.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

শুক্রবার, ২৯ আগস্ট, ২০১৪

ভাষা: অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ

।।  সুদীপ নাথ ।।
        ভাষা দিবসে ভাষা নিয়ে কত কিছু কথা হয়, কত অনুষ্ঠান হয়। তুলে ধরা হয় যার যার নিজস্ব ভাষার উৎকর্ষতার প্রমাণ। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের পিছনের ইতিহাস কম-বেশি সকল বাঙালিরই জানা আছে, অন্তত যারা এসব নিয়ে চর্চা করেন। ১৯৫২ সালে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ২১শে ফেব্রুয়ারিতে চূড়ান্ত আকার নেয়। এই ঘটনার ৪৮ বছর পর  ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করায় এই ভাষা আন্দোলন পৃথিবীর    জাতিসত্তাগুলোর অধিকারে রূপান্তরিত হয়েছে।  পৃথিবীর সব দেশে কিনা জানা নেই, তবে অনেক দেশেই ২০০০ সাল থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। আজ একথা অবশ্য স্বীকার্য যে, বাঙালি জাতির জীবনে এমন গৌরবোজ্জ্বল অর্জন আর কখনো ঘটেনি। ভাষা আন্দোলনের শহীদেরা এখন আমাদের অহংকার। পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন জাতিসত্তার মাতৃভাষা নিয়ে নতুন সম্ভাবনার উৎস হয়ে উঠতে পারে এই দিবসটি, এমনি প্রত্যাশা ছিল আমাদের।

          প্রথমেই ভাষা শব্দের তাৎপর্য সম্পর্কে একটু আলোচনা করে নেয়া যেতে পারে। কথোপকথনে আমরা যে ভাষাই ব্যবহার করিনা কেন, তা কিন্তু কোন না কোন নির্দিষ্ট জনসমষ্টির ভাষা। ভাষা হঠাৎ একদিন গড়ে উঠে না। কোনও জনগোষ্ঠীতে ধাপে ধাপে নয়, ক্রমাগত অনুশীলনের মাধ্যমে তাদের ভাষা গড়ে উঠলেও তা কখনো স্থায়ী রূপ নিয়ে থেমে থাকেনা। এখানেই রয়েছে ভাষা সম্পর্কে একটা ভ্রান্তি। ভাষা গঠনের জন্যে কোন ব্যাকরণ আগে ঠিক করে নিয়ে, কোন জনসমষ্টি মিলেমিশে বসে ভাষা বানায় না। আগে ভাষা তৈরি হতে থাকে, পরে যার মধ্যে ব্যাকরণ খোঁজার চেষ্টা করা হয়। ভাষা একটা চলমান প্রক্রিয়া, তা ভাঙ্গা-গড়ার মধ্য দিয়েই এগোতে থাকে। তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এখন যে ভাষায় আমরা কথা বলি, তা যেমন অতীতে এখনকার মত ছিলনা, ভবিষ্যতেও তা ঠিক এখনকার মত থাকবেনা।

            নির্দিষ্ট জনসমষ্টি বলতে তা ট্রাইবও হতে পারে আবার একটা জাতিও হতে পারে। এখানে ট্রাইবের বা জাতির, ভাষায় কিভাবে উত্তরণ ঘটে তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যেতে পারে। ঠিক তেমনি, ভাষার উদ্ভব নিয়েও ধারণাকে একটু পরিমার্জিত করে নেয়া যেতে পারে।

            প্রথমেই যে প্রশ্নটা আমাদের মনে উদয় হয়, তা হচ্ছে, মানুষের মুখে ভাষা ফুটলো কী করে। ভাষা বলতে যদি গলা দিয়ে নির্দিষ্ট আওয়াজ তথা ধ্বনি (সাউন্ড) সৃষ্টি করে কিছু শব্দ (ওয়ার্ড) বা শব্দগুচ্ছ দিয়ে নিজের ধারণাকে অন্যের ধারণার সাথে যুক্ত করা বুঝায়, অর্থাৎ কথা বলা বুঝায়, তাহলে তা এমন কিছু শব্দ হতে হবে, যেসবের অর্থ কথক ও শ্রোতার কাছে এক হতেই হবে। ব্যবহৃত শব্দগুলো খাপছাড়া হলেও চলবে না। এই পর্বে পৌছাতে প্রতিটি জনগোষ্ঠীকে সুদীর্ঘ সময় পেড়িয়ে আসতে হয়েছে। আবারো বলছি ভাষা কেনো, মানুষের মানুষ হয়ে উঠার ঐতিহাসিক পর্বগুলোও, কোন দিন বা কোন সময়ে স্থাণু নয়, হতে পারেনা। প্রকৃতির গতিশীলতা থেকে কোন কিছুই মুক্ত নয়, হতে পারেনা এবং আমরাও বারংবার ভুলে যাই যে আমরাও প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ বিশেষ। আর এখান থেকেই উৎপত্তি হয় যত সব ভ্রান্ত ধারণার।


              যাইহোক, মানুষের মস্তিষ্কের অসাধারণ উন্নতি তো আছেই, যা অন্য সমস্ত জীবকুল থেকে আমাদের অনেকাংশেই পৃথক করে দিয়েছে। আর ঐ গতিশীলতার হাত ধরেই আমাদের স্বরযন্ত্রও হয়ে উঠেছে তদনুরূপেই উন্নত, যার ধারে কাছেও অন্য সব প্রাণী পৌছাতে পারেনি। স্বরযন্ত্রকে বাক্‌যন্ত্রও বলা হয়ে থাকে। অন্য প্রাণীদের সাথে মূল তফাৎ কিন্তু এই স্বরযন্ত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্য প্রাণীদের সাথে মৌলিক তফাৎ হচ্ছে আমাদের স্বরতন্ত্র। স্বরযন্ত্র/বাক্‌যন্ত্র আর স্বরতন্ত্রের পার্থক্য অনেক। মস্তিষ্ককে কেন্দ্র করে, প্রথম সাঙ্কেতিক তন্ত্র আর স্বরযন্ত্রের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে এই অতি উন্নত দ্বিতীয় সাঙ্কেতিক তন্ত্র যা মননক্রিয়া পরিচালনা করে। তাকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলে স্বরতন্ত্র। এই দ্বিতীয় সাঙ্কেতিক তন্ত্র আমাদের ভাষা সৃষ্টির সাথে সঙ্গতি রেখে উন্নত থেকে উন্নততর হয়েই চলেছে। বিপরীতে, দ্বিতীয় সাঙ্কেতিক তন্ত্রের ক্রমান্বয় উন্নতিতে, ভাষাও দিন দিন উন্নত থেকে উন্নততর হয়েই চলেছে। অর্থাৎ একে অপরের পরিপূরক হিসেবেই কাজ করে চলেছে।

          এই দ্বিতীয় সাঙ্কেতিক তন্ত্রের ভিত্তি হচ্ছে ভাষা। ভাষার সৃষ্টি কিন্তু চিন্তা থেকে হয়নি, অর্থাৎ আগে ভাষা পরে চিন্তা। ভাষার উন্নতির সাথে সাথে কথা বলার শক্তি আয়ত্ত করার পর, দ্বিতীয় সাঙ্কেতিক তন্ত্রের সাহায্যে পরাবর্ত গঠন  করার শক্তি অর্জনের পরেই মানুষ চিন্তা শক্তির অধিকারী হয়েছে। এই ভাষা এবং ধারণা থেকে গড়ে উঠা চিন্তার বিষয়টি, আমাদের জীবন প্রক্রিয়ায়, সমাজ গঠনের প্রক্রিয়ায়, জাতি গঠনের প্রক্রিয়ায় বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে থাকে। পড়াশুনা, জ্ঞানার্জন, ভাব বিনিময়, আচার আচরণের সংস্কৃতি ইত্যাদি সমস্ত কিছুর উৎকর্ষতা নির্ভর করে ভাষা এবং চিন্তা, প্রত্যক্ষণ ও ধারণা এসবের সম্মিলিত উৎকর্ষতার উপর। ভাষা ছাড়া চিন্তা সম্ভব নয়। মানুষের বাক্‌শক্তিগত ভাষিক দক্ষতা, মানুষকে এনে দিয়েছে বিমূর্তভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা।

           এইভাবে মানুষ এই নূতন তন্ত্রের অধিকারী হয়ে অর্থবাহি শব্দের পরাবর্ত তৈরি করে নিজেকে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে, এক বিশিষ্ট ক্ষমতা অর্জন করেছে। ফলে মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা অনেক গুণ বেড়ে গেছে। এই দ্বিতীয় সাঙ্কেতিক তন্ত্র তথা ভাষা, ভাব বিনিময়ের মাধ্যম ছাড়া আর কিছুই নয়। গুণীজনেরা বলেন, ভাষা হচ্ছে, বিশিষ্ট বস্তু ও ঘটনার সামান্যীকৃত ও বিমূর্ত রূপ বা প্রতীক। এ হচ্ছে মূর্ত ও বাস্তবের সাধারণীকরণ এবং বিমূর্তায়ন।

       ভাষা হচ্ছে ধারণার বাহক। মানুষ যখন মানুষ হয়ে উঠতে শুরু করেছিলো, তখনই দলবদ্ধ জীবনে মনের ভাব আদান প্রদানের জন্যে নানারকম স্বরবর্ণের ধ্বনি দিয়েই ভাষার জয়যাত্রা শুরু হয়েছিলো। আর তা থেমে থাকেনি। জীবন যাত্রায় অগ্রগতির কারণে, এক অক্ষরের তথা সরল স্বরধ্বনি যখন ভাব বিনিময়ে কুলিয়ে উঠছিলো না, যখন নূতন নূতন দ্বি-আক্ষরিক ধ্বনি দিয়েই সেই অভাব পূরণ করার চেষ্টা শুরু হয়েছিলো। আর সঙ্গে প্রয়োজনের তাগিদে, অনুশীলনের বাস্তবতায়, স্বরবর্ণের সাথে ব্যঞ্জন বর্ণের ব্যবহার থেকে কালক্রমে, বহু অক্ষরের ব্যবহার, একাধিক শব্দ সহযোগে বাক্যের ব্যবহার ইত্যাদি আয়ত্ত করার অধিকারী হতে থাকল মানুষ।

            এটা সর্বজনবিদিত যে, ভাষা সৃষ্টির পেছনে প্রতিটি জনসমষ্টির মধ্যে অবস্থানকারী সকলের সম্মিলিত প্রয়াস কার্যকরী থাকে। আর সুদূর অতীতে, বেঁচে থাকার এবং জীবনযাত্রা আরো উন্নত করার সামাজিক তাগিদ তথা প্রয়োজনীয়তা থেকেই ভাষার উদ্ভব হয়েছে, একথা বলে দেয়ার অপেক্ষা রাখে না। উৎপাদন ব্যবস্থার যৌথ প্রয়াস মানুষকে ভাব বিনিময়ে বাধ্য করেছে। আর সেই প্রচেষ্টারই ফলশ্রুতি হচ্ছে সেই সেই জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা। এমনও দেখা গেছে, এক একটা পরিবারে তাদের নিজস্ব ভাষা প্রচলিত ছিলো। একটা পরিবার নিয়েই সেখানে একটা গ্রাম গড়ে উঠত। তারা যৌথ চাষ আবাদ করত। এসবের চিহ্ন এখনো এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এমন যৌথ উৎপাদন ব্যবস্থা প্রতিটি জনগোষ্ঠীতেই কোন না কোন সময়ে বিদ্যমান ছিল। তারপর এক বা একাধিক গ্রাম একটা গোত্রে অঙ্গীভূত হতে থাকলো। এই গোত্র বলতে যা বুঝায়, তাকে কিন্তু ইংরাজ সাহেবরা ট্রাইব বলেই চিহ্নিত করে। আর আইরিশদের গোত্রকে ওরা বলে ক্ল্যান। আমরা বলি জনজাতি। যাই হোক, এই গোত্র বা ট্রাইবগুলো উৎপাদন ব্যবস্থার অগ্রগতিতে তাদের নিজেদের ভাষায় অনেক অনেক শব্দের সংযোজন ঘটায়। তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক জীবন, সাংস্কৃতিক জীবন আর প্রয়োজনীয় সামাজিক আচার আচরণ তথা নিয়মাবলী আর ভাষা একে অপরের পরিপূরক হয়ে সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হয়ে উঠতে থাকে। কিন্তু আগের সেই যৌথ উৎপাদন ব্যবস্থা একসময় আর রইলো না। তখন এসে গেলো যার যার জমিতে যার যার আলাদা উৎপাদন ব্যবস্থা। গড়ে উঠতে থাকল তাদের নিজস্ব ভাষা, যদিও তা অন্যান্য সবকিছুর মতই, সব সময়েই চলমান। এটা মনে রাখতে হবে যে, সব স্থানেই কিন্তু একসময়ে এই গোত্র বা ট্রাইবগুলো গড়ে উঠেনি। বিভিন্ন প্রাকৃতিক তথা ভৌগোলিক তারতম্যের কারণে, বিভিন্ন সময়ে এসবের আলাদা আলাদা অগ্রগতি ঘটেছে। আবার স্থানান্তরও ঘটেছে। ফলে এখনো বিভিন্ন গোত্র বা ট্রাইবগুলোর মধ্যে বিচার করে দেখলে, তাদের অগ্রগতির ধারার পার্থক্য দেখা যায়।


          গোত্র বা ট্রাইবগুলোতে তাদের ভাষায় নিজস্বতা চূড়ান্ত আকার নেয়। আর ঠিক তখনই উৎপাদনের অগ্রগতির কারণে, সামাজিক প্রয়োজনীয়তা তথা তাগিদ থেকে এক বা একাধিক গোত্র বা ট্রাইব জাতিতে উন্নীত হতে থাকে। সাহেবরা জাতিকে বলে রেইস। জাতি গঠনের প্রক্রিয়ায় ক্ল্যানের ভাষাগুলো নিয়ে মিলেমিশে আরেকটা নূতন ভাষা তৈরি হয়। কিন্তু তখনও ট্রাইবের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে সেই ট্রাইবেল ভাষায় ভাব বিনিময় করে, যখন তারা তাদের বাড়িতে, বা নিজস্ব কাজকর্মে মিলিত থাকে। কিন্তু হাটে বন্দরে, রাস্তাঘাটে তারা জাতীয় ভাষায়ই কথা বলা শুরু করে। অর্থাৎ এই প্রক্রিয়ায় উপর-নীচে দুটো ভাষাই চালু থাকে। এক ট্রাইবের সদস্যরা, অন্য ট্রাইব তথা গোত্র তথা ক্ল্যানের সাথে রাস্তা-ঘাটে, বাজারে-বন্দরে বা অফিস-আদালতে যে ভাষায় কথা বলে, তাকে চলতি কথায় অনেকে বাজারী ভাষা বা বাজাইরা ভাষাও বলে। এই বাজারী ভাষাই সেই জাতির জাতীয় ভাষা। এই পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। ট্রাইবের ভাষা তখন উপভাষা হিসেবে পরিগণিত হয়। কখনও ঘটে যায় আত্তীকরণ। কখনো কখনো দেখা যায়, একটা বা একাধিক জনজাতি যখন জাতি গঠনের প্রক্রিয়ায় আছে, ঠিক তখনই, রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিস্থিতির চাপে, সেই জাতি গঠনের প্রক্রিয়া আর চূড়ান্ত আকার ধারণ করতে পারছে না। উদাহরণের জন্যে বেশি দূরে যাবার প্রয়োজন নেই। চাকমা জনগোষ্ঠীর মানুষেরা এখনো ট্রাইবেলই রয়ে গেছে। তাদের জাতি গঠনের প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত আকার নিতে যাওয়ার আগেই, বিধ্বস্ত অবস্থায় চলে এসছে। অথচ, তাদের নিজস্ব ভাষার অগ্রগতি তথা উৎকর্ষতায়, তারা এতদূর এগিয়ে গিয়েছিল যে, চাকমা জনজাতি তাদের নিজস্ব লিপির পর্যন্ত উদ্ভাবন করে ফেলেছিল।

             ট্রাইব তথা গোত্র তথা ক্ল্যানের যেমন কতগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে, তেমনই প্রতিটি জাতিরও কতগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে। যেকোনো একটা জাতির বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে, একটা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে বসবাস, নিজস্ব অর্থনৈতিক জীবন ধারা, নিজস্ব সাংস্কৃতিক জীবন আর নিজস্ব ভাষা। মানব গোষ্ঠীর উৎপাদন কাজকর্মের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভাষাও বিকশিত হয়। ভাষা তার মূল শব্দ ভাণ্ডারকে বাড়িয়ে তোলে, ধীরে ধীরে তাকে পরিবর্তিত করে এবং ধীরে ধীরে তাদের ব্যাকরণকেও সংশোধিত করে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীতে যেমন বিভিন্ন ভাষার বিকাশ ঘটে, তেমনি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক যোগাযোগের সঙ্গেও স্ব স্ব ভাষার বিকাশ ঘটে। এইভাবে এক সাথে যাত্রা শুরু করে বিভিন্ন ভাষা বিভিন্ন পথে ছড়িয়ে পড়ে। পারস্পরিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে, এক ভাষা আরেক ভাষাকে বদলেও দেয় এবং পুরানো ভাষাগুলির সমন্বয়ে নূতন নূতন ভাষার সৃষ্টিও হয়। কোন জনগোষ্ঠী যখন অপর জনগোষ্ঠীকে নিপীড়ন করে, তখন নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর ভাষার বিকাশ ব্যাহত হয়। আবার এক জনগোষ্ঠী যখন অপর জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে ফেলে, তখন তাদের ভাষাকেও ধ্বংস করে ফেলতে পারে।

             এবার ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভাষার নিজস্বতা নিয়ে একটু আলোচনা করা যেতে পারে। ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের শৈশব কালটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছয় বছর বয়েসের মধ্যে অন্তত একটা ভাষা শিশুকে শিখে নিতেই হবে। নাহলে সারা সারা জীবন চেষ্টা করেও কোন ভাষা শেখা যায়না। আর ভাষা শিক্ষা না হলে মেধার বিকাশও ঘটে না। শিশুকে মানসিক প্রতিবন্ধী হয়েই বেঁচে থাকতে হয়। পূর্ণবয়স্ক মানুষের মগজে স্নায়ু সন্নিকর্ষ (সাইন্যাপ্‌স) যতগুলো থাকে তার প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যক স্নায়ু সন্নিকর্ষ থাকে দুই বছর বয়েসের একটি শিশুর মগজে। এইসব স্নায়ু সন্নিকর্ষগুলো ছয় বছর বয়েসে অনেক কমে যায়। মোটামুটি দেড় বছর বয়েস থেকে ছয় বছর বয়েস পর্যন্ত শিশু প্রতিদিন পাঁচ থেকে নয়টি শব্দ শিখে নিতে পারে। ছয় বছর বয়েসের পর তার এই ক্ষমতা কমে যেতে থাকে। স্নায়ু সন্নিকর্ষের সংখ্যা কমে যাওয়াই এর কারণ। দশ বছর বয়েসের পর নাকি এই স্নায়ু সন্নিকর্ষ চিরতরেই হারিয়ে যায়, এমনটাই বলছেন বিজ্ঞানীরা। তাই এই সময়ের মধ্যে যতগুলো ভাষা শোনার ও বলার সুযোগ হবে, শিশু ততগুলো ভাষাই ভালভাবে শিখে নিতে পারবে। মোটামুটি বার বছর বয়েসের পর, নূতন ভাবে কোন ভাষাই আর সাবলীল ভাবে শেখা যায়না। অল্প কয়েকজনের ব্যতিক্রমী ক্ষমতা দিয়ে সমগ্রকে বিচার করা যাবে না। এই হচ্ছে ব্যক্তি বিশেষের ভাষা শেখার মোদ্দা কথা।

             রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাভাষা-পরিচয় শীর্ষক একটা প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন, যাতে এই উক্তিটি ছিলো -“কখনো কখনো শোনা গেছে, বনের জন্তু মানুষের শিশুকে চুরি করে নিয়ে গিয়ে পালন করেছে। কিছুকাল পরে লোকালয়ে যখন তাকে ফিরে পাওয়া গেছে, তখন দেখা গেল জন্তুর মতোই তার ব্যবহার। অথচ সিংহের বাচ্চাকে জন্মকাল থেকে মানুষের কাছে রেখে পুষলে সে নরসিংহ হয় না”। হ্যাঁ, এই বিষয়ে বৈজ্ঞানিকেরা বহু গবেষণা করেছেন। পশু পালিত মানব শিশু অনেক পাওয়া গেছে। এদের নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে প্রমাণিত হয়েছে যে, ভাষা ও চিন্তা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত এবং তা সামাজিক ক্রিয়াকলাপ, শ্রম সাধনা আর হাতিয়ার ব্যবহারের সাথে সম্পর্কিত। শুধুমাত্র ইউরোপেরই নানা স্থানে এই ধরণের প্রায় ৩০ টি মানব শিশুর সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা পশুর সাথে বড় হয়ে উঠেছিলো। এই ধরণের শিশুগুলো দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারত না। তাদের প্রথম সাঙ্কেতিক ব্যবস্থা ছিলো মানব সমাজ তথা মানব পরিবারে বেড়ে উঠা শিশুদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি সক্রিয় ও শক্তিশালী। তারা চার পায়ে ভর দিয়েই সজোরে ছুটে বেড়াতে পারত, কেউ কেউ তাড়াতাড়ি গাছে চড়তে পারত।

    
               মানব শিশুর উপর পরীক্ষা নিরীক্ষা নূতন কিছু নয়। আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে মিশরের তৎকালীন সম্রাট দুটি শিশু নিয়ে পরীক্ষা করেন। তিনি একজনকে আদেশ দেন, শিশু দুটিকে এমনভাবে প্রতিপালন করতে হবে যাতে তাদের সামনে কোন কথা বলা না হয়। এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল এটা জানা যে, সমাজে না থাকলে মানুষের প্রথম ভাষা কি হয় তা জানা। আর দ্বিতীয় আরেকটি পরীক্ষার চেষ্টা হয়েছিলো সম্রাট আকবরের সময়ে। সম্রাটের ইচ্ছায় ১২ টি শিশুকে বোবা কালাদের দিয়ে বারো বছর লালনপালন করিয়েছিলেন তিনি, যেখানে কেউ ঢুকতে পারেনি, ওদের সাথে কথা বলতে পারেনি। এই দুটি পরীক্ষার মধ্যে প্রথমটির ফলাফল জানা যায়নি। দ্বিতীয় পরীক্ষায় দেখা গেছে ওই শিশুদের কেউ কথা বলতে পারেনি, যখন ওদের সবার সাথে রাখা হলো ১২ বছর বয়েসের পর। তারপর কি হয়েছে, মানে তারা আদৌ কথা বলা শিখেছিলো কিনা, তা আর জানা যায়নি। তবে এটা জানা গেছে যে, এই শিশুগুলো, আকারে ইঙ্গিতে ভঙ্গিতে আর ইশারায়, মনের ভাব বিনিময় করত, যখন তাদের সমাজে মিশতে দেয়া হয়েছিল।

            এই ধরণের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ছিল ফ্রান্সে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে। ফ্রান্সের অ্যাভেরাতে ১৭৯৪ খৃষ্টাব্দে তিনজন শিকারি গহন অরণ্যে একটা ছেলেকে দেখতে পায়। কিন্তু সে ধরা দিতে চায়নি। কিন্তু গাছে উঠতে গিয়ে শিকারিদের হাতে ধরা পড়ে যায়। তাকে শহরে নিয়ে এসে লালন পালন করা হচ্ছিল। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই সে বনে পালিয়ে যায়। তার নাম রাখা হয়েছিলো ভিক্টর। তার পর ১৭৯৮ ও ১৭৯৯ সালে তাকে বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, কিন্তু ধরা যায়নি। অতঃপর ১৮০০ সালের ৮ জানুয়ারি ভিক্টর নিজেই লোকালয়ে এসে ধরা দেয়।

               ভিক্টর যখন এলো তখন তার বয়েস অনুমিত হল প্রায় ১২ বছর। তার সারা গায়ে প্রচুর ক্ষতচিহ্ন ছিল। আর সে ছিলো উলঙ্গ। সে লোকজনকে কামড়ে আর খামচে দিত। চুপ হয়ে থাকত আর কিছু জিজ্ঞেস করলে নিরুত্তর হয়ে থাকত। সবাই মনে করেছিল সে বোবা ও কালা। তাকে প্রথমে একটি মূক-বধির স্কুলে ভর্তি করানো হল আর একজন ডাক্তার তার দেখাশোনার ভার নিলেন। দিনে দিনে তার অনেক পরিবর্তন হল। সে আস্তে আস্তে সামাজিকতা শিখে নিলো। সে আর জামাকাপড় পড়তে আপত্তি করেনা। হিংস্রতা কমে এলো। এভাবে সে চল্লিশ বছর বয়েস অব্দি বেঁচে রইল।

             কিন্তু তাকে কোন কথা বলা শেখানো যায়নি। কিন্তু সে যে কালা নয়, তা ডাঃ ইটার্ড বুঝতে পারলেন। কারণ তাকে কোন নির্দেশ দিলে সে তা পালন করত। কিন্তু তার মুখে কোন কথা ফোটেনি। দুয়েকটা শব্দ সে উচ্চারণ করতে পারত, এইমাত্র। ভিক্টরকে ২৮ বছরের অনেক চেষ্টাতেও শেষ পর্যন্ত কথা বলা মানে ভাষার ব্যবহার শেখানো যায়নি।

           এদিকে বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত গবেষণা চলতেই লাগল। সুদীর্ঘ গবেষণায় প্রমাণিত হল, ভাষা শেখার বয়েস হচ্ছে ছয় বছর। ছয় বছর বয়েসের মধ্যে অন্তত একটি ভাষা শিখে নিলেই, শিশু পরে আরও ভাষা শিখে নিতে পারে। আর একসাথেও এই বয়েসে অনেকগুলো ভাষা সহজেই শিখতে পারে।

           এবার আসা যাক মাতৃভাষা প্রসঙ্গে। মাতৃভাষা বলতে ঠিক কি বোঝায়, তা নিয়ে একটা সংশয় শিক্ষিত সমাজে বিদ্যমান। মাতৃভাষা কি আমাদের জন্মদাত্রী মায়ের কথ্য ভাষা, নাকি আমাদের জাতীয় ভাষা অথবা যার যার ক্ল্যানের তথা গোত্রের ভাষা সেই প্রশ্ন এখনো পরিষ্কার নয়। একটি শিশুর পিতা যদি ফরাসী ও মা যদি বাঙালি হয়, আর দুজনে যদি দুটো ভাষাতেই সন্তানের সাথে কথা বলে তাহলে, সেই শিশু সন্তানটি দুটো ভাষাই শিখে নেবে অতি সহজেই। তখন তার মাতৃভাষা কোনটা হবে। আর যখন একটি শিশু মায়ের কাছে না থেকে, অন্য কোন প্রতিপালিকা বা প্রতিপালকের তত্ত্বাবধানে বা সান্নিধ্যে বেড়ে উঠে, তখন দেখা যাবে, শিশুটির মায়ের ভাষা যাই হোক না কেন, সে তার প্রতিপালক বা প্রতিপালিকার ভাষাই আত্মস্থ করে নিয়েছে। আবার, একজন বাঙালি মা, নিজের প্রদেশ থেকে বাসস্থান পরিবর্তন করে অন্যত্র চলে গিয়ে, একমাত্র সেই স্থানের ভাষায় যদি নিজের  শিশু সন্তানের সাথে কথা বলে, তখনও কিন্তু সেই শিশু সন্তানটি, সেই স্থানীয় ভাষাই শিখে যাবে। এমনটা কোলকাতায় হামেশাই দেখা যায়। এসব ক্ষেত্রে প্রদেশ থেকে উঠে আসা মা বাবা কোলকাতার স্থানীয় ভাষাতেই কথা বলতে দেখা যায়। অথচ মায়ের মাতৃভাষা কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সেই প্রাদেশিক ভাষাই। আবার অন্য দিকে, ভাষা বলতে বোঝাতে পারে মাতৃভূমির ভাষা। আর মাতৃভূমি বলতে বোঝায় কোন জাতির ভৌগোলিক স্থান।

            আসলে এই ধরণের বিভ্রান্তির কারণ কিন্তু শব্দের যথাযথ প্রয়োগ ও মান্যতার সাথে জড়িত। সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন সমাজের অগ্রগতির ধারাবাহিকতা আর পারস্পরিক সামাজিক আদান প্রদানের দ্রুততা, প্রায়শই কোন কোন শব্দের দ্বারা কোন কোন বিষয়কে বোঝাতে অক্ষম হয়ে উঠে। জাতিতে জাতিতে ভাব বিনিময়ে তাই নূতন শব্দ প্রয়োগ করা অব্দি পুরানো শব্দের কার্যকারিতা চোখে পড়ার মত। এটা লক্ষ্য করলেই নিশ্চিত হওয়া যায় যে, পুরানো শব্দ বাতিলের প্রশ্নটা আসে, নূতন নূতন বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত আবিষ্কারের সাথে হাত মিলিয়েই। অজস্র শব্দ আর মানুষের কাজে না এসে বিভ্রান্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। অথবা, আবিষ্কারকের দেয় শব্দগুলোই, পরিষেবা গ্রহণ যারা করে তাদের ভাষায় স্থান করে নেয়। ইন্টারনেট প্রযুক্তির ব্যবহারে এই বিষয়টি লক্ষ্য করে দেখার মত। এই ভাবে এগোতে এগোতে মানব সমাজ দ্রুতলয়ে একটা আন্তর্জাতিক ভাষার দিকে এগিয়ে যাবে, এতে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়।

                তাই সব দিক বিচার করে মাতৃভাষা শব্দটির যথাযথ অর্থ বুঝে উঠা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। এটাও ভাষা বিষয়ে শব্দের তাৎপর্য সম্পর্কে একটু ভেবে দেখা প্রয়োজন। কোন শব্দ সময়োপযোগী না হলে তার স্থানে সঠিক অর্থবহ একটি নূতন শব্দ দিয়ে তা প্রতিস্থাপিত করা যেতেই পারে। আবার এমনও দেখা যায়, প্রয়োজন তথা পরিস্থিতির তাগিদে, নূতন নূতন শব্দ অনবরত সব ভাষাতেই স্থান করে নিচ্ছে আগের আলোচনায় যা বলা হয়েছে।
        

