.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

মঙ্গলবার, ১৬ আগস্ট, ২০১৬

যত কাণ্ড গণিত নিয়ে (চতুর্থ পর্ব)


 ।। রজত কান্তি দাস।।
নন-ইউক্লিডিয়ান জিওমেট্রির আবিষ্কার
(জেনোস বলিয়াই)
জেনোস বলিয়াই (Janos Bolyai) ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি তাঁর বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ইউক্লিডের পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতে থাকেন। দীর্ঘদিনের অক্লান্ত গবেষণার পর শেষ পর্যন্ত জেনোস এই সমস্যাটির সমাধান করে ফেলেন যা আজ স্বীকৃত। ১৮২৩ সালের ৩ নভেম্বর তারিখে বর্তমান রুমানিয়ার একটি শহর থেকে তাঁর বাবাকে চিঠি লিখে জানান যে তিনি ইউক্লিডের পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধের সমস্যার সমাধান করে ফেলেছেন। তিনি প্রমাণ করেন এই স্বতঃসিদ্ধটি সম্পূর্ণ সত্য নয়। এর মধ্যে গলদ আছে। ইউক্লিডের পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধকে নস্যাৎ করে দিয়ে তিনি যে নতুন ধরণের এক জ্যামিতির জন্ম দিয়েছিলেন তাই নন-ইউক্লিডিয়ান জিওমেট্রি নামে খ্যাত।
 
            প্রসঙ্গত বলে নেই রবীন্দ্রনাথের পরিবারেও এই গণিত নিয়ে চর্চা হতো। এতেই বোঝা যায় সেই যুগেও ঠাকুর পরিবারে বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডার নিয়ে কতটা চর্চা হত। এই জ্যামিতির উপর ভিত্তি করে পরবর্তীকালে আইনস্টাইন তার থিওরি আবিষ্কার করে নিউটনীয় গতিবিজ্ঞানের অনেক কিছুকেই খারিজ করে দেন। জেনোস তাঁর চিঠিতে এই দাবিও করেছিলেন যে তিনি সম্পূর্ণ শূন্যতা থেকে গণিতের জগতে এক নতুন ভাবধারার জন্ম দিয়েছেন। তাঁর এই দাবীকে অস্বীকার করা চলে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো তিনি তাঁর জীবদ্দশায় কি পেলেন। বলতে গেলে হতাশা ও গ্লানি ছাড়া আর কিছুই না। তবে এই হতাশা হয়ত আসত না যদি তিনি জোহানেস কেপলারের মতো নিষ্কাম কর্মের কথা চিন্তা করতেন। কিন্তু মানুষ তো আর ভগবান নয়। তাই সাফল্যের স্বীকৃতি সকলেই আশা করেন।
             ফারকাস বলিয়েই তাঁর কাজের ব্যাখ্যা করে গণিতের উপর একটি বই লিখেন। এই বইয়ের ভূমিকা লিখেছিলেন তাঁর ছেলে জেনোস। ১৮৩২ সালে প্রকাশিত এই বইটির আজ যে খ্যাতি তার কারণ এই ভূমিকার জন্যই। কারণ জেনোস বলিয়েই তাঁর নিজের আবিষ্কারের কথা বইটির ভূমিকাতেই লিখে দেন। ফারকাস যখন তাঁর বন্ধু গোসকে (পুরো নাম Carl Friedrich Gauss) এই বইটি পাঠিয়ে এর উপর মন্তব্য করতে অনুরোধ করেন তখন তিনি তাঁর উত্তরে ফারকাসের বইটির কোন প্রশংসা করেন নি বটে, তবে ভূমিকা পড়ে তিনি জেনোসকে প্রথম সারির জিনিয়াস হিসেবে ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি লিখেন, “আপনার ছেলের প্রশংসা করা মানে নিজেরই নিজেকে প্রশংসা করা। কারণ আমি অনেক আগেই যে পদ্ধতির সাহায্যে এই সমস্যাটির সমাধান করেছিলাম, জেনোসও এই একই পদ্ধতিতে এটিকে সমাধান করেছে।প্রশ্ন হলো গোস যে দাবি করেছেন তিনি অনেক আগেই এর সমাধান করে ফেলেছিলেন তা কি সত্যি। বলতে গেলে পুরোটাই।
 
              জার্মানির গোটিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র গোস ছিলেন গণিতের জগতে এক অবিস্মরণীয় প্রতিভা। নন-ইউক্লিডিয়ান জিওমেট্রির ক্ষেত্রে গোসের অবদান সবার উপরে। আমি যখন সোভিয়েত রাশিয়ার মির পাবলিকেশনের ‘Space, Time and Gravitation’ বইটি পড়তে চেষ্টা করি তখনো দেখেছি গোসের উল্লেখই বেশি পাওয়া যায়। তিনি ইউক্লিডের স্বতঃসিদ্ধকে খারিজ করে দিয়ে বলেছিলেন প্রথমটি ভুল, দ্বিতীয়টিকে কোনদিন প্রমাণ করা যাবে না এবং পঞ্চমটিকে খারিজ করে দিয়ে এক নতুন জ্যামিতির জন্ম দেন। তবে গোসের স্বভাবটি ছিল একটু অন্য রকম। তিনি নিভৃতে থেকে অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন এবং তাঁর যে সমস্ত কাজের সমালোচনা হতে পারে তা তিনি প্রকাশ করতেন না। এই জন্যই তিনি তাঁর বিপুল পরিমাণ কাজের খুব অল্পই প্রকাশ করেছিলেন তাঁর জীবদ্দশায়। তবে জেনোস কিন্তু গোসের আবিষ্কারের কিছুই জানতেন না। তিনি নিজেই এই নতুন জ্যামিতির আবিষ্কার করে প্রথম তার প্রকাশ করেন। অন্তত জেনোসের এই ধারণাই ছিল।
 
             জেনোস বলিয়াই যখন জানতে পারেন যে গোস ১৮১৬ সালেই জানতে পারেন এই স্বতঃসিদ্ধটি প্রমাণ করা যাবে না কারণ এটা সত্যি নয়, তখন তিনি খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়েন। কারণ এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব যে শেষ পর্যন্ত গোসই পাবেন এটা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। তাই মানসিক দিক থেকে জেনোস একেবারেই ভেঙ্গে পড়েন। চরম হতাশার শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি সেনাবাহিনীর চাকরি থেকেও ইস্তাফা দিয়ে দেন। তবু মনের মধ্যে একটা সান্ত্বনা ছিল যে আর যাই হোক তিনিই প্রথম এটা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এই ধারণাও তাঁর বেশি দিন টিকলো নি। ১৮৪৮ সালে জেনোস জানতে পারেন তাঁর বাবার বই প্রকাশ হওয়ার আগেই ১৮২৯ সালে রাশিয়ার নিকোলাই ইভানোভিচ লোবাচেভিস্কি নামে এক গণিতজ্ঞ কাল্পনিক জ্যামিতিনামে একটি বই লিখেন যেখানে জেনোসের ধারণাগুলো ছিল।
             এটা জানার পর জেনোস ভাবলেন যে আসলে তাঁর কৃতিত্বকে খারিজ করে দেওয়ার জন্য গোসই এইসব চালবাজি করছেন। লোবাচেভিস্কি বলে আসলে কেউ নেই। এই ধারণা থেকে জেনোসের মনের হতাশা অনেক গুণ বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত গণিত বিষয়টির উপরই তাঁর অশ্রদ্ধা জন্মে গিয়েছিল। ফলে গণিতচর্চাকে তাঁর জীবন থেকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে তিনি ভাষা, সমাজ বিজ্ঞান ও দর্শনশাস্ত্র নিয়ে চর্চা শুরু করে দেন। জেনোস মোট নয়টি ভাষায় কথা বলতে পারতেন যার মধ্যে চিনা ও তিব্বতীয় ভাষাও ছিল। একজন ইউরোপীয়র পক্ষে এই দুটি ভাষা আয়ত্ত করা সহজ ছিল না। তা সহজ কাজ জেনোস কবেই বা করলেন।

এখন প্রশ্ন হলো জেনোস যে ভেবেছিলেন লোবাচেভিস্কি বলে আসলে কেউ নেই। সবটাই গোসের চালবাজি, তা কি সত্যি?

নন-ইউক্লিডিয়ান জিওমেট্রির আরেক হোতা লোবাচেভেক্সি
       
লোবাচেভিস্কি
     জেনোস যে ভেবেছিলেন লোবাচেভিস্কি বলে আসলে কেউ নেই। সবটাই গোসের চালবাজি
, তা কি সত্যি? না, মোটেই সত্যি নয়। নন-ইউক্লিডিয়ান জিওমেট্রির আবিষ্কারে লোবাচেভিস্কির কৃতিত্বও কম নয়। অনেকে লোবাচেভিস্কিকে জ্যামিতির কোপার্নিকাস বলেও আখ্যা দিয়েছেন কারণ যে সময়ে ইউক্লিডকে জ্যামিতির জগতে ঈশ্বরতূল্য জ্ঞান করা হতো সেই ইউক্লিডের স্বতঃসিদ্ধের ভুল ধরা ছিল বাইবেলের ভুল ধরার সামিল। তাই লোবাচেভিস্কিকে এই ঈশ্বরনিন্দার জন্য রুশ গণিতজ্ঞরা তাঁকে যতটা পেরেছেন অপমান করেছেন। সহকর্মী অধ্যাপক ও ছাত্রদের দ্বারা নিরন্তর অপমান সহ্য করা ছিল তাঁর কাছে নৈমিত্তিক ব্যাপার। এমন কি ১৮৫৬ সালে তিনি যখন মারা যান তখনও তারা তাঁকে ছাড়েন নি। তাঁকে নিয়ে যারা গোরস্থানে কবর দিতে গিয়েছিলেন তারা খ্রিস্টীয় প্রথা অনুযায়ী চার্চের খাতায় লোবাচেভিস্কি সম্পর্কে যা লিখেন তা এই রকম, “এই লোকটা জীবনে ব্যর্থ এবং ফালতু কাজে তার জীবন ব্যয় করেছেসাধারণত চার্চের খাতায় মৃতের সম্পর্কে ভাল কথাই লেখা হয়। কিন্তু লোবোচেভিস্কির কপালে সে সম্মানও জোটে নি। অনেকের ধারণা এই ধরণের অপমানের সম্মুখীন হতে হবে এটা গোস আন্দাজ করেছিলেন। তাই তিনি তাঁর আবিষ্কারের কথা গোপন করে ফেলেন।

              পরবর্তীকালে যখন রাশিয়ায় কম্যুনিস্ট সরকারের পত্তন হলো তখন তারা দেখলেন যে নন-ইউক্লিডিয়ান জিওমেট্রির সঙ্গে মার্ক্সবাদের কোন বিরোধ নেই। বরং এই আবিষ্কারের হাত ধরে যে আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি থিওরি জন্ম হয়েছিল তা মার্ক্সবাদকে পুষ্ট করেছে। রিলেটিভিটি থিওরিতে সময়একটি বাস্তব মাত্রা হিসেবে প্রমাণিত হওয়ায় ইউরোপের ভাববাদী দার্শনিকরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন কারণ তারা সময়কে এক ধরণের কনসেপ্ট হিসেবে ব্যক্ত করতেন। তাই আইনস্টাইনের আগমনে বস্তুবাদের ঝাণ্ডা উড়তে থাকে। ভাববাদীরা গোসা করে আইনস্টাইনকে কম্যুনিস্টও বলেছিলেন। তাই সোভিয়েত সরকারের আমলে লোবাচেভিস্কির কদর বাড়ে। এই সরকার মেন্ডেলপন্থী জেনেটিক্সে বিশ্বাসী প্রায় তিন হাজার জীববিজ্ঞানীকে সাবাড় করে দিলেও লোবাচেভিস্কির প্রতি তাদের প্যাঁর-মহব্বতকে ব্যক্ত করতে কোন কসুর করে নি। তাঁর প্রস্তরমূর্তি স্থাপন, পোস্টাল স্টাম্প বের করা সহ সব কিছুই করেছেন তারা।

                বর্তমানে গণিতজ্ঞদের কাছ থেকে লোবাচেভিস্কি যে সম্মান পাচ্ছেন তাই তাঁর প্রকৃত সম্মান। তবে একই সঙ্গে কেউ কেউ এমনও আরোপ লাগাচ্ছেন যে গোসের সঙ্গে তাঁর পত্রালাপের সূত্রে তিনি এই জ্যামিতির কথা জানতে পেরেছিলেন। লোবাচেভিস্কি এত বড় জিনিয়াস ছিলেন না, ইত্যাদি। তবে লোবাচেভিস্কির বিরুদ্ধে এই সব আরোপ ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়েছে। গণিতের ঐতিহাসিকরা দেখিয়েছেন লোবাচেভিস্কির বই বেরোনোর পর গোস এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। এর পরই দুজনের মধ্যে আলাপচারিতা শুরু হয়। লোবাচেভিস্কির বই বেরোনোর আগে পর্যন্ত দুজনের মধ্যে পরিচিতি কিংবা আলাপচারিতা ছিল না।
 
             এখানে সংক্ষেপে নিকোলাই ইভানোভিচ লোবাচেভিস্কির জীবন নিয়ে দু-চারটি কথা বলে নিতে চাই। প্রথমত লোবাচেভিস্কি ছিলেন একজন নাস্তিক। তিনি ১৭৯৩ সালে রুশ সাম্রাজ্যের নিঝনি নোভগোরদ শহরে জন্ম নেন। জাতিতে তিনি ছিলেন পোলিশ। তাঁর বাবা ভূমি জরিপ বিভাগের একজন কর্মচারী ছিলেন। তিনি কাজান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপ নিয়ে ১৮০৭ সালে গ্র্যাজুয়েট হোন। তিনি ফ্রেডরিখ গোসের বন্ধু মার্টিন বার্টেলের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে গণিত নিয়ে নতুন ভাবে চিন্তাভাবনা শুরু করেন এবং ১৮১১ সালে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি হাসিল করে কলেজের প্রভাষক রূপে জীবন শুরু করে নিজ প্রতিভাবলে ১৮২২ সালের মধ্যেই ৩০ বছর বয়সে পরিপূর্ণ প্রফেসর হয়ে যান। তবে ১৮৪৬ সালে খারাপ স্বাস্থ্যের দরুন তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। ১৮৫০ সাল নাগাদ প্রায় অন্ধ হয়ে পড়ায় তাঁর চলাফেরা করা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং ১৮৫৬ সালে মারা যান।
লোবাচেভিস্কির গণিত ভাবনা থেকে পরবর্তীকালে অনেক নতুন নতুন পদ্ধতির জন্ম নিয়েছিল। এর মধ্যে অ্যালজাব্রিক ইকোয়েশনের বর্গমূল বের করার একটি পদ্ধতিও আবিষ্কার হয় লোবাচেভিস্কির আবিষ্কৃত নন-ইউক্লিডিয়ান জিওমেট্রি থেকে। মানব সভ্যতায় এতটা অবদান সত্ত্বেও লোবাচেভিস্কি তাঁর জীবদ্দশায় সম্মান কিংবা স্বীকৃতি কোনটাই পান নি। বরং সব দিক থেকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়ে এক হতাশাপূর্ণ জীবনই কাটিয়ে গেছেন। এটাই সভ্যতার পরিহাস।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন