.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

সোমবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৭

সৌরপথের আলোকবিম্ব


সুখের আখড়া দুখের ঝুপড়ি জুড়ে কুটিরশিল্পে তন্ময়তৎপর আলোজীবনসফর ৷ ভোরের দোয়েল জানে পুব আকাশের রঙের আড়াল ৷ ক্রমাগত দিগন্তজীবনে লঙমার্চ এগোয় ৷ আগুনের গিরিপথ ডিঙোতে ডিঙোতে আলোর জ্যামিতি ছড়িয়ে যায় কাশবিতান ৷ ঘাসফুল আর সোনালি শস্যসংলাপ ৷ সৈকত জুড়ে শাণিত অস্ত্র শুয়ে ৷ রক্ত মরে কালো পিচ ৷ বিদ্ধ আত্মারা সেখানে ডুকরে কাঁদে ৷ অপরিচিত সানাই করুণ হয় ৷ কোজাগরি চাঁদের আলো অচেতন হয়ে আসে ৷ মেঘের কুচকাওয়াজের ভেতর রাত নামে গভীর খাদে ৷ সোনাঝুরি গাছের তলায় ঝরে পড়া হলুদ ফুল রঙ হারায় ৷ পূর্বজ পথিকেরাও লৌকিক দার্ঢ্যে আঁধারের পথে এগিয়ে গেছেন নির্জন বাতিরেখা ধরে ৷ গর্জন তুলেছে মিছিল যুদ্ধসঙ্গীতে ৷ আলোর কোটরে লুকোনো কামনা-আনন্দ, হাসি-আহ্লাদ অশ্রু মুছে যায় ৷ ছুঁয়ে যায় জয়নাদ ৷ ভেজা নির্জনতার মন্ডলে আনন্দাশ্রুতে ভরে যায় সুবর্ণকলস ৷

যে নরম আলো দিয়ে ভোরের সূচনা তার ভেতর অবগাহনের রোমাঞ্চে জ্বলে ওঠে আগুন ৷ তার আগ্রাসী ধোঁয়ায় আর্তরব ওঠে ৷ দগ্ধ ময়ূরের পেখম খুলে পড়ে যায় জতুগৃহে ৷ প্রবহমান সহজিয়া গানের পাশে পাশে সহস্র লাশ ভেসে যায় ধর্মাতুর বাতাসে ৷ মায়াভরা সেই গান আর শবের ছবি চতুর মিডিয়াপার্সন ছেপে দেয় ভোরের কাগজে ৷ ধর্মলুন্ঠনে কপর্দকশূন্য হয়ে যায় ইতিহাসের অহংকার ৷ সভ্যতার সমৃদ্ধ ঘরানা ৷ হাজারো পরিজনের কান্নার নির্বাক স্লোগানগুলো পেশাদার সেলফিতে ভরে যায় ৷ গড়াতে গড়াতে মসৃণ হয়ে যাওয়া নুড়িগুলো দাম্ভিক দালানে গেঁথে প্রাসাদ বানায় কেউ কেউ ৷ কেউ বা স্বপ্নের খোঁজ করে ফেরিওয়ালাদের কাছে ৷ মনোহারী বিপননে রাজনীতির পসার বাড়ে ৷ কার্তিকের মুন্ডিত মাঠে সন্ধ্যাবাতি জ্বালিয়ে আসে পূর্বজ পুরুষের কোনো জ্ঞাতিবউ ৷ কোমল শিখার সাথি ছায়ামোহনায় প্রাণের স্বপ্ন নিয়ে আঁচলে সন্ততির সুখ বেঁধে নেয় ৷ মিটি মিটি হাসে ঝরা ধানকণা ৷ এজন্যেই তার নির্জনবসত ৷ এজন্যেই অঙ্কুরপ্রয়াস ৷

