.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

মঙ্গলবার, ১৪ মার্চ, ২০১৭

কালিকাপ্রসাদ বেঁচে থাকবেন


ভাল লাগল বলে তুলে রাখলাম---সুশান্ত কর 




কালিকাপ্রসাদের প্রয়াণের পর তিনদিন হয়ে গেল, এখনও ঘটনার শক কাটছে না। এরকম নয় যে আমি তাঁকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনতাম, কিন্তু শিল্পী, বিশেষতঃ একজন সঙ্গীত শিল্পী, যাঁর কন্ঠ আমাদের জীবনের বিভিন্ন ওঠাপড়ার মুহূর্তের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তাঁর চলে যাওয়ায় আত্মীয়বিয়োগের ব্যথা তো বাজবেই। আর তার সঙ্গেই ঘুরেফিরে আসছে, কালিকাপ্রসাদ ও তাঁর কর্মকাণ্ডের স্মৃতিগুলি। কালিকা সম্ভবতঃ ১৯৯৭-৯৮ নাগাদ কলকাতায় আসেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশুনো করতে। কিছুদিনের মধ্যেই দোহার গানের দলটি গড়ে ওঠে। নব্বইয়ের শেষভাগ কলকাতায় ব্যান্ড-সঙ্গীতমুখর ছিল। নতুন করে ফিরে আসে মহীনের ঘোড়াগুলি। এর পাশাপাশি পরশপাথর, ক্যাকটাস, চন্দ্রবিন্দু, অভিলাষা, ফসিলস ইত্যাদি উঠে আসতে থাকে। লক্ষ্যণীয়, ব্যান্ডগুলির দুটি প্রধান ধারা ছিল- ১) গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় আর্বান ফোক বাদ্যযন্ত্র নির্ভর গান বাঁধা, ২) কবীর সুমনের হাতে পুনরুজ্জীবিত বাংলা কাব্যগীতির ধারা। এখানে দোহার ছিল স্বতন্ত্র। তাঁরা অবশ্য নিজেদের ব্যান্ড না বলে গানের দল বলতেন। কিন্তু স্বতন্ত্রতা এই কারণে যে কলকাতার চালু সাংগীতিক ধারার বাইরে কালিকাপ্রসাদ ও তাঁর সঙ্গীরা লোকসংগীতের একটি অন্য অবয়ব এনে ফেলেছিলেন। আবার, এক দিক থেকে দেখলে ৯০ এর শেষভাগ বা তৃতীয় সহস্রাব্দের শুরুর বছরগুলি লোকসংগীতের নতুন ভাবে ফিরে আসার দিনকালও ছিল। অভিজিৎ বসু, তপন রায় প্রমুখেরা নতুন করে গবেষণাভিত্তিক গানের পরিবেশ্ন করছেন সেই সময়টায়। কালিকাপ্রসাদরা এই পরিমণ্ডলে দুটো অভিনব জিনিস করে ফেললেন। তবে সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটু মূলধারার সংস্কৃতিজগত নিয়ে দুলাইন লিখে নিই। সেটা লেখা দরকার, নইলে কালিকাপ্রসাদের অবদানটা বুঝতে অসুবিধা হবে।
মানুষের কৃষ্টি সংস্কৃতির জগৎ বিশাল। তার বিভিন্ন আঙ্গিকে অনেক আকর্ষণীয় জিনিসপত্র হরদম ঘটে চলেছে। তবে গড়পরতা মানুষের কাছে তার কতটুকুর খোঁজ থাকে? দিনগত পাপক্ষয়ের মধ্যে আমরা আমাদের নিজেদের পাশের বাড়িরই খবর নিতে ভুলে যাই। আর সেইজন্যই ভরসা করি মূলধারার সংবাদ পরিবেশকদের উপর, মূলধারার গানবাজনার অনুষ্ঠান, ক্যাসেট সিডি প্রচারক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির উপর। তো, কালিকাপ্রসাদরা, এই মূলধারার কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বরাক উপত্যকার জীবনকে এনে ফেললেন। সচরাচর কলকাতা বাংলাভাষিক ভারতীয়র সবক্টি প্রত্যন্তকে নিজের ভিতরে নিয়ে নেয়, নিজেকে চাপিয়ে দেয় তাদের উপর। কিন্তু, কালিকাপ্রসাদরা যেটা করলেন, তা হল বরাক উপত্যকয়ার ভাষাসংগ্রামের ইতিহাসকে দৃষ্টান্ত করে টানিয়ে দিলেন কলকাতা শহরের উপর। আমরা জানলাম যে এদেশে আমাদের চারপাশের শহর সীমানার বাইরে আরও বিস্তীর্ণ বাংলা আছে। রয়েছে বাঙালির বেঁচে থাকার গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যও। এর আগেও বহির্বাংলা থেকে বহু শিল্পী, গুণিজন শহর কলকাতায় এসেছেন, কিন্তু তাঁদের খুব কম লোকই বহির্বাংলাকে কলকাতার মাটিতে এইভাবে গেঁথে তুলতে পেরেছেন। আর, কালিকাপ্রসাদের কাজের ধারাও হয় উঠল তাই। এপার বাংলা-ওপার বাংলা-অপার বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের মুখে মুখে ফেরা গানকে মূলধারার সংস্কৃতিতে নিয়ে আসা। তুলে আনা ছড়িয়ে ছিটে থাকা মহান লোকশিল্পীদের।
যেটা আগে বলছিলাম, নব্বইয়ের শেষ বা দুহাজারের শুরুর দিকে লোকসঙ্গীত নিয়ে একটা নতুন উৎসাহ তৈরি হচ্ছিল। সাধারণতঃ লোকসঙ্গীতের চর্চার সঙ্গে রাজনৈতিক আলোড়নের একটা যোগ থাকে। কিন্তু, এইসময়ে প্রকাশ্যে আলোড়ন না থাকলেও রাজনীত-সমাজনীতির জগতে একটা অন্তর্লীন অস্বস্তি তৈরি হয়ে গেছিল। সোভিয়েতের পতনের পর থেকে পুঁজিবাদের থাবা বিশ্বে তীক্ষ্ণতর হয়ে আসে আর বিশ্বায়ন আর নয়া-উদারবাদের ধাক্কা মানবসমাজের কাছে খুবই দুরূহ হয়ে ওঠে। স্থানিক পরিচিতিগুলো ভেঙে যেতে থাকে বড় পুঁজির মুনাফার চক্করে। কিছু মানুষ বোধ করতে থাকেন মাটির কাছে ফিরে যাওয়ার দরকার, দরকার মানুষের আবহমান বেঁচে থাকার সূত্রগুলি ফের খুঁজে পাওয়ার। পরিবেশের বিপন্নতা সেই প্রয়োজনকে ফের মনে করিয়ে দিতে থাকে। কিন্তু, সেই সূত্রগুলো তো আমরা হারিয়ে ফেলেছি গত কয়েক প্রজন্ম ধরে। পরম্পরালালিত সংস্কৃতির মূল যে যাপন, যা সাধনা তা প্রায় বিস্মৃতই আজ। প্রতিষ্ঠিত বাউল আজ যখন দেশ বা বিদেশের অনুষ্ঠানে কটি বহুল প্রচলিত গান ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গান, তার মধ্যে তার সাধনার পার্টটাই অনুল্লেখিত থাকে। লোকশিল্পের আকর রয়েছে লোকধর্মে। অথচ গত কয়েক প্রজন্মের অভ্যাসে আমরা ধর্মীয় আচরণমালাগুলিকে তাচ্ছিল্যই করতে শিখেছি। এমন কী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিও মূলধারায় গ্রহণযোগ্য হতে সাধনার বিষয়কে সরিয়ে রেখে সামাজিক কাজগুলিকে হাইলাইট করে। গত প্রজন্মের লোকশিল্পী, যাঁরা কলকাতায় জনপ্রিয় হয়েছেন, তাঁরাও খুব এর বাইরে ছিলেন না। সারবস্তুকে সরিয়ে রেখে মুলতঃ ফর্ম আর পরিবেশনের দিকে জোর দিয়ে লোকসংগীত গাওয়া হয়েছে সরচরাচর। তহচ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যাঁরা গানগুলি বেঁধেছেন তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ধর্মচর্চা করা। নিজেদের সাধনার কথা, ধর্মমার্গের তত্ত্ব আলোচনা বা ব্যাখ্যার জন্য বাউল ফকির গোঁসাই সাঁইরা এই পদ্গুলি রচনা করেছেন। সৌন্দর্য সৃষ্টি একটা গৌণ ব্যাপার ছিল, অন্তর্নিহিত রূপ বহিরঙ্গেও বেরিয়ে এসেছে তাই। কিন্তু, দেহতত্ত্ব, শুদ্ধাভক্তি বা মারফতি আলাপের মূল বক্তব্য বাদ দিয়ে এই গান কখনওই নয়। কালিকাপ্রসাদ তাঁর পূর্বজদের মতন শুধু বহিরঙ্গে গানগুলিকে ধরেন নি। শ্রদ্ধাশীল থেকেছেন সাধকদের মূল উদ্দেশ্যের উপর। আর লোকায়ত ধর্মের এই অজানা হয়ে আসা ধারা, যা বাজার-পুঁজিবাদের আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে এক অন্য পৃথিবীর কথা বলতে পারে, বলতে পারে আল্লার ধন রসুলরে দিয়া, গেলেন আল্লা ফকির হইয়া, রসুলের ধন খাজায় পাইয়া শুইয়া রইলেন আজমিরে’- কালিকাপ্রসাদ বিশ্বাস রেখেছেন সেই পৃথিবীর উপর। সম্ভবতঃ তিনি নিজে সাধক ছিলেন না, কিন্তু লোকায়ত ধর্মের মানব-কেন্দ্রিক এসেন্স প্রচারের এক সৈনিক ছিলেন। তাঁর গানের পরিবেশনায়, বিভিন্ন অনুষঙ্গে, ব্যাখ্যানে তিনি জানিয়ে যেতেন আয়নামহলেরও যে একটা বাস্তব আছে, সেই হদিশটুকু। একদিক থেকে বজ্রযান বৌদ্ধতন্ত্র, আরেকদিক থেকে তুর্কি সুফিদর্শন, আর তার উত্তরকালে বৈষ্ণব-শাক্ত সাধকদের চর্চা, সব মিলে কৃষিবাংলার যে নিজস্ব বেঁচে থাকা ছিল। যে বেঁচে থাকায় অন্যকে আক্রমণ করতে, তাকে উত্যক্ত করতে হত না, আপনার রূপে আপনি বিভোর হয়ে থাকা যেত- সেই বেঁচে থাকার খোঁজ মূলধারার তথ্য-সংস্কৃতির মাধ্যম ব্যবহার করেই ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন তিনি। আমরা আশা রাখি তাঁর দল, তাঁর অনুগামীরা সেই চর্চা অব্যাহত রাখবে।
প্রসঙ্গতঃ, কালিকার প্রয়াণও আমাদের এক শিক্ষা দিয়ে গেল। কতটা দরকার এই সীমাহীন গতির নেশা আর সেই নেশার জোগান দিতে সমাজ-রাষ্ট্রের সম্পদগুলিকে খরচ করে চলা? চাষীর জমি দখল করে মাইলের পর মেইল এই দ্রুতগতির পরিকাঠামো আদৌ কি সেই রকম আবশ্যিক, যেভাবে একে দেখানো হচ্ছে? জল-মাটির গান যিনি গাইতেন, তাঁর তো লাশ হয়ে জলামাটিতে পড়ে থাকার কথা নয়। ঐ জলা তো বস্তুত তাঁর জীবন, যা উন্নয়ন আর প্রগতির চক্করে পড়ে তাঁর জীবননাশী হয়ে দাঁড়াল? কালিকাপ্রসাদ যে পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতেন, তা দৌড়ে হারিয়ে যাওয়ার পৃথিবী নয়। ধীরে বাঁচার, উপভোগ করে বাঁচার, অন্যকে বাঁচিয়ে রাখার পৃথিবী। আর, বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে, সেই স্বপ্ন বেঁচে থাকবে বাংলার জলমাটিতে, বাংলার কৃষকের জীবনচর্চায়, তাঁর ধর্মে, তাঁর সংগীতে। কালিকাপ্রসাদও বেঁচে থাকবেন।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন