  অথবা ... “জীবনে ভালো লাগাটাই হচ্ছে সব চেয়ে জরুরী”......এবং এই যে আবেগের বহিঃপ্রকাশ প্রকারান্তে আমাদের মনের কোনে জমাট বাঁধা ক্ষতে মলমের কাজ করে, মনের মলিনতা ধুইয়ে দেয়, মানিয়ে নেয় মন অনেক কিছু, অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলে......এই মঞ্চে। এবং মঞ্চ বা থিয়েটারে, আমরা যা নই, যা কখনও হতে পারিনি, বলতে পারিনা, বিশেষমুহূর্ত গুলো, ফেলে আসা সোনার খাঁচার দিনগুলি কে আবার উপলব্ধি বা আস্বাদ করতে পারি। আর এই অনুভুতির আস্বাদ যে পায় সেই থিয়েটার জীবনের  আষ্টেপৃষ্ঠে নিজেকে জড়িয়ে নেই। বহুল সংখ্যক নারীদের এবং অবশ্যই পুরুষ ও নতুন প্রজন্মকে নাটক জীবনের পথে এগিয়ে নিয়ে আসতে হলে সেই অনুভুতির আস্বাদন করাতে হবে, এবং  সবার মনের ভেতরের অন্য রকম ইচ্ছে গুলোকে উসকিয়ে দিতে হবে।

                                 আমার স্বল্প জ্ঞানের পরিসরে ,বিগত এক দশক ধরে, আমার পর্যবেক্ষন ,---- বরাকের নাট্যচর্চা,  বরাকের প্রতিকূল ভৌগলিক অবস্থান ও প্রতিকূল রাজনৈতিক অবস্থা সত্ত্বেও সর্বভারতীয় স্তরের, ও, এখানের নাট্যকার, নাট্য পরিচালক , নাট্যকর্মীদের অভিনয় প্রতিভা এবং গন নাট্য আন্দলনের যে জোয়ার তা, সত্যিই উল্লেখযোগ্য । কিন্তু  পরিপূর্ণ নাট্য  প্রতিভা সম্পন্না নারী যিনি পরিচালনা ও অভিনয় এবং নাটকের বিভিন্ন আঙ্গিকে নিপুনা , এরকম নারী নাট্য ব্যক্তিত্ব সর্বভারতীয় স্তরেই  হাতে গোনা কয়েকজন ব্যতিরেকে বিরল। জনমের  মলয়শ্রী হাসমির সাথে পরিচয়ের পর ও জনমের নাট্যকর্ম আমার নাটক জীবনকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু   মলয়শ্রী হাসমি,ঊষা গাঙ্গুলি, শাঁওলী মিত্র ও সাই পারাঞ্জাতের মত মহিলা নাট্য ব্যক্তিত্ব এতদঞ্চলে প্রায় শূন্যই বলা যায়।

                                     এই অঞ্চলের নাট্য চর্চার ইতিহাস-শুধু-ইতিহাস হয়েই রয়ে আছে, কারন নাট্য চর্চা কে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ও নাট্য চর্চার জন্য যে ধরনের পড়াশুনা ও চিন্তাধারা করতে হ্য়, তা  থেকে এক বিশেষ অংশ নিস্পৃহ হয়ে আছেন, বলেই আমার ধারণা। এ অঞ্চলে নাট্য মহিলা ব্যক্তিত্ব নাটক নিয়ে বিশেষ ভাবে চিন্তা ভাবনা ও কাজ করছেন বলে অন্ততঃ আমার জানা নেই। তবে সুখের কথা বিগত দুতিন বছর ধরে বিশেষ করে শিলচরে “ রূপম সর্ব ভারতীয় নাট্য প্রতিযোগীতা” র সময় দুতিন টি মহিলা নাট্য সংগঠন শুধু মাত্র মহিলাদের নিয়ে নাটক পরিবেশন করছেন, এমনকি এবছর এর মধ্যে একটি নাটকের পরিচালিকা ও মহিলা ছিলেন। তবে আশা রাখবো অদূর ভবিষৎ এ এই সংগঠন গুলিই মহিলা নিয়ন্ত্রিত নাট্য পরিচালনার সাথে সাথে পুরুষদের চরিত্রে পুরুষদের নিয়েও নাটক করবে।                                   

                                কিন্তু একটি ব্যাপার আমাকে খুব পীড়া দেয় যে বরাকের নাট্য চর্চা শুধু মাত্র – বিশেষত “ রূপম সর্ব ভারতীয় নাট্য প্রতিযোগীতা” ও আরও কয়েকটি হাতে গোনা প্রতিযোগিতা মূলক নাট্য প্রদর্শনকে কেন্দ্র করেই  কেন কোন মতে জীবিত আছে। এ যেন প্রতি বৎসর দুর্গোৎসবের মত, পূজা এল তো পূজার ধূমধাম, আর “রূপমের” সময় বরাকের সমস্ত নাট্য সংগঠন গুলি জুড়ে কে কার থেকে কত ভালো নাটক করতে পারি, তাঁর প্রতিযোগীতা,সবাই ব্যস্ত মহড়ায়। তাঁর পর যে যার কাজে ,নাটক নিয়ে আর  সেরকম কোন মাথা ব্যথা কারও থাকে বলে মনে হয় না। অথচ যে মানের নাটক এখানে মঞ্চস্থ হয় প্রতি বছর,তা সত্যি প্রশংসনীয়। এই অঞ্চলের নাট্য সংগঠন ও নাট্য চর্চা মূলত শহর কেন্দ্রিক । যদিও এ অঞ্চলেরর বলিষ্ঠ নাট্যকার দের লেখনীতে গ্রামের সমস্যা, নারীদের বিভিন্ন চরিত্রায়ন থেকে শুরু করে ফ্ল্যাট বাড়ি ও সন্ত্রাসবাদের মত সমস্ত বিষয়ই  উঠে আসে, কিন্তু  নাটক গুলি পর্যাপ্ত দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় না এবং এখানে  অনেক ভালো অভিনেত্রী ও বোধ সম্পন্না মহিলা নাট্য ব্যক্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও, সারা বৎসর অনেকেই নাটক করার কোন সুযোগ পান না, তাই ওদের প্রতিভা অব্যবহৃত থেকে যায় । যেহেতু বেশির ভাগ নাটকেই নারী চরিত্র খুব কম থাকে,  এবং প্রায় সব সংগঠনই রূপমে অংশ গ্রহণ করে, তাই নতুন মহিলা নাট্য কর্মীদের আগমনের পথ ও প্রায় রুদ্ধদ্বার। বরাকের এই সমস্যা টি নিয়ে ও নাট্য চর্চাকে নতুন ভাবে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ ও চিন্তা ভাবনার বিশেষ প্রয়োজন অবিলম্বেই।

                                       যদিও বাল্যসুলভ চিন্তা ধারা , তবুও না লিখে পারছিনা, সেদিন cricket এর IPL খেলা দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হল, নাটক কে আরও মনোগ্রাহী করার জন্য যদি আমরা  এতদঞ্চলে অন্তঃত  IPL এর ধাঁচে নাট্য উৎসবের  ব্যবস্থাপনা করতে পারি তা হলে কেমন হয়। শুধুমাত্র নাটকের স্বার্থে ও  নাট্য উৎসবের  জন্য নিজেদের  নাট্য সংগঠনের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে ,  নতুন ভাবে, কিছু সংগঠনের নাট্য কর্মীরা সাংগঠনিক প্রথা ভেঙ্গে যে যার মত অদল বদল করে মিলে মিশে IPL style এ, ভাল নাটক মঞ্চস্থ করার প্রয়াস যদি করা যায়, আমার মনে হয় নাটকের সংখ্যা যেমন বাড়বে, ঠিক তেমনি সবাই সবার সাথে কাজ/নাটক করার ও সুযোগ পাবে, বৈচিত্র আসবে, একঘেয়েমি ও কাটবে ।  যেহেতু বেশীর ভাগ নাট্য সংগঠন গুলিই রূপম ছাড়া সেই ভাবে নাটক করার সুযোগ পায় না, তাই আমরা যদি বৎসরে দুই তিনটি নাট্য উৎসবের আয়োজন করি এবং সেই আয়োজনের দায়িত্ব rotation wise কয়েকটি  নাট্য সংগঠন ভাগ করে নেয়, এবং এই নাট্য উৎসবে বিভিন্ন  সংগঠনের সবার সহযোগে পূর্ণাঙ্গ নাটক পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়, তবে আরও বেশি মহিলা ও পুরুষ , নতুন প্রজন্ম সবাই ওতপ্রোত ভাবে নাটক ও সমাজ এবং মূল্যবোধের সাথে একাত্ম হতে পারবে। social network site facebook ,google plus, orkut ইত্যাদির আজকের জমানায় ওই  social network site গুলি visit করলেই আমরা বুঝতে পারি নারী পুরুষ জাত ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ শুধু মানুষই কে চায় , নিজের মত আদান প্রদানের জন্য, একে অপরের ভাবনা বিনিময় করেন, নিজের আদর্শে অন্যকে প্রভাবিত করেন ও অন্যের আবেগে আন্দোলিত হন। কিন্তু social network site এ শুধুমাত্র আক্ষরিক ভাবেই আমরা মানুষের আবেগ গুলো বুঝতে পারি,আর নাটকই একমাত্র শিল্প মাধ্যম যেখানের নাটকের জড়িত প্রতিটি মানুষ সে পরিচালকই হন, আবহকার, আলো, মঞ্চ সজ্জা, অভিনেতা, অভিনেত্রী, কিংবা make up ,prompter ,ইত্যাদি নানা ধরনের যে দায়িত্বেই থাকেন না কেন, নাটকের মধ্যে সমাবেশ করেন গভীর ভাবে,সমবেত ভাবে।  নাটকের মঞ্চ একটি বিশাল canvas এর মত, এতে sketch করেন নাট্যকার, কোথায় কি - কোন  রং দিতে হবে সেই তুলির কাজ করেন পরিচালক ,বিভিন্ন  রং এ ভরিয়ে দেন অভিনেতা , অভিনেত্রী ও বাকি আরও সমস্ত নাট্য কলা কুশলীগণ এবং পরিশেষে যে ছবি ফুটে উঠে, তার বিভিন্ন রঙে দর্শকরা নিজেদের মন ও আবেগ রাঙিয়ে নেন। এখানেই নাটকের প্রাসঙ্গিকতা। জীবন থিয়েটার ও থিয়েটার নামক জীবন,নারী ও পুরুষদের সম্মিলিত প্রয়াসে,আরও সমৃদ্ধ হোক,আর একজন “নারী অথবা পুরুষ”  নাট্য কর্মী হিসেবে আমাদের অঙ্গিকার হোক জীবনের দুধের থেকে  হাঁসের মত আমরা শুধু দুধটুকু দর্শকদের জন্য রাখবো , আর সমস্ত জল ধুইয়ে মুছে ফেলে দেব।      

                                আমি প্রবন্ধকার নই,  নই গবেষক,   বিশ্লেষক ও নই। সাধারন নাট্যকর্মী হিসেবে আমার নাটকের প্রতি ভালবাসা, ও নাটকের মাধ্যমে  সমাজের প্রতি দায়ভার থেকেই আমার লেখনির সঞ্চালনা। আমার উপরোক্ত লেখা পড়ে অবশ্যই বোঝা যাচ্ছে, আমি নাটকের অনুরাগে অনুরক্ত,  সেই অনুরাগের ছোঁয়া আমার আমার মননে, মস্তিষ্কে, বোধের দায়রায়---  নাটকের  প্রতি  আমার   বিশ্বস্তার আবেশ হয়তো আপনারাও পাচ্ছেন। আর সেই বোধের অনুভব থেকেই  আজকের এই লেখার অবতারনা। নাটকই আমার লেখনি।একজন সাধারন নাট্য কর্মী হিসেবে আমিও কখনও জীবন ও নাটককে   আলাদা করতে পারিনি তাই আমার লেখায় হয়তো জীবন নাটক ও নাটক জীবনের একটা মিশ্রণ ঘটেছে কারন  আমি জীবন  ও নাটকের মেল বন্ধন পেয়েছি মাটির সাথে আকাশের মেল বন্ধনের মত  এবং সেই বন্ধন থেকে আমি কখনো মুক্তি পেতে চাই না, আমি আকাশেও মেঘের মত ভাসতে চাই আবার সেই আমি চাই মাটীতে আমার শক্ত শেকড়ের ভিত।

                                দিনের পর দিন, বছরের পর বছরের----  বঞ্চনা, উপেক্ষা,অনেক বাঁধা বিপত্তি,ঘাত প্রতিঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশ্বায়নের আগ্রাসন, অপসংস্কৃতির দুর্বার হাতছানি কে উপেক্ষা করেও আজকের এতদঞ্চলের নবীন প্রজন্ম প্রবীণের সাথে তাল মিলিয়ে চেষ্টা করছে, নিরন্তর নতুন চিন্তা ধারায় সমৃদ্ধ করছে নতুন নতুন নাটক,  তাতে  রূপালি রেখার মত  ক্ষীণ হলেও আশার আলোয় উজ্জীবিত হই, অদূর ভবিষৎ এ উত্তরসূরিরা ওদের করিশমা দেখাবে,   আমরা সবাই এক সাথে একাত্মভাবে, জীবন ও থিয়েটারের উত্তরণের জন্য কাজ করে যাবো নিরলস ভাবে, নতুন ভোরের নতুন সূর্য কিরনের আভার ছটায় আমাদের চারপাশ ছেয়ে যাবে, এই আশায় আশায় বুক বাঁধি।
                                       উপরোক্ত আলোচনা, ভাবনার দোলায় বয়ে যাওয়া, তখনই শুধু মাত্র পূর্ণ মাত্রা নেবে , যখন এই ভাবনা গুলো নাটকের  মাধ্যমে  আমরা আরও সহজ, সতেজ, ও পরিপূর্ণ ভাবে নিজের আবেগ ও কথা দিয়ে-- যারা সত্যি এই ভাবনা গুলোর  সহায়তায় জীবনের পাক থেকে বেরিয়ে আসতে  চায় ,মানুষ নামক জীবের গোড়াপত্তনের কাজে বিন্দু মাত্র হলেও সঞ্চালকের ভূমিকায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারবো, তবেই আমি ও আমরা সত্যিকারের নাট্যকর্মী হয়ে উঠতে পারবো।

                                 তারজন্য নিয়মিত নাটক নিয়ে কাজ করতে হবে। এবং যারা সত্যি নাটক নিয়ে কাজ করছেন, মানুষের জন্য, সমাজের মানবিক বিকাশের জন্য, তাদের জন্য সাধন কিন্তু অধরা নয়। তাদের জন্য অভিনেত্রী ভালো অভিনয় করছে কি করছে না, দলে কতজন মহিলা নাট্যকর্মী আছেন কি নেই, ভালো মঞ্চ আছে কি নেই, আলো ভালো হল না খারাপ, মঞ্চসজ্জা ও রূপসজ্জা হল কি না, তা গুরুত্ব পূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি হচ্ছে, নাটকটি সুস্পষ্ট ভাবে অভিনীত হল কি না, এবং সেই নাটকটির মাধ্যমে যে বার্তা প্রকাশ করতে চান, তা কতখানি সঠিক ভাবে উঠে এল সেটাই বেশী গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া উচিত। আসল ব্যাপার হচ্ছে, যখন   নাট্যকর্মীরা এবং নাট্য দলগুলি নাটক কে ক্ষুরধার কলমের মত ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখনই নাটক নাটক হয়ে উঠতে পারে।

                              নাটক কে একটি বিশেষ মাধ্যমের মত ব্যবহার  করার পারদর্শিতা দেখানোর জন্য বিশেষ অভিনয় প্রতিভা, বা বিশেষ দলের দলগত সদস্য বা সদস্যা হতেই হবে আমি অন্তত তা বিশ্বাস করি না। আমার মতে শুধুমাত্র একটি বিশেষ গুন প্রয়োজন আর তা হচ্ছে, নাটক নামক কলম বা তুলি দিয়ে  যে কাহিনী বা ঘটনাবলী বর্ণন করতে  যাওয়া হচ্ছে, বা যে সামগ্রিক  পরিস্থিতির ছবি ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস করা হচ্ছে, তা করার চেষ্টা করার আন্তরিক প্রচেষ্টা জারি আছে কি নেই সেটাই হবে মোদ্দা কথা। নাটককে আমার মুখের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করতে হবে, মানে আমি ও আমরা  যা বলতে চাই তা আমরা নাটকের ভাষায় বলব, নাটক হবে আমার  সেই আঙ্গুল যা তুলে আমি ও আমরা দেখাবো কোনটা ঠিক , কোনটা ভুল। আমরা হানা হানি খুনা খুনি করবো না, আমাদের সমস্ত বিবাদ- মারামারি ,আমাদের ঝগড়া, আমাদের  বঞ্চনার বিবরণ হবে প্রতীকী ভাষায়,  আর সেই প্রতীকী ভাষাই নাটক। আর এ আমার শুধু বিশ্বাস নয় দৃঢ় বিশ্বাস ,যে --  এই পৃথিবীতে অসংখ্য নাট্যকর্মী বিভিন্ন ভাবে, প্রচার বিমুখ হয়ে এই কাজ করে যাচ্ছেন।

               
          
              আমার কিছুদিন আগের একটি অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে ভাগ করে নিতে চাই। ইদানীং বেশ  কিছু দিন ধরেই পত্রিকাতে আমাদের এখানের চা বাগানের শ্রমিকদের মৃত্যুর খবর প্রকাশ হচ্ছিল এবং সবথেকে দুঃখজনক খবর ছিল যে চা বাগানের শ্রমিকদের মৃত্যুর কারনটি  অনাহার । আজকের দিনেও অনাহারে  মৃত্যুর খবর নিয়ে অবশ্যই পত্র –পত্রিকায় অনেক লেখালেখি, শাসক গোষ্ঠীর গাঁ বাচানো  বয়ান সবই পড়েছি, কিন্তু সবই যেন কাগজের কচকচানি হয়েই রয়ে গেছে ,--- কিন্তু কিছুদিন আগে শিলচরের নাট্য সংস্থা “কোরাস” আয়োজিত দুই দিনের একটি  চা বাগান নিয়ে workshop এর শেষ দিনের একটি অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণে আমি অফিস থেকে ফেরার পথে নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে দেরীতেই  হাজির হলাম। একটি নাটক চলছিল, অভিনেতা ও  অভিনেত্রীরাই সবাই চা বাগানেরই বাসিন্দা, ওদের নাটকের ভাষাও চা বাগানের ব্যবহৃত ভাষাই ছিল, এবং সবাই খেটে খাওয়া মানুষ, একটি বাচ্চা ছেলেও ছিল। নাটক টি আমি পুরো দেখতে পারিনি কারন আমি দেরী করে গেছিলাম, কিন্তু যততুকুই দেখেছি , তাতে আমি আমার চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি, আমার ভেতরে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল, আর ভাবছিলাম, আমরা কি সত্যি মানুষ না অন্য কিছু। কিছু করতে না পারার জন্য নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হচ্ছিল।  প্রত্যেক অভিনেতা ও  অভিনেত্রী প্রথম অভিনয় করছিলেন, ওদের কষ্ট,ওদের যন্ত্রণা , ওদের খিদে, ওদের কে বঞ্চনার যে চিত্র, ওদের বোধ ও ওদের কিছু করতে না পারার অপারগতার আবেগ –কান্না --- সব নাটক বলে দিয়েছিল--- আমি কিন্তু ওদের ভাষাও ভালো করে বুঝিনি, কিন্তু যে যন্ত্রণার ছবি খবরের কাগজ আমাকে দিতে পারেনি, সেই নাটক আমার গায়ে শিহরন দিয়ে জানান দিয়েছে, কি চলছে ওখানে , দুর্নীতির কোন পর্যায়ে সমাজ, নির্লিপ্ত শাসক, আর আমরা অন্ধ সামাজিক জীব। নাটকের কোন বিশেষ সাজ, আলো, বলতে গেলে কিছুই ছিল না। কিন্তু শুধু আমি ছাড়াও সমস্ত উপস্থিত বোদ্ধা ও নাট্য ব্যক্তিত্বদেরও সেই একই অনুভূতি ছিল। নাটক শেষ হওয়ার পর আরও চমক ছিল আমার জন্য, আমি সত্যি অভিভূত হয়েছিলাম, এবং মনে প্রানে আমার বিশ্বাস আরও প্রগাঢ় হয়েছিলো , “where there is a will , there is a way”. আমাদের সাথে পরিচয় করে দেওয়া হল “একজন মহিলা—নাম “কাজল দেমতা,-- অবসর প্রাপ্ত শিক্ষিকা”  -- উনি এই উপত্যকার প্রত্যন্ত অঞ্চলের  “বরসিঙ্গা- চা বাগান” এর বাসিন্দা, এবং উনি দীর্ঘ সময় ধরে এই কাজ করে আসছেন। এই সমস্ত নাটকের মাধ্যমের উনি চা বাগানের মানুষদের নিপীড়নের কারন ও মূল যন্ত্রণার থেকে বেরিয়ে আসার আশার-আলো  দেখাবার চেষ্টা করছেন, আমার কাছে উনি বিশাল বড় মাপের নাট্য পরিচালক, নাট্য সঞ্চালক , বিশাল নাট্য মহিলা ব্যক্তিত্ব, একজন সমাজসেবিকা, সবথেকে বড় পরিচয় উনি একজন সাহসী,উচ্চ মানসিকতার শুধু মাত্র মহিলা নন,পরিপূর্ণ মানুষ, এবং অবশ্যই আমার নমস্য । আমার স্মৃতিতে আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সর্বদা জ্বলজ্বল করবেন । সেই    সাথে   আমি  “ কোরাস” এর কাছে এই ধরনের সাহসী পদক্ষেপের জন্য ও আমার এই উপলব্ধির জন্য আমি সত্যি  কৃতজ্ঞ। “কোরাস” বহুদিন ধরে নাটকের মাধ্যমে  এ ধরনের সাহসী ও ব্যতিক্রমী কাজ করে যাচ্ছে, এবং চা বাগানের উপর কর্মকাণ্ড  কে প্রচারের আলোকে নিয়ে এসে ওদের নাট্য চর্চার ও এতদঞ্চলের নাট্য চর্চার ইতিহাসে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। 

                                     শিলচরের একজন বলিষ্ঠ নাট্যকার, শ্রীচিত্রভানু ভৌমিকের     “বরাক-মঙ্গল” নাটকটির কথা এখানে উল্লেখ না করে পারছি না। নাট্যকার, শ্রীচিত্রভানু ভৌমিকের  বেশীরভাগ নাটকেরই   মূল বিষয়বস্তু  থাকে স্থানীয় সমস্যা ।  “দশরূপক” সংস্থার  “বরাক-মঙ্গল” নাটকে আমাদের এই অঞ্চলের পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ও সরকারী বিভিন্ন সুবিধা গুলো যে আদতে সাধারন নাগরিকদের জন্য নয়, এবং আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাস্তাঘাটের জরাজীর্ণ অবস্থার জন্য যে নির্বোধ রাজনৈতিক চেলাচামুণ্ডা ও আমরা  সাধারন জনগণই দায়ী,--এবং video conference এর মাধ্যমের এই অঞ্চলের ভিন্ন চিত্র আদর্শ গ্রাম হিসেবে America ও দেশের অন্যান্য প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া যায়-- তারই একটি চিত্রাঙ্কন করা হয়েছিল।  নাটক চলাকালীন  টানটান  হয়ে বসে নাটকটি দেখেছিলাম। ভীষণ ভালো লেগেছিল নাটকটি, মনে হয়েছে, যথার্থ –এইরকম একটি নাটকের খুব আবশ্যকতা ছিল। সব থেকে মন ছুঁয়ে গেছিল গরীব দিনমজুরের কিশোরী মেয়ের অভিব্যক্তি, একটু ভালো করে বাঁচার আশা, মা ও বাবার সাথে পেট পুরে দুবেলা ভাত খেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে নতুন ভোরের আলো দেখার স্বপ্ন দেখতে চাওয়া--- খুব বেশী তো কিছু নয়!!!  অসম্ভব ভালো অভিনয় করেছে কিশোরী “ফুলমতিয়া” চরিত্রে “অঙ্কিতা সেনগুপ্ত ”  ……নাটকের শেষাংশে যখন “ফুলমতিয়া”কে পঞ্চায়েত নেতাদের নির্দেশানুসারে ওদের ভালো থাকার গল্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কে শোনাতে বলা হয়, ---- আলো পড়ে “ফুলমতিয়া”র উপর----- ওর চোখটা খুশীতে জ্বলজ্বল করে উঠে---- ফুলমতিয়া বলতে শুরু করে-----“ বাবুউউউউউ...... ঐ টিল্লার পিছে, হামদের ঘর......হাওয়া দিলে মড়মড় করে হিলে...... আর বারিষ দিলে একদম গিলা হইয়ে যায়......আর তখন আমরা সারা রাত জেইগে বসে থাকি......মা বলে ঘরটা কখন গিরে যাবে...বাবা বলে....গিরবেক নাই....আরও ধার লিবে...মা বলে...অর ধার মিলবেক  নাই...বাবা বলে না দিলে গাই টা বেইচে দিবে” । এই নাটকটি একটি জ্বলন্ত উদাহরণ যে ইন্দিরা আবাস যোজনা সত্যি যাদের জন্য ওরা আজও ভাঙ্গা ঘরের চাল মেরামত করতে  অক্ষম, ধার নিয়ে কোন দিন ও ঋণের বোঝা ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারে না, সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম – হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর ও  –কিশোরী মেয়ের নিরাপত্তা ও দুমুঠো অন্ন ও মাথার উপর ছাদের ব্যবস্থা করতে পারে না...... “ফুলমতিয়া”র  প্রিয় গাই টাকে যখন নিয়ে চলে যায়, তখন তার আর্ত চিৎকার...বাপ ও বাপ......আমার গাই টাকে বাবু লিয়ে যাচ্ছে......এবং সবশেষে  “ফুলমতিয়ার” এইসব অভিব্যক্তির জন্য বকাঝকা ও চড় জুটল, দোভাষী অবশ্য সব সামলে নিয়েছিল... । এই নাটকের সমস্ত চরিত্রায়ন প্রায় নিখুঁত...কিন্তু  আমার  কাছে “ফুলমতিয়া” চরিত্রটি নাট্যকারের অসাধারন সৃষ্টি ।  এই নাটকটিও আমার মতে গ্রামে ও মফস্বল অঞ্চলে আরও বহুবার মঞ্চস্থ   হওয়া খুব উচিত ছিল, তবেই হবে এই নাটকের সার্থকতা। 

                                      আমার  অভিজ্ঞতা আমার স্মৃতির চাদরে মোড়া অনেক এরকম নাটকের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু নাটক দিয়ে আমার  সাংস্কৃতিক জীবনের  কর্মকাণ্ড শুরু হয়নি।  শিলচরে  আমার প্রথম কাজ   “মানুষের খোঁজে” …নাটক নয়, একটি Video film...script writing এবং Directed by শ্রী দেবব্রত চৌধুরী..এই অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক হিংসার কারণ হিন্দু মুসলমান নয় -- ধর্মের ভিত্তিতে মানুষ যাচাই হয় না,তাই ছিল আসল বক্তব্য। আমার  বড়বেলায়  “নঈমা” চরিত্রটি আমার প্রথম অভিনীত চরিত্র। অভিনয় জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নয়,  আমাকে রাজি হতে হয়েছে, কারণ, “নঈমা”  চরিত্রায়নের মাধ্যমে সত্যিকারের  “মানুষের খোঁজে”র সন্ধানে দর্শকদের পথ দর্শাতে শ্রী দেবব্রত চৌধুরী আমার সাহায্য চেয়েছিলেন, আমি না করতে পারিনি। প্রায় তিন বৎসর ওদের সাথে কাজ করেছি, এবং ঐ Team এ আমিই একমাত্র মহিলা ছিলাম, এবং “মানুষের খোঁজে”র “নঈমা”  চরিত্রায়নের সাথে সাথে আমিও অনেক মানুষের খোঁজ পেলাম , জানি না কবে কখন থিয়েটার মানুষদের সংস্পর্শে এসে গেলাম ও আস্তে আস্তে কি ভাবে যে ভারতীয় গণ নাট্য সংঘের কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে গেলাম নিজেই জানি না। যুবতী “নঈমা” নিজের দাঙ্গা কবলিত গ্রাম ও দাউদাউ করে  আগুনে জ্বলন্ত নিজের বাড়ি থেকে অসুস্থ বৃদ্ধ পিতাকে ও নিজেকে অমানুষদের হাত থেকে  বাঁচাবার জন্য ছুটতে ছুটতে পথ হারিয়ে ফেলে , অবশেষে একজন মানুষের (যদিও হিন্দু )দেখা পাওয়া যায়,--যার সাহায্যে  নিরাপদ স্থানের উদ্দেশে ট্রেনে চড়ে নতুন অজানা গন্তব্যে রওনা দেয়......একটি মেয়ের বাঁচার লড়াই যার ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নেই বন্দুক, আছে শুধু বোধ, মানুষকে চেনার চোখ আর সবাইকে নিয়ে বাঁচার ইচ্ছা। তাই “নঈমা “চরিত্রটি আমার “আমি”কে  আরও সমৃদ্ধ করেছে, আমাকে মুসলমান মেয়েদের অবস্থানগত সমস্যা নিয়ে ভাবতে শিখিয়েছে। যদিও আমাদের কাছাড় তথা বরাক উপত্যকাতে হিন্দু  মুসলমান  দুইয়েরই প্রায় সহাবস্থান তথাপিও হিন্দু মেয়েরা , মুসলমান মেয়েদের চেয়ে শিক্ষা-সংস্কৃতিতে,   অনেকাংশে এগিয়ে। কিন্তু আমার পরিসংখ্যান বলে, আজও এতদঞ্চলের মুসলমান মেয়েদের নাবালিক অবস্থায় নিজের থেকে প্রায় ২০/২৫ বড় পুরুষের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়, ওরা অনবরত ঘরোয়া হিংসার শিকার, প্রায় প্রতিদিন খবরের কাগজে পণ প্রথা, ও এই ধরণের দাবী দাওয়ার জন্য পিটিয়ে খুনের খবর থাকে, সব থেকে যা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে যে, এই অঞ্চলের মুসলমান মেয়েদের গান, বাজনা, নাটক ইত্যাদি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিতি ও ভাগ নেওয়ার পরিসংখ্যান প্রায় নেই বললেই চলে, আর বিষয়টি আমার কাছে খুব তাৎপর্যপূর্ণ এই কারনে, এবং হয়তো এটাও একটি মূল কারণ এই অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া  মুসলিম নারী সমাজ। এখানে আমরা এখনও হিন্দু ও মুসলমান নামক ধর্মের বর্ম থেকে বেরিয়ে আমরা বরাকের বাঙালী  হয়ে উঠতে পারিনি,কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ  ও বাংলাদেশের মুসলমান নারীরা কিন্তু এদিকে অনেক এগিয়ে । ঠিক এই ধরণের একটি বিষয় নিয়ে একটি নাটকের কথা মনে পড়ছে, এ অঞ্চলের স্বনামধন্য বিশিষ্ট  নাট্যকার  শ্রীশেখর দেবরায়ের লেখা ও নির্দেশনায় “কালচারেল ইউনিট শিলচর” এর নাটক “জিম্মা” । ভীষণ ভালো একটি প্রযোজনা  এবং মুসলিম মহিলা “সাবিনা” চরিত্রে আমার অভিব্যক্তি প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। চরিত্রটি খুব প্রশংসিত হয়েছিল, এবং আমার সবথেকে ভালো লেগেছিল যে “জিম্মা” নাটকটির দর্শকের আসনে প্রচুর মুসলিম বর্গের পুরুষ ও  মহিলারা ছিলেন। এই যে এক অদ্ভুত বা অজভুত বললেও ভুল হবে না ,-- এক দ্বন্দ্ব  ---হিন্দু ও মুসলমান, --আমাদের মধ্যে এক বিশাল দেওয়াল  ...অথচ আমাদের ভাষা, চলাফেরা , কথা বার্তা, খাওয়া – দাওয়া  প্রায় সমস্ত কিছুই একই রকম, এবং তার থেকেও বড় কথা, আমরা এই ভাবেই পাশাপাশি বছরেরে পর বছর বসবাস করে আসছি, কিন্তু আমাদের মানসিকতার আধুনিকরণ সেই ভাবে ঘটছে না, সুবিধাবাদী ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক পরিকাঠামো এই বিষয়ে সময় পেলেই সুড়সুড়ি দিয়ে জানান দেয়, এই ক্ষতটিকে আরও গভীর করার কুপ্রয়াস চলছে ও চলবে।  এই নাটকের মাধ্যমে “এই অঞ্চলের মুসলিম মেয়েদের তথা মুসলিম সম্প্রদায় ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানসিক দ্বন্দ্ব ভুলে আসলে আমরা হিন্দু মুসলিম ব্যতিরেকে একে অন্যের পরিপূরক হওয়া উচিত এবং এর জন্য উভয় পক্ষকেই একে অপরের দিকে এগিয়ে যেতে হবে,” ---এই সন্দেশটুকু দেওয়ার প্রচেষ্টার জন্য নিজেকে  সমৃদ্ধ মনে হয়েছে, মনে হয়েছে, হ্যাঁ, আমি অন্তত সেই চেষ্টা করেছি, উভয়ের কাল্পনিক দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব  মোচনের।
  
                                    নাটক আমার বোধের পরিসীমা বর্ধিত করেছে, নাটকের চরিত্র গুলি যেন আমার উপর এক বিশাল দায়ভার চাপিয়ে দেয়, মাঝে মাঝে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করি, আমি নাটক নিয়ে কেন এত ভাবি, কেন নাটক নিয়ে আমার এত টানাপড়েন --- কিন্তু যেদিন থেকে আমি আমার কথা আমার মত করে বলতে শুরু করেছি, যদিও কথাগুলো শুধুই আমার জন্য নয়, সেদিন থেকেই জানতে পেরেছি, নাটক মানেই আত্মস্থ হওয়া – নাটক মানে আত্মসমালোচনা করা । আমার খুব ভালো লেগেছিল , যেদিন আমি আবিষ্কার করলাম আমি একজন নাট্যকর্মী ।  আমাকে দর্শকদের সাথে পরিচয় করে দেওয়া হয়েছিল, নাট্যকর্মী হিসেবে,না মহিলাও নয় ,পুরুষও নয়, শুধু নাট্যকর্মী। “বদরপুর থিয়েটার ওয়ার্কশপ” বদরপুর আয়োজিত একটি থিয়েটার নিয়ে আলোচনা সভায় নাট্য বোদ্ধাদের সাথে আমিও আমন্ত্রণ পেয়ে  যোগ দিতে হাজির হলাম। আলোচনার বিষয় ছিল  “নাটক” ---নাটকের মান, কেন নাটক হবে, কেন আগের মত নাটক হচ্ছে না, সব সংগঠনকে কিভাবে আরও ওতপ্রোতও ভাবে নাটকের সাথে জড়ানো যায়, ইত্যাদি বিভিন্ন আলোচনা হল। আমার ভালো লেগেছিল এই ভাবের আদান প্রদান। সংবাদ মাধ্যমে কেন নাটকের খবর সেইভাবে প্রচার  কেন হয় না,তা নিয়েও কিছু ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করেছিলেন কিছু বক্তা। তারপরই হঠাৎ আমাকে আহ্বান করে একজন নাট্যকর্মী বলে পরিচয় করে দিয়ে কিছু বলতে বলা হল । আমি তো প্রায় ঘাবড়ে গেছিলাম, কারণ আমাকে কিছু বলতে হবে আমার জানা ছিল না, তাছাড়া আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবো তাও জানা ছিল না, যা হোক ,নতুন পরিচয়ে অভিভূত আমি   “নাট্যকর্মী” হিসেবে আমার তাৎক্ষনিক মনের ভাব প্রকাশ করলাম----বললাম  সংবাদ মাধ্যমে কেন নাটকের খবর সেইভাবে প্রচার  কেন হয় না, সেটি না ভেবে আমরা নাটককে কিভাবে মাধ্যম হিসেবে আরও বিস্তৃতি দিতে পারি তা নিয়ে আমাদের বেশী করে শুধুই ভাবা নয়, নাটক সাধারনের কাছে পৌঁছে দেওয়া উচিত। নাট্য আন্দোলন , নাট্য সংগঠন ও নাট্যকর্মী ... এই শব্দগুলো একটি শক্তিশালী মাধ্যমের কিছু term. তাই নাটকের প্রচারের জন্য অন্য কোন মাধ্যমের প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না। নাটকই একমাত্র সরাসরি মাধ্যম যা দর্শক – শ্রোতা কে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন সময়োপযোগী নাটকের উপস্থাপনা। আর এখানেই পথ নাটকের , বিষয়ে আরও ভাবার ও পথ নাটক নিয়ে কাজ করার সম্ভাবনার রাস্তা খুলে যায়।

                                            জরুরী নয় নাটক করতে হলে স্থায়ী মঞ্চেই করতে হবে, এবং দর্শক ও বাতানুকূল পরিবেশে আরামে বসে নাটকের মজা নেবেন, আমাদের সেই  সমস্তই দর্শকদের নিয়ে ও ভাবতে হবে যাদের নাটক দেখতে আসার , সময় ও সাধ্য নেই, তাই পথ নাটকের মারফত আসল বক্তব্য, ও সেই সমস্ত দর্শকদের বোধের পরিসীমার দায়রা বাড়ানোর জন্য এগিয়ে যেতে হবে, আর তা কিন্তু সম্ভব নাটক নামক মাধ্যমের দ্বারা। এখানে একটি পথ নাটকের উল্লেখ করতে ইচ্ছে করছে, আমার অভিনীত প্রথম পথ নাটক শ্রী  শেখর দেবরায় রচনায়   “ তিন মন্ত্রের তিন ফুঃ”। নাটকের মূল বিষয় আমাদের এতদঞ্চলের বিপর্যস্ত রাস্তাঘাট এবং নিষ্কর্মা মন্ত্রী বিধায়কের নিষ্ক্রিয়তা ।  পথ নাটক টি lead  করার জন্য কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না, তাই আমাকে বলা হল , আমি ও নাটকটিকে কোন মতে উতরে দেওয়ার জন্য রাজি হলাম, খুব একটা সাহস মানে পথ নাটক করার জন্য যে রকম ক্ষুরধার হতে হয় আমার মনে হচ্ছিল সেই সাহসটা ঠিক যেন আমার মধ্যে নেই। তবুও একবার ১২ এপ্রিল, সফদর হাসমির মৃত্যু দিবসে যা   পথ নাটক দিবস হিসেবে পালিত হয়,  ভারতীয় গণ নাট্য সংগঠনের পরিচালনায়  আমরা নাটকটি শহর ও গ্রাম ও মফস্বলের  বেশ কিছু স্থানে পরিবেশন করেছিলাম। খুব ভালো একটি নাটক এবং বহুল প্রশংসিত হয়েছিল । বিশেষ করে গ্রামে গঞ্জে দর্শকদের আমাদের সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়াটা ও নাটকের বিষয় বস্তুকে বুঝে নেওয়া ও সহমত পোষণ করা, আমাকে “আমি” হতে আরও বলিষ্ঠ করেছে।   নাটক টি বহু বার আমরা করেছি এবং সব থেকে মজা পেয়েছিলাম যে হয়তো এমন কোন অনুষ্ঠানে আমরা যখন নাটকটি করছিলাম ,দর্শকাসনে বসে ছিলেন স্থানীয় বিধায়িকা ও মন্ত্রী ।  তখন মনে হয়েছিল ,না নাটক তো নয়, সরাসরি নাটকের রূপক কথকোপনের মাধ্যমে চপেটাঘাত করছি এবং কিছু করতে না পারার লজ্জা  আমি কিন্তু ওদের চেহারার অভিব্যক্তিতে দেখতে পেয়েছিলাম। এখানেই আমাদের নাটকের সার্থকতা।

                                        কোন একবার  মনে আছে, কাছাড় ব্লাড ডোনারস এ্যাসোসিয়েশন শিলচর, ব্লাড ডোনেশন ডে তে একটি নাটক করার অনুরোধ করেছিল, ওরা প্রতি বছর দিনটি খুব সুন্দর ভাবে পালন করে, সেবার আমার গিয়ে খুব ভালো লেগেছিল, কিন্তু আমাদের নাটকটি দারুণ ছিল, সবাই নাটকটি মঞ্চস্থ করার সময় খুব উপভোগ করেছিলাম, দর্শকরাও খুব মজা পেয়েছিল, কিন্তু নাটকটি এত informative ছিল যে, আমি নাটকটিতে অংশ গ্রহণ করার ফলে রক্তদান সম্বন্ধে অনেক কিছু জানতে পেরেছিলাম, এবং অন্যদের কে জানাতে ও পেরেছিলাম। এই নাটকটিও শ্রী শেখর দেবরায়ের  লেখা ও নির্দেশিত , আমার সব থেকে ভালো লাগা নাটকের একটি এই নাটকটি। প্রথমে আমরা নাটক টি “রক্ত” নামে মঞ্চস্থ করি, পরে শেখরদার পাণ্ডুলিপির যে নাম  ছিল “ সমবেত সংলাপ”  নামেই নাটকটি পরিবেশিত হয়েছিল। নাটকটি সবার এত ভালো লেগেছিল, যে আমরা অসংখ্য বার  নাটকটি পরিবেশন করেছিলাম। এই নাটকের মূল বিষয় ছিল , রক্ত ও জীবন --- রক্তদান সম্বন্ধে ছোট ছোট খুব জরুরী কথা, এবং অবশ্যই রক্ত দানের আবশ্যকতা । নাটকটি  পথ নাটক হিসেবেই বেশী পরিবেশিত হয়েছে, তবে মঞ্চে ও বহুবার নাটকটি হয়েছে।  আমি  যে কথাটি বলতে চাইছি,  মূল   কথাটি  হল, নাটক ও হতে পারে সমাজের বিভিন্ন কুপ্রথা, ভালো গুণাবলী, অন্যায় অবিচার, সামাজিক অজ্ঞতা ইত্যাদি দূরীকরণের একটি পন্থা । সত্যি বলতে কি  আমিও আস্তে আস্তে উপলব্ধি করলাম, নাটক নামক রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে আমরা যদি অন্তত নিজেদের ভাবনার জট গুলো খুলে দিতে পারি, আর সবাই কে নিয়ে সেই রাস্তায় জীবনের কিছুটা পথ পাড়ি দিই, এবং সবাই কে কি করে ভাবনার ছোঁয়ায়  মশগুল হতে হয় সেই নেশাটা ধরিয়ে দিতে পারি, তখনই আমরা যথার্থ নাট্যকর্মী হয়ে উঠতে পারবো।

                                        শুরুর দিকের কথা, আমাকে  কেউ বিশেষ চেনে না, তখন আমি “মানুষের খোঁজে”  ভিডিও ফিল্মে কাজ করছিলাম প্রায় শেষের দিকে , হঠাৎ একদিন ফোন করে  আমার সাথে দেখা করতে আমার বাসায়  এলেন, নিজের পরিচয় দিলেন,নাম বললেন,একজন নাট্যকার, সাথে আরও একজন ছিলেন, এসেই চটপট করে আমাকে উনার চিত্রনাট্য সংক্ষেপে শোনালেন, আমি কিছু বলার আগেই, বললেন কোথায় কখন রিহারসেলে যেতে হবে, আমি একটু হেসে কিছুটা অবাক হয়ে বললাম, আমি পারবো আপনি জানেন ? উনি বললেন তোমাকেই করতে হবে, তুমি চলে এসো।   এর আগেও বেশ কয়েকটি অনুরোধ এসেছিল, কিন্তু আমি খুব ইচ্ছুক ছিলাম না।  উনার আমার প্রতি বিশ্বাস ও উনার আত্মবিশ্বাস দুইই আমাকে প্রভাবিত করেছিল । পরে খবর নিয়ে জেনে ছিলাম, তিনিই সেই চিত্রভানু ভৌমিক, এবং উনিই প্রথম নাট্য ব্যক্তিত্ব যার সাথে আমার প্রথম কাজ, যদিও নাটক নয়, ছিল দূরদর্শন এর  একটি Tele Play “ সন্ধ্যা” ।  যেদিন প্রথম রিহারসেলে গেলাম, ঠিক নাটকের মতই রিহারসেল হচ্ছিল, আমি তখনও নাটক অতসত বুঝিনা, তবে ক্যামেরায় সামনে কাজ করার অভিজ্ঞতার সুবাদে বুঝতে পারলাম, একটি নাটক কেই চিত্র নাট্য রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আমাকে বিশেষ কিছু বললেন না, শুধু বললেন তোমার মত করে ভেবে নাও, এই এই ব্যাপার। অসম্ভব ভালো ও সহজ সরল তথাপি হৃদয় ছোঁয়ানো একটি গল্প। আমার বিশেষ চিন্তা করার অবকাশ ছিল না , কারণ আমি ততদিনে ক্যামেরার সামনে সাবলীল হয়ে গেছি, আর ঝটপট করে shot wise কাজ শেষ করতেই আমি বেশী আগ্রহী ছিলাম। কিন্তু পুরো shouting টাই একটু অন্যরকম ভাবে ক্যামেরাবন্দী করা হয়েছিল, আমার মনে হয়েছিল, shot division properly করা হয়ে উঠেনি। মনে মনে ভাবছিলাম, নাটক – ফাটক খুবই বিরক্তিকর, শুধু রিহারসেল, আমার ক্যামেরাই ভালো, চটপট এসে shot দিয়েই কাজ শেষ। কিন্তু অপর দিকে অন্যরা বলাবলি করতো, নাটকই ভালো, ক্যামেরার সামনে যত ঝামেলা। আমি ছাড়া এই টেলি নাটকে সবাই নাটকের মানুষরাই ছিলেন, এবং সবাই আমার অচেনা। সব শেষ দৃশ্যটি আমার ছিল, এবং আমার এখনো মনে আছে, সারাদিন বসে ছিলাম, ঠিক সন্ধ্যার সময়  আমার shot  এর shouting  শুরু হল, তখনও নাটকটির নাম ঠিক হয়নি, উনি আবার আগাম নাটকের নামটি জানান দেন না, একদম শেষ মুহূর্তে সেটি জানান । কেন্দ্রীয় চরিত্র “সন্ধ্যা” র ভুমিকায় আমি একজন পক্ষাঘাতে পঙ্গু স্বামীর স্ত্রী, যে নিজের সাংসারিক জীবন যুদ্ধে ম্রিয়মান, কিন্তু সবাইকে নিয়ে ভালো ভাবে বাঁচার জন্য কোন ত্রুটি রাখতে চাইছে না। মেয়েটি যদিও অল্প বয়সের, কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থার জন্য মেয়েটিকে অনবরত নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে । স্বামী পঙ্গু, বিছানায়,  তাই সারাদিন কাজ করে, রাতে ঘরে ঠোঙা বানিয়ে দোকানে বিক্রি করে কোন মতে শাশুড়ি - স্বামীর মুখে দুটো অন্ন ও স্বামীর পথ্য জোগাড় করতে করতে  নাজেহাল। স্বাভাবিক ভাবেই যখন তখন ঘর থেকে বেরোতে হয়, ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়, অনেক পুরুষ মানুষদের সাথে কথা বার্তা বলতে দেখা যায়, মাঝে মাঝে কিছু কাজে পুরুষ মানুষ এসে খোঁজ ও করে,...  যা হয় আজও ---আস্তে আস্তে আশেপাশের প্রতিবেশীরা ওকে সন্দেহ ও খারাপ মেয়ে বলে ভাবতে শুরু করে। কিন্তু ওর স্বামী কিন্তু কথা বলতে না পারলেও ইশারায় এসবের প্রতিবাদ করে। সব শেষের দৃশ্যে , যখন মেয়েটি একটা হুইল চেয়ার নিয়ে বাড়িতে আসে, সেদিন একটু বেশী রাতই হয়ে গেছিল, কিন্তু নিজেকে নিংড়ে দিয়ে, সবার অনুমান কে মিথ্যা প্রমাণিত করে যখন সন্ধ্যা প্রমান করলো সে কতটা আশাবাদী , নিজের পঙ্গু স্বামী কে আবার জীবনের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে, হুইল চেয়ারে বসিয়ে নতুন করে বাঁচার  জন্য যে সংঘর্ষ করে যাচ্ছে, আর এই হুইল চেয়ারটি জোগাড় করার জন্যই যত কাণ্ড। আমার এখনো মনে আছে, যখন সন্ধ্যা , কলিং বেল বাজিয়ে ঘরে প্রবেশ করলো, পেছন থেকে টেনে নিয়ে এলো হুইল চেয়ারটি সবাই বিস্মিত হয়েছিল। “সন্ধ্যা”  যে হুইল চেয়ারে স্বামীকে বসিয়ে এই জীবন  চলার পথে ভালো ভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখাতে চেয়েছিল...  শুধু তাই নয়, নিজেও বাঁচতে চেয়েছিল সবাইকে নিয়ে। সেইসাথে  সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকার এই যে আন্তরিক প্রয়াস থেকেই কি আমরা বুঝতে পারি না “ সন্ধ্যা” রা কত শক্তিশালী, ওরা দুর্বল নয়, ওরা খারাপ মেয়ে মানুষ নয়, ওরাও শুধু মানুষ, স্বপ্ন দেখতে চায়, বাঁচতে চায়, হাসতে চায়। ভীষণ ভালো শক্তিশালী একটি চরিত্র...আমার মনে আছে, নাটকের শেষ দৃশ্য, কিন্তু আমার অভিনীত প্রথম  shot, আমার চোখটা জ্বলজ্বল করছিল, বুকের ভেতর কেমন জানি একটা কষ্ট হচ্ছিল, cut and ok শুনতে পেলাম, আরও শুনলাম একজন co-actor আশ্চর্য হয়ে আমায় বলছেন  first takeই ok হয়ে গেলো। অপ্রিয় হলেও আজও সত্যি,যে নারীরা,  কিশোরীরা, মেয়েরা, মহিলারা যত বেশী যুঝছে বেঁচে থাকার জন্য, সমাজ আজ ও হাত বাড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ওদের দিকে আঙ্গুল তুলতেই বেশী আগ্রহী। কিন্তু সব কিছুকে, সব বাঁধা কে নস্যাৎ করে দিয়েও এই সমাজের অগুনতি “সন্ধ্যা” রা  জীবন রাতের অন্ধকার আকাশে সন্ধ্যাতারা হয়ে অন্যদের আলো দেখাবার আপ্রান চেষ্টা করছে,এবং অপেক্ষা করছে কখন ভোরের আলো ফুটবে।  এই চরিত্রটির মাধ্যমেই আমি বিশেষ পরিচিতি পেয়েছি, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও মফস্বল …দর্শকদের  কাছে।  অসম্ভব ভালো কিন্তু খুব সাদামাটা ছিমছাম একটি প্রযোজনা, এখনও প্রায়ই অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার হয়ে থাকে।  নাট্যকার শ্রী চিত্রভানু ভৌমিক এর এই যে প্রয়াস, নাটকের মাধ্যমে “সন্ধ্যা” দের বেঁচে থাকার , স্বপ্ন দেখার ও জীবনের স্রোতের বিপরীতে আপ্রান চেষ্টা করে ভেসে থাকার ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করার চিত্রাঙ্কন  আসলে সামাজিক জীবদের মান ও হুঁশ নামক বোধের আদল দিয়ে মানুষ রূপ দেওয়ার আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্যি প্রশংসনীয়।

                                 এই যে ছোট ছোট অথচ খুব সূক্ষ্ম অনুভূতি ও তার পরবর্তী প্রতিক্রিয়াগুলি কে নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরা ও দর্শকের মনে প্রশ্ন উত্তরের ডামাডোল তৈরী করে দেওয়া, সব পারেন নাট্যকার । আমি যে চরিত্র বা নাটকের কথা গুলো এখানে আলোচনা করছি,  হয়তো মনে হতে পারে পাঠকবর্গের কাছে আমি শুধু বাছা চরিত্র গুলিকেই বিশ্লেষণ করছি, তা নয় আসলে আমি যে চরিত্র গুলি কে মনন করেছি, উপলব্ধি করেছি, ও আমার মত করে ভেবেছি ও আমার জীবন থিয়েটারের অনেক মুহূর্তের সাথে একাত্ম হতে পেরেছি যে সব চরিত্রায়নের মাধ্যমে, সে গুলি আমাকে আমার “আমি” থেকে সমাজের “আমরা” হবার পথে অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছে, সেই গুলিই আপনাদের সাথে ভাগ করে নিচ্ছি । আমাদের রোজকার জীবনের অনেক কিছুই আমি মেনে নিতে পারি না, মেনে নিতে কষ্ট হয়, একেক সময় মনে হয় কেন মানুষ সব সময় এত আত্মকেন্দ্রিক,কেন চোখ থাকা সত্বেও না দেখে অন্ধের মত পাশ কেটে চলে যায়, এত সব আমি একা কি করে প্রতিরোধ করবো, মাঝে মাঝে ভীষণ হতাশ লাগে, কিন্তু আমার বিবেক আমার অন্য “আমি” আমাকে কবিগুরুর ভাষায় জানান দেয়, “ অন্তর গ্লানি সংসার ভার... পলক ফেলিতে কোথা হাহাকার......”  আর তাই আমার মন বলে “  যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে...”…….যে কোন ভাবেই হোক এগিয়ে যেতে হবে, থামা চলবে না, এই আশায়... চলতে চলতে একদিন ঠিক পৌঁছে যাবোই।

                                         এই মুহূর্তে আমার আরও একটি নাটকের কথা  খুব মনে পড়ছে কয়েক বৎসর আগের কথা, সব থেকে দুঃখজনক যে নাটকটি আমরা মাত্র একবারই মঞ্চস্থ করেছি, তারপর আর সম্ভব হয়ে উঠেনি, একটি পরীক্ষা মূলক নাটক,  বিশিষ্ট  নাট্যকার শেখর দেবরায় লেখা ও নির্দেশনায় “শিলচর কালচারেল ইউনিট” এর পরিবেশনা “রূপান্তর” । উত্তরপূর্বাঞ্চল এর বিবিধ কৃষ্টি ও সংস্কৃতি  এবং এতদঞ্চলের সমস্যা, রাজনীতি, এবং সন্ত্রাসবাদ এবং প্রতিবাদের সঠিক ভাষা কি সেই প্রশ্ন নিয়েই নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিল। একটি চর্চিত নাটকের অন্যতম এই নাটক। পত্র পত্রিকায় অনেক দিন ধরে  অনেক বিদগ্ধ জনের মতামত , সমালোচনা ও আলোচনা প্রকাশ হয়েছিল। নাটকটি খুব প্রশংসিত ও হয়েছিল। নাটকের মাধ্যমে নাট্যকার একটি প্রশ্ন দর্শকদের জন্য তুলে ধরেছিলেন----- কি হওয়া উচিত আমাদের প্রতিবাদের ভাষা ? প্রকৃতির প্রাচুর্যে ভরপুর কিন্তু সঙ্কুল জনক ও কঠিন  ভৌগলিক অবস্থানের দরুন,  উত্তরপূর্বাঞ্চল ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে অনেক পিছিয়ে, এবং তার জন্য রাজনীতি বহুলাংশে দায়ী। মনিপুর , আসাম, ত্রিপুরা, নাগারাজি, মেঘালয়, অরুণাচল , মিজোরাম … এই অঞ্চলের মানুষ কিন্ত অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে ও বাঁচার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। অন্য দিকে কিছু সুযোগ সন্ধানী অমানুষ, রাজনীতিবিদ নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য এক শ্রেণীর নিরীহ ও বোকা জনগণ কে প্রতিবাদের নামে ফুসলিয়ে সন্ত্রাসবাদ নামক এক স্থায়ী ব্যবসাপ্রস্থ   স্থাপন করেছে। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ সাধারন মানুষের মনের ক্ষতকে উস্কে দিয়ে সন্ত্রাস নামক ভয়ংকর ছোঁয়াচে মারন রোগের শিকার বানাচ্ছে । আর যারা সন্ত্রাসী, ওরা নিজের জীবন ও সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে অক্লেশে  ঠাণ্ডা মাথায়  খুনীরূপে আত্ম প্রকাশ করছে। কিন্তু ওদের এই সন্ত্রাসী কার্যকলাপের পেছনে যে যুক্তি কাজ করে তা হচ্ছে …… এই পন্থা ওদের প্রতিবাদের ভাষা……আবার এই প্রতিবাদ কে দমনের জন্য সেনাবাহিনী ও সরকার  মনিপুরে যে দমননীতি চালাচ্ছে (যার মধ্যে অত্যাচার ও ধর্ষণ ইত্যাদি ও বর্তমান) , তার প্রতিবাদে একবার মনিপুরের  একটি ঘটনায়  কিছু সংখ্যক ইমারা ( মনিপুরী মায়েরা)  সেনা বাহিনীর কার্যালয়ের সামনে একসাথে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হয়ে গর্জে উঠেছিল-----“ আয় আমাদের ধর্ষণ কর, দেখি তোদের কত ক্ষমতা”……এই যে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এবং তার পরবর্তী প্রতিবাদ………একই সাথে আমরা যদি গৌহাটির সেই আদিবাসীদের নিজস্ব দাবী নিয়ে মিছিলের ঘটনার দিনের কথা স্মরণ করি……এবং পরে পুলিশের ব্যভিচারী লাঠি চালানো……এবং একাংশ জনগণের সেই মিছিলের প্রতিবাদস্বরূপ  লক্ষ্মী ওরাং নামের আদিবাসী  কিশোরী কে সম্পূর্ণ নগ্ন করে রাজপথে প্রকাশ্যে দিবালোকে চলতে বাধ্য করেছিল……ঐ ঘটনা গুলির সমন্বয় করে আমরা তুলে ধরতে চেয়েছি বিভিন্ন প্রতিবাদি ভাষা……আমি এই নাটকে ইমা ও আদিবাসী মেয়েটির চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। ইমা চরিত্রটি আমাকে ভীষণ ভাবে নাড়া দিয়েছিল……আমার ভাবতে গা শিউরে উঠেছিল……যে কতখানি চূড়ান্ত পর্যায়ে একজন নারী স্বেচ্ছায় এ কাজ করতে পারে……কতখানি অসহায় মনিপুরের ইমারা………আর লক্ষ্মী ওরাং আমাদের মহাভারতের কথা মনে পরিয়ে দেয়, সত্যি আজও নারী কত অসহায়, ……আমরা আমাদের নাটকের মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছিলাম, সাত বোনের রাজ্যের সমন্বয় মাথা উঁচু করে বাঁচতে চায়, আমরা আমাদের বিবিধ ভাষা…বৈচিত্র …সংস্কৃতি…সবুজ পরিমণ্ডল …বাঁধা বিপত্তি …এসব নিয়েই আছি ও থাকব। শুধু আমাদেরকে আমাদের মত করে থাকতে দাও…এবং দর্শক সমস্ত প্রতিবাদের ভাষা পর্যালোচনা করে নিজেই ঠিক করে নিক……কি হওয়া চাই সঠিক প্রতিবাদের ভাষা। আলোচনা, একে অপরের সাথে সাংস্কৃতিক আদান প্রদান ও মানবিক বোধ সম্পন্ন মানসিকতার বহিঃপ্রকাশই  হওয়া উচিত আমাদের সঠিক প্রতিবাদের ভাষা।

                                        প্রকৃতির মত সমাজও বিবর্তনমুখী......এবং সামাজিক রীতি নীতি, প্রথা ও উন্নত চিন্তা ধারা ও সমাজ সংস্কার মূলক কার্যকলাপ দলগত প্রয়াসের ফসল নাও হতে পারে। একক প্রচেষ্টাও খুব সুক্ষ্ম ভাবে বিশাল বৈপ্লবিক জোয়ার আনতে পারে এবং সামাজিক কুপ্রথা নিরসনে এক ইতিহাস গড়ে তুলতে পারে। সত্য ঘটনা ও ইতিহাস অবলম্বনে আরও একটি নাটকের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চাই । নাটক “ শিলালিপি” ,নাট্যকার শেখর দেবরায়, পরিবেশিত হয়েছিল “ শিলচর কালচারেল ইউনিট” এর প্রযোজনায়। খুব পুরনো নয়, ২০১১ তে প্রথম মঞ্চস্থ হয়, পরে এই অঞ্চলের বিভিন্ন নাট্য উৎসবে ও ত্রিপুরাতেও নাটকটি পরিবেশিত হয়েছিল। গত বছরই মেলাঘর-ত্রিপুরা  নাট্য উৎসবেও নাটকটি পরিবেশিত হয়েছিল, সেখানে উপস্থিত  বাংলাদেশের নাট্যদল “লোক নাট্যদল” এর নাট্যকর্মীরাও  সবাই খুব ভূয়সী প্রশংসা করেছেন  নাটকটির । নাটকটির মূল বিষয় আমাদের কাছাড়ের আজকের যে অঞ্চল টি “ডিমা হাসাও” যা পূর্বে উত্তর কাছাড় বলে পরিচিত ছিল, হাফলঙ- মাইবঙ- হারাঙ্গাজাও-মাহুর-জাটিঙ্গা-মাহুর... ইত্যাদি  অঞ্চলগুলির সমাহারই আজকের ডিমা হাসাও, সেই অঞ্চলের রাজতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের ইতিহাসে নরবলি নামক কুপ্রথার অবলুপ্তি ও পরবর্তী সময়ে নানা ঘটনাবলীর নাট্যরূপ । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর সেই সঙ্গে খুন অপহরণ সন্ত্রাস দুর্নীতি এই অঞ্চলটিকে  আজ আসাম তথা বরাক উপত্যকা এবং অবশ্যই ভারতবর্ষের রক্তক্ষয়ী বধ্যভূমির একটি অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়েছে । কয়েক হাজার বছর পূর্বে  সেই কাছাড় রাজ্যের রাজার অকাল প্রয়াণে তাঁর নাবালক পুত্র সুরদর্পনারায়ণকে রাজা রূপে স্থলাভিসিক্ত করা হয়, কিন্তু যেহেতু রাজকুমার  সুরদর্পনারায়ণ খুবই ছোট  ছিলেন , মাতা চন্দ্রপ্রভা রাজকুমার  সুরদর্পনারায়ণের হয়ে সমস্ত রাজ্য পরিচালনা করতেন। রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্রের  যে বিভিন্ন hypocrisy এই নাটকের বিভিন্ন চরিত্রায়নের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার প্রচেষ্টা করা হয়েছে, তা নাটকটিকে শুধু মাত্র একটি ভালো নাটকই নয় , একই সাথে নাটকের বিষয় বস্তুকে   contemplative and contemporary করে তুলেছে। “রাজমাতা চন্দ্রপ্রভা” চরিত্রটি আমার মতে আমার অভিনীত কঠিন চরিত্র গুলির মধ্যে একটি। রাজ্যের সুখ সমৃদ্ধি অকাল মহামারী ইত্যাদি নিরসনে রাজ্যের ধর্মাধ্যক্ষের আদেশে প্রতি বছর মায়ের মন্দিরে মায়ের চরণে নরবলি উৎসর্গ করা হয়। যারা নরবলির যোগানদার  “মাইপাডাউ” নামে ওরা পরিচিত , সমাজতন্ত্রের অংশাবলি , এবং অবশ্যই রাজতন্ত্রের  কেউ  কিন্তু নরবলির জন্য আজ অবধি বলি হয়নি। রাজ্যের সুখ শান্তির জন্য সাধারন নিরীহ প্রজাদের কেই সব সময় বলির পাঠা হতে হয়। কারণ সমাজতন্ত্রের ও রাজতন্ত্রের প্রতি সমীহ ও সত্ত্বার অধিকারকে হাতের মুঠোতে রাখতে কিছু মানুষ  সবসময় ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে । রাজমাতা চন্দ্রপ্রভার চিন্তাধারার  প্রভাবে রাজা  সুরদর্পনারায়ণ  বড় হয়ে উঠলেন, কোন তন্ত্রের কাঠপুতুল না হয়ে সত্যিকারের রাজা হলেন এবং ইতিহাসে পাতায় জায়গা করে নিয়েছিলেন। বৈষ্ণব ধর্মের প্রচারক ভুবনেশ্বর বাচুস্পতি প্রেমের বাণী, হিংসা দ্বেষ ভুলে গিয়ে সৌহার্দের ভাষা রাজমাতা চন্দ্র প্রভাকে নিজের ভাবনার প্রতিফলন ভেবে উল্লসিত হওয়া এবং স্বীকারোক্তি যে এমন ব্যক্তিত্ব রাজসভায় চাই যার  জ্ঞানের আলোকে অজ্ঞতা , কুসংস্কার , অন্ধকার দূরীভূত হবে, এবং অবশেষে যখন রাজা সুরদর্পনারায়ণ  ঘোষণা করলেন আজ থেকে নরবলি রাজ্যে নিসিদ্ধ হল, তখন সমাজ তন্ত্রের কুশীলবরা এই আদেশ মেনে নিলেও “মাইপাডাও” রা কিন্তু মানতে পারল না। ওরা বলল , আপনারাই তো আমাদের নরবলির যোগানদার বানিয়েছেন, হাজার হাজার বছর ধরে আমরা তাই করে আসছি, এখন না বললে কি করে হবে, আমরা সেই যুগেও ছিলাম , আমরা এই যুগেও আছি, আমরা ভবিষ্যতে ও থাকব। নরবলির খড়গ নিসিদ্ধ হল, কিন্তু সেই খড়গের জায়গা নিয়েছে আজ বন্দুক পিস্তল, বম , অপহরণ, এবং অহরহ নরবলি চলছে, আজ আসামে  জ্বলছে, হাজার হাজার মানুষ গৃহহারা হচ্ছে...কাল ত্রিপুরাতে সন্ত্রাসবাদের নামে আতঙ্ক খুন লোপাট জলভাতের মত চলছিল, পরশু মণিপুর ......মুম্বাই...দিল্লি...আমেরিকা... মিশর...সিরিয়া...ভিয়েতনাম...ইরাক ......আফগানিস্তান...পাকিস্তান...... সমস্ত বিশ্ব জুড়ে চরম অমানবিকতা ...  চলছেই  চলছে...এবং চলবে যতদিন না রাজতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্রের বিভেদ ঘুচবে ...সমাজতন্ত্র সঠিক ভাবে কাজ করবে ততদিন রাজতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের দ্বারা পোষিত ও  পালিত “ মাইপাডাও” রা এই নিধন যজ্ঞ চালিয়ে যাবে। মানুষ মারার খেলা চলবে। তাই ঘরে ঘরে রাজতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র প্রতিটি অংশে যারা আছেন তাদের ভাবনা চিন্তা ধারা রাজমাতা চন্দ্রপ্রভার ব্যক্তিত্বের আবেশে আবেগে চালিত হতে হবে এবং বহুলাংশে রাজতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রে  “রাজমাতা চন্দ্রপ্রভা” দের মত ব্যক্তিত্বের যোগদান আবশ্যক। আমাদের সমাজে “রাজমাতা চন্দ্রপ্রভা” , “কুন্তী,” “দ্রৌপদী” ...এই ধরণের প্রভাবশালি ব্যক্তিত্ব খুবই জরুরী, যারা রাজতন্ত্রে থেকে সমাজতন্ত্রকে সঠিক পথে চালিত করতে পারে প্রজাতন্ত্রের উন্নতির জন্য। মনে পড়ে গেলো আরও একটি নাটকের কিছু চরিত্রের কথা, বুদ্ধদেব বসুর “প্রথম পার্থ” ......নির্দেশনায় ছিলেন বিশিষ্ট নাট্য কর্মী শ্রীরাহুল দাশগুপ্ত ...প্রযোজনায় “প্রান্তিক” সংস্থা......“দ্রৌপদী” চরিত্রে আমার ভূমিকা ...মহাভারতের দুটি শ্রেষ্ঠ নারী চরিত্রের একটি.....অদ্ভুত লেগেছিল আমার......এত হাজার বছর পূর্বেও এত বলিষ্ঠ নারী চরিত্র ... “দ্রৌপদী” চরিত্রাঙ্কনের মাধ্যমে  মতাদর্শগত জায়গায় অবস্থান করা যে ক্ষেত্রটি...... আমাকে বিশেষ আকর্ষণ করেছিল। “কুন্তী,”  ও “দ্রৌপদী”  এবং কর্ণ এই তিনটি  চরিত্রই মুখ্য। খুব বিখ্যাত একটি নাটক ।      এই নাটকটিও একটু অন্য ভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমার মনে আছে “প্রথম পার্থ” “রূপম শিলচর সর্ব ভারতীয় নাট্য প্রতিযোগিতা” তে   আমার অভিনীত প্রথম নাটক । এই নাটকটিও খুব  প্রশংসিত হয়েছিল ।

                         হাজার হাজার বছর পূর্বে দুঃশাসন দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণ করার প্রয়াস করেছিল, সেই কুকর্মের জন্য দ্রৌপদী শুধু মাত্র দুঃশাসন বা দুর্যোধনকে নয় যুধিষ্ঠির থেকে শুরু করে পঞ্চপাণ্ডবকেও তার জন্য প্রকাশ্যে দায়ী করে ছিলেন, এবং তার প্রতিবাদ স্বরূপ কুরু বংশ ধ্বংস করার জন্য যে পণ করেছিলেন তার ইতিহাস সবার জানা। কিন্তু এখানে যে বিষয়টি লক্ষনীয়  তা হল , সেই যুগেও দ্রৌপদীর মত নারীও প্রতিবাদ করার স্পৃহা ও স্পর্ধা দেখিয়েছিল এবং পরিণামে কুরু বংশ  ধ্বংস হয়েছিল। আজ এই বিশ্বায়নের যুগে আমরা কি সেই স্পৃহা ও স্পর্ধা দেখাবার সাহস অর্জন করেছি। কোন নারী কি সমাজে ...বিশেষ করে উচ্চ প্রতিষ্ঠিত বংশের নারীরা প্রকাশ্যে এভাবে স্বামী বা সমাজের অন্য পুরুষদের ব্যভিচারের,  বিরুদ্ধে সরব হতে পারবে...... প্রকারান্তে আমরা যদি মনিপুরের ইমাদের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই আজকের সমাজের দুঃশাসনরা ইমাদের বাধ্য করছে  এবং প্রতিবাদ স্বরূপ ইমারা প্রকাশ্যে স্বেচ্ছায় বিবস্ত্র হচ্ছে ...... আজ সমাজ অসংখ্য দুঃশাসনের সমাহার তাই প্রকাশ্যে দিবালোকে লক্ষ্মী ওরাং নামের কিশোরীকে রাজপথে বিবস্ত্র করার উদ্ধততা আমরা দেখতে পেয়েছি। আর সম্প্রতি গৌহাটির মৌসুমী কাণ্ড তে চোখ বুলালেই আমরা দেখতে পাচ্ছি যে আমরাই সেই যুগের দুঃশাসন থেকে শতগুণ দুঃসাহসী অসংখ্য দুঃশাসনকে জন্ম দিচ্ছি, প্রতিপালন করছি, এবং তাতে আমাদের বিন্দু মাত্র লজ্জা শরম নেই। আর তার থেকেও লজ্জাকর যে ঘটনা, আমরা নীরবে এই ধরণের ঘটনাবলীকে সায় দিয়ে যাচ্ছি, কখনও বা মেয়েদের চরিত্রহীন বলে, কখনও বা মেয়েদের পোশাক পরিচ্ছদের দোহাই দিয়ে, কখনও বা সমাজের দোহাই দিয়ে,  কিন্তু আমরা কখনও নিজে এর দায়ভার স্বীকার করে নিতে পারি না, আর পারি না বলেই অহরহ ঘটে যাচ্ছে আজও এইসব ঘটনাচক্র । কিন্তু একটি কথা স্বীকার করে নিতেই হবে যে সমস্ত বিশ্ব জুড়ে যে অমানবিক কাণ্ডকলাপ , দাঙ্গা, খুন রাহাজানি, দুর্নীতি , ইত্যাদি ইত্যাদি চলছে, তাতে মেয়েদের যোগদান কম। তাই আমাদের সমাজে রাজমাতা চন্দ্রপ্রভা , দ্রৌপদীর ইত্যাদি এরকম  অন্যান্য ব্যক্তিত্বদের  আমাদের সমাজের দুই ধরণের থিয়েটারেই বিশেষ করে জীবন থিয়েটারে,  সমাজের হাল ধরতে হবে, ও দুই ধরণের থিয়েটার নারীদের আরও মানসিক ভাবে শক্তিশালী হতে হবে।

                               শুরুতে দ্বিধা ছিল, আদৌ এগোতে পারবো কি, কিন্তু চলতে শুরু করলে অনেক দূর পাড়ি দেওয়া যায়। শুরু কি ভাবে করবো ভাবতে ভাবতেই শুরু করেছিলাম, এবার থামার জন্য নিজের রাশ টানছি । এবার আমায় থামতে হবে। এই হয় , সর্বক্ষেত্রেই শুরু করাটাই সবথেকে বেশী  জরুরী, শেষ হবেই, চলুন যে যার মত করে শুরু করি, সে জীবন থিয়েটার হোক আর থিয়েটার জীবন দর্শনই হোক । আমরা সবাই ভাবতে জানি, কিন্তু ভাবনার সমুদ্রের অগুনতি ঢেউগুলি শুধু যাওয়া আর আসা করতে থাকে, তারপর একসময় মনের কোনে আবার হারিয়ে যায়, ভাবনার বুদবুদকে যে কোন ভাবে ধরে ফেলি চলুন এই আমি যে ভাবে আমার লেখনির আধারে কাগজ বন্দী করে নিলাম । এত যে কাগজে কলমে যুদ্ধ করলুম তা আপনাদের জন্য নয় কিন্তু , প্রথম পাঠক আমি, আমার সাথে আমার যে কথকপন আমার ভাবনার দোলনায় চড়তে চড়তে আমার মনের জানলা দিয়ে  অনেক কিছু দেখলুম, নিজেকে ফিরে দেখার সুযোগ করে দিলেন লক্ষণ  ঘটক বাবু, উনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, না হলে আমি কিন্তু সত্যি কখনও আমার ভাবনা গুলোকে চিত্রায়িত করতে পারি বলে জানতামই না।


                          আবার সেই আমিতে এসেই শেষ করছি, সব আমার জন্য, আত্মশুদ্ধির জন্য, এ আমি থেকেই শুরু করতে হবে, আমি যে কত শক্তিশালী তা একটি বীজকে পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যায়, একটি বীজের মধ্যে একটি বৃহৎ অঞ্চলকে গহীন ঘন সবুজ অরন্যে পরিণত করার ক্ষমতা সুপ্ত থাকে। আমাদের সেই সুপ্ত ক্ষমতাকে জাগিয়ে তুলে সমাজকে, আমাদের চারপাশকে মানুষের বাসযোগ্য করে তোলার প্রয়াস করতে হবে । একটি বীজ যখন মহীরুহে পরিণত হয়, এবং সেই মহীরুহ থেকেই অসংখ্য বীজের সৃষ্টি হয়। মনে হতে পারে বীজ, অরন্য, মহীরুহ ......এগুলোর সাথে, সমাজ, থিয়েটার, নারী এসবের কি সম্পর্ক। কিন্তু আমি মনে প্রানে বিশ্বাস করি, এ পৃথিবীতে সব কিছু একে অপরের সাথে কোন না কোন ভাবে জড়িত। শেকড়ের সাথে জলের, গাছের পাতার সাথে সূর্যের আলোর, প্রখর রোদ্দুরের সাথে বৃষ্টির, আর এসব কিছুর সাথে সৃষ্টির ,এবং এটাই সত্যি। আমরা সবাই একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত । তাই আমি ,আপনি  আমি , তোমরা আমি ও আমরা আমি সব আমি মিলে চলুন এগিয়ে যাই সভ্যতার দিকে, হাত বাড়িয়ে দিই যে আমি পেছনে রয়ে গেছে তার জন্যে, সমস্ত “আমি” রা  যে যার মত করে সে হতে পারে নাটক দিয়ে, গান দিয়ে, কবিতা দিয়ে, আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম দিয়ে,সবাই কে নিয়ে স্বপ্ন দেখার , এই সুন্দর পৃথিবীতে বাঁচার জন্য অঙ্গীকার বদ্ধ হই।



থিয়েটারে রাজনীতি--- রাজনীতিতে থিয়েটার এক বিচিত্র অনুধাবন

 ।।জয়শ্রী ভূষণ।।

( লেখাটি আগরতলা থেকে প্রকাশিত 'অভিনয় ত্রিপুরা'র শারদ সংখ্যা, ২০১৩তে প্রকাশিত)
        
    
 রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি, সমাজনীতি, দুর্নীতি, সংস্কৃতি, শান্তি, সম্প্রীতি, সংহতি,রীতিনীতি ইত্যাদি... ইত্যাদি... যদিও এগুলোকে শুধুমাত্র এক একটি শব্দ রূপে আমরা দেখছি ও পড়ছি, তবে এরা কি শুধুই এক একটি শব্দ না এই এক একটি শব্দ এক বিশাল গভীরতর প্রশস্ত কুয়ার মত, যার উপরটুকু আমরা দেখতে পাই শব্দ রূপে, কিন্তু এর বিস্তার ও সীমার পরিধি আমাদের কারোই জানা নেই, বা জানার চেষ্টা সচরাচর করা হয় না। এদের মিলন যে মাটির পরতে পরতের প্র্ত্যেক স্তরের সাথে এবং সর্বশেষে অবগাহন হয় যেখানে ধরিত্রীর সৃষ্টি ও সমুদ্রের শুরু, এবং সেই সমুদ্রের স্পর্শে মিলে মিশে আরও কত কত যে রংবদল তা নিয়ে আমরা সাধারান মানুষ কখনও ভাবিনা । কিন্তু আমি ভাবছি ... কদিন ধরেই “রাজনীতি” শব্দটি নিয়ে ভাবছি, চেষ্টা করছি মনে করতে, আমি কি এই শব্দটিকে চিনি, শুনেছি অনেক... কিন্তু আমি কতটুকু জানি... “রাজনীতি” কে। ভেবে ভেবে যা বুঝলাম তাতে আমার আক্কেল গুড়ুম । আমি তো কিছুই জানি না আসলে “রাজনীতি” কি ? আমার আশেপাশের যারা তথাকথিত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞ তাদের ধ্যান ধারণা ও জীবন যাপনের পদ্ধতি ...মনে মনে পড়ার চেষ্টা করে ... “রাজনীতি” কে বোঝার চেষ্টা ... আমার সমস্ত ভাবনা... ,আরও গুবলেট হয়ে গেল । কি আর করি শেষমেশ ...ধ্যাৎতেরিকা... বলে কিছুদিনের জন্যে আমার এই অসফল বোঝার প্রয়াসে কমা দিলাম। তবুও যেন.... আমার ভাবনাগুলি কিন্তু ...ভাবের আকাশে সাঁতার কাটছে আমি বুঝতে পারছিলাম, আমি না চাইলেও আমার ভাবনা গুলি আমার মনের আকাশে ধোঁয়ার মত হারিয়ে যেতে যেতেও কোথায় যেন একটু সময়ের জন্য থেমে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, আর আমিও আমার অজান্তে সেইসব ভাবনার ধোঁয়াকে হঠাৎ যেন দূরে সবুজ পাহাড়ের গায়ে নীল আকাশের গায়ে গা ঘেষে ঘন ধবধবে সাদা মেঘের মত দেখতে পাচ্ছিলাম স্পষ্ট । এই যে পাওয়া ও না পাওয়ার দ্বন্দ্ব... , বোঝা ও বুঝতে না পারার কষ্ট ...... থেকে বেরিয়ে হঠাৎ করে পেয়ে যাওয়ার আনন্দ সত্যি রোমাঞ্চকর...অন্তত আমার কাছে, এ পাওয়া বড় পাওয়া... বিশাল প্রাপ্তি...অনেকটা হারিয়ে যাওয়া নিজেকে খুঁজে পাওয়ার মত।
            সত্যি বলছি, একদম সোজা সাপটা ভাষায় অকপটে প্রথমেই স্বীকার করে নিচ্ছি রাজনীতি মানে তথাকথিত সবাই রাজনীতি বলতে যা বোঝায়... তারপর লাল সবুজ গেরুয়া নিয়ে সবার বিশ্লেষণ আমি এখনও সঠিক ভাবে মগজধঃকরণ করতে পারি না,তবুও কেন তাহলে এ বিষয়ে লিখতে বসলাম, তার উত্তরের দেখা হয়ত আমি আমার এই লেখার অন্ত পথেই পাব সেই সাহস নিয়েই আমার উপস্থিতি আপনাদের মাঝে এখানে একজন সাধারন মানুষ হিসেবে। প্রথমেই যেদিন “রাজনীতি” বিষয়টি নিয়ে ভাবলাম, আমার সেই মুহূর্তের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ যে ছবিটি আমার মনের পর্দায় ভেসে উঠল, বলতে পারেন আমার মনের থিয়েটারের পর্দা সরে যাওয়ার পর পরই যে দৃশ্য ভেসে উঠল...... “সংসদ ভবনে সংসদ চলাকালীন সময়ে কিছু রাজনৈতিক নেতা যারা নাকি এই সমাজের হর্তা কর্তা বিধাতা ও আমাদের সবার ত্রাতা , কয়েকটি কেদারা মানে চেয়ার মাথার উপর উঠিয়ে ভীষণ বেগে বিপক্ষের দিকে ছুড়োছুড়ি করছেন, আর আমরা কোটি কোটি আম জনতা, টেলিভিশনের পর্দায় সেই থিয়েটারের সরাসরি সম্প্রচারন উপভোগ করছিলাম...”। আসলে এই যে দৃশ্যটি যখন আমি একদিন সত্যি সত্যি টেলিভিশনের পর্দায় প্রত্যক্ষ্য করেছিলাম, সেদিন আমি একেবারে বলতে পারেন “থ” বনে গেছিলাম, আমি ভাবতে পারছিলাম না যে এরা কিভাবে দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকতে পারে, এদের তো নিদেন পক্ষে সাধারনজ্ঞানটুকুও নেই। যাহোক আমি পরমুহূর্তেই যারপরনাই খুশী হয়ে আমার মনের থিয়েটারের পর্দা বন্ধ করে দিলাম, আর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ভাবলাম, যাক্, এযাত্রা আর চিন্তা নেই, এই বিষয়ে আমি অনেক কিছুই লিখতে পারব, কারণ রাজনীতি মানেই তো থিয়েটার আর থিয়েটার মানেই তো রাজনীতি, তাই আমিও খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম, ভাবলাম এত বিশাল ব্যাপ্তি বিষয়টির, এতগুলি খবরের চ্যানেল চলছে... শুধুমাত্র “রাজনীতি” উপর নির্ভর করে, ওরা এত এত অনুষ্ঠান, সরাসরি অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা করছে, কত কত রমরমা, মুখরোচক খবরের খনি হচ্ছে খবরের চ্যানেল গুলি, বলতে গেলে এই সব চ্যানেল গুলোই তো মূর্তিমান “থিয়েটারে রাজনীতি রাজনীতিতে থিয়েটারের” সত্যতা প্রতিষ্ঠাতা, একদম আমাদের অন্দরমহলতক সব পৌঁছে দিচ্ছে, কজন আর থিয়েটারে গিয়ে রাজনীতির পাঠ পড়েন, সবাই টেলিভিশনের পর্দার সামনে বসেই নিজেদের Ph.D. থিসিস করে নেন। এরই মধ্যে আমার মাথার ভেতরে অনবরত মনের থিয়েটারের পর্দা খুলছে, আর আমি দেখছি আবার বন্ধ হচ্ছে আবার খুলছে আবার দেখছি ...এই প্রক্রিয়াটি বেশ কিছুদিন ধরেই আমার মধ্যে চলছে, মানে আমি উঠতে বসতে একটু অবসর পেলেই মনে মনে থিয়েটারে রাজনীতি ও রাজনীতিতে থিয়েটার... দুটোই আমার আমির সাথে নিজেই নিজের মধ্যে উপভোগ করছিলাম।
          ...প্রথম দৃশ্য... “সোনিয়া গান্ধী পতাকা দুলিয়ে অনেকগুলি ট্রাক ভর্তি ত্রান সামগ্রী পাঠাচ্ছেন উত্তরাঞ্চলের দুর্গতদের জন্য, ...দেখেই কেমন যেন বোকা বোকা লাগছিল হাসব কি না তাই ভাবছিলাম,...দ্বিতীয় দৃশ্যটি ছিল যেখানে গিয়ে ট্রাকগুলো দাড়িয়ে ছিল মানে ওখান থেকে আর রাস্তা নেই যাওয়া যাবে না, প্রতিবেদক ট্রাক চালকদের সাথে কথা বললেন, ওরা বলল ওদের কাছে কোন নির্দেশ নেই এখন ওরা কি করবে ... ট্রাকের ভেতরের সামগ্রীর কি হবে, আর দুদিন দাড়িয়ে থাকলে সব সামগ্রী পচে গলে নষ্ট হয়ে যাবে, ...না হেসে আর পারলাম না,... দারুণ ব্যাপার লাগছিল আমার...সোনিয়াজী পতাকা দুলিয়ে ওদের কে বিদেয় করার আগে খোঁজ নিতে ভুলে গেছেন ওদিকের রাস্তা ঘাট সমস্ত ভেঙ্গে গেছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল তাই সবাই আটকে আছেন, হাজার হাজার মানুষ ও সাথে সমস্ত পশু ও গবাদির শবের গণ সৎকারের চিন্তা করছে সেনা জওয়ানরা, উনি শুধু পতাকা দুলিয়ে দিলেন আর ক্যামেরা বন্দি করে খবরের চ্যানেলে খবর পাচার ব্যস..., তারপরে আবার রাজনৈতিক ভাবে এদেশের আপামর জনগণের জন্য মাথা বেঁধে কোমর কষে লেগে গেলেন কি করে সব রাজ্যে কংগ্রেস নামক রাজনৈতিক সংগঠনটির সদস্য সদস্যাদের রাজনৈতিক পাঠ দিতে যাতে ওরাও উনার মত শুধু পতাকা দুলানোটুকুও অন্তত ভালো ভাবে শিখে নেয়। উনি হচ্ছেন “হাই কমান্ড” ..উনার হ্যাঁ ও নার উপর ভারতবর্ষের রাজনীতি হেলদোল চলছে ও চলবে..
          .দ্বিতীয় দৃশ্য ...এদিকে দুই নেতা বিমানবন্দরে হাতাহাতিতে ব্যস্ত কে আগে যাবেন বিমানে ...গিয়ে পৌঁছে জানান দিতে হবে যে উনারা কে কার আগে উত্তরাঞ্চলের দুর্গতদের পাশে দাড়িয়ে ছিলেন, ওখানে যেসব ভাগ্যবান-দুর্গতরা বিমানে চড়ে নিজেদের ঘর বাড়ি ও গন্তব্য স্থলে পৌঁছনোর জন্য অপেক্ষারত...ওরাও নিরুপায় হয়ে রাজনীতিতে থিয়েটার দেখে তারপর বিমানে চড়ার সুযোগ পেলেন। কম ভাগ্যের ব্যাপার নয় বলুন, এ রকম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়ের তথাকথিত “রাজনীতি” র সুবাদে, এই দুর্দিনেও এরকম সরাসরি থিয়েটার উপভোগ করা যাচ্ছে। কিছুদিন আগেও পশ্চিমবঙ্গে তোলপাড় চলছিল, না কি হয়েছে, “পরিবর্তন চাই”... দিদির দৌলতে আমরা অনেক নতুন ধরণের সংলাপ যা নাকি বিগত সরকার আমাদের শোনাতে পারেনি, আমরা অহরহ শুনছি, আনন্দ পাচ্ছি, ও সেই সাথে পরিবর্তনের আবর্তে ঢুকছি। সম্প্রতি আবার “মোদী” নামক অধিনায়কের চয়ন হল, খুব সামনেই রাজনীতির ফাইনাল ম্যাচ, ভারতীয় জনতা পার্টি নামক রাজনৈতিক দলের বদৌলতে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে উথাল পাথাল হয়ে গেল, রাজা বদল, সাথে সাথে পালাও বদল মানে রাজার সাথে সাথে, সংলাপ ও রাজনীতির থিয়েটার বিষয় ও অনেকটাই বদলে যায়, কি দারুন ভাবুন তো! এরকম যে হাজার হাজার বিষয়, অনেক ব্যক্তিত্ব, এতসব তো আমি লিখে শেষ করতে পারব না, কাজেই এখানেই ক্ষান্ত দিচ্ছি।
          ইস্ যাঃ.. আর একজন আমার খুব প্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব... উনার কথাটা এখানে না লিখলে ঠিক জমবে না, আমাদের সবার প্রিয় লালুজি, যখনই টেলিভিশনের পর্দায় উনাকে দেখি কথা বলছেন , আমি সঙ্গে সঙ্গে “স্ট্যাচু” হয়ে যাই ও খুব মন দিয়ে উনার কথা শুনি, বিশেষ করে সংসদ চলাকালীন সময়ে আমি খুব চেষ্টা করি লালুজির বক্তব্য শুনতে, অনেকটা রম্য রচনার মত মনে হয়, হিহিহি করে একটু হাসার সুযোগ পাই আমি। এই যে উপরে এত সময় “রাজনীতিতে থিয়েটার” নিয়ে হাহা ও হিহি করলাম, তাতে কিন্তু “ হাহা-হিহি” ছাড়া সদর্থক কিছুই পেলাম না । আমরা বোকার মত ভারতীয় “রাজনীতির থিয়েটারে” শুধু মাত্র নীরব দর্শক... যেসব দর্শকদের সমস্যা ও সমাধান, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয় নিয়ে ওরা ওদের থিয়েটারের সংলাপ ও বিষয় হিসেবেও ভাবে না, কিন্তু আমরা প্রতিবার, গাঁটের পয়সা দিয়ে, আমাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পারিশ্রমিক দিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক থিয়েটারের দলগুলিকে বিভিন্ন রংগের জামা পরিয়ে আইপিএল এর মত ম্যাচ দেখি, ম্যাচ ফিক্সিং করি, তারপর আবার পরবর্তী ফাইনাল ম্যাচের জন্য অপেক্ষা করি। উপরোক্ত ভাবনাগুলো যখন আমার মনকে কালো ধোঁয়ার মত ছেয়ে ফেলেছে, তখন আমি কোনোমতে মুখে হাত দিয়ে দম বন্ধ করে আবার আমার মনকে খোলা আকাশের নীচে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে এলাম আর প্রান ভরে শ্বাস নিলাম। আমাকে আবার বোঝাতে শুরু করলাম, এ কি ভাবছি আমি, এত শুধু পরনিন্দা আর পরচর্চা হয়ে যাচ্ছে, কোন ভালো কথা আমি নিজেকে পর্যন্ত শোনাতে পারছি না, এ কোন রাজনীতি, এ কোন থিয়েটার, না না এসব তো আমি ভাবতে চাই না, আমি আপনাদের সাথেও ভাগ করতে চাই না, মনটা আবার একটু খারাপ হয়ে গেল, তাহলে মনে হচ্ছে সত্যি আসলে “রাজনীতি” মানেটা কি এখনও বোধহয় আমার বোধগম্য হল না। আবার ভাবতে শুরু করলাম, এবার একটু নিরাশ হয়েই ভাবছি। তখনই হঠাৎ মনে পড়ল, শব্দটি বোধহয় “রাষ্ট্রবিজ্ঞান” বা “পৌরবিজ্ঞান” । আমি তখন সবে অষ্টম শ্রেণীতে উঠেছি। অঙ্ক, বিজ্ঞান, ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্যে প্রতি আমার অনুরাগ ছোটবেলা থেকেই, কিন্তু অষ্টম শ্রেণীতে একটু বাড়তি বিষয় নির্বাচন করতে হত আমাদের, তো আমি ভাবছিলাম কোন বিষয়টি পছন্দ করবো। ১৯৮২ সাল, বৈশাখ মাসের একদিন ভোরবেলা ঘুম ভাঙ্গল কান্না আর হইচই শুনে, কে কাঁদছে, কি হয়েছে জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে বিছানা থেকে উঠে চোখ খুলেই জানালার পর্দা উঠিয়ে উঁকি দিয়ে ছোট্ট মেয়েটি দেখতে পেল... বাড়ির সামনে ট্রাক দাড়িয়ে আছে...আর ট্রাকটির মধ্যে মনে হচ্ছে ওর বিছানার মতই ধবধবে সাদা চাদর দিয়ে কাউকে ঢাকা দিয়ে রাখা । কৌতূহল আরও বাড়ল, কী যেন একটা অজানা ভয়ে মনটা কেঁপে উঠল, ছোট্ট মেয়েটি আর কিছু না বুঝুক এটুকু আঁচ করতে পারল একটা কিছু হয়েছে তাই, বুড়ি, কুট্টি,ঝুট্টি,সুমু, শঙ্কু আর শম্ভুদা অমন করে চীৎকার করে কাঁদছে। আরে ওই তো বাপি আর বড় পিসী মিলে ট্রাকে উঠে গেল...তারপর সবাই মিলে ট্রাক থেকে সেই ধবধবে সাদা চাদরে ঢাকা সেই বস্তুটি নামিয়ে উঠোনে তুলসী তলায় রেখে দিল। এবার আর কৌতূহল সম্বরণ না করতে পেরে একছুটে উঠোনে গিয়ে মেয়েটি যেই না সাদা চাদর সরিয়েছে, দেখতে পেল...আরে এত জেঠু ঘুমিয়ে আছে, কি করে এত সকালে জেঠু আগরতলা থেকে করিমগঞ্জের বাড়ীতে, আর তাও কেন উঠোনে এভাবে ঘুমিয়ে আছে, ওঠে না কেন, হঠাৎ করে কোথা থেকে মা এসে টেনে নিয়ে কানে কানে বলল, তুমি দুষ্টুমি করবে না, জেঠু মারা গেছে, তুমি পা ছুঁয়ে বসে থাকো, ছোট্ট মেয়েটি মনে মনে ভাবল দাঁত না মেজেই বসব, আশে পাশে ততক্ষণ পাড়া প্রতিবেশীরা সবাই ভিড় করেছে...তাই আর রা না কেড়ে চুপটি করে বসে রইল ...... এই প্রথম মুখোমুখি মৃত্যুর সাথে আমার পরিচয় কিন্তু খুব ভালভাবে তখনও মৃত্যুকে চিনতে পারিনি ।
         তারপর ১৯৮৬ সাল ১৭ই এপ্রিল, বাসন্তী পূজার মহাষ্টমীর সন্ধ্যা আরতি চলছে, ঢাক বাজছে, কাঁসর বাজছে, পয়লা বৈশাখের ঠিক দুদিন পরেই... বাপির আকস্মিক মৃত্যু... ...আমাকে মৃত্যুর আসল কদর্য রূপ চিনিয়ে দিল...... । মৃত্যু নামক ঝড়ে আমার ছোটবেলা উধাও হল ...তারপর থেকেই মাও যেন কেমন বদলে গেল...আগের মত মারে না, বকাঝকা ও করে না। মা যে এখন চাকরীর জন্য দরখাস্ত করছে......এ অফিস...সে অফিস ছুটোছুটি করছে... ডি সি র অফিস, ডি আই অফিসে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ হাঁটাহাঁটি করতে করতে ক্লান্ত বিধ্বস্ত আমার মা...না মার কোন চাকুরী হল না, একান্নবর্তী পরিবারে বসবাস করার দরুন থাকা খাওয়ার কষ্ট সেরকম হল না, পড়াশোনাও চালিয়ে গেলাম ...সাদামাটা ভাবে। অনেকবার ভেবেছি কি করলে আমাদের আর্থিক সমস্যার সমাধান হবে, আমি তখনও ছোট, মায়ের চাকুরীই সব সমস্যার সমাধান, কিন্তু কে দেবে...অনেকটা সিনেমার গল্প বলে মনে হলেও নাবালিকা অপক্ক কিশোরী মনের আবেগে আমি তখনকার প্রধানমন্ত্রীকে আমার মাকে একটি চাকুরী পাওয়ার জন্য আবেদন করে চিঠি লিখব বলে মনস্থির করলাম, কারণ আমার তখনকার সেই পারিপার্শ্বিক ব্যবস্থা, আমার মায়ের অসহায় অবস্থায় একমাত্র অভিভাবক হিসেবে অবুঝ ও অজান্ত মনেও রাষ্ট্র ব্যবস্থার উপরই নির্ভর করেছিলাম। কিন্তু তখন আমি এতটাই ছোট যে চিঠি খানি পর্যন্ত ভালো করে লিখে উঠতে পারিনি, সেইদিন গুলোতেই বোধহয় মনে হয় আমার আবোধমনে প্রথম রাজনীতির সাথে পরিচয়। সেই কবেকার মনের কথা মনেই রয়ে যেত যদি না আজ আপনাদের সাথে ভাগ না করতাম।       
          সময় গতির ঢেউ এ দিন গড়িয়ে গেল আর সেই মনের কোনের চাপা আবেগই হয়ত অষ্টম শ্রেণীতে “সিভিক্স” অর্থাৎ “পৌরবিজ্ঞান” নামক বিষয়টির প্রতি আমাকে আকৃষ্ট করে ছিল, যা হোক কিছু দিন পড়ার পর আমি ওই বিষয়টির মাথামুণ্ডু কিছুই আমার মগজে প্রবেশ না করাতে পেরে ষাণ্মাসিক পরীক্ষার ঠিক একমাস আগেই “সিভিক্স” এর বদলে সংস্কৃত নিয়ে নিলাম ও বাংলা ও ইংরেজির মত আমি সংস্কৃতকেও খুব ভালোবেসে ফেললাম । তাই “রাজনীতির পাঠ” আর আমার হয়ে উঠেনি। আরও পড়াশোনা করার অদম্য ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও, পারিবারিক কারণেই আর্থিক অনটনের জন্য আর কেন্দ্রীয় সরকারী চাকুরী পেয়ে যাওয়ায়, মায়ের ইচ্ছানুসারে “হাতের লক্ষ্মী পায়ে না ঠেলে” কলেজের পাট শেষ করতে করতেই সরকারী চাকুরীজীবী হয়ে গেলাম। আমার বিভাগে যোগদানের প্রথম দিন থেকেই দুয়েকজন বরিষ্ঠ সহকর্মীরা আমায় সব ব্যাপারে খুব সাহায্য করেছেন, প্রায় তিনমাস ভিনরাজ্যে চাকুরিগত প্রশিক্ষণে ছিলাম, সেখানেও আমাকে পারিবারিক কারনে একাই যাওয়া আসা করতে হয়েছে, উনারা সব সময় আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছেন, এবং স্বাভাবিক ভাবেই উনারা আমার আস্থাভাজন হয়ে উঠেন ও আমিও উনাদের উপর কিছুটা নির্ভরশীল হয়ে পরি। উনাদের পরামর্শ মতই আমি আমার বিভাগেই বিএমএস নামক এক ইউনিয়ন এর সদস্য পদের জন্য সমস্ত কাগজপত্রে সই করি কিন্তু তা আমি বিভাগে যোগদানের প্রায় ৪/৫ মাস পরে জানতে পারি । কারণ আমাদের বিভাগের ট্রেড ইউনিয়ন পদ্ধতি ও ওদের কর্মকাণ্ডের কোন জ্ঞান আমার ছিল না। পরবর্তী সময়ে শিলচর শাখায় যোগদানের পর জানতে পারি এই বিভাগে তিনটি ইউনিয়ন আছে, বিএমেস, এনএফপিই ও এফএনপিও । ওদের মধ্যে নীতিগত কোন তফাত আছে বলে আজ অব্দি আমার বোধগম্য হয়নি। তাই আমিও কোন দলে আছি তা নিয়ে কখনও মাথা ঘামাইনি। আসল কাজের সময় কাছাড় ডিভিশনের তিনটি ইউনিয়নই প্রকৃতপক্ষে নিষ্ক্রিয়। কাজেই এই তিনের কোন ভেদাভেদ আমি বুঝতে পারিনি বা বলতে পারেন এখানেও আমার রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতাই দায়ী। ঠিক রাজনৈতিক নেতাদের মত আমাদের বিভাগের বেশীরভাগ ইউনিয়ন নেতাদেরও কাণ্ড কারখানা দেখে ও কথাবার্তা শুনে আমার তো প্রথমে চোখ চড়ক গাছে, তারপর দিনে দিনে রাগে গা রিরি করতে শুরু করল, মানে বুঝতে পারতাম, সহ্য শক্তি কমে আসছে। পরিবারের কেউ কোন দিন কোন কিছুতে বাধা না দিলেও ছোটবেলা থেকেই খুব রক্ষণশীল ভাবেই বড় হয়েছি, কিন্তু চিন্তাধারায় কোন রক্ষণশীলতা পরিবার থেকে পাইনি, কথাবার্তা অমায়িক ভাবে বলা, পোশাক-আশাক, চলা-ফেরা, সব কিছুতে আমার মায়ের শিক্ষার আঁচ পেতাম। মা বলতেন “কয় জন বড় না সয় জন বড়” । ছোটবেলা অন্যদের ঝগড়া শুনলে বা দেখলে আমি ভয়ে চিল চীৎকার করতাম। সেই আমির স্বভাব একটু একটু করে বদলাতে শুরু করল। অফিসে ৮ ঘণ্টার জায়গায় ৯/১০ ঘণ্টা কাজ করতে হত, আমি কথা কম বলতাম, তাই হয়ত ভাবত কিছু বোঝে না, আমি দেখতাম, অনেকে আড্ডা মারছে, ঘুরছে, পান খাচ্ছে, বড় বড় কথা বলছে, ফোনে অনবরত কথা বলে যাচ্ছে, কিন্ত প্রশাসনিক স্তরের কারও কিছু যায় আসে না, যে কাজ করে না তার জন্য কোন কাজ না করলেও কোন সমস্যা নেই ,কারণ ওদের মতে ও তো কাজ করে না ওকে বাদ দাও, যে করছে তাকে আরও চাপ দাও ,করে নিতে পারলে আরও দায়িত্ব বাড়িয়ে দাও, আর যারা করছে না ওদের জন্য শুধু মাস শেষে মাইনেটুকু দিয়ে দাও। এক দেড় বছর এগুলো দেখে দেখে আমার মাথা খারাপ হবার জোগাড়, ইতিমধ্যেই আমি স্পন্ডেলাইটিস নামক রোগের কব্জায় চলে এলাম। এরই মধ্যে একদিন অফিসে কাজের ফাঁকে একটু দুপুরের টিফিন খেয়ে একটু শ্বাস নিচ্ছিলাম, আর মনে মনে ভাবছিলাম যে কি পাপ করেছিলাম, যে আমাকে সরকারী চাকুরে হতে হল, মনে মনে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সবার শ্রাদ্ধ করছিলাম, এত কষ্ট করে পড়াশোনা করে কিছুই যে আমার মাথায় মঠ উঠাতে পারল না কেন,... সেই সব হাবিজাবি ভাবছিলাম ..... আমার সমস্ত স্বপ্ন আস্তে আস্তে ভেঙ্গে চুরমার, ইচ্ছে ছিল পড়ব আর শুধুই পড়ব...কোনদিন থামব না, সেই আমাকে মাঝ রাস্তায় থেমে পড়তে হল, ভীষণ নিরাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম, মনের গতি তো ...এক এক সেকেন্ডেই আমার মনের সৌরমণ্ডলে পাই পাই করে ঘুরছিল, ঠিক সেসময়ই আমাদের বিভাগের এনএফপিই-র (National Federation of Employees Union)একজন নেতা যিনি সারাদিন পান চিবোন, নিজের চেয়ারে থাকেন না, আর আমাদের বিভাগের নিম্নস্তরের কর্মচারীরা কোন দরকারে অনুনয় বিনয় করতে আসলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেন, উনি আবার সবজান্তা, লাল মানে বামপন্থি ইউনিয়ের নেতা হিসেবে নিজেকে ও লাল রঙেই project করেন , সব দেখে শুনে এতদিনে আমার যা উপলব্ধি...যে মাসের শেষে বিনা কাজে মাইনে গুনা আর উস্তাদি করার জন্যই উনার নেতা রূপে আত্মপ্রকাশ...যা হোক আমাকে দেখেই ভাল মন্দ জিজ্ঞেস করতে করতে কথায় কথায় বললেন উনি এখন সিনেমা গিয়ে কি একটা নাচে গানে ভরপুর সিনেমার নাম বললেন ঠিক মনে আসছে না এখন, সেটি দেখতে যাচ্ছেন, আমি দেখেছি কি না জানতে চাইলেন। শুনেই ঝাঁ করে মাথায় মনে হল রক্ত চড়ে গেল, জিজ্ঞেস করলুম,----“মম্মো” , “একদিন আচানক” , “মেঘে ঢাকা তারা” , “The Birds,” “The Roots”, “War and Peace”, “Mirracle Still Happens” ......দেখেছেন ? আমি আপনার মত অফিস ফাঁকি দিয়ে সিনেমা দেখি না, আর কোথায় আপনি মশাই সবার থেকে বেশী কাজ করবেন না সারাদিন খালি এদিক ওদিক করেন...আপনার থেকে আমরা ছোটরা শিখব না আপনি শিখবেন কোনটা......একটু মুচকি হেসেই কথাগুলো বলছিলাম,...উনি প্রথমে হাঁ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে কথা গুলি শুনলেন তারপর বললেন ...তোমাকে তো দেখলে বোঝা যায় না তুমি তো অন্যরকম...আমি বললাম হ্যাঁ আমি আমার মতন...এই বলে নিজের জায়গায় গিয়ে আবার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলুম। কথাগুলি বলে মনে হচ্ছিল মনের আগুনের জ্বালায় কিছুটা জল ঢেলেছি, অনেকটা স্বস্তি পাচ্ছিলাম….. একেই বোধহয় বলে “Outburst” ... “মনের সুপ্ত আগ্নেয়গিরির লাভাক্ষরন...” । এই যে এই মুহূর্তের আবোলতাবোল কাগুজে কচকচানিও কোথাও যেন তথাকথিত রাজনীতির থিয়েটারের এক একটি দৃশ্যের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে তাই না। আমি আবার সেই “রাজনীতি” নামক শব্দের ঘোলা থকথকে ঘন কাঁদা মেশানো বেনো জলের তোড়ে আমার ভাবনার স্রোত থেকে উৎপাটিত হয়ে যাচ্ছি যেন। কিন্তু আসলে কি রাজনীতি মানেই “নোংরা নীতি” ...রাজনীতি মানেই কি “অরাজকতা”, ...রাজনীতি মানেই কি “দুর্নীতি”...... রাজনীতি মানেই কি “তেলা মাথায় তেল দেওয়া”... রাজনীতি মানেই কি “মোসাহেবি” ...... রাজনীতি মানেই কি “গুন্ডারাজ”... রাজনীতি মানেই কি “ডাল মে কুছ কালা হ্যায় ”...... রাজনীতি মানে কি “শুধুই দলাদলি-দলবাজি” ... রাজনীতি মানেই কি “স্বজন পোষণ”...... রাজনীতি মানেই কি “ আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ”...... রাজনীতি মানেই কি “ সাধারনের নাগালের বাইরে সবকিছু”...... রাজনীতি মানেই কি “শুধুই অনিয়ম”... “রাজনীতি মানেই কি “শুধু কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি একে অপরের প্রতি...”...রাজনীতি মানেই কি “ নাক সিটকানো -ভুরু কুঁচকানো”...রাজনীতি মানেই কি আমাদের জন্য শুধুই “থিয়েটার” আর আমরা শুধু ক্ষণিকের দর্শক...”।
        না না আমি এভাবে ভাবতে আর পারছি না, মন সায় দিচ্ছে না, মাথাটা যেন ঝিমঝিম করছে, আমি বোধহয় আবার দ্বিধাগ্রস্ত –confused হয়ে যাচ্ছি। আমাকে আবার একটু সময়ের জন্য থামতে হবে, প্রান ভরে শ্বাস নিয়ে আমার ভাবনার গতি পথ বদলাতে হবে। উপরোক্ত কথাগুলি আপনাদের মূল বিষয় থেকে আলাদা মনে হলেও হতে পারে কিন্তু আজকে যখন “থিয়েটারে রাজনীতি ও রাজনীতিতে থিয়েটার” নিয়ে আমার সাথে আমার আলাপচারিতা ও অনুসন্ধান আপনাদের সাথে সরাসরি ভাগ করে নিচ্ছি ......তখন কখনও যেন মনে হচ্ছে... আমি ও বিশেষ করে আমার মন হচ্ছে নদীর পারের জলের মত..অনবরত দুলছে ....এই মনে হচ্ছে পার ছুঁয়ে ফেলেছি আবার পরক্ষনেই মনে হচ্ছে আমার মন আবার মাঝ নদীতে...... কখন যে কোন বিষয় কোথা থেকে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে... কি যেন এক অদৃশ্য সূক্ষ্ম সুতোয় জুড়ে আছে আমার আশপাশ চতুর্দিক। সব কিছু মিলেমিশেই আমি আর এই আমিরও পরিবর্তন হচ্ছে অনবরত যা কেউ বুঝতে পারি না... বিজ্ঞানের ভাষায়—“ Nothing is constant in this world”…এই জগত পরিবর্তনশীল......আর আমরা সবাই যেহেতু এই জগতের জাগতিক বস্তু......আমাদেরও পরিবর্তন চলছে...তাই আমরা সবাই আমাদের জন্ম, মৃত্যু, বেড়ে উঠার আবর্তে জড়িয়ে আছি...। কিছুদিন পরেই বিকেলে আমার অফিসের রুমে আমার সাথে দেখা করতে কয়েকজন ভদ্রলোককে নিয়ে উপরোক্ত নেতা সহকর্মী উপস্থিত হলেন...আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন ওদের সাথে......। বললেন ...উনারা একজন অন্যরকম মেয়ের সন্ধান করছেন যে ওদের সাথে কাজ করতে পারবে। সেই শুরু, আমি আস্তে আস্তে এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করলাম, বলতে পারেন উনারা এসে আমাকে সেই পথ দেখিয়ে দিলেন...। অনেকের সাথে পরিচয় হল.............. সবার সাথে নানা থিয়েটার কেন্দ্রিক কাজে জড়িয়ে পরলুম, ......বিশেষ করে রাহুল দাসগুপ্তের অভিভাবকতায় ......ভারতীয় গণনাট্য সংঘের শিলচর শাখার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেলাম। এদের মাঝে এসে আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম,.......ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সংস্পর্শ আরও পরিবর্তন আনল আমার মধ্যে ..আমার নাগরিক সচেতনতা বোধের পরিধি,.........নিজেকে প্রকাশ করার বিধি ...সামাজিক দায়বদ্ধতা, আমার ভালো লাগা - খারাপ লাগা, নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করা ও সাংগঠনিক পরিচালনামূলক কাঠামো... ইত্যাদি নানা বিষয়ের অ আ ক খ শিখতে শুরু করলাম। আমি আমার পরিবার ও অফিসের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন শহরে অজানা ও অচেনা মানুষের মাঝে এক নতুন আমিকে খুঁজে পেলাম। বিভিন্ন ধরণের নাটকের চরিত্রে অভিনয় করতে শুরু করলাম, সাথে গান , কবিতায় , লেখায় বিভন্ন সমাজ সচেতনতা প্রক্রিয়ার ক্রিয়া বিক্রিয়ায় এক অন্য আমিকে পেলাম, সেই আমি আর আগের মত নিরাশ হয় না, নিজেকে একা অসহায় ভাবে না, অনেক বেশী সাবলীল, সাহসী, উদ্দীপ্ত, ও আশার-প্রত্যাশার স্বপ্নের বেড়াজালের প্রায়শই বিচরণ করে.....এই যে পরিবর্তন......আমার মধ্যে...যে কোন পরিস্থিতিতে নিজেকে যুঝার জন্য প্রস্তুত করার জন্য এন্টিবায়োটিকের মত কাজ করেছে, আমার চারপাশের “থিয়েটারে রাজনীতি” ...... যেখানে আমি পাঠ পেয়েছি সাধারণ মানুষের রাজনৈতিকসত্বাবোধের......এই মানসিক পরিবর্তন এক দিনে হয় না, তার জন্য দায়ী পারিবারিক পরিমণ্ডল......গুনগত শিক্ষা..... পারিপার্শ্বিক আবর্ত ....আর জরুরী ... “Sense of Displacement.” মাত্র ২/৩ মাস আগে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সফররত সময়ে শিলচরের নাট্যবোদ্ধাদের সাথে আড্ডায় এক সন্ধ্যায় বিখ্যাত নাট্যকার, নাট্যপরিচালক, চিত্র পরিচালক ও আরও অনেক গুণাবলী সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব শ্রীমহেশ দাত্তানির কথা শুনছিলাম......বিভিন্ন কথা প্রসঙ্গে উনি বলছিলেন......... “ a sense of displacement is very necessary for some creative and positive thinking and that sense of displacement from his mother Language....his home town...and many more things gave him that power to outburst causing outbreaking of Theatre activities.” কথাগুলি শুনে আমার ভীষণ ভাল লেগেছিল, মনে হয়েছিল বোধহয় আমরা এক পথেরই পথিক।
       আসলে থিয়েটার কী ও কেন করি সেই প্রসঙ্গে আমি বলেছিলাম, যে যদিও থিয়েটার একধরনের বিনোদন মূলক অনুষ্ঠান তবুও আমরা এ অঞ্চলের বেশীরভাগ নাট্যদল ও নাট্যকর্মীরা এই অঞ্চলের পিছিয়ে পড়তে পড়তে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থার উত্তরণের পথে একটু আশার আলো দেখাতে প্রদীপের ভূমিকা গ্রহণ করে থাকি। তাতে যা মনোরঞ্জন হয় বাকিটুকু হচ্ছে আমাদের প্রতিবাদ , প্রতিরোধ ও আমাদের বিরোধের ভাষা আমাদের থিয়েটার। ইতিমধ্যে আমি আঁচ করতে পারলাম , অনেকেই আমাকে বামপন্থী, বলে শুধু ভাবা নয় সরাসরি অনেক প্রশ্নও করতে শুরু করে দিল। কিন্তু আসলে তো আমার কাছে ডান ও বাম বলে কোনদিনও রাজনৈতিক ভাবে কোন কিছুই সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। তাই অনেকের এই ধরণের উক্তি গুলো আমার কাছে কিছুটা উটকো মনে হত এবং আমিও যারপরনাই বিরক্ত হতাম। আমি ভাবতাম আমি নাটক করছি , আলোচনা সভায় যোগদান করছি, যে সব অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করছি, তাতে আবার সিপিএম, বিজেপি, কংগ্রেস কি? একদিন রবিবারের সকালবেলা... টিং টং...টিং টং...ফ্ল্যাটের দরজার কলিংবেল বেজে উঠল, খুলে দিতেই দেখলাম পাশের ফ্ল্যাটের দাদা, ভেতরে এসে বসতে বসতেই বললেন... “ কিতা ,...তুমরা তো পারলায় না... কুনু কামের না তুমরা...” ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না কি বলতে চাইছেন, আমি প্রশ্ন বোধক চিহ্ন মুখে নিয়ে ভেতরে গিয়ে আমার পতি দেবকে বললাম দাদা এসেছে...ও সঙ্গে সঙ্গে ড্রয়িং রুমে চলে এল...শিলচরে এলে রবিবারে মাঝেমধ্যে ওরা আড্ডা দেয়, ...আমার কোন প্রতিক্রিয়া না পেয়ে বোধহয় ...একটু পরে উনি আবার বললেন... “ কিতা ...পারলায় না তো ইবারও... কুনুবার পারতায় না....আমরার তো ১৫ এর মধ্যে ১৩ জনেই পাই লাইল”...... যেই ১৫ ও ১৩ সংখ্যাটি শুনলাম, বুঝেগেলাম শুনি আসামের নির্বাচনী ফলাফলের কথা বলছেন, গত নির্বাচনে আসামের মুখ্য মন্ত্রী তরুণ গগৈ বলেছিলেন যদি কাছাড় উনাকে ১৫ জনই বিজয়ী বিধায়ক দিতে পারে উনি কাছাড়কে হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ দেবেন। গতবার ১৫ টি আসনের মধ্যে ১৩ টি কংগ্রেস জিতেছিল, সেবার ভোটের আগে শুধু ভোটের আগে বললে ভুল হবে প্রকৃত পক্ষে সারা বৎসরই আমরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই অঞ্চলের বঞ্চনা, যন্ত্রণা, ভাষা আগ্রাসন, এই অঞ্চলের প্রতি উদাসীনতার কথা, অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া মূল্য, অচল যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্রডগেজ, মহাসড়ক ইত্যাদি নানা সামাজিক উন্নয়ন মূলক কাজের জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করা হয় এবং আমি এই সব কাজে যতটুকু সম্ভব সক্রিয় ভাবে যোগদান করি। তো যেহেতু আমি এই সব কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকি তাই উনি ধরে নিয়েছেন আমি এখন সিপিএম এর মানুষ। কথাটা শুনেই কেন জানি না সেদিন খুব চটে গেলুম। চটে গেলাম বললেও ভুল হবে আসলে ক্ষেপে গেলুম। আসলে তো আমি কখনও নিজেকে বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী বলে ভাবিনি, আমার অভিব্যক্তি সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব ছিল , স্বতন্ত্র ছিল, হ্যাঁ হতে পারে আমার চিন্তা ধারার সাথে উনি বাম রাজনীতির মিল খুঁজে পাচ্ছিলেন। বললুম ৫০ বৎসর ধরেই তো কংগ্রেসের শাসন চলছে, এখনও কিছু হল না , এবারও তাই হবে “ঘোড়ার ডিম” । এবং সত্যি আজও এক টাকার প্যাকেজ আসেনি, তাতে কোন অসুবিধা নেই , পরবর্তী নির্বাচনেও ওরাও গরিষ্ঠতা পাবে নিশ্চিত। আসলে আমি তখনও জানি না যে আমার কথাবার্তা কিছুটা হলেও বামঘেষা, যাহোক খুব ঝাড়লাম উনাকে আমাকে কথার বর্ষণ ধারায় , নানা কথা বলে একেবারে প্রায় উত্তেজিত হয়ে পড়লুম আর কি? কিন্তু আমি একটা জিনিস স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম আমাদের সমস্ত কার্যকলাপকে এমন কি আমাদের থিয়েটারের বিষয় বস্তু , চরিত্রের বিশ্লেষণকে অনেকেই বাম নীতির ছোঁয়া বলে মনে করতে শুরু করলেন।
           গভীর ভাবে ভাবতে শুরু করলাম, তাহলে কি যা কিছু চিন্তা ধারা, কার্যকলাপ, যা সবার সুবিধার জন্য, জনগনের জন্য, যে সব মানুষ শুধু মাত্র নিজের পরিবারের গণ্ডির বাইরে বেড়িয়ে পাড়া প্রতিবেশী, শহর ও সমাজের বৃহত্তর অংশের কথা ভাবে, নিজের পরিবারের অংশ বলে মনে করে ওরাই বামপন্থী, ওটাই কি তাহলে বাম মানসিকতা, যে একের মধ্যে নয় রৌদ্রের ছটার মত সবাই কে সমান উত্তাপের অনুররণ করাতে চায়। তখন থেকেই খুঁজছি আর খুঁজছি, ...... নিজেকে বোঝাতে পারছি না “রাজনীতি” র অর্থ ...... তাহলে কি “রাজনীতি” মানে “রাজার নীতি”, রাজা একটি রাজ্যের সর্বোচ্চ পদ, রাজার নেতৃত্বে রাজ্যের প্রজাদের সুখ সমৃদ্ধির জন্য যে রীতি নীতি নির্ধারণ করা হয় তাই কি রাজনীতি ? যে নীতি সবচেয়ে উৎকৃষ্ট যে নীতি দেশের জনসাধারণের জন্য, একটি রাষ্ট্রকে সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনার জন্য ব্যবহার হয় তাই কি রাজনীতি ? তাহলে কি রাজার মত “ রাজনীতি” হচ্ছে একটি সমাজের, একটি দেশের , যে কোন একটি শাসন ব্যবস্থার জন্য প্রণীত সর্বোচ্চ নীতি যা দেশের ও জনগণের উন্নয়নের জন্য ব্যবহার হয়। তাহলে আমার সংজ্ঞায় “রাজনীতি” কি দাঁড়ালো? মনে হচ্ছে চলতে চলতে আমি কোন এক মোড়ে পৌঁছে গেছি, যেখানে একটু একটু আমার স্বল্পজ্ঞানে কোথাও রাজনীতির অস্পষ্ট আদল কি দেখা যাচ্ছে, মনে হচ্ছে বোধহয়, আরও একটু মনোযোগ দিয়ে দেখি হ্যাঁ , সত্যি তো আমি কিছুটা হলেও দেখতে পাচ্ছি কি আসল “রাজনীতি” র ছবি ? কিন্তু এখন তো সেই রাজতন্ত্র নেই, তাই রাজনীতির সংজ্ঞা ও কি বদলে গেছে। এখন কি আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে ? না কি আসলে আমাদের এখন কোন রাজাই নেই , নেই কোন নীতি ও ... তাই বোধহয় বদলে গেছে আজকের পরিপ্রেক্ষিতে “রাজনীতি”র সংজ্ঞা ও । আজ রাজনীতি পরিণত হয়েছে, প্রহসনে, নিকৃষ্ট নীতিতে যে নীতি শুধুই স্বেচ্ছানীতি-স্বার্থ নীতির কথা বলে, যে নীতি শুধুই দ্বন্দ্ব – আর বিভেদের কথা বলে।
         বেশ কয়েক বছর আগে, ভারতীয় গণনাট্য সংঘ শিলচর শাখার উদ্যোগে , “জনম –( জন নাট্য মঞ্চ) নাট্য দল শিলচর এসে পৌঁছুল, কয়েকদিন ধরে সমস্ত শিলচর সহ বরাক উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে ওদের নাটকগুলি পরিবেশন করলেন। বিভিন্ন নাট্য বোদ্ধা ও এই অঞ্চলের সাধারন জনতা তাদের পরিবেশনা শুধু মাত্র উপভোগ করলেন বললে ভুল হবে, একাত্ম হয়ে গেলাম। আমিও সেই প্রথম ওই ধরণের অভিনয় ও নাটক ও পথ নাটক দেখতে পেলাম, অনেক কিছু শিখতে পেলাম। ওরা যা বিশ্বাস করে, যে অবস্থায় দেশের ৮০ শতাংশ জনগণ দিন কাটাচ্ছে, তাঁদের রাজনৈতিক শিক্ষা ও অধিকারবোধ জাগ্রত করার এক সফল প্রয়াস বলে মনে হল। ওরা সরাসরি দেশের আর্ত সামাজিক ব্যবস্থা, ও তার জন্য দায়ী রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল গুলোকে বেছে নিয়েছিল, এবং সেই সাথে ওরা স্বীকার করে নিয়েছে ওটাই ওদের আজীবন ব্রত, ওদের নাটক কথা বলে বাম রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষে এবং তাতে কোন ইনিয়ে বিনিয়ে বলার পদ্ধতি ওদের ছিল না । ওরা সরাসরি বলেছিল, আমরা বাম রাজনৈতিক দলগুলির জন্য কাজ করি, নির্বাচনের আগে ওদের নাটকের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার অভিযানে ওরা অংশ গ্রহণ করেন। প্রয়াত সফদর হাসমীর পত্নী মলয়শ্রী হাসমী ও সুধন্য দেশপাণ্ডের নেতৃতে , নিউজিল্যান্ডের একজন অভিনেতা ও আরও কয়েকজন এর অভিনয়ে এবং ওদের যেখানে সেখানে রাস্তায় ঘাটে মোড়ে বাজারে ওদের বিন্দাস পরিবেশনা, সত্যি যাদের নাগরিক সচেতনতা, অধিকার বোধের পাঠের নুন্যতম যে শিক্ষা জরুরী , তার কিরন ছিটিয়ে দিয়েছিল। “জনম” এর সংস্পর্শ আমাকে কিছুটা হলেও “ থিয়েটারে রাজনীতি” র আভার ছোঁয়া দিয়েছিল। খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে মেকআপ ছাড়া, কোন নির্দিষ্ট মঞ্চ ছাড়া সাধারনের মাঝখানে শুধু মাত্র বাচন ভঙ্গি, ও বিষয় বস্তুর গভীরতায় ছোঁয়া ওদের নাটকে পেয়েছিলাম, উনারা বলছিলেন “ হাম নাটক করতে দর্শককে লিয়ে দর্শক কে বিচ মে...উনতক পহুচনা হামারা কাম হ্যায় ”। ২০১২ এর অগাস্টে হঠাৎ একদিন ফেসবুকে দেখলাম ধর্মনগরে নাটকের কর্মশালা হচ্ছে, নাটকের কর্মশালা শুনলেই আমার কি রকম জানি একটা তীব্র ইচ্ছে হয়... মনে হয় ইসস...আমিও যদি যেতে পারতাম, যদিও সময় ও সুযোগে হয়ে উঠে না। সেদিন ও ইচ্ছে হল।
          আমার চোখ পড়ল শিলচর এর স্বনামধন্য নাট্যকর্মী সুব্রত ভট্টাচার্য ও ধর্মনগরের মণিদীপ দাস এর কথোকপন এর উপর । মণিদীপ দাস লিখেছে বরাকের নাট্য কর্মীদেরও সাথে নিয়ে ওরা কর্মশালায় কাজ করতে চাইছে। ফোন নাম্বার দেওয়া ছিল যোগাযোগের জন্য। আমি মণিদীপ এর সাথে কথা বললাম, ভীষণ ভাবে আমন্ত্রণ জানালো ,খুশী হল বলল দিদি চলে এসো তোমার ভালো লাগবে। আমাকে প্রবীর গুহের ফেসবুকের ঠিকানায় বিস্তারিত সব জেনে নিতে বলল। কর্মশালায় যোগদানের যোগ্যতা ছিল নাট্যকর্মী হলে খুব ভালো অথবা ১৮ বছরের উপর বয়স হতে হবে। আমি যেখানে যাই সেখানে আমার একমাত্র ছেলেকে সাথে নিয়ে যাই বিশেষ করে নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আমি ওকে আমার সাথে জড়িয়ে রাখি। কিন্তু মণিদীপের সাথে কথা বলে বুঝলাম আমার ছেলেকে সাথে নিয়ে কর্মশালায় যোগদান করা যাবে না। মনটা একটু খারাপ হয়ে গেলো। মনে হল এবার ও বোধহয় আমার যাওয়া হল না। তবুও আমি ফেসবুকে প্রবীর গুহের নাট্য কর্মকাণ্ডের খোঁজখবর নিতে শুরু করলাম। দেখলাম উনি Alternate Living Theatre এর Director. মনে হল অন্যরকম কিছু। আর অন্যরকম কিছু হলেই আমার উচাটন আরও বেড়ে যায়। যাহোক শেষমেশ ভেবে দেখলাম, অনেক ঝামেলা, ছেলের Half Yearly Exam. , Office, তার মধ্যে শিলচর থেকে ধর্মনগরে গিয়ে ১০/১২ দিন থাকা আমার জন্য অসুবিধাজনক হয়ে যাবে। মন বেজার করেই মনকে বোঝালাম যে এবার ও আমার যাওয়া হচ্ছে না। আমিও চুপচাপ আবার নিজের মন কে বুঝিয়ে Busy হয়ে গেলাম জীবনের আবর্তে। কর্মশালা শুরু হয়েছিল ৩০ শে আগস্ট থেকে,২৭ শে আগস্ট আমাকে মণিদীপ ফোন করলো , আমি বললাম না আমি আসছি না ছেলেকে একা রেখে আসতে পারবো না । মণিদীপ বলল না দিদি চলে আসুন ছেলেকে নিয়েই আসুন কোন অসুবিধা হবে না। মনের ভেতরের চাপা ইচ্ছেটা আবার লাফিয়ে উঠল, আমার ছেলে আমার সামনে বসে ছিল, আমার সাথে যেতে পারবে শুনেই খুব খুশী হয়ে বলল হ্যাঁ মাম্মা, তুমি চিন্তা করো না, আমি পড়বো এসে পরীক্ষা দেব। যেমনি কথা তেমনি কাজ, তারপর কোনোমতে দুজনে সব কিছু সামলে, অফিস, ছেলের স্কুল সব ফেলে ধর্মনগরের জন্য রওয়ানা দিলুম ২৯ শে আগস্ট বাসে চড়ে, পৌঁছুতে পৌঁছুতে প্রায় ৪টা বাজল। যে বন্ধুর বাড়িতে উঠেছিলাম, সেখানে গিয়েই ব্যাগ-ট্যাগ রেখেই আমরা দুজনে বেরিয়ে পরলুম BBI স্কুলে , বিকেল ৫টায় শুরু হওয়ার কথা ছিল, আমরা ৫ মিনিট আগেই হাজির হলাম, কাউকেই তেমন করে চিনি না, অনেকেই উপস্থিত ছিলেন, এরই মধ্যে স্যার শ্রী প্রবীর গুহ এলেন, সাথে মণিদীপ ও এলো। এরপরই শুরু হল L.E.Society ও নাট্যমঞ্চের যৌথ উদ্যোগে সঙ্গীত নাটক একাডেমীর সহায়তায় উদ্বোধনি অনুষ্ঠান, প্রদীপ প্রজ্জলন করলেন ত্রিপুরা বিধানসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ, শিক্ষাবিদ অমরেন্দ্র শর্মা। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নাট্যকর্মী দেবব্রত চৌধুরী , নাট্যকার হৃষীকেশ নাথ এবং কলকাতা থেকে আগত “অলটারনেটিভ লিভিং থিয়েটার” নাট্য দলের নির্দেশক ও এই কর্মশালার মুখ্য প্রশিক্ষক আন্তর্জাতিক নাট্য ব্যক্তিত্ব শ্রী প্রবীর গুহ । অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন রঞ্জিত পুরকায়স্থ। স্বাগত ভাষন রাখেন নাট্যকর্মশালার আহ্বায়ক তথা নাট্য মঞ্চের সম্পাদক মণিদীপ দাস। খুব সংক্ষেপে সবাই বক্তব্য রাখলেন। সব শেষে প্রশিক্ষক শ্রী প্রবীর গুহ তাঁর বক্তৃতায় “জননাট্যের খোঁজে” শীর্ষকের ব্যাখ্যা করলেন। উনি বললেন নাটক মানেই শুধু অভিনয় নয়, নাটক মানে শুধু ভালো মঞ্চ নয়, নাটক মানে Voice for voiceless. আমার খুব ভালো লাগছিল উনার কথা শুনতে। মনে হচ্ছিল আরে...আমার ভাবনা অনেকটা মিলে যাচ্ছে তো! আরও বললেন আমরা নাটকের দর্শক তৈরি করতে পারছি না কারণ নাট্যকর্মীরা দর্শকদের কাছে পৌঁছুতে পারছিনা, তাঁর মতে দর্শকরা যদি নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন , নাটক দেখতে না চান, নাট্য কর্মীদের নাটক নিয়ে দর্শকদের কাছে পৌঁছে যেতে হবে। আর সে জন্যেই পথে ঘাটে, স্কুল কলেজে, অফিস প্রাঙ্গণে সাধারন মানুষের কাছে পৌছার মত প্রতিটি জায়গায় নাটক করতে হবে। দর্শক তৈরি করাটাও নাট্য কর্মীদেরই দায়িত্ব আর সেই দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে। মূলত উনার নাট্য জীবনের গুরু বাদল সরকার। তবে উনার কিছু স্বতন্ত্র ধারা গত ৪০ বছর ধরে নাট্য চর্চার মাধ্যমে তৈরি করেছেন, আর তাই তিনি তাঁর দলের নাম রেখেছেন “অলটারনেটিভ লিভিং থিয়েটার” । বললেন আজীবন থিয়েটার করে যাবেন সেই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তা পালন করছেন। খুব সাধারন পরিবেশে বড় হয়েছেন, বুঝতে পারলাম তিনি মাটিতেই আছেন, তাই মাটির মানুষ , গ্রামের মানুষ, আদিবাসী, লোক সংস্কৃতি এসব নিয়ে কাজ করছেন এবং সেই কাজের জন্য একটি ধারা ও শৈলী তৈরি করে মানুষ গড়ার মানুষ হওয়ার মানসিকতার বীজ বপন করছেন। আমার মনে হল ভাগ্যিস এসেছিলাম, না হলে তো খুব miss করতাম। খুব সুন্দর করে বললেন আমরা বিদেশী culture adopt করছি, আর উনি বিভিন্ন দেশে গিয়ে বিদেশীদের ভারতীয় নাট্য ধারার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন ও কর্মশালা করছেন। আমাদের কর্মশালা শেষ করেই ১৩ই সেপ্টেম্বর জাপান যাচ্ছেন আরও একটি কর্মশালায় প্রশিক্ষন দিতে। আরও বললেন আমরা যখন নাটক করি, দর্শকদের involve করতে পারি না, তাই নাটকের চরিত্র যে রূপায়িত করছে তার সাজসজ্জা, অভিনয় , আলো মঞ্চ ইত্যাদি নিয়েই দর্শকরা বেশী ভাবে। নাটকের বিষয় বস্তু নিয়ে কিন্তু সেভাবে কেউ কথা বলে না ভাবে না বা বেশীদিন সেই ভাবনা দর্শকদের মনকে দোলায় না। আমাকে খুব ছুঁয়ে গেলো কথাটা। কারণ আমিও উনার সাথে সমভাবাপন্ন । তাই নাট্যকার বা নাট্যকর্মী হিসেবে আমাদের সেই দায়িত্ব নিতে হবে সমাজের যে ব্যবস্থা, সমস্যা, রাজনীতি, সমাজনীতি কুপ্রথা সেগুলো কে অপসারণের জন্য সমাজের সবাই কে ভাবাতে হবে। আর একটা খুব সুন্দর কথা বললেন শুনে খুব ভালো লাগলো, বললেন আজকাল বিশাল budget এর নাটক হচ্ছে, খুব সম্প্রতি নাকি NSD এক কোটি টাকার budget এর নাটক উপস্থাপন করেছে। বিশাল দামি দামি মঞ্চ, মঞ্চে গাড়ী, এমনকি বাইক ও আসতে পারছে। সেইটার বিপরীতে তিনি যা বললেন আমার দারুণ লাগলো, বললেন ওরা এক কোটি টাকা খরচ করছে, আমি এক টাকা দিয়ে করবো। দুর্দান্ত মনে হোল আমার শুনে। এই challenge গুলো জীবনে না থাকলে বোধহয় অন্যরকম কিছু করে উঠা যায় না। তাই উনাকে আমার সত্যি অর্থে একজন বড় মাপের মানুষ, দৃপ্ত ব্যক্তিত্ব ও একজন বলিষ্ঠ নাট্য যোদ্ধা বলে মনে হল। আর মনে হল আমার আসাও সার্থক হল অবশ্যই। কিছুক্ষণের মধ্যেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হল। ঠিক হল পরের দিন মানে ৩০ শে সেপ্টেম্বর সকাল ৭-৩০ থেকে ৯-৩০ ও বিকেলে আবার শুরু হবে ৫-৩০ থেকে ৭-৩০। প্রতিবেলায় ৪ জনের rotationwise বিভিন্ন group করে দেওয়া হল যারা এসে room সাফ করবে, গুছিয়ে নেবে, সাজিয়ে রাখবে artistic way তে। শুধু একটা নিয়ম মেয়েরা ঝারু দেবে না, খাবার serve করা, ইত্যাদি করবে না, ওগুলো সব ছেলেরা করবে, মেয়েরা সব সময় এই কাজগুলি ঘরে করে, তাই এই দায়িত্ব ছেলেদের দেওয়া হল। আমার ছেলে যদিও ৮ বছরের তবুও স্যার বললেন, তুমি তোমার ছেলেকে ও নিয়ে এসো। ও খুব খুশী মার সাথে নাটকের workshop করবে। পরের দিন মানে যেদিন workshop শুরু হল, ১১/১২ থেকে শুরু করে below ১৮ বছরের বয়সের প্রশিক্ষণার্থী ছাড়াও ৩৫/৪০ বছরের আরও প্রশিক্ষণার্থী ছিলেন। উনি বললেন খুব POSITIVE কথা। বললেন যে কেউ , যার সদিচ্ছা আছে, আশা আকাঙ্খা আছে, নিজের কষ্ট ব্যথা বেদনার কথা বলতে চায় নিজের মত সশক্ত ভাবে বিশ্বাস করে, সেই থিয়েটার করতে পারে। আরও বললেন থিয়েটার মানেই অবিকল যে চরিত্রটি অভিনয় করছে তার নকল করতে হবে তা নয়, নতুন নতুন experiment আমরা করতে পারি। যা ইচ্ছে তাই তবে হ্যাঁ, তাতে জীবনের কথা,বাঁচার কথা, আশার কথা, আমাদের সমস্যার কথা, দুর্বলদের যন্ত্রণার কথা থাকতে হবে, তবেই আমরা থিয়েটার নিয়ে মানুষের - দর্শকদের মনকে ছুঁতে পারব। আর বললেন এখানে আমরা যা করবো সব “আমি” না “আমরা” করবো ।আমি তো মনে মনে শিহরিত হয়ে উঠছিলাম, আর ভাবছিলাম, আমার মত ভাবনা সেই বিশেষ ব্যক্তি ও ভাবেন সেই ভাবনায় পথ চলছেন বিগত ৪০ বছর ধরে, আমার মনে হল তাহলে আমিও তো সেই পথেই চলছি , সত্যি বলছি, আমার আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেলো। আমার মত চলার , বলার , ভাবার ইচ্ছে আরও বলিষ্ঠ হল। আরও কিছু নিয়ম ছিল , নাটক করতে হলে ও নাটককে গুরুত্ব দিতে হবে, যারা দিতে পারবে ওরাই workshop attend করতে পারবে, এই যে নিয়মানুবর্তিতা, দৃঢ়তার পাঠ , খুব জরুরী কিন্ত । Priority টা আমাদের বুঝতে হবে, সেই বোধ টা উনি আমার মনে হয় অনেকের ভেতরে জাগাতে পেরেছেন। জোর দিলেন দৈহিক অঙ্গ সঞ্চালন, ভঙ্গি , দেহ ভাষা ও বলা যেতে পারে, যা আমাদের কথা না বলেও অনেক কিছু বোঝাতে পারে। একদম প্রথম দিন উনি শুরু করলেন হাল্কা free hand exercise দিয়ে। ৩৪ জন সবাই মিলে গোল হয়ে দাঁড়ালাম। গোল হয়ে দাঁড়ানোর কারণটা শুনে তো আমার দারুণ লাগল। গোল হয়ে দাঁড়ালে সবাই সবাইকে দেখতে পাবে। তিনটি কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ বললেন, সব সময় চোখে চোখ রেখে কথা বলতে, টানটান সোজা হয়ে দাঁড়াতে আর হাত দুটিকে এমন ভাবে রাখতে হবে ভাবতে হবে আমাদের হাত নেই, ওই প্রথম প্রথম যে জড়তা থাকে নাটকের সময় সেটা ভাঙ্গার জন্যেই হাত কোথায় রাখবো পা কোথায় রাখবো সেটাকে মাথায় রেখেই এই নিয়মগুলি আমাদের workshop এ চালু করে দিলেন। ভুলবশত যেই হাত পেছনে নিচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে তার অদ্ভুত শাস্তি, হয় বাঁদরের মত নাচতে হবে, ডিগবাজি দিতে হবে, ছেলেদের নেচে দেখাতে হবে, যে গাইতে জানে না তাকেই গাইতে হবে, মানে এক কথায় শাস্তি গুলো এত মজার যে স্যারের হয়ে একে অন্যের ভুলটা ধরিয়ে দিচ্ছিল, কারণ শাস্তি পেলেই তো সবাই হিহিহি করে হেসে লুটোপুটি। আমার বেশ ভালো লাগলো কি সুন্দর করে স্যার জীবনে এগিয়ে চলার ভাবনা গুলো ও আস্তে আস্তে এই ভাবে নাটক নাটক খেলার মাধ্যমে মনের মধ্যে গেঁথে চলেছেন। তিনি প্রথমেই বলেছিলেন, নাটকে বেশী কথা বলা ভালো লাগে না, তাই কথা কম ,দেহ ভাষা বেশী ব্যবহার করতে হবে, আর অনবরত আমরা নতুন নতুন ভাবনায় আমাদের সমস্যা, আমাদের কষ্ট, আমাদের আনন্দ, আমাদের আশা, উৎসাহ গুলো কে তুলে ধরবো, আর দর্শকদের ভালো লাগবেই, আর আমাদের কাজের প্রথম দর্শক তো আমরাই। আর ও একটি খুব আমার মনের আমার বিশ্বাসের কথা যা আমি মনে প্রানে শুধু বিশ্বাস করি নয়, মেনে চলি ও যে আমি একজন পরিপূর্ণ মানুষ। উনি ও সেই কথাটি শুধু বললেন নয় প্রতিষ্ঠা করলেন, ছোট বড় সবাই যার যার মত সমভাবে ব্যক্ত করবে, ভাবের আদান প্রদান করবে এবং workshop এ প্রতিদিন সমস্ত activities এ actively involve হতে হবে এবং হলও তাই। বিভিন্ন বয়সের ৩৪ জন মিলে মিশে “আমরা” হয়ে কি করে যে ১০ দিন কেটে গেলো খেলতে খেলতে আর সবাই যে কত কিছু শিখেনিলাম তা ওখানে না গেলে বোধহয় জানতে পারতাম না। শুরু হয়ে ছিল free hand exercise দিয়ে। সেই শরীরী ভঙ্গি গুলো কে রোজ রোজ একটু একটু করে ভাবনার তুলি দিয়ে কথা সুর উচ্ছলতার রঙ দিয়ে কিভাবে সাজাতে হ্য় মাত্র ১০ দিনে তাই তিনি করে দেখালেন, শেখালেন সবাইকে। আমার সাথে একদিন workshop এর পর discussion বসেছিলেন, অনেক কথা শুনলেন, বোঝালেন , বললেন, guide করলেন। এই যে ব্যাপারটা উনি যে অন্যের মনের ভাবনাকে পড়তে পারেন , English-এ বোধহয় একেই বলে “CLAIR VOYANCE” …..এই অতিরিক্ত ভাবনা গুলোই উনাকে একজন বিশাল ব্যক্তিত্বতে পরিণত করেছে এবং আমি খেয়াল করেছি, উনি প্রথম দিন থেকেই যাদেরকে selectively point out করেছেন, শেষের দিকে কিন্তু ওরাই সবার থেকে ভালো করেছে, এবং ওরা অদূর ভবিষ্যতে কাজ করে যেতে পারবে এবং এই যে মানুষকে মানুষ গড়ার, সমাজকে সবার বাসযোগ্য করে তোলার জন্য জহুরির মত মানুষদেরকে কাজ করে তোলবার জন্য খেলার মাধ্যমে নাটকের মাধ্যমে গড়ে তোলার পদ্ধতি বা formula মাঝে মাঝে ঠাট্টা করে বলতেন এগুলো হচ্ছে, Probilogy…. আমার কাছে দারুণ রোমাঞ্চকর মনে হয়েছে । উনার উপর উনারই এক ছাত্র “ দামাল” নামে একটি documentary তৈরি করেছে, আমায় বললেন তুমি দেখ, পড়ে অবশ্য সবাই কে একদিন কর্মশালায় দেখানো হয়েছিল, আমি “দামাল” দেখে চোখের জল আটকাতে পারিনি, স্যারকে বললাম, কি করে এরকম হল স্যার, আপনি যা বলছেন এখানে ওগুলো তো সব আমারও কথা। আমি সত্যি খুব imotional হয়ে পড়েছিলাম সেদিন , তবে একই সাথে আমার মনে হয়েছিল আমার ভাবনা, আমার চলার পথে , আমার আগে আগে আরও আরও অনেক আছে, আর এই সত্যটি আমাকে আরও বেশী আমার মত করে বাঁচার সাহস দিয়েছে, আমি উপলব্ধি করেছি, আমি একা নই। মনে হয়েছিল, আমাদের নাটকে , আমাদের গানে, আমাদের চলাফেরায় আমাদের রাজনৈতিক চেতনা থাকা চাই। সব কিছুতেই রাজনীতি আছে, এবং থিয়েটার করতে হলেও তার একটা রাজনৈতিক দৃষ্টি ভঙ্গি থাকবেই এবং থাকা উচিত। প্রবীর গুহের নাট্য কর্মশালায় মূলত প্রথম আমার উপলব্ধি হল যে সমস্ত নাট্য কর্মীর “থিয়েটারে রাজনীতি” র জ্ঞান জরুরী এবং এই জ্ঞানই আস্তে আস্তে বিন্দু থেকে সিন্ধুর মত আমাদের মত সাধারনের মগজে “রাজনীতি” র এক স্বচ্ছ অবয়বের ছবি ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হবে এবং এই “থিয়েটারে রাজনীতি” র পাঠের জন্য জরুরী নিয়মিত এই ধরণের নাট্য কর্মশালা , তাতে বিভিন্ন নাট্য শৈলী ধারার সাথে যেভাবে আমাদের পরিচয় হয় একই সাথে আমাদের রাজনৈতিকবোধের বীজ অঙ্কুরিত হয়। ভাল-মন্দ, ডান-বামের জানার পরিধির ব্যাপ্তি ঘটে। এই প্রকারের “থিয়েটারে রাজনীতি” ই কিন্তু “রাজনীতির থিয়েটারকে” বহুলাংশে প্রভাবিত করে ও সমাজ সংস্কারে এক অনবদ্য ভূমিকা নিতে পারে। কোন কথা না বলে তাৎক্ষণিক একটি নাটকের ঘটনার মুহূর্ত তৈরি করা এবং তাতে কোন সামাজিক পারিপার্শ্বিক বা মানসিক সমস্যা ও তার দূরীকরণ কি ভাবে দেখানো যায় , শুধু মাত্র মাথা থেকে পা পর্যন্ত isolated movement দিয়ে কিভাবে মানুষের বিভিন্ন characteristics গুলো কে বর্ণনা করা যায়, এই যে শিক্ষা গুলো সত্যি অভূতপূর্ব। ৩৪ জন আমরা যারা কর্মশালায় ছিলাম , ছোট বড় সবাইকে একদম সরবতের মতন মিশিয়ে দিতেন। বাচ্চারা একসাথে দাঁড়াবে না, মেয়েরা একসাথে দাঁড়াবে না, বলতেন এখানে ছেলে মেয়ে বাচ্চা বলে কিছু নেই, সবাই সমান , খেলতে খেলতে শেখাতে শেখাতে হঠাৎ করে ৫/৬ দল বানিয়ে দিতেন আর সময় খুব বেশী হলে ৫/১০ মিনিট , ওই সময়ের মধ্যেই একেকদিন সুর, কথা, কোন বিষয়বস্তুকে কি ভাবে উপস্থাপন করতে হবে সেই কাজ গুলো করাতেন। সব থেকে মজার ব্যাপার হল কার দলে কে আছে সব লটারি। কিছুই করার নেই কারণ স্যার ও ওভাবেই দল গড়ছেন। আমার ভীষণ ভালো লেগেছিল ছোট্টরা ও পিচ্চিরা সবাই সত্যি কিন্তু বড়দের থেকেও অনেক গভীর ভাবে ভাবতে ,গড়তে ও করতে জানে। সব দল ওদের performance দেখাবে আর দর্শক ছিলাম অন্য সব দলগুলো। সবাই তক্ষুনি সবার ভালো লাগা, খারাপ লাগা , কেন, কি করে সব এক এক করে বলছে, আর মজা লাগত যে ছোটরাও কিন্ত কোন অংশে কম নেই। এই যে ছোট বড় মাঝারি মননের সবাইকে একসাথে balance করে তার পর এধরনের কর্মশালা এত উদ্যম উৎফুল্লতা, সত্যি বলতে আমরা সবাই সত্যি অর্থে “আমরা” হয়ে পড়েছিলাম। সব শেষে উনি যা করলেন তা হলও এতদিন সবাই যে যা করেছে, কেউ খুব ভালো দেহ ভাষা প্রদর্শন ও বর্ণনা দিয়েছে, কেউ বা হয়তো খুব ভালো সুর করেছে, খুব ভালো লিখেছে, হঠাৎ করে বলতেন ,যাও তোমরা সব জুড়ে দাও কিন্তু ভালো লাগতে হবে, আবার শুরু হল সেই দেহ ভাষা,সুর, কথা, নাটকের মুহূর্ত কে মালার মত গেঁথে আর একটি নতুন মালা গাঁথার খেলা। এই করতে করতেই উনি শিখিয়ে দিলেন কি করে আলাপ থিয়েটার, nonsenseথিয়েটার করতে হয়। সবাই একাত্ম না হলে কিন্তু কিছু সৃষ্টি করা যায় না, সত্যি আমরা একে অপরের সাথে মিলেমিশে নতুনের সৃষ্টির আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে থাকতাম। এই করেই চোখের নিমেষে ১০ দিন শেষ হয়ে গেল। সমাপ্তি অনুষ্ঠানের জন্য উনি বললেন আমি কিছুই করব না বলব না, সব তোমাদের করতে হবে, যদি পার তবেই কর, আমি তোমাদের সাথে আছি। শেষ পর্যন্ত তাই হলও আমরা সবাই মিলেই সমাপ্তি অনুষ্ঠানটি চিন্তা ভাবনা করে, পরিচালনা , সঞ্চালনা, অভিনয়, কথা, গান, সবই হল স্যার এঁর অভিভাবকতার আড়ালে , এবং দুর্দান্ত হয়েছিল এত কম সময়ে এই রকম অন্য ধরণের অনুষ্ঠান সত্যি মনোগ্রাহী হয়েছে এবং দর্শকরাও সমভাবে আমাদের সাথে involved হয়ে গেছিল। এই ১০ দিনে দেখলাম ও বুঝলাম স্যারের অনেক অনুগামী যারা এই ধরণের “থিয়েটারে রাজনীতি” র বোধ নিয়ে রতন থিয়াম, সুধন্য দেশপাণ্ডে ও আরও আরও অনেক বিখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্বের সাথে কাজ করছে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে নাট্য কর্মশালার আয়োজন করছে, এবং অনাম্নি ভাবে প্রচার বিমুখ হয়ে বিভিন্ন আদিবাসী ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই ধরণের থিয়েটারের অনুষ্ঠান করছে, আস্তে আস্তে মানুষকে মানসিকভাবে, রাজনৈতিক ভাবে সজাগ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। জেনে খুব ভাল লাগলো আসলে “থিয়েটারে রাজনীতি” র প্রভাব কত বিস্তীর্ণ কণ্টক পথে গভীর জঙ্গলের আদিবাসীরাও ওদের মাদল ওদের গানের আমেজে মিলিয়ে মিশিয়ে সবার সাথে পায়ে পায়ে মিলিয়ে দুলে দুলে আনন্দে নাচতে নাচতে একটু একটু করে শিখছে আর সেই সাথে আমরা যারা কংক্রিটের জঙ্গলে বাস করি আমাদের চার দেওয়াল আর বোকাবাক্সের মধ্যে আমাদের পৃথিবী আবদ্ধ, ওদের কাছে গিয়ে প্রকৃতির নির্মল সহজ-সরল থিয়েটারের আনন্দ নিচ্ছি, এই যে দেওয়া আর নেওয়ার আর এক নামই থিয়েটারে রাজনীতি।
                
           সনটা ২০১০ হবে, এপ্রিল মাস, আন্দামান-নিকবোর দ্বীপের পোর্টব্লেয়ারের মাটীতে পা দিয়েই একটু FRESH হয়ে চলে গেলাম সোজা সেলুলার জেলে। সমস্ত গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল, আমাদের আজকের এই স্বাধীন দেশ, চতুর্দিকে কেলেঙ্কারি আর কেলেঙ্কারি,দুর্নীতি, গরীব আরও গরীব, ধনী আরও ধনী, হিন্দু মুসলমান নামক হাতিয়ার ব্যবহার করে শতশত হাজার , হাজার শিশু – মহিলা গ্রাম শহর ধ্বংস , রাজনৈতিক দলগুলির প্রকাশ্যে কোন্দল,এর জন্যেই কি ওখানে এই দেশের শতশত শহীদেরা অমানুষিক পাশবিক অত্যাচার হাসিমুখে বরণ করে আত্ম বলিদান করেছিলেন । শুধু ১৫ই আগস্টে ও ২৬ এ জানুয়ারিতে কিছু দেশাত্মবোধক গান বাজিয়ে আবার সবাই যে যার মত ব্যস্ত অরাজনৈতিক কর্মে । ভীষণ খারাপ লাগছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার আগের পরিস্থিতির সাথে আমাদের দেশের এখনকার পরিস্থিতির তুলনা করে, কালাপানির সমুদ্রের ঢেউ এর দোলায় মনটা সত্যি হুহু করে উঠলো। রাগে মনে মনে বলে উঠলুম সমস্ত রাজনৈতিক তথাকথিত নেতাদের রাজনীতিতে প্রবেশের আগে অন্তত তিনদিন এই জেলে ঐসব কুঠুরিতে কাটানো উচিত, সেই কষ্ট সেই যন্ত্রণার কণা বিন্দু যদি ওরা অনুভব করতে পারেন , “রাজনীতিতে থিয়েটার” এর দৃশ্যাবলীর কিছুটা হলেও পরিবর্তন ঘটবে। কারণ রাজনৈতিক নেতারাও তো আমাদের দেশের এক একজন বেতনভুগি কর্মচারী, তাহলে কেন আমাদের গণতন্ত্রে একটি বিশেষ পদ্ধতি, বিশেষ শিক্ষার মাধ্যম থাকবে না, শুধু ক্ষমতার লোভ ও যথেচ্ছাচারিতার আঁচড় যাতে রাজনীতির রাজে ও নীতিতে কোন ছায়া ফেলতে না পারে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রাজনীতির থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেয় তার জন্য কি প্রয়াস চলছে ? এখানেই “থিয়েটারে রাজনীতি” দৃশ্যপট শুরু এবং সমাজের বিভিন্ন নাট্য কর্মী , নাট্য দল প্রতিনিয়ত নিজের গাঁটের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মত একের পর এক দৃশ্যপটের সূচনা, অনুশীলন ও পরিবেশন করে যাচ্ছেন। এই প্রয়াসের এক জ্বলন্ত উদাহরণ লক্ষ্মণ ঘটক বাবু , উনার “অভিনয় ত্রিপুরা” যিনি আমার মত গবেটকে দিয়েও “থিয়েটারে রাজনীতি ও রাজনীতিতে থিয়েটারে” লিখিয়ে নিলেন, হয়ত সুদূর ভবিষ্যতে আমি সত্যি সত্যি “রাজনীতি” র অভিধানিক ও সাংবিধানিক গূঢ় অর্থ বুঝতে পারব, বা বোঝার সেই পথে প্রথম চলতে শুরু করলাম।
              গত ১৫ই মে, “১৯শে র মহাপথচলা” শীর্ষক মহামিছিলের শেষে শিলচর ভাষা শহীদ ষ্টেশনে দাড়িয়ে সন্ধ্যে বেলা, “দলছুটের” পথ নাটক দেখছিলাম,নাটকটি এ অঞ্চলের মুখ থুবড়ে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার দৃশ্যায়ন করছিল,হঠাৎ ই দেখলাম ওপাশ থেকে চার্বাক স্যার , আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের Masscom Deptt এর প্রফেসর, বললেন কি খবর আপনার “ভালো লাগা ও ভালো থাকা” লেখাটা পড়লুম, ভালো লিখেছেন, ঘটক বাবু তো আপনাকে লেখক বানিয়ে ফেললেন, দুজনেই হেসে উঠলুম। লেখা ভালো হয়েছে শুনে সত্যি যতটা অবাক হয়েছি ততটাই ভালো লেগেছে, কথায় কথায় বললুম এবারের বিষয় ““থিয়েটারে রাজনীতি ও রাজনীতিতে থিয়েটার” তা কি যে লিখব বুঝতে পারছি না কারণ রাজনীতি তো সেরকম বুঝি না, আবার হেসে উঠলেন বললেন বলেন কি আপনি “আই.পি. টি .এ.” করেন রাজনীতি বোঝেন না । তারপর বললেন, আপনি শুধু আপনার ভাবনাটুকু লিখে ফেলুন তা হলেই হবে। আমি এখানে শুধু আমার ভাবনাটুকুই লিখলাম, হয়ত তা ““থিয়েটারে রাজনীতি ও রাজনীতিতে থিয়েটারে” র পার ছুঁতেও পারে নি। কিন্তু আমি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে , আমি যদি আমার বোধকে একটি সরল রেখার সাথে তুলনা করি তা হলে দেখতে পাই ...... সেই রেখায় দুটো অন্ত আছে, একটা ডান ও আর একটি বাম......দুটো ধরণ আছে ভালো ও মন্দ কিন্তু দুটোই একই সাথে এক সরলরেখায়। আমার বোধের গতি ও দিশা বামের দিকে অন্যদের হয়ত ডানের দিকে , সেই দিক পরিবর্তন ও গতির চলাচল বদলের জন্য নাট্যকর্মীরা, সমাজসেবীরা, NGOs.ও আরও বিভিন্ন সংস্থা “থিয়েটারে রাজনীতি ও রাজনীতিতে থিয়েটারে”র সার্বিক উন্নতির জন্য প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে.........আর এই প্রয়াসই হয়তো ভারতীয় রাজনীতির সরল রেখায় .........কংগ্রেস, বিজেপী, সিপিএম, জেডিঊ , অগপ, তৃণমূল ......ইত্যাদি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির সহাবস্থান , নীতিগত ডান ও বামের দিকে চলাচল, আমাদের বিচিত্র ভারতবর্ষে হিন্দু মুসলমান, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ , জৈন ইত্যাদি বিভিন্ন ধর্মের বর্ণের মানুষের সুযোগ্য বাসভূমি রূপে পরিণত করতে সহায়ক হবে।

              ফিরে এসেই আমার একটি অনুষ্ঠান ছিল তাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, ২রা Oct’12 দুটো নাটক হয়েছে । তার মধ্যে একটি ছোটদের নাটক ছিল। ১০ জন ছোট শিশু যাদের বয়স ৫ থেকে ৯ বছরের ভেতর, আমার ছেলে এবং আমি মিলে ৪ দিনে একটি ছোটদের নাটক ১০ জনে মিলে বসে, আলোচনা করে, without any script, music আমরা নাটকটি মঞ্চস্থ করি, সবাই মানে ১০ জন শিশু থেকে শুরু করে দর্শকরা সবাই খুব উপভোগ করেছে , কারন সেই নাটক শিশুদের মননের রাজনৈতিক নীতিবোধের উষ্ণ আঁচ দর্শক পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পেরেছিল। থিয়েটার আমাদের সমাজ দর্পণ , আমাদের নিজেদের ছবি , আমাদের পাওয়া ও না পাওয়ার ব্যথা ও আনন্দের বহিঃপ্রকাশের মঞ্চ বা স্থান যাই বলুন, আমদের প্রশ্ন ও উত্তরের একটি খোলা বই, এবং সেই থিয়েটারে ......রাজনীতির ভিটে বহু পুরনো ও চিরস্থায়ী, আমরা কি ভাবে সেই রাজনীতির সাথে নিজেদের সখ্যতা গড়ে নেব ও সেই সখ্যতা আমাদের দর্শকদের মনেও সঞ্চারণ করবো তা নির্দিষ্ট হবে আমরা যারা নাট্য কর্মী, আমরা যারা নাট্য দলগুলি নিয়ে থিয়েটার করি আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান কি ও আমাদের রাজনীতির মতাগত দর্শন কি তার উপর। রাজনীতি রান্নাঘর থেকে শুরু করে অফিস আদালত স্কুল কলেজ পাড়া প্রতিবেশী সর্বত্র বিদ্যমান, রাজনীতি ছাড়া কিছুই চলতে পারে না, কারণ সব কিছুর জন্যই যে নীতিগত আদর্শ দরকার, কাজেই রাজনীতি সবকিছুরই , আবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আর যেহেতু আমাদের থিয়েটার বা মঞ্চে সমাজের বিভিন্ন বিষয়, সমস্যা, বার্তা, স্বপ্ন, আদির পুনর্জন্মস্থল, “থিয়েটারে রাজনীতি” আমাদের সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। নাট্য কর্মী, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষ ও আমাদের সবার দায়িত্ব আমরা আমাদের মঞ্চ-থিয়েটার এবং সমাজ থিয়েটারে সক্রিয় ভাবে রাজনৈতিকবোধের প্রকাশ করা । আমাদের সমাজ ও দৈনন্দিন জীবনে আমাদের সমাজ থিয়েটারে আমরা অহরহ জান্তে অজান্তে কোথাও বাধ্য হয়ে, কোথাও স্বেচ্ছায় অভিনয় করে যাচ্ছি বা করতে হচ্ছে, এবং এই সমাজ থিয়েটারের রাজনীতিতে “রাজনীতি" শব্দটিকে সদর্থক ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে নাট্য কর্মীদের বিভিন্ন থিয়েটারের দর্শন ও কলাকৌশল অনুসারে বিনোদনের আস্তরণের মোড়কে শিক্ষা ও সমাজনীতি, নাগরিক চেতনা ও অধিকার বোধ, শোষণ ও দমনের বিরুদ্ধাচরণ, অহিংসনীতি পরায়ণতা, উগ্র জাতীয়তাবাদের পথ পরিত্যাগ , ইত্যাদি নানাবিধ বিষয়ের সংমিশ্রণের আকারে “রাজনীতি”র বোধের উন্মেষ ঘটাতে হবে, তবে তা একদিনে তো হবে না, কারণ তা একটি on going chain process । তবে সেই সাথে আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, “ রাজনীতি” র রাজ ও নীতি দুটোই কিন্তু সরাসরি রাজনৈতিক নেতাদের ও নেতৃত্বের উপর নির্ভরশীল। কবে কোন রাম রাজ্য ছিল, কবে কোথাকার শুদ্ধধন ছিলেন, তখনকার রাজনীতি, কবেকার আকবর ও তার সভার নবরত্ন, কবেকার কৃষ্ণচন্দ্র ও গোপাল, বীরবলদের কাহিনী ও চিত্রনাট্য আমাদেরকে যে আভাস দেয়, যে রাজ্যের রাজা যত ভাল, রাজতন্ত্র সুষ্ঠু ভাবে পরিচালিত হয়, সেই রাজ্যে রাজনীতির থিয়েটারে রাজতন্ত্রের সাথে সমাজতন্ত্রের বিভেদ কম থাকে, প্রজারা ভাল থাকবে, রাজ্যে শিক্ষা, সংস্কৃতির পরিবেশ সৃষ্টি হবে, সেই সব রাজ্যে বা রাষ্ট্রে থিয়েটারে রাজনীতির মান অনেক উন্নত হয়। কিন্তু এখন তো সেই রাজতন্ত্রের জমানা শেষ, আগে রাজপরিবারের ভাবি রাজা ও রাজকুমারদের বিশেষ ভাবে রাজতন্ত্রের ভার গ্রহণ করার জন্য ছোটবেলা থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হত, মানসিক ভাবে তৈরি করা হত। আজকাল তো এসবের কোন বালাই নেই, এলেবেলে দুধভাত হলেই রাজনীতি তে হাতে খড়ী , তারপরেই তো সমাজের খুঁটি, আর কিছু জানার দরকার নেই। এক নিমেষে রাজনৈতিক দল গড়ে, ভোটে জিতে মন্ত্রী হয়ে কেল্লা ফতে আর কি। দেশ, জনগণ , সব গোল্লায় যাক। এদের আর কি দোষ, এদের বোধের দায়রায় এরা সবাই “সুবিধাবাদী পার্টি” র সদস্য এবং গণতন্ত্র নামক থিয়েটারে ওরা রাজনীতির রাজ কে বিদেয় করে “দুর্নীতি” আমদানি ও রপ্তানি করছে। যে দেশে জওয়ানরা, সেনা বাহিনী, সীমা সুরক্ষা বল, সমস্ত ছোট ও আধিকারিকের পদের জন্য UPSC, SSC, TET, SLAT, NET, AIEEE, JET,এরকম হাজার ধরনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়, পিয়নের চাকুরী থেকে শুরু করে শিক্ষকের নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু বাধ্যতামূলক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে ওদের চয়ন হয়, সেইখানে, সেনা , শিক্ষা, মেধা, অর্থনীতি, সমাজনীতি , ইত্যাদি ইত্যাদি যারা পরিচালনা করবেন , ওদের না কোন শিক্ষাগত যোগ্যতার দরকার, না তাঁদের ACCOUNTABILITY OR EFFICIENCY নামক কোন ভয় আছে। খুবই আশ্চর্যের যদিও, হয়তো আপনারা আমার লেখা পরে ভাবছেন আমার কি উদ্ভট ভাবনা ।