.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৪

বিবাদের ধাঁধা

(C)image:ছবি























।। শমীক চৌধুরী।।

১)
আমার তোমার পরিধি পেরিয়ে
লোকালয়ের কোলাহল এড়িয়ে
কত দূর এগোনো যায় ?
আবার তোমার গালে হাত
যুক্তিতক্কের যত বিবাদ
আমোদ প্রমোদ দিনরাত -
ভাবতে বসলেই অবসাদ !!


২)
জীবন সরল ধাঁধা
জুজু বুড়ির জট।
হিসাব মিললে ঠিক
নইলে হিং টিং ছট !!




শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৪

যুদ্ধ ভাগবত


(দৈনিক যুগশঙ্খে প্রকাশিত 28 ডিসেম্বর রবিবার এর বৈঠক এ। )





























 নীলদীপ চক্রবর্তী॥ 




মিত্রশক্তি অক্ষশক্তি
মগ্ন যুদ্ধময়
মরুভূমিতে সূর্য ফোটে
কৃষ্ণ হেসে কয় !

মিলনোন্মুখ পরমাণুরা
অংক সাঙ্কেতিক -
শ্বেতকৃষ্ণ সৈনিক দল
বাযুতে ! পদাতিক !

নভোশ্চরী লোহার পাখি
আগুন মাখা ডানা
আগুনপাখি ঝলসে পোড়ায়
ভূমির সীমানা !

সীমানা থেকে অনেক দূরে
স্থিরীকৃত হয়
স্বয়ংক্রিয় বোতামে মৃত্যূ
কৃষ্ণ হেসে কয় !




শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৪

কার মনে যে কি আছে !!
























||শমীক চৌধুরী ||


বাই ছিলাম  সুখী
মুখ ভরা ছিল  হাসি।
সেদিন হঠাৎ বলেছিলে
কার মনে যে কি আছে ?

কেনো তোমার এই মনে হওয়া
আবার বইছে উতল হাওয়া
মরছে মানুষ , পুড়ছে ঘর
জ্বলে ছারখার চরাচর ।।

কোনো এক গায়ের বধুর কথা -
থাকবে না পটে আঁকা। 
অপলক  শিশু টির চোখ ,
দেহ প্রাণহীন, স্তব্ধ সে বুক  ।।
আর কত করব যে শোক
সময় হাসে করে বাঁকা মুখ। 

রাজতন্ত্রের আজ ভীষণ অসুখ।
নাই জানা তার সঠিক ওষুধ ।।
বদলি হচ্ছেন কেবল বদ্যি মশাই -
সার উনাদের আসা যাওয়াই।
দাওয়াইয়ের বদলে কথার হাওয়াই ।।

 বলা কথাই বলে যায়।
 শোনা কথাই শুনে যাই। 
 যে করে হোক দখল চায়-
 হামলে পড়ে কুর্সী বাঁচায় ।।

 আমলারাও আজ আছেন বেশ
 জাহান্নমে যাক না দেশ।
 হাতির পিঠে ঘুরে বেড়ায়
 গন্ডার দেখে  সময় কাঁটায়।

 এদিন তো বেশি চলবে না
 ধীরে হলেও জাগছে জনতা।
 সবাই জানে আমরা  ঘুমোই
 মুখ বুজে  সব  জুলুম  সই।
 তাই বলে কেউ ভুল করো না,
 অন্যায়ের দিন হাতে গোনা।
 একদিন ঠিক জাগবে জনতা। 

হতে পারে না এই আশা বৃথা

এ যে আমাদের মনের কথা।



রবিবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০১৪

শীতগাথা

(সৌজন্যঃ রবিবারের বৈঠক)


























 (কবিতাটি দৈনিক যুগশঙ্খের 'রবিবারের বৈঠক,
 ২১ ডিসেম্বর, ২০১৪ সংখ্যাতে প্রকাশিত)




।।দেবলীনা সেনগুপ্ত।।




প্রতি শীতদিনে
কমলা – কোয়া সম
মিঠে কড়া রংসাজে
রোদ হেসে যায়
আমার ঘর- আঙিনায়
কাপাস তুলোর মত
নরম মায়ায়
আকণ্ঠ করি পান
সেই রোদগান
এবং গোধূলিবেলায়
নীড়গামী পাখির ডানায়
যবে আঁধার ঘনায়
কুয়াশা আখরে ঢাকে নিসর্গরেখা
দিকচক্রবালে
তখনই পাহাড় হতে পাহাড়ের ঢালে
জুম-খেতির আগুন শিখায়
সব শীত দূরে যায়
আগামী ফসল আশায়

এখনও...
প্রতি শিশিরবেলায়
শীতগাথা আমোদ ছড়ায়
আমার মন – আঙিনায়...।



মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৪

দিনবদলের প্রলাপ

(C)Image:ছবি

।। পার্থ ঘোষ।।
       

          অকারণে মন খারাপের বিলাসিতা আমার ছিলনা কোন কালেই। ভারী শব্দের আযোজনে গোমট করবো পরিবেশ,তৈরি করবো থমথমে ভাব,এতটা শক্তিও কি আছে আমার ? না ছিল কখনো ? দেশ বিদেশের কত খবর, বিতর্কের ঝড় উঠে রোজ।মানুষ চিন -ভিয়েতনাম, ইরাক- আমেরিকায় ঘোরে প্রতি সন্ধ্যায়।
              "সাম্রাজ্যবাদী শক্তি" শব্দটার মানে নিয়ে আজো ধোঁয়াশা কাটেনি আমার,ছোট্ট বেলা থেকে শুনে শুনে শব্দটাকে বড়ই নিজের লাগে। রাশিয়ার কোন কিশোরী আত্মহননের পথ বেছে নিলে আমার কিছু যায় আসেনা,দিল্লীর মোমবাতি মিছিলে আমার কোন দায় নেই,ঢাকার ছাত্র আন্দোলনে আমার অবদান কতটুকু ? 
          শান্তির নোবেল "মালালা" না পেলেও, দুপুরের ভাত ঘুমে ব্যঘাত ঘটতোনা কোনো। কাঁটাতারের বেড়াতে আপত্তি করেও কি লাভ হতো কিছু ? বছর চৌদ্দের নাবালিকা স্কুল পালিয়ে স্বেচ্ছায় সতীত্ব হারালে,ভালবাসা জয়ী হয় কিনা,জানা নেই! আনপড় নেতার অযাচিত নীতিকথায় গা জ্বালা নেই আমার। 
         খুঁটিতে বাঁধা যুবতী বেবাক কিল চড় খেলে, পত্রিকার কাটতি ভাল হয়,মানুষ পড়ে। টাউন হলে ভারতনাট্যম, গাঁটের টাকায় শৈল্পিক হাততালি দিই। শিল্পের জন্যই শিল্প.....আমি আম জনতা। রোজকার বাজার সেরে ফেসবুকে সেল্ফি,কিংবা অচেনা সুন্দরীর এডিট করা ছবিতে পছন্দের মোহর লাগাই,প্রতিক্রিয়া না পেলেও তৃপ্তির ঢেকুর তুলি।কিছুই যায় আসেনা।
        বরং আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্ব পায়,লোকাল খবর,লোকাল বলতে নিতান্তই পাড়া-মহল্লার হাল
হকিকত। পরিচিত বাকি দোকানদারের চোখ এড়িয়ে অন্য ফুটে দ্রুত হেঁটে যাই।গত পরশুর কামরাঙা রঙের
গা ঢেকে রাখা, অন্যের সুন্দরী বউটিকে আর একবার দেখার আশায় অপেক্ষা করি।পাঁচ টাকার কাঁচা লঙ্কা কেনার অজুহাতে পুরো সন্ধ্যা ঘুরঘুর করি বাজারে। মাঝে বিনে পয়সার বহুব্যবহৃত পত্রিকায় রাখি চোখ,চায়ের দোকানে মাগনা চায়ের প্রত্যাশা। পরিচিত চা পিপাসুর এক কাপ ভালবাসার চা যদি জুটে যায়। D.A বৃদ্ধির কানাঘুষো তে জন্মের মনযোগী হই, শেষে অর্থমন্ত্রীর আদ্যশ্রাদ্ধ করে টেবিল চাপড়াই,বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের ঢং এ।দেশ বিদেশের খবর বলতে, এক ক্রিকেট। সেখানেও আমি তীব্র সমালোচক শ্রীনিবাসন নামক,অসাধারণ এক জোচ্চোর যোদ্ধার।
             নিজেকে আপ-ডেটেট প্রমাণের কোনো সুযোগই ছাড়িনা। অফিসে গিলে আসা চটকদার খবরে প্রকৃত
জ্ঞানীকেও চমকে দিই।নিজের ছেলের মিথ্যা টেলেন্টের গল্প শুনিয়ে,বিশুদ্ধ বাহবা কুড়াই,লক্ষ্য রাখি পাশের বাড়ির কেউ শুনেনা ফেলে।  রবিবারের সকাল থেকেই উথলে উঠে ভক্তি। সকালবেলা ইসের কাপড় ছেড়ে পূজার ফুল তুলি।  বিকেলে হাঁটা পথের মন্দির, পাঠ শুনতে টাকা খরচ নেই,উপরি পাওনা সুগন্ধি প্রসাদ আর
রকমারি সাজের নারী দর্শন।
           তবুও জীবন বয়ে চলে,জনমত তৈরি হয়। সমাজ পাল্টাতে থাকে সবার অলক্ষেই। কেউ থাকেনা চিরদিন,থাকে কিছু অসাধারণ চিন্তা আর কিছু প্রকৃত গঠনমূলক কাজ। সস্তা বাহবার জন্য কত কিছুই না করি। সব ব্যবসায় ডাহা ফেল মেরে, যে বাঙালি কলা বিক্রি করে মোড়ের মাথায়,সেও শিক্ষা দেয়।
প্রতিটি বাঙালি যুবার মত প্রথম যৌবনে একদিন কবিতা লিখেছি,একদিন শরীর চর্চা করেছি,একদিন সবার চোখ ছানাবড়া করে দিয়ে ঝাঁপিয়েছি জলে,সাঁতার না জানা ডুবন্ত শিশুর মা আজো কৃতজ্ঞতার হাসি দেয়।এই
কীর্তির কথা বেমালুম ভুলেছে সবাই,মা' টিও ভুলে যাবে একদিন। কত রাজার মহারাজার কথাই বিস্মৃতির অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে, ইতিহাস বড়ই নির্মম সাবজেক্ট ।
         রবিবাসরীয় একান্ত দুপুরের ভাত ঘুম কেড়ে নিয়েছে ফেইসবুক। ছিপ ফেলে প্রতিক্ষা,যদি মিলে যায়
চাটিং সখী কোন!! দিন বদলায়, বদলাতে থাকে নিরন্তর। শুনেছি ফেইসবুকচারীদের আত্মহননের ইচ্ছা কম হয়ে যায়।"স্বচ্ছ ভারতের" পোষ্ট মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।"ঝাড়ু হাতে" নেতার বউয়ের একান্ত সাক্ষাৎকার নিতে মন চায়। আজ হোক চুমু খুল্লামখুল্লা। এই চুমুতে তো আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সম্ভাবনা নেই। পশুদেরও নাকি চুমু খাওয়া আছে,অনাবিল। প্রতিবাদে না ভালবাসায় ঠিক বুঝিনা।তবু দিন বদলায়,বদলে যেতে থাকে নীরবে।
          প্রতিবাদ হয়,প্রতিরোধ গড়ে উঠে কিনা বুঝিনা। ধর্ষণের পরিসংখ্যান হতাশাই বাড়িয়ে দেয়। তবুও দিনবদলায় নোটিশ ছাড়াই। বদলাতে থাকে নিরন্তর। আমি আপনিই এই দিন বদলের কুশিলব। একটা চরম বদল হোক,আমূল বদলে যাক চারপাশ।ধর্মের ব্যাখ্যা, নকল সহানুভূতি,সংবেদনশীলতা,পাড়া মহল্লা,রাজপথ, নিদেনপক্ষে আমাদের অতিসাবধানী,ন্যকা ন্যাকা ভাবনার বদল হোক।বংশানুক্রমিক সযত্নে লালিত সংস্কার আর তথাকথিত আধুনিকতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি, আমরা অনেকেই আজ দিশাহীন।পরবর্তী প্রজন্ম অপেক্ষায় এক স্বচ্ছ ভারত ও স্বচ্ছ ভাবনার। নাকি তাদের জন্যও রেখে যাব একরাশ ধোঁয়াশা আর অনন্ত দিশাহীনতা ???



শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৪

মুক্তি

(C)Image:ছবি






























।। সৌম্য শর্মা।।

ছেলে, মেয়ে, ভাই, বোন
বন্ধু,  বান্ধব , আত্মীয়,  স্বজন
সুরক্ষিত  সঞ্চয়, বাড়ী , গাড়ী,
মোটা মাইনের সরকারী চাকুরী,
সুন্দর  সাজানো সংসার
ভালোবাসায় মোড়ানো উপহার
সবই তো পেয়েছি  অপার  !!

তবু, যখন নিসঙ্গে একা
চলে, ফিরে ফিরে দেখা
আমার এই  শেষ বোঝাপড়ায়
পেতে চাই, শুধুই  তোমায়  !!

জীবনে এতো যে অধিকার  করে আছি,
মাঝে- মাঝে মনে  হয়, সব ছেড়ে দিই
শুধু থাকি একা , একাই বাঁচি
পাখীর পালকের মতো, হালকা হয়ে যাই,
 উড়ে বেড়াই  তোমার আকাশে
পরিপূর্ণতার পরম নিশ্চিন্ত  আশ্বাসে  !!




বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৪

রিক্সাওয়ালা....

(C)Image:ছবি
।। পার্থ ঘোষ।।
         উত্তুরে বাতাসের দাপটে আজ একটু তারাতাড়িই সবাই ঘর মুখো হয়েছে।রাত বাড়ার সাথে সাথে শীতও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। ইলেক্ট্রিকের ঠান্ডা লোহার পোষ্টগুলো বেয়ে চুয়িয়ে চুয়িয়ে নামছে আলো। রাজপথের বুকে চলছে কুয়াশাদের শিশির হওয়ার গল্প । এই ক'বছরে শহরটার চেহারাই আমূল বদলে গেছে।গভীর রাতে উদোম বুকের এই শহরটা এক অদ্ভুত মায়াজাল সৃস্টি করে রাখে এখন।ছোট শহরের তকমাটা ধীরে ধীরে ঝেড়ে ফেলতে চাইছে যেন।দ্রুত বদলাতে থাকা শহরটায় পাঁচ সাত কিলোমিটার দূর থেকে রোজই আসতে হয় সুধনকে। তিনচাকার রিক্সাটা তার রুটিরুজির একমাত্র অবলম্বন।পায়ে চেপে মানুষ গুলোকে টানতে টানতে জীবনের প্রায় আদ্ধেক রাস্তা পেরিয়ে  গেছে।

         হ্যলোজেনের স্তিমিত আলোতে একটা রাজনৈতিক পতাকা অবিরাম দুলছে। পতাকার ছায়ায় কোন দলের অহংকার লেখা থাকেনা,তবু সুধনের অর্থহীন দৃষ্টি আজ আঠার মতো আটকে থাকে তাতে। তিনচাকার রিক্সার হুড খুলে যাত্রী সিটে ঠায় বসে থাকে। ঘরে ফেরার তাড়া নেই কোন,তবুও বাড়ির কথা মনে হতেই বুকের ভেতরটা খামছে ধরে কেউ।

           সারাদিনের ক্লান্ত ও ঠান্ডা পা'দুটো উনুনের আঁচে সেঁকতে সেঁকতে কতকাল মলিনার মায়ের সাথে গল্প হয়না। ' আর দুটো ভাত দিই? একটু ঝোল নাও, শুঁকনো ভাতগুলো গলা দিয়ে নামবে কেন? '... এমনই দু'একটা অভ্যস্ত বাক্য ছাড়া মলিনার মা যেন অন্য কোন কথা ভুলেই গেছে আজ। সুধনের চিন্তার ভাঁজে ভাঁজে এবার নানা পুরানো স্মৃতি এসে ভিড় জমায় । বিয়ের পর এই মুখটাকে বড়ো মিস্টি লাগতো তার,এখনো যে ভাল লাগেনা তা নয়। নাকছাবিটা সুন্দর মানাতো ওকে। প্রথম পোয়াতি হবার সময় কলসি নিয়ে পড়ে কী কান্ডটাই না বাঁধিয়ে ছিল। শম্ভু ডাক্তার না থাকলে মারাই যেত সেবার।এতরাতে জোরে হাসতে বারণ করেও লাভ হতোনা কিছুই, পাহাড়িয়া ঝর্নার মতো খলখলানি হাসিতে মাটিতে নুয়ে পড়ত।খাওয়া শেষ হলে সুধন আজ ভাতের থালাতেই মুখ ধূয়ে নেয়। মলিনার মা পাশের দোচালাটায় চলে গেলে, পা সেঁকতে শুরু করে উনুনে,মৃতপ্রায় আগুনটাকে একটু উস্কে দেয়।আবারও ভাবনাগুলো ফিরে আসে। নিজের মেয়ে বলে নয়,পাড়াপড়শীরাও স্বীকার করত, মলিনার রূপের প্রশংসা করত সবাই।বাড়ন্ত শরীরটার দিকে চোখ গেলেই মেয়ের বিয়ের জন্য সুধন উতলা হয়ে উঠত। পোড়ামুখী নির্ঘাত প্রেমে পড়েছিল,আজো ভাবতে গেলে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে তার।অবৈধ গর্ভের লজ্জায় নদীর চড়ার ঐ কদম গাছ গাছটায় ঝুলে যাবার আগে পর্যস্ত কেউ কিছুই জানতে পারেনি।সুধন অভ্যাসের বিড়িতে একটা জোরে টান মেরে ভাবতে থাকে এত উঁচুতে মেয়ে তার উঠল কি করে? তবে কি গাছেও চড়তে শিখেছিল লুকিয়েই ! মেয়ের নিথর শরীরটা নামিয়ে আনার সময়ও বুকটা আজকের মতোই গভীর যন্ত্রনায় কঁকিয়ে উঠেছিল।

          আজ চিন্তার রেশ বারবার ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে তার।একমাত্র জীবিত সন্তানের মুখটা মনে পড়তেই এক তীব্র কাঁপুনি দিয়ে উঠে সারা শরীর।ছেলে তার বড়ই ভাল। চাকরিতে নাম লিখিয়ে এসেই মরণ বাবার পা ছুঁয়েছে, প্রণাম করে বলেছে--- তোমাকে আর রিক্সা টানতে যেতে হবেনা।সারাজীবন অনেক করেছ বাবা।এবার বাড়ির ধারে কাছে সহজ কোন কাজ পেলে, ইচ্ছা হলে যেও। ' সেদিন আনন্দে সুধনের গলা ধরে এসেছিল, রা' সরছিলনা মুখে। সেদিন থেকে আর যায়নি রিক্সা নিয়ে,। এমন সুখের দিনের আশাতেই বোধহয় বাঁচে প্রতিটি বাপ।

       ছেলে আজকাল অনেক দূরে থাকে,নিজেই রান্নাবান্না করে। পরান নিজেই বলেছে বাড়িওয়ালাটা ভালই, তার দুটি যুবতী মেয়েকেও নাকি পড়াবার দায়িত্ব দিয়েছে পরানকেই।ওদের পড়িয়ে ঘর ভাড়ার টাকাটা উঠে যায়। ছেলে সবই বলেছে তবুও সে রাতেই মলিনার মা,মরণের জন্য পাত্রী দেখার কথাটা বলেছিল।সুধনের বেশ মনেও ধরেছিল কথাটা, মুখে কিছু না বললেও একবার ভাবার চেস্টা করে কল্পিত পুত্রবধূর মুখখানা। কত রক্ত-ঘামের, কত সাধনার ফল ছেলে তার। পড়ার খরচ চালাতে হিমসিম খেতে হয়েছে,রিক্সার মালিকের কাছে বারবার হাত পেতেছে। কস্টগুলো ক্রমে যেন ইতিহাস হয়ে গেছে।পরান বি.এ.পাশ করে আজ সরকারী স্কুলে মাস্টার হয়েছে।এখন পাড়ায় তাকে সুধইন্যা বলে খুব একটা কেউ ডাকেনা।মাস্টারের বাপ হবার গর্ব তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে সে। সন্ধ্যার পড়া ফেলে পার্টির ছেলেদের সাথে রাত পর্যন্ত আঠা পোস্টার নিয়ে যখনই বেরুত,খুব রাগ হত তার । কিন্তু ছেলে বুঝিয়েছে -- পার্টির কাজে যেতে হয় বাবা, নাহলে কথা কইবার জায়গা থাকেনা যে। সুধন মনে মনে ভাবে এই পার্টি বাড়িতে টিনের ঘর দিয়েছে,পাকা লেট্রিনের ব্যবস্থা করে দিয়েছে, এসব তো সত্যিই হয়েছে। তাই অকাট্য যুক্তি আর প্রমানের সামনে নিজের অপছন্দের কথা আর তুলে না,চুপ মেরে যায় সুধন।
          
             মাস কয়েক আগে ননীর চায়ের দোকানে সকালে চা খেতে খেতে শুনছিল,  নতুন সরকারী মাস্টারদের চাকরিগুলো থাকবে না আর, কিসের চাকরি নীতি নাকি মানা হয়নি তাই। নিরক্ষর সুধন এগিয়ে গিয়ে আরেকজনের ঘাড়ের উপর দিয়ে চোখ বুলাতে থাকে পত্রিকার পাতায়।কিছু বোধগম্য না হলেও সে নিষ্পলক তাকিয়েই থাকে পত্রিকাটার দিকে।এবার আট দশ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মোদ্দা ব্যাপারটা বুঝে নিতে চায়,এক অব্যক্ত আশংকায় গলাটা যেন শুকিয়ে আসছিল।
            চরম এক অস্থিরতার মধ্যেও একচক্কর বাড়ি যায়,মলিনার মাকে গিয়ে গোটা ঘটনাটাই বলেছে-,কিন্তু কথাটা পেড়ে তেমন পাত্তা পেলনা।

         পরান তার বন্ধু পাশের বাড়ির শেফালের কাছে প্রায়ই ফোন করে,আজো করেছে।আগেই বলে রেখেছিল তাই শেফাল ফোনটা এনে দেয় সুধনকে।চিন্তিত সুধন ত্রস্ত গলায় জিজ্ঞেস করে--কিরে,পত্রিকায় নাকি লিখেছে - তোদের চাকরিটা থাকবেনা ? ছেলে শাসিয়ে দেয়--সব বাজে কথা।দাদাদের সাথে কথা হয়েছে, সব গুজব,ফালতু কথা। ছেলের দাবড়ানিটা সুধনকে কিছুটা সাহসী করে,বুকে বল আসে তার।মানুষের আর খেয়েদেয়ে কোন কাজ নেই--পরের ভালটা কেউ দেখতেই পারেনা।মনে মনে বিড়বিড় করে কথাগুলো। সন্ধ্যাটা বেশ কিছুটা যুবতী হলে
             আবারও যায় চায়ের দোকানের পরিচিত আড্ডায়।এই আড্ডাটার একটা নেশা আছে,টানে খুব।বহু বছরের অভ্যাস। নিন্দামন্দ যেমন হয়,ভাল কথাও দু'চারটে শোনা যায়।প্রতি সন্ধ্যায় স্থানীয় বাংলা খবরটা সেই দাঙ্গার বছর থেকে এখানে শুনতেই হয় তাকে।আজো দিল্লির বাংলা খবরটা চলতে চলতেই এককাপ চায়ের কথা বলে। ননী হাতে চায়ের গরম কাঁচের কাপটা ধরিয়ে দিলে,স্থানীয় খবর শুরু হয়।প্রথমেই চাকরি যাবার খবরটা পড়া হচ্ছে। হাইকোর্ট শব্দটা বারকয়েক কানে আসে,বাকি কথাগুলো বিশেষ শুনতেই পায়নি,কিংবা শোনেনি সে।হাতে ধরা চা জুড়িয়ে জল।আজ দুপুরবেলাও ঠিকমত খেতে পারেনি।মাথাটা একটু ঝিমঝিম করছিল তার।পাঁচটা টাকা দিয়ে ঔষধের দোকানে প্রেশারটা মাপালে হয়। পরান বারবার করে বলে রেখেছে---মাঝে মধ্যে প্রেশারটা চেক করিয়ে নেবে। সবসময় অবশ্য ভালও লাগেনা।কিন্তু দু'একবার করিয়েছে।দোকানদার বলেছে সব ঠিকই আছে।প্রেশার মাপানোর মধ্যে এক অদ্ভুত ভালবাসা জড়িয়ে থাকে সুধনের।ছেলের কথা মত পাঁচটা টাকা নাহয় খরচই হল--তবু পরানের ভালবাসার হালকা চাপটা যেন টের পায় সে,প্রেশার মাপার যন্ত্রটার মোটা ফিতের চাপটা যেন অবিকল পরানের স্পর্শ।

           আজ এক জায়গায় বসে থাকতে ভাল লাগছেনা তার।একটা অস্থিরতা ভেতর থেকে কেবলই আনমনা করে দিচ্ছিল বারবার।হাঁটছে এদিক ওদিক।একটু যেন ঘেমেও উঠেছে, কুঞ্চিত কপাল জুড়ে বিন্দু বিন্দু অস্বস্তি। নিজের অজান্তেই হাটতে হাটতে কখন যে দীনেশ মাস্টারের বাড়ী পৌছে গেছে খেয়ালই করেনি।দীনেশ মাস্টার বড় ভাল মানুষ, দেশ বিদেশের অনেক খবরই রাখেন উনি।সুধনকেও ভালবাসেন নিজের মায়ের পেটের ভাইয়ের মত।এ বাড়িতে মুনিষের কাজে এলে দুপুরে ভাত না খায়িয়ে ছাড়েনই না। দীনেশ মাস্টার তাকে দেখেই বলতে লাগলেন--পরানের সাথে কথা হল কিছু? খবরটা শুনেই ওর কথা খুব মনে পড়ছিল। এবার হটাতই ধপাস করে ঠান্ডা পাকা মেঝেতে বসে পড়ে সুধন।হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করে।নিজের সাথে সারাদিনের নীরব যুদ্ধের পরাজিত সৈনিক এবার আর ধরে রাখতে পারেনা নিজেকে।ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে থাকে-- আমি হাইকোর্ট বুঝিনা,সরকার বুঝিনা,এ কেমন অন্যায় মাস্টার?? এ কেমন অন্যায়? আমার এখন কি হবে? ছেলেটার চাকরি গেলে...... বলেই কান্না আরো জোর পায়।সুধন আর কথা বলতেই পারছিলনা। দীনেশ মাস্টার মলিনার মৃত্যুর ঘটনা জানেন,তাই সুধনের অজানা ভয়ের কারণটাও ভালই বুঝেছেন।অভয়ের সুরে বলতে লাগলেন--দেখইনা সরকার কী করে? কিছু একটা করবেতো নিশ্চয়। পরানতো আর একা না,দশ হাজার জীবনের ব্যাপার। ভেবনা সব ঠিক হয়ে যাবে। আর পরান আমাদের খুব বুঝের ছেলে,ভেবোনা কিছু.....
                দীনেশ মাস্টারের কথাগুলো সুধনের ক্ষতে যেন কিছুটা প্রলেপের কাজ করে।তবুও মনের অস্থিরতাটা কিছুতেই কাটছেনা।

             সবে পুরসভার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এদিকটায় এখনো রাস্তায় আলো লাগেনি,বেশ অন্ধকার।সাবধানে লুঙ্গির খুঁটে হাত বুলিয়ে দেখে নেয়,বিড়ি,দেশলাই আর টাকা চল্লিশটা ঠিক আছে কিনা।বহুদিন সে হরিপদের বাড়ি যায়না।হরিপদের বাড়িতে এখন কম বয়সীদের নেশার আড্ডা। পরানের সন্মানের কথা ভেবে সুধন নেশা ছেড়েছে আজ অনেক কাল।তবুও আজ সাতপাঁচ ভেবে ঢুকে পড়ে,পেট পুড়ে দেশী মদ খায়,টলতে টলতে বাড়ী ফেরে।মলিনার মা প্রথমে কিছু না বুঝলেও, পুরানো উৎকট গন্ধটাকে চিনতে ভুল হয়না তার।মনে মনে ভাবে কত বছর বাদে আজ আবার নেশা করেছে।মলিনার মা কথা না বাড়িয়ে ভাত দেয়।ধীরে ধীরে সোহাগের গলায় বলে --আজ বুঝি প্রতাপের বাপের পাল্লায় পড়েছ? সুধন একথার কোন উওর না দিয়ে,নেশার সুরে বলে-- কাল থেকে আবার রিক্সায় যাব।মলিনার মা কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি।নেশার ঘোরে আগেও এমন উল্টোপাল্টা বকত,ভাবছিল আজও ঘোরেই বাজে বকছে। এবার সুধন ভাতের বড় একটা গ্রাস মুখে পুরে দিয়ে আবারও বলল--কাল ভোরে ডেকে দিও।সকাল সকাল না গেলে ভাল রিক্সা পাবনা। এরপরেও মলিনার মা কথাগুলো বিশ্বাস করেনি। সকালে ডাকতে হয়নি সুধনকে,নিজেই উঠে পড়ে।মুখ ধুয়ে বেড়িয়ে পড়ে রাস্তায়।চায়ের দোকানে প্রভাতী চায়ের আস্বাদ নিয়ে পুরানো রিক্সাওয়ালাদের সঙ্গ নেয়।মালিক পূর্বপরিচিত হওয়ার সুবাদে খুব বেশী কথা বলতে হয়নি,
             তিরিশ টাকা দিনে ভাড়া ফুরিয়ে একটা নতুন রিক্সা নিয়ে শহরমুখী হয় সুধন।অনেকদিনের অনভ্যস্ত পায়ের মাংসপেশিতে কিছুটা টান পড়ছিল ,তবু যেতে যে তাকে হবেই।জীবন যুদ্ধে স্থবিরতার আরেক নাম মৃত্যু।যুদ্ধ তার বাকি এখনো,তাই এই পথ তাকে চলতেই হবে।
              দুপুরবেলা হঠাৎই বি.এল.ও'র কিছু জরুরি কাজে কিছু না জানিয়েই বাড়ি ফিরে আসে পরান।বাবার খোঁজ করতেই মলিনার মা কাল রাতের সবকথাই ছেলেকে বলে। আবার সেই রিক্সায় গেল? -- বলে খানিক চুপ করে থাকে পরান। অপয়া ডিসেম্বরের সবে শুরু,আরো যে কী কী  দেখতে হবে কে জানে? কথাগুলো নিজের মনেই আওড়াতে আওড়াতে বাড়ির সামনেটায় গিয়ে দাঁড়ায় পরান।
         রাতে এত ঠান্ডা পড়ে অথচ এই দুপুরবেলার সূর্যের তাপে গা পুড়ে যায়।সবাই বলে টানের দিন,মাঠের তৃষার্ত গরু গুলোও মুখ তুলে আছে।এরই মধ্যে সুধন ফিরে আসে রিক্সা নিয়েই,বাপ ছেলের মুখোমুখি হয়, কিন্তু কেউ কিছুই বলে উঠতে পারেনি।কিছু অপ্রিয় কথা অনেক সময় মৌনী হয়ে বেশি জ্বালা দেয়।
           বাড়ির বাইরে রাখা রিক্সাটার কাছে যায় পরান। এর হাতল,চাকা,বেল, সব কিছুতে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে সে।এই রিক্সার কামাই খেয়েই সে আজ এত বড় হয়েছে, রিক্সাটাকে খুব ভাল লাগছে তার।ছোট বেলায় যেমন পরান রিক্সা চালিয়ে খেলা করত,ঠিক তেমনি আজো চালকের আসনে বসে জোরে একটা চাপ দেয়,রিক্সাটা চলতে শুরু করে,আবার চাপ দেয়,রিক্সাটা দৌড়াতে থাকে এবার,মরণ চাপতে থাকে প্যডাল।গতি বাড়তে থাকে ক্রমে,আরো জোরে... আরো জোরে আরও আরও আরও....রিক্সাটা .প্রচন্ড এক গতিলাভ করে ছুটতে থাকে.....।



শকুনের সাতকাহন....


(C)Image: ছবি

।। পার্থ ঘোষ।।


         ৮০'র দশকের কোন এক নিস্তরঙ্গ দুপুর।আপাত শান্ত বাংলার শিক্ষক, পঞ্চম শ্রেণির ক্লাশ নিচ্ছেন।খোলা জানালা দিয়ে দেখা যায় পথ। পথচলতি মানুষ, গরু,বেওয়ারিশ কুকুর একটু ছায়ার খোঁজে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। শিক্ষকের গম্ভীর গলা ভেসে আসে অনেকদূর। এবার সমীর বল...বলেই....

শিক্ষকঃ বল দেখি, শ - কু - ন.....শকুন
ছাত্রঃ হকুইন্
শিক্ষকঃ বল্ শকুন....
ছাত্রঃ স্যার হকুইন্
শিক্ষকঃ বল্ শকুন
ছাত্রঃ হকুইন্

শিক্ষকমশায় কিছুটা রেগে গিয়ে এবার ভেঙে ভেঙে, টেনে টেনে শান্ত ও ধীর লয়ে বললেন... বল শ......কু......ন।
ছাত্রটি ও ভেঙে ভেঙে,টেনে টেনে বলতে লাগল... হ.....কু........ইন্
এবার শিক্ষকের চোখ ক্রমশ লাল হয়ে উঠতে লাগল। কক্ ফাইটের মোরগের মত উনার ঝুঁটিও খাড়া হতে লাগল। ঈষৎ গলা চড়িয়ে বলতে লাগলেন.....শ....কুন,

ছাত্রটিও ততটাই জোরে, মাত্রা ও তীক্ষ্ণতা বজায় রেখে বলতে লাগল.... হ...কুইন্
অগত্যা শিক্ষকমশায় চেয়ার ছেড়ে হাতে বেত নিলেন। বল- শকুন ? ছাত্রটি তখনও অকাতরে "হকুইন্" ই বলে যাচ্ছে।সাঁই সাঁই শব্দে বেত্রাঘাত শুরু---- তবুও "হকুইন্ "আর "শকুন "হচ্ছেনা।শিক্ষকমশায়ের মেজাজও ততটাই তিরিক্ষে হয়ে যাচ্ছে-------- কি..?.হকুইন্ ??? বল.. শকুন !!

             তখনও হকুইন চলছে একনাগাড়ে। তিনখানা বেত ভেঙে খান খান। শিক্ষকমশায় ক্লান্ত হয়ে কিছুটা যেন হাঁপাচ্ছেন।ছাত্রের অবস্থা অনেকটা, বলির আগে ভেজা ছাগশিশুর মত।মারের জায়গা গুলোতে,নানা ভঙিমায় একেবেঁকে দ্রুত হাত বুলিয়ে যাচ্ছে।সে তখনো পর্যস্ত মার খাওয়ার যুতসই কারনই খুঁজে পাচ্ছিল না। শেষে শিক্ষকমশায় নাছোড় ছাত্রের কাছে একপ্রকার হার স্বীকার করেই যেন রণে ভঙ্গ দিলেন।
             তখনো স্কুলে মারধোর ছিল স্বীকৃত বিধান। শিশু মনোবিজ্ঞান উন্নতি করলেও,সেই গ্রাম্য স্কুলের চৌকাঠ পর্যন্ত তা এসে পৌঁছায়নি । ভিন দেশ থেকে আগত গোবেচারা মুখের সমীর পাল এমনিতেই গুটিয়ে থাকত। তেলচুকচুকে মাথায় যেন জ্যামিতি বাক্সের স্কেল দিয়ে সিঁথি টানা। শকুনের জন্য ওর সেদিনের মার খাওয়া আর তার কাঁচুমাচু রক্তিম মুখ আমি আজো ভুলতে পারিনা। সেই ছোট্টবেলাতেই বাড়ী ফেরার পথে রাস্তারধারে গোলহয়ে থাকা লম্বা গলার এই পাখিদের পাথর ছুঁড়ে মারার জন্য হাত নিশপিশ করত।সুযোগ পেলেই অব্যর্থ ছুঁড়তামও ঢিল । আজ আর এই সত্যিকারের শকুনকুলের দেখা পাইনা,অনেক বছর। জানিনা পাখিটি আজ লুপ্তপ্রায় না বিলুপ্ত!

           তবে শকুন নামক বিভৎস দর্শন পাখিটার সমস্ত গুণাবলী নিয়ে সেদিনের সমীর আজ বহাল তবিয়তে। পুঁথিগত বিদ্যার সাথে ছাড়াছাড়ি তার অষ্টম শ্রেণিতেই। কালের ও নিজের তাগিদে আমূল বদলেছে সে। ছিঁড়ে ও ছিনিয়ে খাওয়াটা বেশ রপ্ত করে নিয়েছে আজ। দামি গাড়িতে ইংরাজি স্কুলে যায় সন্তান। নিজের গলায় গরুবাঁধার দড়ির সাইজে সোনার মা'কালি মার্কা লকেট সহ মোটা চেইন।হাতে সিন্ধুসভ্যতার পুরুষের মত বালা। স্ত্রীর অলংকারের দাপটে পড়শি বউ-ঝি'দের মুখে টুঁ শব্দটিও নেই। দামি সিগারেট আর মদের দয়ায় ফি বছর চেকাপে চেন্নাই, আমেদাবাদ। ছোট বড় নানা কমিটির মোড়ল। নানা দলের দাদারা আসেন সামান্য নিমন্ত্রনে, বাড়ীর কালিপুজা মাতিয়ে দিতে। বছরে দুবার করে মেরেজ'ডে আর নানা আছিলায় জন্মদিন পালন।
            শুধু এই শকুন গোত্রীয়দের নিয়েই সমাজ নয় জানি,তবে এরাই সমাজের দিশা বদলায় আজ। সোসাল নেটওয়ার্ক তথা সামাজিক জালে আবদ্ধ সচেতন মানুষ হাতে গোনা। সখের গান,কবিতা আর সাহিত্যের আঙিনায় ভিনরূপী শকুনের আজ দৃপ্ত পদচারণা। জনপ্রতিনিধিদের অবর্তমানে, গুণীজন সংবর্ধনায় এরাই প্রধান বক্তা বা বিশেষ অতিথি। তাই কখনো কখনো ভাবি সেই সমীর আজ আমার লজ্জা না অহংকার !!! সব যুগেই এমন কিছু শ্রেণির চরিত্রেরা ছিল,থাকে, হয়তো থাকবেও। ভারতীয় উপমহাদেশের জলবায়ু বিশেষ ভাবে এই জাতীয় প্রাণীদের যোগ্য বাসস্থান, তাই এখানে এদের অবাধ বিচরণ ও বসবাস।
           কেবলমাত্র সমীর নয়,সমীর প্রতিনিধি মাত্র। যেকোন পেশাতেই আজ সমীরদের রমরমা দখল ।ছোট বড় ব্যবসায়ী থেকে অফিসের ছোট ও বড়বাবু,কেরানি, মাস্টার-বাস্তুকার বা ডাক্তার, কোথায় নেই এরা ? প্রাথর্না গৃহ গুলোতেও শকুনেরা বেঁধেছে বাসা আজ,ঈশ্বরের দরবারেও ছিঁড়ে ও ছিনিয়ে নেবার দাপুটে ভক্তির উৎপাত এদের। আমরা সহজেই মেনে নিই সব,সবকিছুই ।এই মেনে নেওয়াটার পোষাকী নাম রাখি "ভদ্রতা"। এমন ভদ্রদের সাথে তুলনাতে তৃতীয় লিঙ্গরাও অপমান বোধ করেন নির্ঘাত। অনেক পুরুষ থেকেও ওদের মর্দানি আমায় অবাক করে।
           বিশ্বাস করুন,আমার কাঁচা আলে কেউ পা দেয়নি নির্দিষ্ট করে কোনদিন । ঐ ভদ্রতার মোড়কে আছি ভালই,তৃতীয় লিঙ্গ সেজে। রসেবশের জীবন আমার। শাকপাতা খাই বলে মাছ মাংসের দাম জানিনা,তফাৎ মাত্র এইটুকুই । আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করবেন এমন উপায়ও যে নেই। সামনে দাঁড়ালে হুবহু আমাকেই দেখবেন,একান্ত নিজস্ব দর্পণে। কোন ব্যক্তি বিশেষের কুৎসা করার অভিলাষী নই আমি,কিংবা কোন রাজনৈতিক রং লাগাবার সামান্য ইচ্ছাটুকুও নেই আমার । বলছিলাম একটি শকুন জাতীয় জীবকুলের কথা,যারা যুগে যুগে বিদ্যমান। আর সেই ছোট্ট বেলা থেকেই আমার জাত শত্রু বলে যাদের দেখলেই ছুঁড়তে ইচ্ছা করে পাথর। অর্থ ও ক্ষমতার বলে এরা সমাজটাকে খোক্ লা করে অহর্নিশ। পতিব্রতা সধবার সর্বনাশ থেকে অসহায় বিধবার অনিচ্ছার সহবাসে এরা নিপুণ কারিগর। এক অদ্ভুত সহজাত বুদ্ধিতে ওরা অনায়াসেই রাজক্ষমতার কাছাকাছি থাকে, ব্যবহারও করে অনায়াসে । এদের আলাদা কোন দল বা জাত হয়না,এরা শকুনগোত্রীয়।
          সমাজের সজীব সত্যচিত্র তুলে না ধরে কবে কোথায় যথার্থ কাব্য আর যথার্থ সাহিত্য হয়েছে,আমি অন্তত জানিনা। চর্যাগীতিকাই হোক আর ময়মনসিংহের পালা, মধুকবির লেখাই হোক আর কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাবনা , সমাজ ও সমকাল এসেছে বারবার। মেকি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়ে কিছুদিন বাজার গরম করা গেলেও কালের বিচারে তার কীই বা মূল্য ? তবু আমি শুকনা ডালে দেখি প্রেম,রক্তশূন্য নারীর চোখে খুঁজে বেড়াই ভালবাসা। আমি ভাবের ঘরে চুরি করি,সভ্যতার ধ্বজায় লিখি নাম।
            আজ আমার একটা নিজস্ব ঝাঁকুনি চাই প্রবল, রিখটার স্কেলের সমস্ত রেকর্ড ছাপিয়ে হোক প্রচন্ড এক ভূকম্পন। শিরা উপশিরায় জ্বলে উঠুক আগ্নেয়গিরি,কিংবা সুনামি হোক কোন ভয়ানক । প্রলয়াঘাতে অন্তরাত্মা জেগে উঠুক আপন তাগিদে। প্রতিবাদের জন্য প্রতিবাদ হয়েছে অনেক। আজ পাড়ায় পাড়ায় জাগুক বিবেক। সত্যিকারের শকুন বিলুপ্ত না হয়ে বাঁচুক কোথাও,অন্য কোনখানে । এ শহর গ্রাম পাড়া মহল্লা হোক শকুন বিহীন। একটা আন্তরিক চেস্টা শুরু হোক নিজেদের শকুন দৃষ্টি আর শকুনি খিদের থেকে পরিত্রাণ দেবার ও পাওয়ার । অন্তত সমকাল ও ভাবিকালের প্রতি সুবিচার হবে কিছুটা।



বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৪

দেহাতীত
























।। সৌম্য শর্মা।।


 মেলা যখন ভাঙ্গবে তখন, খেলা যাবো ছেড়ে
          ইচ্ছে করে মুখ ফিরিয়ে  থাকবো তোমায় ভুলে
 ভিড়ের মাঝে মিলিয়ে যাবো, পথহারাদের দলে
          সকল খেলা মিটিয়ে নিয়ে থাকবো অনেক দূরে

 এমনি করে দিনে দিনে দিন যাবে যে চলে
          বেলা শেষে বারে বারে সূর্য যাবে ঢলে
 জানি তখন, আমায় তুমি রাখবে না আর মনে
          কোটি তারার মাঝে আমায় আর পাবে না চিনে

 স্মৃতির ঘরে নাইবা রবে, নাইবা পেলে মোরে
          বেলাশেষের শেষ খোয়াতে অতীতের তীরে
 হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোতে দেখো খোঁজে
          ছোট্টবেলার  ছোটোছুটি, কান্নাহাসি, খেলাধূলার মাঝে
 ফুলবাগানে, পুকুরপাড়ে  নয়তো নদীর ধারে
          চুপটি করে বসে দেখো, পাবে আমারে !!



মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৪

একটি দুর্লভ বইয়ের খোঁজে


।।পার্থ ঘোষ ।।

ক অদ্ভুত সময়ের জীবিত মানুষ আমি। আজকাল কবিতা,গান,গল্প,উপন্যাস আর মিনি স্কার্টের মত মিনি কবিতার আড়ালে ঢাকি যত লজ্জা, অপদার্থতা। কেউ কেউ জীবনকে উপভোগ করি, স্বাদ মাখা আঙুল চুষে চুষে। বাদ যায়না কিছুই। ভদ্রতার ঘোমটা ফেলে,ঘরে ঢুকেই হালকা বাহারি গ্লাসে ঢালি শিক্ষা,কাটা আপেলে চিবাই কালচার। নীল আলো জ্বালিয়ে দক্ষিনী ডাবিং ছবি কিংবা দেশীয় আর্টফ্লিম।তিন বছর ধরে টানা চলতে থাকা পারিবারিক সিরিয়ালে,ঘরের লক্ষী আজ ঝাগড়ার ক্লাশ করে । ৩৭৮ নাম্বার পর্বে,চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে তার। মূখ্য চরিত্রটি যেন গৃহিনীর আপন বোনঝি। পারিবারিক রাজনীতির খুঁটিনাটি শিক্ষা, থুড়ি !! নিখাত মনোরঞ্জন । নারীদের রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ খুবই জরুরি। 
         রান্নাঘরে পোড়া গন্ধ।পাশের ঘরে ভাবি রাষ্ট্রপতি হবার সম্ভাবনা নিয়ে লায়েক ছেলে,  হাতে দামি নোটস আর লেটেস্ট মোবাইল। বাদামি চুলে জেলি মেখে যে ছেলেটি স্টাইলের ঘুম ঘুমাবে সারারাত,স্বপ্নসুন্দরীরা ঘুমে এলেও যেন মুগ্ধ হয়।তাকে নিয়ে অযথা চিন্তার কিছু নেই,নচিকেতার জীবনমুখী গান শোনে।বৃদ্ধাশ্রমে, অবিকল গলা মেলায় সকাল বিকাল। ডাগর মেয়ে ব্যস্ততম শিক্ষকের বাড়ি পড়তে যাবে কাকভোরে, ফ্যসান শো'য়ের পোশাকে। কালচার্ড বাবা গর্বিত বাইক নিয়ে ছুটবে যেন অশ্বমেধের ঘোড়া।
        "হাম দো হামারা দো" স্লোগানের অঘোষিত অপমৃত্যু ঘটেছে প্রায় দেড়দশক আগেই।চিনের  রকমারি উপকরনের সাথে আপন করেছি চিনা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের নীতিকেও।গো-খাদ্য প্রিয় নেতার সন্তান বেশি থাকায়, সরকার আইন করতে না পারলেও, মধ্যবিত্ত সমাজভাবনাতে এক সন্তানের প্রকল্প জনপ্রিয়তা পেয়েছে।মামা-মাসির দিন শেষ, কাকা-জেঠা নামক শব্দগুলোর অর্থ বোঝাতে, আরো এক দশক পরে হয়তো অভিধানই লাগবে। পণপ্রথা বিরোধী পোস্টারে কাজ  হয়েছে।বরপক্ষের মিনমিনে আপত্তি থাকলেও কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা হাসিহাসি মুখে গ্যাসচালিত ঠান্ডা গাড়ি উপহার দেয়। ইংরাজি বলা আদুরী কন্যাই এখন
দাবি শিখেছে যে। নারী আপন অধিকার সচেতন হলে দেশ উন্নত হয়।কন্যা ভ্রুণ হত্যা কমেছে কিনা জানা নেই।স্ত্রী -পুরুষের আনুপাতিক হারের স্থিতাবস্থা নিশ্চিত হওয়া উচিৎ।
       হলুদ হাতের মা, ঠায় বসে মজলিশ জমায় প্রভাতী স্কুলের সামনে। আলাপী মুখে হালের সিরিয়াল,সিনেমা,অন্যের বরের অবৈধ প্রণয়,নতুন ফ্রিজের গু্ণগান,রেশনের চালের নিন্দা।নিজের পরিচিত স্বর্ণকারের সততা নিয়ে দস্তুর মত বাজি ধরেন।বান্ধবীর বুটিক ও বিউটি পার্লারের নিখুঁত বর্ণনা। শাড়ির চেয়ে চুড়িদারের উপকারিতার মোক্ষম কারণ বলার সাথেই আসে অনিবার্য ধর্মীয় গুরুর প্রসংগ,আগামী উপাসনার অগ্রীম নিমন্ত্রন।গত বিবাহবার্ষিকীর মেনুর লিস্ট। ননদের বিয়েতে স্বামীর আর্থিক গৌরবময়
অবদানের ফাঁকে শ্বাশুড়ির মতিভ্রষ্টতার অজুহাতে পৃথক হবার গল্প।সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে,সূর্য পূর্বদিকে উঠার মত সত্য কথন।
        ২৫ শে বৈশাখ আর ২৫ ডিসেম্বরে সমান গুরুত্ব দিই।ভাদ্রমাসে তালের পিঠা না খেলেও ডিসেম্বরে কেক আনতে ভুলিনা। বিয়ের তারিখে গন্ডগোল হলেও ভালেন্টাইন্স ডে ভুলিনা। খেঁজুরের রসে নাক সিঁটকালেও
ভদকায় আপত্তি করিনা।কলমির শাঁকে অরুচি হলেও বিদেশী হার্বাল প্রডাক্টসের খোঁজ রাখি।বিজ্ঞান সম্মত
খাওয়া ও ভদ্রলোকসুলভ উৎসব পালনে পারদর্শিতা অর্জন করেছি। পায়ে ছুঁয়ে প্রণাম করার বদলে, কোমর ব্যথার অজুহাত দিয়ে হাঁটু ছুঁই বড়দের।
        ইতিহাসের অধিকাংশ মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া আন্দোলনে মধ্যবিত্তের ভূমিকা অনস্বীকার্য। হয় শিল্প-
সাহিত্যে কিংবা পতাকা হাতে।এই মধ্যবিত্তের গুণগানের ফাঁকে দারিদ্র্যসীমার নীচের কথা আজো চাপা পড়ে যায়।যদিও রিক্সাশ্রমিকের ছেলে ব্রেন্ডড জিন্স প্রেমিকার হাত ধরে সারারাত পূজা দেখে। সমাজের উঁচুনিচু ভেদাভেদ ঘুচলেই মঙ্গল।
       এই ডামাডোলের মাঝেই ভাগ্যক্রমে একদিন জীবনের মানে শিখতে গিয়েছিলাম তেলবিহীন রুক্ষ মাথার এক বৃদ্ধের কাছে। গুরু বলে প্রণাম করেছি তাঁর কাঁদা মাখানো কর্কশ পায়ের পাতায়। জমিতে কাজ করতে করতে যিনি বলেছেন পাপ কী,পূণ্য কী। অভুক্ত মুখে তেঁতো বিড়ির কষ গিলতে গিলতে শিখিয়েছন মানবিকতার সর্বশেষ সংজ্ঞা । ধর্ম অধর্মের অতি সূক্ষ্ম তফাৎ বলেছেন অনায়াসে।যুক্তিবাদের মুখে ঝামা ঘসে দিয়ে,নীতি শিক্ষার কথা বলেছেন। "ফেইসবুক স্টেটাস " শব্দটাকে না জানলেও অনায়াসেই মানব
সভ্যতা,বাঙালি কৃষ্টির স্টেটাসের দিশা বদলের কথা শোনালেন। খড়ি উঠা শীর্ণহাতে মাথায় আশীর্বাদ  করে বললেন,...."ওহে তথাকথিত শিক্ষিত বাঙালির দল,তোমরা আগে কিছুদিন ' অ আ ক খ 'শেখ। বাল্যশিক্ষা বইয়ের শিক্ষায় শিক্ষিত কর নিজেদের। " বাজার ঘুরে আজ সারাদিন আমি "বাল্যশিক্ষা"বই খুঁজছি। "লিটিল লিটিল টুইংকেল স্টারের" ভিড়ে বইটি পাওয়া যাচ্ছেনা,কেউ পেলে দয়াকরে একটু জানাবেন। বয়সে বড়
হলে নির্ঘাত পায়ের পাতা ছুঁয়েই প্রণাম করব।





সময়


(C)Image:ছবি
















।। সৌম্য শর্মা।।



ফিকে ঘাসে মোড়া অসমান জমির উপর
এক প্রাণ কথা  আর এক বুক  আকাশ নিয়ে
দুটি হৃদয়, পাশাপাশি  পরস্পর…

দূরে দেবালয় থেকে আসা হালকা আলো
মেঘের ফাঁকে  উকি দেওয়া  মরা চাঁদ
আকাশে তারার ঝাড়বাতি;
আবছা আলোয়  কেমন এক বিচিত্র  অনুভূতি
তীব্র নেশায়  যেন ঘোর লাগা

একজন কিছু বলবে বোধহয় নির্জনতায়
আরজন, তিনটি শব্দ শোনার অপেক্ষায়

তবু, দুজনের অন্যমনষ্কতায়
গাভীন সময় ঝাঁপ  দেয় , বিষন্নতায়
জীবনের গহীন স্রোতে…





সোমবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৪

ভাবীকালের মা


 
(সৌজন্য 'রবিবারের বৈঠক, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৪)
 বাঁখারির বেড়ার ফাঁক দিয়ে দিনের প্রথম আলো চোখ ছুঁতেই সাড় পেয়ে গেল কুসুম। বহু বছরের নিয়মে অভ্যস্ত শরীর চোখ মেলে তাকাতে চাইলেও মাথা ও বুদ্ধি কাজ করছিল না ঠিকমত। আচ্ছন্নভাব ছেয়ে ছিল সমস্ত দেহে...মনেও। একটা তীব্র একটানা গোঁ গোঁ শব্দ ঘুরপাক খাচ্ছিল মাথার ভেতর,কিন্তু তার উৎস  ঠাহর করে উঠতে পারছিল না সে। আরও কিছু সময় নিশ্চল হয়ে বয়ে যেতে দেয় সে। সূর্য্যালোকে রাতের আঁধার কেটে যাবার মত চেতনের বিভায় ক্রমশঃ একটু একটু করে সজাগ হচ্ছিল তার বোধ ও বুদ্ধি। তাদের ইঁটভাটার বস্তি পেছনে ফেলে আধ ঘন্টার রাস্তা এগিয়ে গেলেই উড়োজাহাজের স্টেশন...জানে সে এবং বুঝতে পারে যে শব্দটা ওখান থেকেই আসছে।দিনের প্রথম বিমান আকাশে ভাসল চারদিকে শব্দ ভাসিয়ে ।অনেক চেষ্টায় ভারী হয়ে থাকা চোখের পাতা অল্প ফাঁক করল কুসুম...বিছানায় শিবনাথ নেই...কোথায় গেল? ইঁটভাটায় কাজে গেল কি? কিন্তু কই? আজ তো ইঁটভাটার বাঁশি শুনতে পায় নি কুসুম...দিনের প্রথম উড়োজাহাজ ছাড়ার আগেই তো রোজ সেই বাঁশি বাজে আর কুসুম ঘুম ভেঙ্গে উঠে পড়ে।আজ কি হল? হঠাৎ বিদ্দ্যুচমকের মত তার মনে হল আজ ইংরাজী মাসের ছাব্বিশ তারিখ, কি যেন একটা উৎসব আছে আজ...তার কাজের বাড়ির বৌদি বলছিল...কি যেন একটা দিবস...মনে করতে পারল না কুসুম...শুধু মনে পড়ল যে আজ ছুটি....ইঁটভাটায় আজ কাজ হবে না...তাই সকালে বাঁশি বাজেনি। তাহলে কোথায় গেল শিবনাথ? উঠে বসতে গেল কুসুম...পারল না। সমস্ত শরীরে ব্যথাবোধ। শিবনাথের হাতে মার খাওয়া তার নতুন নয়...কিন্তু গতকাল যেন খুন চেপে গিয়েছিল শিবনাথের ...কুসুমের শরীরের এক ইঞ্চি জায়গাও খুঁজে পাওয়া যাবে না...যেখানে শিবনাথের থাবা আক্রমণ করেনি। অথচ সকালে চোখ মেলেই সেই শিবনাথের জন্যই উৎকণ্ঠ হল সে।
            মূল শহর ছাড়িয়ে বাস রাস্তা ধরে ঘণ্টা দেড়েক গেলে এক বিশাল দীঘি। এককালে বেশ পরিস্কার জল ছিল দীঘিতে...আর প্রচুর মাছ।সারা দিন  দীঘির জোলো বাতাস ঠাণ্ডা করে রাখত আশে পাশের মাটিকে। সে মাটিতেই কুসুমদের মত কিছু পরিবার বাসা বেঁধেছিল ।সে পরিবার গুলোর হয়ত বা তেমন কোন বংশ কৌলীন্য ছিল না... ছিল না শিক্ষা সংস্কৃতির  সুযোগ। নিজেদের অধিকার প্রাপ্য ইত্যাদি বিষয়েও তাদের উদাসীনতা ছিল...আসলে অধিকার সাব্যস্ত করার পথ, মত ও কলাকৌশল তাদের আয়ত্বের বাইরে ছিল। তাদের সাধারণ জীবন কেটে যাচ্ছিল সাধারণ মাপের সুখ দুঃখ নিয়ে। জন্ম মৃত্যু বিবাহ ছাড়া আর তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা বা উৎসবের সুযোগ তাদের জীবনে ছিল না...কিন্তু স্বপ্ন ছিল কিছু কিছু...বেঁচে থাকার স্বপ্ন...হাইওয়ের পাশে থরে থরে দাঁড়িয়ে থাকা বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড গুলো সেই স্বপ্নে মায়াবী রঙ লাগিয়ে যেত প্রায় সময়ে।
            কাজলকালো চোখে এমনই কিছু স্বপ্নমায়া জড়িয়ে একদিন শিবনাথের বৌ হয়ে তার ঘরে এসেছিল কুসুম। কালো অথচ দোহারা চেহারার শিবনাথকে বেশ মনে ধরেছিল তার...।দুজনের ভাব জমতেও বেশি দেরি হয়নি।শিবনাথ টুকটাক বেতের কাজ জানতো.. বাড়ীতে বসেই এটাসেটা  বানাতো আর সপ্তাহে সপ্তাহে শহরে ফেরি করে আসতো সেসব। আবার কোন কোন দিন সারা দুপুর বিকেল দীঘিতে মাছ মারত।কিছু মাছ দিয়ে রাত্তিরে ঝাল রাঁধত কুসুম... বেশির ভাগটাই পরের দিন হাটে বেচে দিত শিবনাথ।আর হাটের থেকে ফেরার পথে কুসুমের জন্য নিয়ে আসতো কাঁচের চুড়ি...যে চুড়ির কিছু কিছু সে নিজেই আবার ভাঙত রাতের বিছানায়...কুসুমকে সোহাগ করতে করতে।
            নতুন বিয়ের নেশা ও আড় ভাঙ্গার পর কুসুম একদিন ধরে পড়েছিল শিবনাথকে...সঙ্গিনী স্বপ্না ও কৃষ্ণার মত সেও  শহরে যাবে...বাবুদের বাড়ীর ঘরকন্নার কাজ করবে। শিবনাথ কোন মতেই রাজী হয়নি। কুসুম অনেক বুঝিয়েছিল...মান করেছিল, চোখের জলও ফেলেছিল। কিন্তু শিবনাথের সেই এক গোঁ। ঘরের বউকে পরের কাজ করতে দেবে না। কুসুম তবুও আশায় আশায় ছিল...কিন্তু সেই যে একদিন কাকডাকা ভোরে  ঘরের পেছনে গাছে ঝুলতে থাকা স্বপ্নার প্রাণহীন দেহটা উদ্ধার করা হল এবং কৃষ্ণার কাছ থেকে সে জানতে পারল যে কাজের বাড়ীর দাদাবাবুটির বদান্যতায় স্বপ্নার “পেটহয়ে গিয়েছিল বলেই..., সেদিনই শিউরে উঠেছিল কুসুম, আর মনে মনে ভগবানকে শতকোটি প্রণাম জানিয়েছিল...শিবনাথকেও।
            সেদিন দুপুরে ভাত খাওয়ার পর নিজের কাজ নিয়ে ঘরের দাওয়ায় বসেছিল শিবনাথ। কুসুম ঘরের ভেতর বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছিল। কদিন ধরেই শরীরে কেমন যেন অসোয়াস্তি ভাব।খাবার খেলেই গা-পেট সব গুলিয়ে আসে।গত দুমাস ধরে ‘মাসের কাপড়’ ও লাগেনি তার। তবে কি...? শিবনাথকে দুদিন ধরেই বলবে বলবে করছে কুসুম, কিন্তু সেই যে গত পরশু শহরে গিয়েছিল শিবনাথ, তারপর থেকে সমস্ত দিন কেমন অন্যমনস্ক হয়ে আছে, মেজাজও ঠিক নেই। কিছু বলতে গেলেই মুখ করছে। থাক রাতের বিছানায় বলবে এখন...কুসুম একটু চোখ বুজে জিরোতে চেষ্টা করে। হঠাৎ তুমুল শোরগোল এ বিছানা ছেড়ে উঠে বসে সে।দ্রুত পায়ে বাইরে আসে...হে ভগবান এ কি...একটা লোহার চাকা লাগানো বিশাল দৈত্য একধার থেকে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিতে থাকে তাদের এতদিনকার বসবাসের ঘর-দুয়ার, গৃহস্থালি । কিছু বুঝে উঠতে পারে না কুসুম...ঘোর লাগা চোখে দেখতে থাকে শিবনাথ প্রাণপণ চেষ্টায় তাদের আপাতসামান্য অথচ অসামান্য সংসারের টুকরো গুলিকে সেই লৌহ দানবের থাবা থেকে বাঁচানোর বৃথা চেষ্টা করে চলেছে।
            সন্ধ্যাবেলায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসে শিবনাথ যখন অসংলগ্ন কথা বলতে থাকে, কুসুম বুঝতে পারে, দুদিন আগেই শহরে গিয়ে এ সর্বনাশের ইঙ্গিত পেয়েছিল তার স্বামী। কিন্তু এত দ্রুত যে তা ঘটবে,সেটা বুঝে উঠতে পারেনি। ছোট ছোট মানুষদের ছোট ছোট আশা-আকাংখা গুঁড়িয়ে দিয়ে বড়বড় মানুষদের দামী দামী জিনিস-পত্তর কেনাবেচার দোকান হবে সেখানে।
            রাত পোহালেই অবশিষ্ট সংসারকে একটা বাক্সে পুরে শিবনাথের পিছু পিছু বেরিয়ে পড়েছিল কুসুম।শিবনাথের এক পরিচিত মানুষের সাহায্যে এই ইঁটভাটার বস্তির খোঁজ পেয়ে সেখানেই নতুন করে ঘরকন্না সাজিয়েছিল তারা।ইঁটভাটায় একটা কাজ ও জুটিয়ে নিয়েছিল  শিবনাথ। কিন্তু যত কুসুমের শরীরে গর্ভ চিহ্ন স্পষ্ট হতে থাকে, ততই যেন একটু একটু করে বদলে যেতে থাকে শিবনাথ।যে দুটি হাত মনের ভালবাসা দিয়ে নমনীয় বেতের কমনীয় জিনিস বানাত, আগুনে ঝলসান ইঁট বানাতে বানাতে তারাও যেন ক্রমশঃ দানবীয় হয়ে ওঠে।কুসুম বুঝতে পারছিল, ইঁটভাটার চুল্লিতে শুধু ইঁটই পোড়ে না...প্রতিদিন ঝলসে যায় তার স্বামীর মন ও আত্মা। কিন্তু নিরূপায় সে কি করবে বুঝে উঠতে পারছিল  না। সন্ধ্যের পর নেশা করতেও শুরু করেছিল শিবনাথ।প্রথম প্রথম কুসুম বাধা দিতে চেষ্টা করেছিল , কিন্তু একদিন অশ্রাব্য গালিগালাজ করে তার চুলের মুঠি ধরে ঠেলে ফেলে  দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল শিবনাথ। আর এখন তো নেশার ঘোরে মাঝে মাঝে দিন রাতের ভেদ করে উঠতে পারে না সে।
            এরকম পরিস্থিতিতেই এক দিন ও সন্ধ্যার মিলন লগ্নে কুসুমের কোলে আসে পাতা। কুসুম ভেবেছিল হয়তো বা মেয়ের মুখ বাবাকে বদলে দেবে...কিন্তু না। দিনে দিনে শুধু কুসুম নয়, মেয়েও যেন অসহ্য হয়ে  ওঠে শিবনাথের কাছে। আর তারপর একদিন...মেয়ে কোলে কুসুম কে বেড়িয়ে পড়তে হয় বাবুদের বাড়ীতে কাজের খোঁজে...সেইসব বাবুদের,যাদের শখ মেটানর জিনিষের দোকান গড়ে উঠেছে তাদেরই একান্ত বাসভুমিটিতে।আর সেইদিন শিবনাথও  আর এগিয়ে আসে না ঘরের বউকে পরের বাড়ির কাজের বউ হওয়া থেকে আটকাতে।
            আর তারপর বহু ঋতু পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে থাকে কুসুমদের বস্তি।কিন্তু কুসুমের রোজকার জীবন কোন পরিবর্তন দেখে না। ভোররাত থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত প্রতি পল অনুপল শুধু নিজেকে নিঃশেষে বিলিয়ে দেওয়ার পালা। তার মধ্যেই হঠাৎ একদিন চমকে গিয়ে দেখে কুসুম তার ছোট্ট পাতা কখন যেন শৈশব ও কৈশোরকে বিদায় জানিয়ে যৌবনকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে ।পাতা কিন্তু মেনে নেয় না শিবনাথের অনাচার। প্রায়ই বিদ্রোহ করে ,রুখে দাঁড়াতে চায় জন্মদাতার বিরুদ্ধে আর সেইসব সময়ে আরও কঠিন ও দুঃসহ হয়ে ওঠে কুসুমের বেঁচে থাকার প্রয়াস।
       গতকাল কুসুমের কাজের বাড়ি থেকে ফিরতে দেরি হয়েছিল।ফেরার পথে কিছু কেনাকাটা ছিল। সেসব  সেরে সে ঘরে ফেরার আগেই শিবনাথ ঘরে এসে পাতার কাছে ভাত চেয়েছিল...পাতা দেয়নি মানে দিতে পারেনি, কুসুম ফিরলে তবে রান্না হবে...বাড়িতে সব কিছুই বাড়ন্ত। সে কথাটাই পাতা শিবনাথকে বলেছিল।শিবনাথ প্রচন্ড মেজাজ দেখিয়ে গালি গালাজ সুরু করলে পাতাও আর ধৈর্য রাখতে পারেনি, সেও বাপকে  যা নয় তাই বলে কথা শোনাতে থাকে। ঠিক সেই মুহূর্তেই এক শরীর ক্লান্তি, এক পেট খিদে আর এক ব্যাগ বাজার টেনে নিয়ে ঘরে ঢুকেছিল কুসুম...ব্যস...শিবনাথ আর দেরি করে নি...হিংস্র শ্বাপদের মত ঝাঁপিয়ে পড়েছিল কুসুমের উপর...যে ভাবে ইচ্ছে,যেমন ভাবে ইচ্ছে বেধড়ক, এলোপাথারি মেরেছিল কুসুমকে...যতক্ষন না কুসুম জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। পাতা বাধা দিতে এলে মেয়েকেও দু লাথি মেরে অন্ধকারে বেরিয়ে গিয়েছিল।......
            ধীরে ধীরে ঘুমের কুয়াশা থেকে বেরিয়ে আসে কুসুম। অনেক চেষ্টায় গলা দিয়ে ক্ষীণ শব্দ বের করে মেয়েকে ডাকে। বিরক্তি ও বিতৃষ্ণা নিয়ে পাতা সামনে এসে দাঁড়ায়।
-কি বলবে বল?
দুর্বল হাতে মেয়ের হাত চেপে ধরে কুসুম।।চোখ দিয়ে জল গড়ায়...
-আবার কাঁদছ কেন? পাতা ফুঁসে ওঠে...খালি মার খেতে আর কাঁদতে জান, উল্টে মারতে পারনা?
-ওরকম বলিস না পাতা...
-কেন বলব না?মেয়ে-বউকে খাওয়ানোর মুরোদ নেই,আবার মারতে আসে...?ওরকম হাত ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিলে তবে ঠিক হয়...।
-কিন্তু যন্ত্রণাও যে পায় সেটা বুঝতে পারিস না?
-যন্ত্রণা?
-হ্যাঁ পাতা...আমি তো জানি... মানুষটাতো এরকম ছিল না। একমুহুর্তে বিনা দোষে যদি কেউ সর্বস্বান্ত হয় তাহলে সে কি ভীষণ যন্ত্রণা পায় বুঝিস না?
-তাই বলে তুমি কিছু বলবে না?
- আমি পারি নারে পাতা...তোর বাবা যখন আমাকে মারে আমারও খুব যন্ত্রণা হয়...কিন্তু আমি যখন সে সময় ওর চোখের দিকে তাকাই, সেখানে রাগ বা হিংসা দেখতে পাইনা রে পাতা...সেখানে শুধু অসহায় যন্ত্রণা...।আমি কেন কিছু বলি না জানিস...এখন তো তবু মানুষটা আমার কাছে তোর কাছে এসেই ভাত চায়, এখনও আমাদেরকে নিয়েই বাঁচতে চায়...কিছু বললে যদি আমাদের ছেড়ে চিরদিনের মত চলে যায়,সে আমি সইতে পারব নারে পাতা...আর সবাই অবুঝ হলে যে ভগবানের সৃষ্টি থেমে যাবে...।
            কুসুমের চোখ ভেঙ্গে নেমে আসা অঝোর ধারাকে পাতা দু হাতে মুছিয়ে দিতে থাকে।
            সেই সময়েই দূরে কোথাও ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি সহযোগে গণতন্ত্র দিবসের  ত্রিবর্ণ পতাকা আকাশের নীলে মুখ তুলে তাকায়...ইঁটভাটার বাঁখারি ঘেরা বস্তি ঘরে তার কোন ব্যঞ্জনা হয়তো বা পৌঁছায় না... সেখানে তখন সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ মর্মে ,সমস্ত সৃষ্টির রক্ষাকল্পে যাবতীয় দিনযাপনজড়িত গ্লানি ও যন্ত্রণা আত্মস্থ করে বেঁচে থাকার এবং বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় নিবিড় হতে থাকে দুই মানবী মা—একজন বর্তমানের মা, অন্যজন ভাবীকালের...।