.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

বৃহস্পতিবার, ৩১ মার্চ, ২০১৬

বসন্ত ধুলো ....বাইশ

।। চিরশ্রী দেবনাথ ।।


(C)Image:ছবি











হোলি শেষ হয়ে যাবার পর
 কিছু রঙ্ লেগে থাকে নদী খাতে
সাবান গলে  গলে  লাল কালো তরল পাথর কুচি
তারাই সেইসব মিথ্যেজল, আসমানী অভিমান
যাদের কাজ শুধু বছর বছর রঙ্ বয়ে আনা .....



কালান্তরের কন্যারা


।। সুনীতি দেবনাথ।।














সে তো বহুকাল আগে
বিরহী শাপগ্রস্ত যক্ষ প্রিয়তমাকে
মেঘদূতের হাতে পাঠায় প্রেমপত্র,
পৌঁছেনি পত্র তবু চিরন্তন হয়ে
আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বিরহী অন্তরে
মাতন তুলেই যায়।
যক্ষ আর যক্ষপ্রিয়া শাশ্বতের ঘরে
চিরায়ত বিরহী যুগল স্থানু হয়ে আছে।
সুনীলবাবু তোমার নীরার কথা বলছি --
বহুদিন বাঙালি যুবক নীরাকে দিয়েছে  প্রেমাঞ্জলি
আর বাংলার যুবতীরা মনে মনে নিজেকে নীরা ভেবে 
চমকে এদিক ওদিক তাকিয়ে হয়েছে লাজুক।
আজ তুমি অতীতের প্রান্তরে অতিকায় ক্যানভাসে
বর্ণিল প্রস্তরখণ্ডে খোদাই করা আকাশ ছোঁয়া প্রতিমূর্তি!
বিস্ময়ে মাথা উঁচু করে দেখে সেই সময়ের তোমাকে
আজকের নিরিখে বহুমাত্রিক অতিমানব মনে হয়।
তোমার যৌবনবতী গহীনা নীরা বহু পথ হেঁটে
আজো কোন রহস্য ছুঁয়ে রোমাঞ্চে উষ্ণতা ছড়ায়,
উঁচু পর্বত শিখরবাসিনী চর্যাপদের শবর বালিকা
চুলে গুঁজে ময়ূরপাখ গুঞ্জামালা গলায় নিরবধি
কালের প্রাঙ্গণে যেমন করে রহস্যে ঘোরপাঁক খায়।
নাটোরের বনলতা সেন এখনো বেতের ফলের মত
শান্ত চোখে চেয়ে কাকে যেন বলে, এতদিন কোথায় ছিলেন?
ফুল্লরার বারমাস্যা বেহুলার ভেলা লহনা খুল্লনা
গীতিকার মহুয়া মলুয়া আরো সব যুবতী কন্যা
আজো যেন সুখ দুঃখ হাসি কান্না প্রেম নিয়ে
বাংলার চিরন্তনী নারীরা সব আম কাঁঠাল শেওড়ার ছায়ায়
ছায়া ছায়া মায়াবী বৃত্তে লঘু ছন্দে ধ্রুপদী ঝংকারে 
হেলেদোলে হেসেখেলে প্রেমে অপ্রেমে ভাসে শুধু।
সেই সব মধুরা কন্যারা এপারে ওপারে সেপারে
কোনো পারে আজ আর নেই, পাবে না খোঁজে কোনদিন।
বেদরদী এই কালে সেসব কন্যাদের মত যাপনের রীতি নীতি নেই,
দ্রৌপদীর বস্ত্র আর কোন সংবেদী সখা বাড়ানোরও নেই
দুঃশাসনেদের সংখ্যা গেছে বেড়ে পথে ঘাটে ঘরে।
আজকের কন্যারা রক্তাভ আকাশতলে প্রতিবাদী মিছিলে হাটে,
স্লোগানে স্লোগানে আত্মার বিদ্রোহ ঘোষণা করে,
রক্ত তাদের আলপনা আঁকে প্রকাশ্যে রাজপথে।
ইট পাথর ভাঙ্গে, কলে কারখানায় স্বল্প মূল্যে খিদমত খাটে,
তবু সন্তানের অনন্ত ক্ষুধা, যাপনের নিষ্ঠুর  গ্লানি
সারাদিন সারারাত সারাটি সময় দংশন করে শুধু।
গ্রামে গঞ্জে আরো সব পুঁতিগন্ধময় নিরক্ত জীবন
কান্না ভুলে জেনে গেছে এমনি হয়, এর নাম বেঁচে থাকা।
ভিন্ন চিত্রে বহুতলের খাঁচায় বন্দি সোনার ময়নারা
অদৃশ্য শেকলের জ্বালায় জ্বলে ছটফট করে,
স্ট্যাটাস বাঁচাতে  স্বদেশী দেহে বিদেশী পোশাক
হাই স্পিডে ড্রাইভ ঝাঁ চকচকে শপিং মল স্যুইমিং পোল
সুরা হাতে সাকি অন্তঃসারশূন্য আমদানির ভিন্নতর
জীবনালেখ্য!
আল্ট্রা কনট্রাস্টের বিকট পাঞ্চিং একুশের প্রগতি!
স্বপ্নের কন্যারা হারিয়ে যায় প্রেম কাঁদে নীরবে নিভৃতে। 
দেখছি শুনছি ভাবছি
ক্রোধ আমার চিৎকার করে আকাশ ফাটিয়ে বলতে চায়
হেই, হচ্ছেটা কি? থামাও এসব,
উপর নিচের সব জঞ্জাল ঝেঁটিয়ে বিদেয় করো।
সমান তালে একসাথে মেলাও পা, বাঁচার জন্য জোরসে চলো!  

© সুনীতি দেবনাথ।




ইদানিং

।। সুনীতি দেবনাথ।।

 
(C)Image:ছবি














দানিং কবিতা নিয়ে ঝুটঝামেলায়
হাসবো না কাঁদবো ভেবে পাইনা মোটেই
ইদানিং কবিতার ভাবনায় দেহ মন নষ্ট
এতো সংকীর্ণ চলাচল
অজান্তে বিক্রিবাট্টা
বসতভিটে লাউমাঁচা তুলসীতলা
অন্দরের বৌ ঝিদের একান্ত পুকুরঘাট
মেয়েলি শরীর জননী জায়া ভগ্নি কন্যার।
ইদানীং অস্তিত্বের লড়াইয়েও
কবি কবিতার বিক্রিবাট্টা।
শঙ্খ ঘোষ সিনা উঁচিয়ে চলার 
মন্ত্রগুপ্তি শিখিয়েছেন এই সেদিনও
তাকিয়ে আছি আপনার দিকে
কী বলবেন আপনি বলে ফেলুন
সৎ আর সিদ্ধ কবি কি বিক্রি হতে পারেন
আপাত সন্ধির শর্তে মুচলেকা কবি দেবেন.?
ইদানীং আমার হৃদপিণ্ডের শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াকলাপে
বিঘ্ন কিছুটা ঘটছেই, বিশুদ্ধ অবিশুদ্ধ রক্ত  অনুপাতে বেমিল।
সারি সারি লাশেরা অন্তহীন রক্তের ঘূর্ণিস্রোতে
আছাড়ি পিছাড়ি খায়, আগুন জ্বলে শহর বস্তি গ্রামে
এতো রক্ত, এতো বিনষ্ট প্রাণ, এতো ধর্ষিতার দৃষ্টির ঘৃণা!
এখন আমি ইনসোমনিয়ার শিকার,
সারাটা রাত অন্ধকার কালো রাত
চোখ বুজলে রক্ত আগুন ঘৃণা ক্ষুধা পাশবিকতার রাত
এই আমার নষ্ট স্বদেশে তবু
বিশুদ্ধ স্বপ্নের কচি চারা পুঁতে যাবো
এসব কথার কথা বা খাঁটি বাতেল্লাবাজি
ভাবার কারণ নেই, ইদানীং আমি দুঃসাহসী।
কাজরী,
২০ মার্চ, ২০১৬
© সুনীতি দেবনাথ




প্রজন্ম

(C)Image:ছবি

 

















 ।। সুনীতি দেবনাথ।।


উক্যালিপটাসের সরু দীঘল পাতা পিছলে
সকালের চৈতী রোদ্দুর ছলকে ঝাঁপিয়ে পড়লো
টংঘরের দুয়ারে চিত্রার্পিত ধনবতী রিয়াংএর পেটে।
চার চারটে সুদীর্ঘ দিন রাত নৌকো বেয়ে পার হলো
ফেরেনি মরদ চাল নিয়ে উপরের লুসাই বস্তি থেকে,
পেটে জ্বলছে ধনবতীর জুমের আগুন ধিকিধিকি
সারাদিন সারারাত দমকে দমকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে,
আরেক বিপন্ন নবীন অস্তিত্ব হাত পায়ের সঞ্চালনে
ঘোষণা করেই চলেছে বেরোতে চাই আলোকে
মোচড়ে মোচড়ে কঁকিয়ে উঠছে নারী বিস্ফারিত চোখ।
তারপর সূর্য যখন প্রখর উত্তপ্ত মাথার উপর
আদিম জননীর মত ধনবতী রক্তস্রোতে ভাসিয়ে
রক্তাক্ত আবহে একটি শিশু উপহার দিলো
আগামী পৃথিবীর প্রবাহিত জনতার স্রোতে,
কান্নার উতরোলে সে তার আবির্ভাব ঘোষণা করলো,
তার কান্নার চমকে তপ্ত চৈতালি সূর্য উঁকি দিল
সামনের রক্তিম পলাশ উঁকি দিল.প্রসবের রক্তিম
স্রোতে নিস্পন্দ নিষ্প্রাণ জননীর পাশে দেখা গেল
আগামীর রক্তাক্ত ইতিহাস জেহাদে ক্রন্দনে আকুল,
বিষাদে মুখ ফেরালো সূর্য ঝরলো পলাশ গুচ্ছ ।
কাজরী,
৯ মার্চ, ২০১৬