               তবে এটা স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে যে, অবদমিত জনগোষ্ঠীর ভাষায় অবদমনকারি জনগোষ্ঠীর ভাষা ঢুকে পড়ছে বেশি। ইংরেজরা আমাদের দেশে রাজত্ব করার সুবাদে, আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়ে গেছে তাদের ভাষা। ফলে জীবনযাত্রায় তাদের ভাষা না শিখে উপায় নেই। চলতে গিয়ে প্রয়োজন হচ্ছে ইংরাজি ভাষা শিখে নেয়ার। ইংরেজ, ফরাসি ও জার্মানেরা পৃথিবীর নানা দেশে দীর্ঘ দিন সাম্রাজ্য বিস্তার করে রাখার ফলে, পৃথিবীর সুবৃহৎ অঞ্চলেই এইসব ভাষা স্থায়ী ভাবে ঢুকে পড়েছে। স্পেন, বলিভিয়াতে তাদের বর্ণমালা চাপিয়ে দিতে বাধ্য করেছে। এমন অনেক উদাহরণই রয়েছে। আবার পাশাপাশি অবস্থানে থাকা জাতিগুলির মধ্যেও, ভাষার অবদমন তথা আধিপত্য ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। যেমন ভারতে হিন্দি ভাষা রাষ্ট্র ভাষা করা হয়েছে। অথচ হিন্দি ভাষা শুধুমাত্র গো-বলয়ের ভাষা। গো বলয়ের জনগোষ্ঠী ভারতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে থাকায়ই তা সম্ভব হচ্ছে। প্রচার যন্ত্রকে ঢালাও হারে ব্যবহার করা হচ্ছে তাদের ভাষাকে চাপিয়ে দিতে ও ছড়িয়ে দিতে।

             একটা জাতির জাতীয় পরিচয়ে যেমন ভৌগোলিক স্থান একটা শর্ত, ঠিক তেমনি সেই জাতির নিজস্ব ভাষাও একটা শর্ত। তাই কোনও জাতির পরিচয়ের প্রশ্নে, ভাষাকে টিকিয়ে রাখতেই হবে। নাহলে সেই জাতি ইতিহাসের বস্তু হিসেবেই স্থান করে নিতে বাধ্য হবে। হারিয়ে যাবে তার সমস্ত সাধ আহ্লাদ। হারিয়ে যাবে সেই জাতি। এমন ঘটনা অবিরত ঘটে চলেছে, যদিও তা একটা দীর্ঘ কালীন প্রক্রিয়া।

             এই প্রেক্ষাপটেই তাৎপর্যময় হয়ে উঠতে পারে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ইউনেস্কো, জাতিসংঘ এমনকি তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো, এই প্রবণতার বিরুদ্ধে  দাঁড়াতে পারে। তাহলেই এই মাতৃভাষা দিবস পালন হয়ে উঠতে পারে আক্ষরিক ভাবেই অর্থবহ। পৃথিবীর শত শত ভাষার  মতো বাংলা ভাষাও আজ আসন্ন এক বিপন্নতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে। *****



বুধবার, ২৭ আগস্ট, ২০১৪

রক্তদান কেন প্রয়োজন ?

(C) Image
  ।।আশু পাল।।

কেন রক্তদান করা দরকার, এ বিষয়ে আলোচনা করার আগে আমরা বুঝে নিই রক্ত বস্তুটি আসলে কি, এবং আমাদের দেহে রক্ত প্রকৃতপক্ষে কি কাজ করে। যে কোন সচল প্রাণীর দেহ তৈরি হয়েছে লক্ষ কোটি জীব-কোষ দিয়ে। এই কোষ গুলি বেঁচে থাকে অক্সিজেনের উপর নির্ভর করে। প্রতি মুহূর্তে মুহূর্তে অক্সিজেন গ্রহণ করে, এবং পর মুহূর্তেই তাকে কার্বন-ডাই-অক্সাইডে সংশ্লেষিত করার মধ্য দিয়েই জীব কোষ বেঁচে থাকে। তিন থেকে পাঁচ মিনিট ওই অক্সিজেন না পেলে জীবকোষ মরে যায়। আর মানব শরীর যেহেতু অসংখ্য জীবকোষেরই সমষ্টি, তাই বিপুল সংখ্যায় জীবকোষ মরে গেলে মানুষও মারা যায়। এ জন্যই আমরা প্রতি পলে পলে শ্বাসের মাধ্যমে অক্সিজেন গ্রহণ করি এবং প্রশ্বাসের সঙ্গে কার্বন-ডাই-অক্সাইড দেহ থেকে বের করে দেই। ঘুমিয়ে থাকলেও এই প্রক্রিয়া বন্ধ হয় না, চলতেই থাকে।
       ঘটনা হল, আমরা শ্বাসের মাধ্যমে যে অক্সিজেন গ্রহণ করি, সেটা যায় আমাদের ফুসফুসের (Lung)মধ্যে। কিন্তু এই অক্সিজেনকে তো পৌছিয়ে দিতে হবে দেহের প্রত্যেকটি কোনায় কোনায়, প্রতিটি কোষে কোষে – সেটা কি করে হবে ? ফুসফুস থেকে জীবকোষ অব্দি এই অক্সিজেন বয়ে নিয়ে যাওয়া, এবং জীবকোষ থেকে বর্জ্য কার্বন-ডাই-অক্সাইড ফুসফুসে ফিরিয়ে নিয়ে আসার কাজটি করে আমাদের রক্ত। রক্তের দুটো প্রধান উপাদান ; রক্তকোষ (Blood Cell) এবং  রক্তরস (Plasma)। কোষ গুলি আবার মুখ্যত তিন প্রকার; লোহিত কণিকা (RBC), শ্বেত কণিকা (WBC) এবং অনুচক্রিকা (Platelet)। আমরা যা কিছু খাই, ভাত বা রুটি, আমিষ বা নিরামিষ, তা থেকেই আমাদের দেহযন্ত্র এক জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় রক্ত তৈরি করে নেয়। রক্ত তৈরির এই প্রক্রিয়া প্রতি নিয়তই চলতে থাকে। দেহের বিভিন্ন অংশে উৎপাদিত হয়ে কোষ গুলি এবং প্লাজমা অহরহ দেহের মূল রক্তস্রোতে মিশে চলেছে।
          আমাদের দেহে অবস্থিত দুই শতাধিক হাড়ের মধ্যে কিছু আছে ফাঁপা (Hollow)। সেই ফাঁপা হাড়ের মধ্যে যে মজ্জা থাকে, লোহিত কণিকা (RBC) তৈরি হয় সেখানেই। কম বেশি ১২০ দিনের মত আমাদের দেহের মধ্যে বেঁচে থেকে তারা তাদের দায়িত্ব পালন করে। তারপর মরে গিয়ে পায়খানা ও প্রস্রাবের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে যায়। লোহিত কণিকার কেন্দ্রীয় উপাদান হল লোহা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় হিমোগ্লোবিন। অক্সিজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড পরিবহণের কাজটা এরাই করে। নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে কমে গেলে রক্তাল্পতা (Anemia) দেখা দেয়, অল্প পরিশ্রমেই হাঁফ ধরে। এক ফোঁটা রক্তে আট লক্ষের মত লোহিত কণিকা থাকে। শ্বেত কণিকা চার-পাঁচ রকমের হয়। যদিও এদের শ্বেত কণিকা বলা হয়, আসলে এগুলো রংহীন। এদের কিছু জন্মায় যকৃতে (Liver) আর কিছু মজ্জাতে। এদের আয়ুষ্কাল ছয় থেকে আট ঘণ্টা। তারপর মরে যায়। একাংশ রি-সাইকেল পদ্ধতিতে আবার জন্ম নেয়, আর বাকি গুলো দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। প্রতি ফোঁটা রক্তে এদের সংখ্যা ছয় থেকে আট হাজার। শ্বেত কণিকারা আসলে মানব দেহের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স। বহিঃশত্রুর (রোগজীবাণু) আক্রমণ হলে এরাই প্রথম তাদের বাধা দেয়, প্রতি-আক্রমণ করে রোগ জীবাণুদের মেরে ফেলে, অথবা নিজেরা মরে যায়। পুঁজ বস্তুটি হচ্ছে লক্ষ লক্ষ মৃত শ্বেত কণিকার দেহাবশেষ। যে কোন কাটা-ছেঁড়ায় সংক্রমণ (Infection) প্রতিরোধ করে। উল্লেখ করা দরকার যে, আভ্যন্তরীণ সংক্রমণের সময়, আমাদের দেহযন্ত্র শ্বেত কণিকার উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। রক্তে শ্বেত কণিকার সংখ্যা বৃদ্ধি হলে নিশ্চিত বলে দেওয়া যায় যে, কোন না কোন রোগ জীবাণু দেহে প্রবেশ করেছে। রোগ নিরাময় হয়ে গেলে নিজে থেকেই তাদের সংখ্যা আবার স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে। শত্রু যদি বেশি শক্তিশালী হয়, তা হলে যেমন ব্যারাক থেকে সামরিক বাহিনী তলব করা হয়, তেমনি শ্বেত কণিকারা রোগ প্রতিরোধে ব্যর্থ হলে, তবেই আমাদের ওষুধের শরণাপন্ন হতে হয়। অণুচক্রিকাও (Platelet) বর্ণহীন একপ্রকার রক্তকোষ, যা যকৃৎ, প্লীহা (Spleen) প্রভৃতি জায়গায় জন্ম নিয়ে রক্তস্রোতে মিশে যায়। বাঁচে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। এরা আঠালো। দেহের কোনও জায়গায় কেটে বা ছড়ে গিয়ে রক্তপাত হলে এরা লাখে লাখে ছুটে গিয়ে সেই জায়গায় একটা আঠালো প্রলেপ তৈরি করে রক্তপাত বন্ধ হতে সাহায্য করে। রক্তকোষ গুলির জন্ম এবং মৃত্যু এক ধারাবাহিক ঘটনা, একদিকে নতুন কোষ জন্মাচ্ছে, অন্যদিকে পুরানোরা মরে যাচ্ছে।  আমরা প্রতিদিন যে জল খাই, সেই জল থেকেই এক বিশেষ দৈহিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় রক্তরস বা প্লাজমা। লোহিত কণিকা, শ্বেত কণিকা ও অণুচক্রিকারা এই রক্ত রসে ভেসে ভেসে হৃদপিণ্ডের দ্বারা তাড়িত হয়ে সারা দেহে ছুটে বেড়ায় এবং নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে। রক্তকোষ গুলি ছাড়াও কিছু কিছু রাসায়নিক লবণ (Chemical salt), প্রোটিন পদার্থ ইত্যাদি প্লাজমার মধ্যে দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে।
          হৃদপিণ্ড হচ্ছে একটি স্বয়ংচালিত (Automatic) পাম্প, যা আমৃত্যু অনবরত সঙ্কুচিত ও প্রসারিত হয়ে চলেছে। এই সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমেই সে আমাদের রক্তকে সারা দেহে ছুটিয়ে বেড়াচ্ছে। ফুসফুস থেকে অক্সিজেন-সমৃদ্ধ রক্ত যখন আমাদের হৃদপিণ্ডে আসে, তখন সে সেগুলোকে ধমনির (Artery) মাধ্যমে সারা শরীরে পাঠিয়ে দেয়। রক্ত তখন অক্সিজেন বিলি করতে করতে আর পাশাপাশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড সংগ্রহ করতে করতে ছুটে যায় দেহের  দূর প্রান্ত পর্যন্ত। তারপর কার্বন-ডাই-অক্সাইড সমৃদ্ধ রক্ত শিরার (Vein) মাধ্যমে ফিরে আসে হৃদপিণ্ডে। এবার হৃদপিণ্ড তাদের ফুসফুসে পাঠায় প্রশ্বাসের মাধ্যমে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বের করে দিয়ে অক্সিজেন সমৃদ্ধ হয়ে ফিরে আসতে। এভাবেই রক্ত তার দেহ-পরিক্রমার বৃত্ত পূর্ণ করে। এই প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়া মানেই মৃত্যু। রক্ত যখন হৃদপিণ্ড থেকে বেরিয়ে ধমনির ভিতর দিয়ে ছুটে যায়, তখন সে ধমনির দেওয়ালে একটা চাপ সৃষ্টি করে। একই ভাবে সে যখন শিরার ভিতর দিয়ে হৃদপিণ্ডের দিকে ফিরে আসে, তখনও শিরার দেওয়ালে চাপ সৃষ্টি হয়। এটাকেই রক্তচাপ বলে। যাওয়ার সময় চাপ বেশি থাকে, তাকে বলা হয় সিস্টোলিক; আর ফেরত আসার সময়ের তুলনামূলক কম চাপ থাকে, তাকে বলে ডায়াস্টোলিক। রক্তচাপ মেপে কেউ যখন বলেন, ১২০ বাই ৮০, তখন বুঝতে হবে ১২০ হচ্ছে সিস্টোলিক আর ৮০ হচ্ছে ডায়াস্টোলিক। এটাই একজন সুস্থ মানুষের স্বাভাবিক রক্তচাপ।
দেহে কতটা রক্ত থাকবে বা আছে, তা নির্ভর করে ওই ব্যক্তির দৈহিক ওজনের উপর। চিকিৎসা বিজ্ঞান দেখেছে, প্রত্যেক নীরোগ পুরুষ-দেহে রক্ত থাকে প্রতি কেজি ওজনে ৭০ থেকে ৭৬ মিলিলিটার। মহিলাদের দেহে সেই পরিমাণটি হল ৬৬ থেকে ৭০ মিলিলিটার। অথচ ভীষণ পরিশ্রমের কাজ করতে হলেও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আমাদের দরকার প্রতি কেজিতে মাত্র ৫০ মিলিলিটার রক্ত। সাধারণ পরিশ্রমে এরচেয়ে সামান্য একটু কম হলেও চলে। তা হলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের প্রত্যেকের দেহেই প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত (Surplus) রক্ত মজুত থাকে। ন্যূনতম হিসাব ধরলেও ৫০ কেজি ওজনের একজন পুরুষ মানুষের দেহে রক্ত থাকে (৫০x ৭০) =  ৩৫০০ মিলিলিটার, মানে সাড়ে তিন লিটার, আর তার প্রয়োজন হল (৫০x ৫০) = ২৫০০ মিলিলিটার বা আড়াই লিটার। ৭০ এর জায়গায় ৭৬ ধরলে অতিরিক্ত রক্তের পরিমাণ হবে ১৩০০ মিলিলিটার। আরও বেশি ওজনের নর-নারীর দেহে রক্ত থাকবে আরও বেশি। সাধারণ ভাবে একজন মানুষের দেহে যে রক্ত থাকে, তাতে তার প্রয়োজন মিটিয়েও অতিরিক্ত রক্ত থাকেই। কিন্তু কোন দুর্ঘটনা, অস্ত্রোপচার, দীর্ঘদিন ধরে রোগে ভোগা, আগুনে পোড়া, ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি বা ‘রে’ (Ray) দেওয়ার ফলে বেশি পরিমাণে রক্তকোষ নষ্ট হয়ে যাওয়া, মাতৃত্ব-কালীন পুষ্টি-হীনতা ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে অনেক সময় একজন মানুষের দেহে বাইরে থেকে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তা ছাড়া থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুদের তো অন্যের রক্ত গ্রহণের মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকতে হয়। তখনই দরকার হয় রক্তদানের। কেননা, বহু বছর ধরে দিনরাত গবেষণা চালিয়েও বিজ্ঞানীরা আজ অবধি রক্তের কোন বিকল্প আবিষ্কার করতে পারেন নি। কোন কারখানা বা শস্যক্ষেতেও রক্ত উৎপাদিত হয়না। রক্ত তৈরির একমাত্র কারখানা হল এই মানব দেহ। ফলে কোনও রোগীর চিকিৎসা ও বেঁচে থাকার জন্য রক্তের দরকার হলে, কোন নীরোগ, হৃদয়বান, মানবিক গুণের অধিকারী মানুষকেই এগিয়ে এসে নিজ দেহ থেকে রক্ত দিতে হয়। তাঁর দেহে সঞ্চিত অতিরিক্ত রক্ত থেকেই তিনি রক্তদান করেন। সঞ্চিত অতিরিক্ত রক্ত থেকে আমরা যদি ৩০০-৩৫০ মিলিলিটার রক্ত দান করে দেই, তাহলেও আমাদের কোন অসুবিধাই হওয়ার কথা নয়। এছাড়া ওই রোগীকে বাঁচানোর বা রক্ত সংগ্রহের আর অন্য কোন উপায় নেই। অন্যের ক্ষেত্রে আমরা রক্তদানের গুরুত্বটি সঠিক ভাবে উপলব্ধি করতে পারিনা। কিন্তু এ রকম একটা দৃশ্য ভেবে দেখুন তো, আপনার মা, বাবা, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা বা আপনি নিজে অসুস্থ হয়ে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছেন, অথচ হাজার হাজার মানুষ তাদের দেহে প্রয়োজনের অতিরিক্ত রক্ত বয়ে নিয়ে বেড়ালেও শুধুমাত্র অজ্ঞতাজনিত ভয় ও কু-সংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে রক্ত দিতে রাজী হচ্ছেন না। ব্যাপারটা কত মর্মান্তিক ! কতটা অমানবিক ! ঘটনা তো এমনও হতে পারে; আপনি গাড়িতে চেপে দূরে কোথাও যাচ্ছিলেন, পথে গাড়িটি দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়ে সাঙ্ঘাতিক আহত এবং অচেতন অবস্থায় অকুস্থল থেকে আপনাকে কেউ হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন। প্রচুর রক্তপাত হওয়ায় আপনার জীবন রক্ষার জন্য এক্ষুণি আপনাকে রক্ত দিতে হবে। হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্কে কোন রক্ত নেই (কারণ লোকে রক্ত দিতে ভয় পায় বলে ব্লাড ব্যাঙ্কের ভাঁড়ার শূন্য)। আপনার  বন্ধু-বান্ধব,আত্মীয় স্বজনেরা এখনও আপনার দুর্ঘটনার খবরই পাননি। এ রকম অবস্থায় ঘটনা কোন দিকে গড়াতে পারে ? এমন ঘটে যাওয়া অসম্ভব তো নয় ? কাজেই, শুধু অন্যের জীবন রক্ষার জন্য নয়, নিজেরও অনাগত বিপদের মোকাবিলা করার জন্যও নিজে নিয়মিত রক্তদান করা এবং অন্যদেরও সচেতন করে রক্তদান করতে উৎসাহিত করা আমাদের অন্যতম কর্তব্য।
             রক্তদানে নিজের কোন ক্ষতিই হচ্ছেনা। দান করা রক্ত পূরণ হওয়ার জন্য ভাল ভাল খাবারের ও প্রয়োজন নেই। সাধারণ ডাল-ভাত-রুটি সবজিই যথেষ্ট। তা ছাড়া, ওই প্রতি কেজিতে ৭৬ মিলিলিটারের চেয়ে বেশি রক্ত  শরীরে জমেও থাকে না। দান না করলেও নিজে থেকেই নষ্ট হয়ে যায়। আবার দান করে দিলে নিজে থেকেই তৈরিও হয়ে যায়। যে গাই প্রতিদিন আধ-সের দুধ দেয়, সাত দিন না দোয়ালে সে কি পরের দিন সাড়ে তিন লিটার দুধ দেবে ? না, তা হয়না। তেমনি, দান করে দিলে আবার রক্ত তৈরি হবে, না করলে জমে জমে দেহের মধ্যে রক্তের বিশাল ভাণ্ডার গড়ে উঠবে না। তা হলে রক্তদান করতে দ্বিধা/সঙ্কোচ কেন ? মনে রাখবেন, আপনার দান করা রক্ত শুধু একজন মানুষের প্রাণ রক্ষাই করেনা, একটি পরিবারকে ধ্বংসের হাত থেকেও রক্ষা করে। রক্ত না পেয়ে কোন পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্যটি মারা গেলে হয়তো তার বৃদ্ধ মা বাবার আর কোনদিন ওষুধ খাওয়া হবেনা, ছোট বোনটির আর বিয়ে হবেনা, ছেলে মেয়ে গুলোকে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে পেটের ধান্দায় পথে পথে ঘুরতে হবে, হয়তো পা পিছলে অসামাজিক কাজকর্মে যুক্ত হয়ে যাবে। সংসারের খাইখরচ মেটাতে গিয়ে হয়তো তার স্ত্রীকে মানুষের বাড়িতে বাসন-মাজা-র কাজ নিতে হবে। হয়তো আরও নিকৃষ্ট কোন পথে পা বাড়াতে বাধ্য হতে পারে। মহান মানবিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আপনার দান করা রক্ত সেই সমস্ত অপ-সম্ভাবনাকে প্রতিহত করবে।
অন্যদিকে, রক্তদানে শুধুমাত্র গ্রহীতাই উপকৃত হন না, দাতা নিজেও বিভিন্ন ভাবে লাভবান হন। জন্ডিস, ম্যালেরিয়া, যৌনরোগ, এইচ আই ভি প্রভৃতি হন্তারক রোগজীবাণু নিজের অজান্তেই আপনার শরীরে বাসা বেঁধেছে কি না, রক্তদান করলে সে সবের পরীক্ষা হয়ে যায় বিনা খরচে। পরীক্ষার ফলাফল চূড়ান্ত গোপনীয়। কোন রোগ জীবাণু ধরা পড়লে শুধুমাত্র আপনাকেই এ বিষয়ে জানানো হবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া হবে। ওই পরীক্ষা গুলো কোনও ল্যাবরেটরিতে করাতে হলে বর্তমান বাজার দরে আপনাকে খরচ করতে হবে প্রায় ১৭০০ টাকা। রক্তদান করলে আপনি সহজেই আপনার রক্তের গ্রুপ জেনে নিতে পারবেন। আপনার গ্রুপ সংবলিত একটি সরকারি কার্ড আপনাকে দেওয়া হবে, যা সারা পৃথিবীতে আপনার রক্তের গ্রুপের নিশ্চিত প্রমাণপত্র হিসেবে স্বীকৃত হবে। রক্তের গ্রুপ জেনে রাখা আধুনিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এক অত্যন্ত জরুরি বিষয়। রক্তদানের পর দেহে যে নতুন রক্তকণিকা জন্মায়, তা দাতার শরীরকে সতেজ, চনমনে আর কর্মচঞ্চল করে তোলে। আমাদের দেহ প্রতিদিন প্রায় ৪০০ মিলিলিটার রক্ত তৈরি করতে সক্ষম। কিন্তু যেহেতু স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের দেহ থেকে দৈনিক মাত্র ৫০ মিলিলিটারের মত রক্ত নষ্ট হয়, তাই সেই পরিমাণ রক্ত তৈরি করার পর আমাদের রক্ত তৈরির প্রক্রিয়া (Mechanism) স্তব্ধ হয়ে থাকতে বাধ্য হয়। স্তব্ধ হয়ে থাকতে থাকতে তার কর্মক্ষমতা কমে যায়। নিয়মিত রক্তদান করলে সেই মেকানিজম ঘন ঘন কাজ করার সুযোগ পায়। ফলে, ওই ব্যক্তির ছোট খাটো অপারেশনেও রক্ত গ্রহণের প্রয়োজন হয়না। নিয়মিত রক্তদাতাদের কখনো এনিমিয়া হয়েছে বলে শোনা যায়না। পাশাপাশি, নিয়মিত রক্তদান করলে হার্ট অ্যাটাক এবং রক্তচাপের সম্ভাবনা ২০ শতাংশ কমে যায়। নিয়মিত রক্তদাতাদের সরকারি তরফে একটি ‘ডোনার কার্ড’ দেওয়া হয়। সেই কার্ডের বিনিময়ে এক বছরের মধ্যে দাতা নিজে বা তার পরিবারের সদস্যরা এক বোতল রক্ত বিনা পরিবর্তে পেতে পারেন। কিন্তু এইসব বৈষয়িক লাভের চেয়ে অনেক বড় লাভ হল, একজন মানুষের প্রাণ রক্ষা করতে পারার অসাধারণ মানসিক তৃপ্তি। ‘আমি ডাক্তার নই, কোন মহাপুরুষও নই, কিন্তু আমার রক্তে একজন মানুষের প্রাণ আজ রক্ষা পেয়েছে’—এই স্বর্গীয় অনুভূতিতে রক্তদাতার মন-প্রাণ এক অবর্ণনীয় প্রশান্তিতে ভরে ওঠে।
            খাদ্য সঙ্কটের সময় মানুষ যখন চারিদিকে খাদ্যের জন্য হাহাকার করছে, কালোবাজারিরা যদি তখন লুকিয়ে গুদামে খাদ্য মজুত করে রেখে দেয়, আধুনিক সভ্য সমাজ তখন সেটাকে অমানবিক, বে-আইনি আখ্যা দেয়। তেমনি, হাসপাতাল গুলিতে রোগীরা যখন রক্তের অভাবে ধুঁকছে, মারা যাচ্ছে, তখন আমরা আমাদের শরীরে অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত রক্ত মিছিমিছি বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি – রক্তদান করছিনা, এটাও কি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অপরাধ নয় ?
অনেকেই বলেন, অপরিচিত যাকে তাকে আমি রক্ত দিতে যাব কেন? বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পরিচিত বা আমার পাড়ার কেউ হলে বলবেন, আমি নিশ্চয় রক্ত দেবো। রক্তদানের মৌলিক সংহিতা বলে, রক্তদাতা এবং রক্ত গ্রহীতার মধ্যে পরিচয় থাকতে নেই। কেন ? কারণ, এর দুটো খারাপ সম্ভাবনা আছে। সমস্ত অগ্রগতির পরেও রক্ত বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত এমন কোন পরীক্ষা পদ্ধতি আবিষ্কার করতে পারেনি, যে পদ্ধতিতে পরীক্ষার পর রক্তকে ১০০ শতাংশ বিপন্মুক্ত বলে ঘোষণা করা যায়। ‘জিরো রিস্ক ব্লাড’ আজও মানুষের জ্ঞানের অধরা। আপনি হয়তো জানেন না, আপনার শরীরে দাদ বা এক্‌জিমার মত কোন একটা চর্মরোগের জীবাণু প্রবেশ করেছে। এখনো আপনার শরীরে তার প্রকাশ ঘটেনি, কিন্তু রক্তে তার উপস্থিতি রয়েছে। পরীক্ষায় তা কোন কারণে ধরা পড়ল না। আপনার রক্ত পেয়ে পরিচিত সেই রোগী হয়তো সুস্থ হয়ে উঠলেন, কিন্তু তার একজিমা দেখা দিল। অনুসন্ধান করে বুঝতে পারলেন, যে আপনার দেওয়া রক্ত থেকেই ওই নতুন রোগের শিকার হয়েছেন তিনি। মনে মনে কি তিনি বলবেন না, ‘দূর ছাই, ওই অমুকের কাছ থেকে রক্ত নেওয়ায় আজ এই বিচ্ছিরি রোগে ভুগতে হচ্ছে।’ আবার উল্টোটাও হতে পারে। যে বন্ধুকে আজ রক্ত দিয়ে বাঁচালেন, বছর-দেড় বছর পর একদিন হয়তো কথায় কথায় তার সঙ্গে কোন বিষয়ে আপনার তর্ক বেঁধে গেল। বন্ধুটি রাগের মাথায় আপনাকে কিছু একটা খারাপ কথা বলেই ফেললেন। তখন আপনার মুখ দিয়ে না হোক মন থেকে এই কথা বেরিয়ে আসতেই পারে—ও’ ঠিকই আছে, একদিন তোকে রক্ত দিয়ে বাঁচিয়েছিলাম বলেই আজ এমন কথা বলতে পারলি, রক্ত না দিলে তো এই কথা বলার জন্য বেঁচেই থাকতিস না। অনাকাঙ্ক্ষিত এমন পরিস্থিতিগুলো এড়ানো উচিৎ, তাই পরিচিতদের মধ্যে রক্ত বিনিময় না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। আর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় – ইংরাজিতে যাকে বলে ‘ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেটিভ’—মা, বাবা, ছেলে-মেয়ে, সহোদর বা জেঠতুতো-খুড়তুতো ভাই-বোন-- এদের মধ্যে তো কখনোই নয়। অত্যাধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, একই জেনেটিক রক্ত যাদের শরীরে বহমান, তাদের একজনের রক্তের ক্রোমোজোম  অন্যের রক্তের ক্রোমোজোমকে ভীষণ ভাবে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একে অন্যকে মেনে নেয়, কিন্তু কখনো কখনো মারাত্মক ভাবে একে অন্যের সাথে বিক্রিয়া করে। যদিও খুব কম ক্ষেত্রেই এমন ঘটনা ঘটে, কিন্তু ঘটে গেলে আর কোনভাবেই রোগীকে বাঁচানো যায়না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। কে বলতে পারে, ওই মারাত্মক ঘটনা আপনার প্রিয় রোগীর ক্ষেত্রেই ঘটতে চলেছে কি না! চিকিৎসা শাস্ত্রের পরিভাষায় এর নাম “গ্রাফট্‌ ভার্সাস্‌ হোস্ট ডিজিজ”। রক্ত না পেলেও হয়তো তাকে বাঁচানো যেত, কিন্তু ‘ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেটিভ’-এর রক্ত গ্রহণ করায় মৃত্যুই তার একমাত্র ভবিতব্য হয়ে দাঁড়ালো। কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের সময়ও এমন ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। পরিচিত মানুষ বা আত্মীয়স্বজনদের যারা রক্ত দিতে চান, এদিকটা ভেবে দেখতে তাদের অনুরোধ জানাই।
          আরেকটি ভয়াবহ সম্ভাবনা আছে। আমাদের চারপাশের সমাজ আজ অভাবনীয় ভাবে পালটে গেছে, এবং আরও পাল্টাচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে অণু পরিবার তৈরি হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে  আগের মত মূল্যবোধের বন্ধন এখন আর নেই। আমরা বা আমাদের সন্তানেরা কে কোথায় যাচ্ছি, কি করছি, সব খবর সব সময় রাখা সম্ভব হচ্ছেনা। অনেকেই হয়তো জ্ঞানে কিংবা অজ্ঞানে জীবনে এমন অস্বাস্থ্যকর ঘটনা ঘটিয়েছি, যাতে এখন মনে ভয় আছে- আমি নিজেই হয়তো খারাপ কোন একটা সংক্রমণ বাঁধিয়ে বসে আছি। লজ্জায় কাউকে কিছু বলতে পারছিনা। এ রকম অবস্থায়, যখন আমার মা, বাবা, ভাই, বোনের জন্য রক্ত দেওয়ার প্রস্তাব আসবে, তখন একদিকে চিন্তা, না দিলে লোকে বলবে, ‘ছেলেটা নিজের মা-কে বাঁচানোর জন্যও রক্ত দিতে রাজী হচ্ছেনা’ অন্যদিকে ভয়, অজানা সংক্রমণে আমার যা হবে হোক, দেখা যাবে, কিন্তু মা-কে কেন ওই রোগে সংক্রমিত করতে যাবো। পরিস্থিতির চাপে তখন ওই ব্যক্তির আত্মহত্যাকেই সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে হতে পারে। একজন স্বেচ্ছা রক্তদাতার সামনে এরকম কোন সংকট নেই। নিজের জীবনযাত্রা প্রসূত এ ধরণের কোন সংশয় থাকলে যে কোন অজুহাত দেখিয়ে তিনি রক্তদান এড়িয়ে যেতে পারবেন।
          এর পরেও প্রশ্ন থেকে যায়, পয়সা দিয়ে যদি রক্ত কিনতে পাওয়া যায়, তবে কেন আমি আমার শরীর থেকে রক্তদান করতে যাবো ? আসলে, রক্ত বিক্রয় এবং ক্রয়—দুটোই আইনি অপরাধ। ধরা পড়লে, বিক্রেতার পাশাপাশি ক্রেতাকেও শাস্তি ভোগ করতে হয়। নেহাত বিপদে পড়ে কিনতে বাধ্য হয়েছেন বলে আইনের শাস্তির হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়না। তাছাড়া পয়সার বিনিময়ে যারা রক্ত বিক্রি করে, তাদের রক্তের গুণমান অত্যন্ত নিম্নমানের। পয়সার লোভে তারা ঘনঘন রক্ত বিক্রি করে। ও রকম তিন বোতল রক্তও স্বেচ্ছা রক্তদাতার এক বোতল রক্তের সমকক্ষ নয়। টক্‌ দই-এর মালিক যেমন নিজের দই টক বলে কখনো বলেনা, তেমনি রক্ত বিক্রেতা কখনোই নিজের অসুখ বিসুখের কথা প্রকাশ করে না। কারণ, উভয় ক্ষেত্রেই ক্রেতার স্বাদ বা স্বাস্থ্য তাদের চিন্তার বিষয় নয়, তাদের লক্ষ্য ক্রেতার পকেট। আরেকটা বিষয়, সংসার চালানোর জন্য বা উদরপূর্তির জন্য কোন ব্যক্তিকে রক্ত বিক্রয় করতে দেখা যায়না, ও’সব ‘সাহেব’ মার্কা বাংলা সিনেমার গল্প। শতকরা একশো-জন রক্ত বিক্রেতাই রক্ত বিক্রি করে নেশার পয়সা সংগ্রহের জন্য। সেই নেশার ঘোরে রেড লাইট এরিয়ায় যাতায়াতও অসম্ভব নয়। আর কে না জানে, ওই সব এলাকা হচ্ছে এইচ আই ভাইরাসের (HIV) কারখানা। তাদের কাছ থেকে সংগৃহীত রক্তেরও পরীক্ষা নিরীক্ষা অবশ্যই হয়, কিন্তু আগেই বলা হয়েছে, সমস্ত আধুনিকতম পরীক্ষার পরও রক্তের ১০০ শতাংশ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়না। তা হলে কেন পয়সা খরচ করে জেনেশুনে নিজের প্রিয় মানুষটির জন্য মৃত্যু কিনে আনা ? মানুষ তো শত্রুর সঙ্গে এমন ব্যবহার করে, আমরা কেন আমাদের আপনজনদের জন্য এমন জঘন্য কাজ করবো ? বিক্রেতার রক্ততো নয়ই, পরিচিত ব্যক্তি বা আত্মীয়ের রক্তও নয়, মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে একজন অদেখা, অপরিচিত মানুষের প্রাণ বাঁচানোর উচ্চ মানসিকতায় যিনি স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন, তার রক্তই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ সেরা রক্ত।
       তা হলে কি সবাই রক্তদান করতে পারে ? রক্তদাতার যোগ্যতা নির্ধারণের তিনটি প্রাথমিক শর্ত আছে ; বয়স, দৈহিক ওজন এবং রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা।
ক) রক্তদাতার বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে। তার কম বা বেশি নয়।
খ) তার দেহের ওজন হতে হবে ৪৫ কেজি বা তার চেয়ে বেশি। কিন্তু কম হলে চলবে না।
গ) ইচ্ছুক দাতার রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমপক্ষেও ১২.৫ গ্রাম শতাংশ (এক ডেসিলিটার রক্তে থাকা হিমোগ্লোবিনের ওজন) হতে হবে।
     
     
আর কা’রা রক্তদান করতে পারবেন না ?

  যে সকল নারী-পুরুষ এই শর্ত গুলি পূরণ করেন, সাধারণ ভাবে বলা যায়, তারা সবাই রক্তদানে সক্ষম।‍ তবে রক্তদাতা নির্বাচন করার ক্ষেত্রে এগুলি ছাড়া আরও কয়েকটি নির্দিষ্ট নিয়মাবলী রয়েছে। একজন মানুষ স্থায়ী ভাবে বা অস্থায়ী ভাবে রক্তদানে অযোগ্য বলে নির্ণীত হতে পারেন। যদি কোন ব্যক্তি উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure), মধুমেহ (Diabetis) থাইরয়েড বা অন্য কোন রোগের জন্য প্রতিদিন ওষুধ খেতে বাধ্য থাকেন, তবে তিনি আর কোনদিনই রক্তদান করতে পারবেন না। তবে আগে ওষুধ খেতেন, এখন খেতে হয়না যাদের, তারা রক্ত দিতে পারবেন।
১) কুকুরের কামড়ের ইনজেকশন যারা নিয়েছেন, তারা ইনজেকশন-এর কোর্স শেষ হওয়ার পর ১ বছর রক্তদান করবেন না।
২) বড় অপারেশন যাদের হয়েছে তারা ১ বছর পর্যন্ত রক্তদান করবেন না। ছোট অপারেশন হলে ৬ মাস পর্যন্ত রক্তদান অনুচিত।
৩) কোন কারণে যদি কেউ রক্ত গ্রহণ করে থাকেন, তবে তিনিও এক বছর রক্তদান করতে পারবেন না।
৪) জন্ডিস, ম্যালেরিয়া বা টাইফয়েড রোগ হলে, সুস্থ হওয়ার পর আরও ৬ মাস রক্তদান করবেন না।
৫) যারা হাসপাতালে গিয়ে দাঁত ফেলেছেন,  নাক বা কানে ছিদ্র করিয়েছেন, বা শরীরে উল্কি / ট্যাটু করিয়েছেন, তারাও ৬ মাস রক্তদানে অক্ষম।
৬) গত ৬ মাসের মধ্যে যে মহিলার গর্ভপাত হয়েছে, বা যিনি বর্তমানে সন্তান-সম্ভবা, তিনিও রক্তদান করতে পারবেন না।
৭) যে মহিলার সন্তান এখনও মাতৃদুগ্ধ পান করে, তিনি রক্তদান করবেন না।
৮) যে মহিলা বর্তমানে ঋতুচক্রের মধ্যে আছেন (মাসের নির্দিষ্ট ৫/৬ দিন) তিনি রক্তদান করবেন না।
৯) যার কোন চর্মরোগ বা যৌনরোগ আছে, তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পরও ৬ মাস পর্যন্ত রক্তদান করবেন না।
১০) যে ব্যক্তি বর্তমানে কোন ধরণের অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খাচ্ছেন, তিনি কোর্স শেষ না হওয়া পর্যন্ত রক্তদান করবেন না।
১১) যিনি গত বারো ঘণ্টার মধ্যে সুরাপান করেছেন, তিনি রক্তদান করবেন না। কোন ব্যক্তি যদি নিয়মিত সুরাপানে বা  নেশা সেবনে (Drugs) অভ্যস্ত হন, তা হলে তার কাছ থেকে রক্ত গ্রহণ না করাই উচিৎ।
১২) যে ব্যক্তি একাধিক সঙ্গীর সঙ্গে যৌন সংসর্গে অভ্যস্ত, তার কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ অনুচিত। পতিতা পল্লীর লোকজন, জেলের কয়েদী বা দূরগামী ট্রাকের ড্রাইভারদের কাছ থেকে কখনোই রক্ত সংগ্রহ করতে নেই।
১৩) মানসিক ভাবে অবসাদগ্রস্ত ব্যক্তি বা মানসিক রোগীদের কাছ থেকে রক্ত গ্রহণ করা উচিৎ নয়।
১৪) একবার রক্তদান করে ৯০ দিনের মধ্যে আর রক্তদান করা অনুচিত।
       উপরোক্ত নির্দেশিকার বাইরেও কিছু কিছু প্রশ্ন কা’রো থাকতেই পারে। প্রতিটি রক্তদান শিবিরে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক উপস্থিত থাকেন। প্রশ্ন এবং সংশয়ের কথা সেই চিকিৎসকের কাছে সরাসরি জিজ্ঞেস করে নেওয়া উচিৎ। নিরাপদ ভাবে রক্তদানের জন্য রক্তদানের আগে এবং পরে কিছু অবশ্য পালনীয় নিয়ম আছে। সে গুলিও আমাদের জেনে নিয়ে সেই মত চলতে হবে। নিয়ম গুলি হচ্ছে —
ক) খালি পেটে রক্তদান করতে নেই। রুটি বা ভাত জাতীয় শক্ত খাবার অল্প পরিমাণে খেয়ে মিনিট পাঁচেক বিশ্রাম নিয়ে রক্ত দিতে হয়।
খ) ভরপেট খাবার খেয়ে নিলে কমপক্ষেও এক ঘণ্টা বিশ্রাম না নিয়ে রক্তদান করবেন না। বমি হয়ে যেতে পারে, মাথা ঘোরাতে পারে।
গ) আগের রাতে ভাল ঘুম না হলে রক্তদান না করা উচিৎ।
ঘ) বসে বা দাঁড়িয়ে কখনোই রক্তদান করবেন না। রক্ত দিতে হয় শুয়ে।
ঙ) রক্তদানের আগে এক গ্লাস জল অবশ্যই খাবেন।
চ) রক্তদান শেষ হওয়ার সাথে সাথে উঠে বসবেন না। পাঁচ-সাত মিনিট শুয়ে বিশ্রাম নিন, তারপর বসে আরও এক গ্লাস জল খান। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ান।
ছ) সুচ গাঁথার জায়গাটায় তূলা দিয়ে কনুইটা ভাঁজ করে দেওয়া হয়। অন্তত পনেরো মিনিট সময় কনুইটা সোজা করবেন না। রক্তবাহী নালীর ছিদ্রটা বন্ধ হওয়ার জন্য এই সময়টুকু প্রয়োজন।
জ) রক্তদানের পর এক ঘণ্টা সময় গাড়ি বা মোটর সাইকেল ইত্যাদি চালাবেন না। সিঁড়ি ভেঙে দোতলা তিনতলায় উঠবেন না।
ঝ) রক্তদানের দিন ক্রিকেট, ফুটবল খেলা, শারীরিক ব্যায়াম ইত্যাদি কঠিন পরিশ্রমের কাজ না করাই ভাল।

      মানুষ ছাড়া অন্য সমস্ত প্রাণীই নিজের জন্য বাঁচে। একমাত্র মানুষ ই নিজে বেঁচে থাকার পাশাপাশি অন্যের জন্যও চিন্তা ভাবনা, কাজকর্ম করে। এ জন্যই মানুষকে বলা হয় বিধাতার সর্বোত্তম সৃষ্টি। এই সুন্দর পৃথিবীতে বেঁচে থাকার আকুতি প্রকাশ পেয়েছে রবীন্দ্রনাথের ভাষায়। তিনি বলেছেন, “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই...”। তাই আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, “রক্তদানের বার্তাকে আমরা ঘরে ঘরে পৌছিয়ে দেবোই। রক্তের অভাবে আর একজন মানুষকেও আর মরতে দেবো না আমরা।” রক্তদান আন্দোলন দীর্ঘজীবী হোক।




সোমবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৪

তবুও স্বাধীনতা...

















বুও স্বাধীনতা আসে...
স্বাধীনতার দিনে
কত রঙ এসে মেলে
তেরঙা মিছিলে।
কত শ্বাস – হতাশ্বাস
নিশানে নিশানে প্রতিভাস-
কিছু তার মুছে যায়,
কিছু থেকে যায় বিভাস
স্বপনে সুদূরে..

তবুও স্বাধীনতা আসে
স্বাধীনতার দিনে
জানালার জাফরিতে
মাথা রেখে দেখি-
এক টুকরো নীলে
ভেসে যায় অধরা আভাস,
আমার স্বাধীনতা, অথবা
স্বাধীনতার আমি
প্রত্যাশায় উদ্ভাস.....



শুক্রবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৪

ফেইসবুক ও স্বাধীনতা

।। রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ।।















ডিজিট্যাল শুভেচ্ছায় ঢাকা পড়ছে
বিকানো দিনগুলোর ডুমুরে জমাট হাইকু ।

ফেইকবুক জুড়ে স্বাধীনতার অঢেল চিহ্ন

দূরে বাঁদি ঘরে ভারতবর্ষ ধুঁকছে
এইচ আই ভি , ধর্ষণ , নালিক আর ডিসপেপসিয়ায় ।   



বৃহস্পতিবার, ১৪ আগস্ট, ২০১৪

স্বপ্নের দেশ...


























 ।। মধুমিতা ভট্টাচার্য।।

হাট্টিমা টিম টিম
মুংগেরীলাল
স্বপ্ন দেখে
পাড়ছে সোনার
ডিম।

গাছপালাতে
ঘর বাড়িতে
কখনো বা
সাংসদেতে
মুরগি হয়ে
পাড়ছে সবাই
মস্ত সোনার
ডিম।

এবার মায়ের
জন্মদিনে
তাইতো ছেলে
ঠিক করেছে
সোনার ডিমে
ভরিয়ে দেবে
চাষী ভাইয়ের
ধানের গোলা।

মায়ের চোখের
অশ্রু বলে
বারণ আছে
স্বপ্ন দেখা
বারণ আছে
মিথ্যে বলা।






মাতৃভাষা তোমার জন্যে


(ব্লগে নতুন এলাম। পরীক্ষামূলক ভাবে পোষ্ট করছি। আপাতত তাই ছবিতেই দিলাম। এই কবিতাটি ৯ মার্চ, ২০১৪তে 'দৈনিক যুগশঙ্খে'র রবিবারের বৈঠকে  প্রকাশিত হয়েছিল)



সোমবার, ১১ আগস্ট, ২০১৪

আরহাম

।।   মিফতাহ- উদ-দ্বীন   ।।


 
(C) Image




















(ছেলে আরহাম কে নিয়ে আমার প্রথম ছড়া)
   

রহাম কী রকম
আছো তুমি আজকে?
কাছে থাকি সারাক্ষণ
ফেলে সব কাজকে।

পাঁচদিনে পৃথিবীতে
কী কী সব দেখলে
বলে ফেল কানে কানে
আজ কিছু শিখলে?

কোথা ছিলে এদ্দিন
কারা ছিল সঙ্গী
একে একে বল সবই
করে নানা ভঙ্গি।

চোখ বোজে হাই তুলো
হেসে চলো মুচকি
সঙ্গীরা সব তবে
নেয় বুঝি খোঁজ কি?



রবিবার, ১০ আগস্ট, ২০১৪

বাইশে শ্রাবণের কবিতা

দৈনিক যুগশঙ্খে প্রকাশিত আজ (১০ আগস্ট,১৪)





















খন আমি রবীন্দ্রনাথ পড়ি,
মাঝে মাঝেই পড়ি
প্রায় ই পড়ি
তখন চারপাশে মোমের আলোর মত
নরম আঁধার ঘনায়
আর ক্রমশঃ ডুবে যেতে থাকি
গভীর থেকে গভীরতর মায়ায়
সেই প্রায়ান্ধকার থেকে
আলোময় তুমি উঠে এসে
হাত বাড়াও' রঞ্জন' হয়ে
আর আমি 'নন্দিনী' হয়ে
ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে চাই তোমায়
অথবা 'লাবণ্য' হয়ে
'অমিত' ভালবাসায়
ভরে দিতে থাকি তোমার হৃদয়
যে হৃদয়ে জাগে একটিই মুখ
"ভালবাসা" অথবা "রবি ঠাকুর"



বৃহস্পতিবার, ৭ আগস্ট, ২০১৪

জাতিস্মর

কবিতা পড়ছেন নীলদীপ
         (নীলদীপ চক্রবর্তী পেশায় তিনসুকিয়ার একটি ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়ের শিক্ষক। কিন্তু ছাত্রজীবন থেকে বাংলা ভাষা সাহিত্যের সেবক। গল্পও লেখেন। তিনসুকিয়ার একটি স্থানীয় টিভি চ্যানেলে সংবাদও পড়েন বাংলায়। কবিতা লেখেন বহুদিন ধরে। ইতিমধ্যে একটি কবিতার বইও বেরিয়েছে। কিন্তু চাপা স্বভাবের এই কবিকে তিনসুকিয়ার বাইরে কেউ চিনতেন না,  জানতেন না বিশেষ । এই সেদিনও। এই বছর খানিক ধরে যুগশঙ্খের 'রবিবারের বৈঠকে' কিছু কবিতা পাঠিয়েছেন ছাপাতে। এই মাত্র।
            তিনসুকিয়াতে কবিতা লেখনে অনেকে কবি হবার জন্যে। কিন্তু   কবিতাকে ভালোবেসে কবিতা লেখেন,  লিখতে জানার চেষ্টা করেন যে গুটি কয় , তার মধ্যে নীলদীপ অন্যতম।  তিনসুকিয়াতেও তাঁকে ধরা খুব সহজ কর্ম নয়। আজ ৭ আগষ্ট 'উজান সাহিত্য গোষ্ঠী'র ১০ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে  আয়োজিত হয়েছিল এক বহুভাষিক কবিতা পড়ার অনুষ্ঠান। সেখানে এলেন , পড়লেন। যথারীতি শ্রোতামন জয় করলেন। তারই একটি নিয়ে নিলাম, ঈশানে তুলে দেবো বলে। আশা করি আপনাদেরও ভালো লাগবে।)


 আমার কথা মনে পড়লেই
বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস
      বুক, মাথা আর পেট থেকে
                          বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস—
সোনারঙের দিনগুলো-শুয়োপোকার মতো
বেরিয়ে আসে চেতনার আকাশে!

আমি মাঠে খেলতাম, নদীতে নাইতাম
কাশেমচাচার বাড়ি যেতাম—
আমার বাড়ি নবীগঞ্জে
আমার বাড়ি আখাউড়ায়
আমার বাড়ি ছুটতে ছুটতে...ব্রাহ্মণবেড়িয়ায়!

রেজানুর, আমিনা, রুকুদের সাথে
ছুটতে ছুটতে হঠাৎ টুকরো টুকরো
তুলোর মতো ছড়িয়ে যেতাম পাবনায়, খুলনায়!

ঐখানে একটা ডোবা ছিল, ঐখানে রেলপথ
ঐখানে বিশালাক্ষ্মীর মন্দির, এইতো
ঈদ, এইতো নবান্ন...এখানে কাশেম
ওখানে নবারুণ। ঐখানে বাঁকা চাঁদ
ডুবে যাওয়া, জংলাঝোপ---শালডুংরি
ওখানেই খুব আবেগে আমিনাকে জড়িয়ে ধরা!
সেসব কথা মনে পড়লেই , বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস।

ফিঙে পাখিদের গা ডোবানো বুড়িগঙ্গায়
চিত সাঁতারে হারিয়ে যেতাম
আর বাঁশিতে হলুদ আকাশে ছড়িয়ে দিতাম বিষাদসুর
আমার বাড়ি তখন ঢাকায়! আমার বাড়ি বিক্রমপুর!

হঠাৎ দেখি মানুষগুলো কেমন যেন টুকরো মেঘে
হারিয়ে যাচ্ছে মাটির মানুষ, কান্না চাপায় ক্ষিদের বেগে।

ছড়িয়ে পড়ে মাটির মানুষ, টুকরো হয়ে রক্ত আকাশ
সেসব কথা মনে পড়লেই---
আর কিছু নয়, দীর্ঘশ্বাস!