অমোঘ আলোকে আরাধনা করে অনুর্বর মাঠেও বেঁচে ওঠে জন্মবীজ ৷ হেমন্তরাতের কুয়াশাচিহ্ন চুমু খায় সৃজনের ইজেলে ৷ সবাই তো জীবনপ্রয়াসী ৷  জনজাতির শান্ত পল্লীপথে একাকী হাঁটেন তথাগত ৷ প্রান্তরের সিঁথান ঘেঁষে জলসত্র অপেক্ষায় থাকে ৷ দূরদিগন্তমোড়ের অলৌকিক ভয় চলে যায় বানপ্রস্থে ৷ তবুও কোনো কোনো  সূর্য আসে ভয়ের জ্যাকেট পরে ৷ মায়াহরিণের টানে হরিয়ানায় পাচার হয়ে যায় প্রত্যন্তবালিকা ৷ ভাস্কর্যনারীর নিষ্পাপ মুখমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ে স্বপ্নটুটা হাহাকার ৷ কেন মাঝে মাঝে বিষাদে ভরে ওঠে জনভূমি?  জাত আর ধর্মপরিচয়ে সর্বনাশ? বসুমাতার বিভাজন? বিমর্ষকন্ঠে একতারার সুর নিয়ে হননকোলাহল সরাতে প্রয়াসী অন্ধপাখি ৷ তার বিষন্ন প্রার্থনায় শান্তিসুগন্ধ ছড়ায় ইকোলিরিক ৷করুণালহরী পাতালে পরতে জেগে থাকা জ্বালানিভান্ডার ৷ পরোক্ষে ধরে রাখে জীবনাবহ ৷ অন্ধকারের শ্লোক মুছে ফেলে দৈবহাত শুরু করে আলোর আরতি ৷ নিখাদ ভালোবাসা মেরুপ্রান্ত অবধি ছড়িয়ে যাবার ঈপ্সায় ধর্মশ্লোকের বিপন্নতাকে জড়িয়ে ধরে ৷ আলোর কলসে অরণ্যজল তুলে রাখার সৃজনপ্রেরণায় বিশুদ্ধস্নান ভুবনবন জুড়ে ৷ বর্ষণসিক্ত আলো আসে নিকোনো উঠোনে ৷ মুছে যায় অকল্যাণসর্বস্বতা ৷ মৃত্তিকার শীতলপাটিতে জেগে ওঠে শুদ্ধ আলোকবয়ন ৷




রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭

কু- মন

কু- মন
তোর ভেতর- বাড়ি খালি হতে দেখছি।
.
চাষের জমিতে তিরস্কারের লাথি মানে জৈবপ্রযুক্তি নয়,
ফসল না শুধুই গাছ সময় জানাবে তোকে।
.
তারুণ্য- পতনের সব আবর্জনা জমা হলে
আত্মমর্যাদার চোখে চোখ রেখে দেখিস--
তোর ভেতর একটি অতিরিক্ত তরুণ এবং মৃত লাইব্রেরি।
.
..............
অভীক কুমার দে




কবিজীবন

কবিজীবন
বুকের আঁচল সরে যেতে যেতেই এক জীবন
নদী, বেঁকে যাওয়া যৌবনের স্মরণিকা
লুকোচুরি খেলে চরে,
শুনেছি, মুহুরীর মতোই ছেলেবেলা
আঁচল সরে যেতেই ভরাট বুক আর ভরাট থাকে না,
বেহুলাভেলার মতোই লাশ নিয়ে ঘোরে !
.
মাটির ঠিকই জানা থাকে--
কেমন স্রোত বয়ে গেলে নদীর গভীরতা বাড়ে,
কেমন চাপে বেঁকে যায় নদী।
.............
অভীক কুমার দে




শনিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৭

ভয়ের ঋতু

।। শিবানী দে।।

(C)Image:ছবি

শ্বিন মাস পড়তেই আজকাল ভিতুর ডিমেদের ভয় করে এই শুরু হল হুল্লোড়ের ঋতু এমনিতেই আজকাল   আবহাওয়ার   পরিবর্তনের  ফলে গরম বেড়েছে,  গ্রীষ্ম বর্ষার দিনগুলোকে কিছুটা দখল করে নেওয়ায় বর্ষা শরতকে ঠেলে দিয়েছে, হেমন্তের ঘরে,( শরত আর হেমন্ত জড়াজড়ি করে শীতকে ঠেলেছে, শীত এত ঠ্যালা সহ্য করতে না পেরে মরেই যাচ্ছে , ওদিকে গ্রীষ্ম শুধু পরের বর্ষাকেই নয়, আগের বসন্তকেও প্রায় খেয়ে নিয়ে  অপ্রতিহত প্রতাপের একনায়ক ঋতু হয়ে উঠছে ।)  রোগবালাইর বাড়বাড়ন্ত কিছু কিছু আগেও কি ছিল না, ছিলকিন্তু সেই সঙ্গে নীল  আকাশে রৌদ্রমেঘের খেলা,  শুকিয়ে আসা মাঠঘাটস্থলপদ্ম শেফালির সৌরভকাশফুলের দিগন্তজোড়া  সাদা আলোজলভরা পুকুর নদীসন্ধ্যার আকাশে মৃদু কলশব্দে ফিরে যাওয়া বলাকাপাঁতিমনকে আলোড়িত করত---এসেছেসে এসেছে পুরোনো দিনের জাবরকাটা ভিতুর ডিমেদের কাছে এই ছিল  পুজোর গন্ধপুজোর বারতা  

          এখন সে সব নেই, দরকার ও নেই। আবহাওয়ার গরমের চাইতেও আগামীতে ফুর্তির গরমের আয়োজনে আমরা চাঙ্গা ।  গ্রামের দিকে অল্পস্বল্প থাকলেও শহরে ইট লোহা কংক্রিটের মধ্যে প্রকৃতির রূপ পরিবর্তনটর্তন আমাদের চোখে পড়ে না, আকাশে তো লেট বর্ষার জন্য সারাক্ষণই কালো মেঘের আনাগোনা, বৃষ্টি, তার চাইতে এই ভাল যে পুজো আসার  কাউন্টডাউন শুরু করে  টেলিভিশন আর বাকিদিন’----দুর্গাপুজো শুরু হওয়া অবধি রোজ চলতে থাকে বড়বড় ব্যানারে বিজ্ঞাপন পড়ে যায় পুজোর, কোথায় কতবড় প্রতিমা, কি  থিমের প্যান্ড্যাল । বিজ্ঞাপন শুরু হয়  পোশাক আশাকের, সব উপভোগ্য জিনিষেরনিদেনপক্ষে  মাসতিনেক আগে থেকেই, আর সেই সঙ্গে দোকানে দোকানে হামলে পড়া ও  ফলে  রাস্তায় বাজারে ভিড়, বাসে ট্রেনে সিটের তো বটেই, দাঁড়ানোর জায়গারও আকাল তাতে এমন আর কি ? দুটো তিনটে মাস বড়োজোর কষ্ট ।   রোজকার প্রয়োজনীয় জিনিষের দাম বেড়ে যায়, তা নাহয় বাড়ল। এদিকে  বন্যাডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া, ভাইরাল ফিভার, ডায়েরিয়াইত্যাদিতে আক্রান্তদের কথা প্রথম প্রথম শোনা গেলেও পরে  উৎসব  আয়োজনের চাপে তা পেছনে পড়ে যায় চাপা পড়াই উচিত,  সেসব নিরানন্দের খবর খেতে কার ভাল লাগে? তাই সেসব খবর  হঠাৎ  টিভি  থেকেখবরের কাগজ থেকে উধাও হয়ে যায়, কারণ  এইসময় দেশে আপামর সবাই আনন্দের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে  কোথায় প্রতিমাকে সোনার শাড়ি  পরানো হবে , কোথায় সম্পূর্ণ সোনার অলঙ্কারে প্রতিমাকে সাজানো হবে, তার   প্রচারে সংবাদ মাধ্যম মেতে ওঠে। এতে আর খারাপ লাগার, অশ্লীল লাগার কি আছে, যখন বলা হয় মাকে এত সব সোনায় সাজানো হবে। মায়ের জন্য এত সোনা, ‘মায়ের সন্তান তারাই যারা এত সোনা জোগাতে পারে। মায়ের কৃপায় তাদের কখনো কোনো কিছুর অভাব হয় না । বন্যায় কার বাড়ি ভেসে গেছে, রোগে কারা মারা যাচ্ছে, কারা দুবেলা খেতে পাচ্ছেনা তাদের কথা ভেবে আনন্দ নষ্ট করা যেতে পারে না।
          দুতিনবছর আগে অবধি উৎসবের মরশুম আরম্ভ হত বিশ্বকর্মাপুজো থেকে, অর্থাৎ ভাদ্রের শেষ দিন থেকে। এখন  তারও   আগে দেখা দিচ্ছেন গণেশ ঠাকুর। আগে তিনি খুবই সীমিত ছিলেন। এবছর তো তিনি অনেক রাস্তাই দখল করে  ফেলেছেন । আশা করছি আগামী বছরগুলোতে তাঁর বাড়বাড়ন্ত আরো হবে। কলকাতা লন্ডন না হোক, মুম্বাইকে টেক্কা দেবে, অন্তত গণেশপুজোর দিক  দিয়ে। কলকাতার নিজস্ব দুর্গাপুজো তো আছেই। রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিনের পর দিন মহাপুজোর আয়োজন করতে হয়। কারণ সবই মহা, প্রতিপদ থেকে দশমী অবধি। তার পর জ্যান্ত দুর্গার প্রযোজনার কার্নিভাল। বিসর্জনের পর  কদিন অল্প বিরতি, তারপর কালীপুজো দীপান্বিতা---মাত্র দুদিনের পরব, কিন্তু বেশ কবছর  থেকে শুরু হয়েছে ধন  তেরস, যা হবার কথা শুধু ত্রয়োদশীর দিনে, কিন্তু ব্যবসায়ের খাতিরে ধনতেরসের বিক্রিবাটা আগে পিছে আর অন্তত দুদিন চারদিন করে ফিবছর বেড়ে যাচ্ছে। ফলে ফুর্তির দিন ও আরো বাড়ে।  আবার দোকানে ভিড়, এবারে সোনা রূপো, বাসনপত্র বৈদ্যুতিন সামগ্রীর বিপণিগুলোতে। কত বিক্রিবাটা ।  বাঙালি এখন ধনতেরস উৎসব খুব  খাচ্ছে।  খবরের কাগজে কাগজে ধনতেরসের মাহাত্ম্য ছাপা হয় ।   ধনতেরস পালন  করলে নিশ্চয়ই  বাঙ্গালি ও মাড়োয়ারির মত  বড়লোক হয়ে যাবে   এই উপলক্ষে  দোকানে দোকানে কেনাকাটার বহর দেখে দেখে বোঝা যায় অভাবটভাব  গত শতাব্দীর ব্যাপার  শিল্প না আসুক,  বাণিজ্যের বৃদ্ধি না হোক, গণেশ, ধনলক্ষ্মীর পুজোর দৌলতে আমরা ধন সম্পদ  পাবই, একেবারে ব্রতকথার মত।  
        কত বছর থেকে শুনছি শব্দবাজি বন্ধ হবার কথাপরিবেশবিদ থেকে কোর্ট থেকে প্রশাসনসকলের কাছ থেকেই  উপদেশ নির্দেশ আদেশকিন্তু বহাল তবিয়তে শব্দবাজি চলছে, চলবে  কানের পর্দা ফাটুক আর হার্ট ধড়ফড় করুকশ্বাস  ধোঁয়ায় রুদ্ধ হোক বা সারা দিক ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে দৃষ্টিক্ষমতা কমে যাকবাজি পোড়ানো হবেই বাজি পোড়ানো বিজয়া থেকে শুরু হয়ে যায়দীপাবলি হয়ে  ছটপুজো পর্যন্তদিনে রাতে যেকোনো সময়ই বাজি পোড়ানোর মোচ্ছব   তাছাড়া আছে বিয়েশাদি উপলক্ষে, ক্রিকেট বা  অন্য কোন খেলার অথবা নির্বাচনের পর বিজয়ী দলের, তাদের সমর্থকদের  বিজয়োৎসব যতই পরিবেশ আর স্বাস্থ্য নিয়ে লাফালাফি করা হোকনা কেন বাজিকে সঙ্গে  নিয়েই ফুর্তি করতে হবে  কারণ আমরা শব্দপ্রিয় জাতি শব্দে ভূত ভাগাইশব্দে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করিবাক্যের শব্দে অন্যকে জব্দ করি   আর বাজি তো আমাদের  দেশি  শিল্প  চিনা নয়  আমাদের অলিতে  গলিতে বোমার সঙ্গে বাজি তৈরি হয়  
          এই রাস্তাজোড়া উৎসব পালনএই যে কানের গোড়ায় বাজি ফাটানোএই যে কান ঝালাপালা সঙ্গীতডিজে,  এইসব তো আমাদের অধিকার কে এগুলোকে হরণ করতে পারে ? পরধর্ম মতাবলম্বীর কথা তো দূরস্বধর্মের কত শতাংশ এই হুল্লোড়বাজিতে আনন্দ  পায় এসব জেনে আমাদের কাজ নেই। আমাদের ফুর্তি করতে দাও শামিল হও, ঠিক  আছে, আপত্তি করলে বিপদ ডেকে আনবে ।
            উৎসব ঋতুর শেষে আমরা বলি, আসছে বছর আবার হবে, আরো বেশি করে হবে। ভিতুর ডিমেরা বলে, আর এসো না, মা। তবে আমরা জানি, মা না এলে বাবা আসবে, বাবা না এলে দিদি দাদা আসবে। কেউ একজন এলেই হল, আমরা ফুর্তি ঠিকই জমিয়ে নেব।





শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭

জম্পুই সাহিত্য

।। অভীক কুমার দে।।
(C)Image:ছবি















.
সেদিন ওয়াচ্ টাওয়ারের উপর সন্ধ্যা ঘনালো বলে
ছটফটে মেঘলা আকাশে ফুরফুরে বাতাস আর কুয়াশার মাখামাখি,
জম্পুই শরীরে একটু আগেই বৃষ্টি হয়েছিল খুব,
তবুও মেঘের চিত্রনাট্য আকাশ জুড়ে...
.
শেষ বিকেলের সূর্য মেঘের বুকে রেখে গেছে যে প্রেম
ঝরে পড়ার পর তার চিহ্নও নেই পাতার গায়ে,
ভেজা দাগের অবশেষ চুপচাপ চুমু খায় বনের গালে !
এমন ত্রিকোণ প্রেম ভালোবাসে না কাঞ্চন,
তমাল শেখরের শিকড় ছড়ানো প্রেমের মতোই 

শিখরে, ছবি হয়ে ছবির খেলায় শিল্পী অথবা রঙ।
.
জম্পুই আমি, আবেগের সোঁদা গন্ধ ছড়িয়ে নীরব,
একটা অচেনা পাখি মধুর সুরে বলতে শুনি--
কোন এক গাছের সব পাতা ঝরে গেলেও
কবির পাতায় কবিতা হয়ে জম্পুই সাহিত্য।



আজকের ছবিগুলো



 ।। এম রিয়াজুল আজহার লস্কর ।।
(C)Image:ছবি























( সকাল থেকে এখন পর্যন্ত যা যা দেখলাম- তা নিয়ে একটা ছড়া )

ভোর না হতেই ব্যস্ত মানুষ সবাই উঠে দৌড়ে।
অল্টো দিয়া ছাগল মারে পিনাক কান্তি গৌড়ে। ।

ঝরলো শিশির সবুজ ঘাসে খানিক পড়ে শীত ।
চতুর্দিকেই আতশবাজি  কালী পূজার গীত। ।

কাদা এখন ভাসছে চোখে যেথায় পড়ে দৃষ্টি ।
আকাশখানি ঢাকছে মেঘে হচ্ছে ভারি বৃষ্টি । ।

ভাঙ্গা রাস্তা ধেড়াং ধেড়াং শব্দে ছুটে গাড়ি।
আম জনতা এসব দেখে মুখটা করে হাড়ি। ।
@
( হাইলাকান্দি / আসাম)
২০/১০/২০১৭



এতো বড় রঙ্গ জাদু...

।। নীলদীপ চক্রবর্তী।।
 (কলকাতা থেকে প্রকাশিত 'অর্কিডকাগজে পূজাসংখ্যা ১৪২৪ )
(C)Image:ছবি


ঙ্গমঞ্চ ঝলসানো সব রংমাখা নট-মুখ 
নটদের বুকে দুরু দুরু ভয়, প্রথম অংক শুরু
আলোর ফোকাস শব্দক্ষেপণ নাটুকে পদক্ষেপ
রঙ্গালয়ের কুশীলবদের ক্ষতবিক্ষত বুক

নাট্যদৃশ্যে অভিনেতা কিছু দালান কোঠার বাসি
গৃহসাজে আছে চাকচিক্য, আবহ বদলে যায়
স্বগৃহে তাঁর রুগ্না স্ত্রী, যমে মানুষে লড়ে-
দ্বিতীয় ফোকাসে আলো নিভলেই আঁধার পুনরায়

ড্রপসিন পড়ে বিরতির বেল এবারে মধ্যান্তর
প্রথম অংক দ্বিতীয় অংক, পূর্ণদৈর্ঘ্য পালা 
কৈশোর পেরিয়ে ভরা যৌবনে মঞ্চের কুশীলব
দৃশ্য শেষে, মৃত্যু শিয়রে নেই গত্যন্তর !

রঙ্গমঞ্চ ঝলমল করে পেছনে অন্ধকার
অনু পদক্ষেপে সঞ্চারে সব অভিনেতা রংমাখা
মরো-মরো কারো পরান ভোমরা কেউবা প্রাণময়
এতো বড় রঙ্গজাদু, নট নটীদের গাথা !  







বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৭

অনন্ত অপেক্ষায়


।। রফিক উদ্দিন লস্কর  ।।


(C)Image:ছবি











র কতকাল আর কতদিন, অস্ত যাবে পশ্চিমে রবি
রাতের পরে দিনের আলোয় ফুটবে না'কি কোন ছবি!
অন্ত হবে না'কি কোনদিন আমার এই দীর্ঘ অপেক্ষার,
সত্যি করে বলনা তুমি, কখন ফিরে আসবে আবার।
সখের বাগানে গজিয়েছে আজ সকল ফুলের চারা,
তুমি তো বলছিলে, নষ্ট করনা একদিন বড় হবে তারা।
পাপড়ি মেলিল সকল ফুল, আজও নেই তোমার দেখা,
আসেনা ভ্রমর আর ছুটেনা অলি, বাগান নিত্য ফাঁকা।
ঝরে পড়ে ফুল ঝরে পড়ে পাতা, গাঁথা হয়নি পুষ্পমালা,
আমি জানি, তুমি অভিমানী! তাইতো বাগানে তালা।
অশান্ত নদীর বুকে জেগে উঠা চরে, বসে একান্তে...
দেবো পাড়ি সবকিছু ছাড়ি, পৃথিবীর এক অন্য প্রান্তে।
কত স্বপ্ন ছিল নতুন ভুবনে গড়িব মোরা সুখের মহল,
যাওয়া আসা আর হয়নি তাতে, স্মৃতিরা করছে দখল।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহরগুলো কেবল স্মৃতিতে ধারণ...
গেলো শৈশব কৈশোর, অজান্তে মন যৌবনে পদার্পণ।
ছোট্ট নীড়ে আনন্দের ভিড়ে, বসতির ছিলো অঙ্গীকার,
 
মোরা একসাথে মৃত্যু প্রতিরোধে, আজীবন বাঁচার।
ব্যাকুল প্রাণ হয়নি অপেক্ষার অবসান, তবুও আশায়
মন বলে তুমি আসবে জীবনে আমার বিধির কৃপায়।
ব্যথা বেদনা আর হৃদয়ের ক্ষতগুলো মুছিয়ে দিতে,
বিরহের তৃষ্ণা মিটাতে তুমি আসবে সুধা নিয়ে হাতে।
ভুলে অতীতের সকল কিছু উড়বো মেঘের ভেলায়,
আমি ভালোবাসার বিশ্বাসে আজও অনন্ত অপেক্ষায়।।

২০/১০/২০১৭ইং
নিতাইনগর,হাইলাকান্দি (আসাম-ভারত)




বৃষ্টিকথা

।। অশোকানন্দ রায়বর্ধন।।
(C)Image:ছবি











পানছড়ির পাহাড়ের গায় ভ্রাম্যমাণ মেঘের বিরতি
ছবির মতো স্থায়ী ও প্রামাণ্য আসঙ্গকথা
চিরকালীন প্রণয়কল্প বুনে চলেছে বিরামবিহীন
মাহ ভাদরেও ঝরে কান্নার অশ্রু বিরহকানাৎ বেয়ে
কোন মেয়ে কৌমাৰ্য হারালো শেষ বাদলের আঁধারে
কার শুধু নগ্ন লাশ
  পড়ে আছে স্বঘোষিত দেবভোগের
উচ্ছিষ্ট ভাণ্ডের মতো ৷ ভাদুরে বর্ষার জল ধুয়ে যায় শব

কাদের কান্নায় এ যাবত কেঁদে উঠেছে বনমানবের বুক
কোন প্রমাণপত্র বাতাসেও ওড়ে নি তো কোনদিন
ভালোবাসা তবুও লোমশ বুক বালিশপ্রতিম আস্থাঘর
সমস্ত সমরাস্ত্র নতজানু হয়ে মানবের পায়ে নুয়ে পড়ে
রক্তপিপাসু রণ নয় ৷ হৃৎপিণ্ড তাক করা আয়ুধও না
ধারালো ফলা ভেঙে জীবনজল হয়ে ঝরুক জনপদে




ঘরে ঘরে ডাক পাঠালো.....

।।অশোকানন্দ রায়বর্ধন।।
(C)Image:ছবি
মাটির প্রদীপের শিখা মাটির বুকে তির তির করে জ্বলতে থাকুক কিংবা অট্টালিকার কার্নিশে কার্নিশে সমবেত বৃন্দশিখায় মেতে উঠুক তাদের সম্মিলিত কুচকাওয়াজ এই ধরণীকে মাতিয়ে তোলার জন্যেই নিবেদিত ৷ ভুবনপুরের অন্ধকার দূর করার জন্যেই নিবেদিত প্রাণ নিভৃতে তৈলাধারে সংরক্ষিত রসদকে পাথেয় করে আলোকবন্দনায় রত ৷ যে রাতকীটসমূহ তাদের পক্ষবিধূননের মাধ্যমে বাধার সৃষ্টি করে আলোকযাত্রার সুরম্য উপাসনার, তার কোনো প্রতিবাদ করে না আলোকদল ৷ আজ যে আলোকোৎসবের ক্ষণ ৷ আজ শুধু আলোদান আর আলোকিত হওয়ারই ব্রতক্ষণ ৷ সমবেত আলোবিতরণে নিজেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে আলোপ্রদীপ ৷ অপরকলঙ্ক বিকশিত করা  আজ আলোকাভিসারীর অভীষ্ট নয় ৷ তিমিরনিশার কলঙ্ক ঘুচানোর, আলোকস্নানে স্নিগ্ধ করার সপ্রদীপ মহড়়া এরাতের লক্ষ্য ৷ অন্তহীন অন্ধকার পথযাত্রীর হাতে আলোকবর্তিকা তুলে দেওয়ার মাঝে পবিত্র হওয়ার যে কুম্ভস্নান সেই স্নানে সিক্ত হয়ে দূরীভূত হয় অন্তরের তমসা ৷ সেই মহাহোমের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশীদার হলেও এক পরম তৃপ্তি পরমানন্দ ৷ আলোর দীপালিকা সেই চিরানন্দের বার্তাবাহক ৷ পবিত্র স্নাতক ৷ আসুন আলোকস্নাত হই অফুরন্ত আলোকুম্ভে ৷



সবার চেয়ে বড় বড়াই



  ।। এম রিয়াজুল আজহার লস্কর।।


















ড়াই  এখন ধনের
বড়াই এখন জনের
বড়াই এখন যায়না পাওয়া—
সুস্থ সবল তনের।

বড়াই এখন টাকার
বড়াই এখন চাকার...
সবার চেয়ে বড় বড়াই
মিলেমিশে থাকার। ।
©
কপিরাইট সংরক্ষিত
( ঐক্যটা হোক স্বপ্ন সবার , পৃষ্ঠা নং ২৪ )



ভাইরাসের চাষ

।। রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ।।

(C)Image:ছবি




















ত্যা শেষে বৃষ্টিরাতে নগরজলে
শিকড়হীন শ্বাস
অবিরত পাগলা মেঘের চলছে
ভাইরাসের চাষ



প্রক্ষেপণ
















।। অর্পিতা আচার্য ।।

প্র তিটি সৃষ্টি এক প্রক্ষেপণ -
প্রতিটি গল্পের গায়ে হাত বুলায় 
আহত শৈশব তার দৃঢ় গাঁথুনির 
পরতে পরতে, লুকিয়ে রয়েছে কোন 
বিস্মৃত সংলাপ যে কবিতা ভেসে 
যাচ্ছে অদম্য উচ্ছ্বাসে - প্রত্যেকটি 
বিন্দুতে তার অতীতের অশ্রু হাসি মেশা,
আশৈশব লালনের প্রোথিত সংস্কার 
ছায়া ও ছবির মত শব্দ ছুঁয়ে কাঁদে -
ক্যানভাসের অস্তরাগে তুলির চুম্বন,
স্বপ্ন আর সত্যির আঁকিবুঁকি দাগ
প্রতিটি পোঁচের গায়ে নিদ্রিত অহম্ 
রেখে যাচ্ছে চিরন্তন অচেনা বিন্যাস






বুধবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৭

কালী

             ই ছবিটি দেখলেই মনে হয় ধুন্ধুমার কিছু লিখি,

নিজেকে চুরমার করি,  যেন এই আভূষণ তাঁর নয়, তিনি গোধূলি, পর্বতমালা আর সমুদ্র পরিধান করে আছেন, এই সমূহ লাল আমার কলমে, আমার আধারে ঝরে যাক, ইত্যাদি ইত্যাদি, বাট হয় না।
কান্না আসে।
        সেই কান্না,  যার উৎসে কোন দুঃখ নেই, অতৃপ্তি, অভালোবাসা, অপ্রেম, অপ্রাপ্তি, বিষাদ, অপমান, মৃত্যু--  নাহ্, কিছুই নেই, তোলপাড় জিজ্ঞাসা করেছি নিজেকে, পাইনি ! একটি ভীষণ পিওর জাফরান রঙের টিনএজ কান্না।
       এই নারীকে দেখলে আমার আর শ্মশান, শবদেহ, মুণ্ডমালা, রক্তপান, সুরা, শিব, কাপালিক, নগ্নতা, দেবীভাব, হেমন্তকাল, নদীতীর, জবার আহুতি, অট্টহাস্য কোনকিছুই মনে হয় না।
মনখারাপ লাগে শুধু।
          এই সেই মেয়ে , যার কোন পারাপার নেই, এর মধ্যে দিয়ে আমি বয়ে যাব, মোক্ষভাব গচ্ছিত রেখেছি পদতলে, দরকার মতো চেয়ে নেবো, এখন তোমাকে দেখি, এ সৃষ্টির স্রষ্টা যিনি , দুরন্ত মেধা তার, সেই মেধায় আলো ছড়ায়, প্রণাম আসে মন থেকে ।
তাই তো?
      একটি প্রণামের জন্য মন কাঁদছে, খুঁজে পেয়েছি কারণ।
         একজন মানবী চাই, যার পায়ে লুটাবো তৃণদল, যাকে আভূমি প্রণাম করবো, তিনি সর্বাংশে রিক্ত হবেন, অসীমে পূর্ণ হবেন, পিওর হবেন...
....চিরশ্রী





মঙ্গলবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৭

বিবর্তন দ্বিতীয় সংখ্যা :হোয়াটস এপ কবিতাপত্র

প্রকাশিত হল WhatsApp পত্রিকা বিবর্তন দ্বিতীয় সংখ্যা...
রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ এবং রাজীব মজুমদারের সম্পাদনাতে, আগরতলা ত্রিপুরার থেকে..... ছবি ক্লিক করে বড় করুন, আর পড়ুন...






কাঞ্চন, তোমার জম্পুই ভালো নেই

।। অভীক কুমার দে ।।

(C)Image:ছবি


















.
কাঞ্চন, একদিন তুমি বলতে--
জম্পুই, তোমার নীল রঙের চওড়া বুক আর সবুজ ভাবনায় আমি ঋতুমতী,
শুনেছি ঐ নীল বুকের ভেতর কমলা রঙের মন আছে,
ঝর্ণাধারায় নেমে আসে লুসাই সুর,
শিহরিত মন শিশির- আঁচলে ঢাকি।
একদিন তুমিই বলতে--
অবাধ বিচরণের সব প্যারাসুট খোলা রাখি বুকে,
মাটি- আকাশের মিলনমেলায় পরীর মতোই নেমে আসে কুয়াশা
আদরে আবদারে ভিজে যায় পাহাড় তোমার,
আমি স্বপ্ন বুনি, প্রহর গুনি।
.
কাঞ্চন, তুমি ভালোই আছো,
হারাধন বৈরাগী, অমলকান্তি চন্দ- দের বুকে জড়িয়ে;
তোমার জম্পুই ভালো নেই,
বনোজাতের তীব্র শব্দ ছুরি 

প্রশ্নের মতোই মগজের তার কাটে,
মনে হয় চেঁচিয়েই বলছে--
স্পন্দন শোনাও তোমার, যেভাবে--
কাঞ্চন শোনে,
ছুঁয়ে দেখে, 

বনোরেখায় ছাপানো বুক আঁচলে ঢাকে।
.
কাঞ্চন, ভালো করে একবার চেয়ে দেখো--
চওড়া বুকে আগের মতো কমলারঙ নেই এখন,
কেউ আমার শরীর বিষাক্ত করে তুলছে,
হৃদয় ছোঁবার সব পথ এবড়োখেবড়ো,
চোরাকারবারির চলাচলে দমবন্ধ হয়ে আসে 

রোজ রাতে, ছুঁড়ে ফেলা খালি বোতলে শিশিরের থুতু আর প্লাস্টিকের দখলদারি--
নীল বুকে সময়ের ব্যথা, ভীষণ...
তবু হৃৎস্পন্দন শুনবে বলে সরুপথে পা রাখে অনেকেই
মাতাল মানুষ অথবা মানুষের মতো মাতাল,
তোমার জম্পুই ভালো নেই।



রবিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৭

চিত্র ও চরিত্র


।। অভীক কুমার দে ।।




(C)Image:ছবি














.
বি জেগে নেই, ঘুমিয়ে...
সিনেমা চলছে,
মুখ লুকিয়ে দেখছে কেউ চরিত্রের পর চরিত্র
চিত্রের গোপন অন্তর পর পর।
.
আমি'র ভেতর ছটফটে পায়রা- চোখ অবুঝ,
জেগে উঠতে চায় কবি, গলা ফাটিয়ে বলতে চায়--
চরিত্র সব ভেঙে দেখো, অন্তর্গঠন নয়,
বরাবরই চিত্রের অন্তর গঠন।
.
সিনেমা চলছে, দেখো--
কবি জেগে নেই, ঘুমিয়ে...